বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০০৮

রূপক কর্মকারের শাহরিয়ার-প্রজেক্ট!

ঘটনাটি ঘটেছে সচলায়তনে। কদিন আগে রূপক কর্মকার নামে এক "অতিথি ব্লগার" সেখানে নাযিল হলেন। তাঁর লক্ষ্য ব্লগের খাতায় কবি আবু হাসান শাহরিয়ারকে প্রমোট করা। সচলায়তনের কেউ কেউ শাহরিয়ার-ভক্ত, ফলে কাজটি তেমন কঠিন নয়। তিনি নাযিল হলেন আবু হাসান শাহরিয়ার-এর একটি সাক্ষাৎকারসহ। সেখানে আ হা শা সচলায়তনের ব্লগারদের "বিশ্ব নাগরিক" জাতীয় বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন। আর যায় কই? সচলায়তনের ব্লগাররা ঝাঁপিখোলা কৃতজ্ঞতা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন ঐ পোস্টে, শাহরিয়ার-বন্দনায় এবং আত্মতুষ্টিতে সচলায়তন বরাবরের মত মুখর হয়ে উঠল। অভিষিক্ত হলেন রূপক কর্মকার নিজেও, তবে সেটি শাহরিয়ার-এর বার্তা পৌঁছে দেয়ার কারণেই। নিজেও তিনি কোনোভাবেই নিজেকে বিশিষ্ট করে তুললেন না, নির্লোভ বার্তাবাহকের মতই দায়িত্ব পালন করলেন। অবাক লাগল! কে এই শাহরিয়ারময় রূপক কর্মকার, শাহরিয়ারের সিগনেচার ছাড়া ত্রিভূবনে যার অস্তিত্ব কিছু নাই। ভাবলাম হতে পারে, কতরকম ভক্তই না জগতে থাকে, প্রভুর পায়ে জীবন সঁপে দেয়া ভক্তেরই কাজ বটে।

কিছুপরই বুঝলাম, যত নখদন্তহীন নির্লোভ ভাবা হচ্ছিল তিনি ততটা নন। সচলায়তনের ব্লগার পলাশ দত্ত ও মুজিব মেহদীর সাথে রীতিমত পায়ে পা দিয়ে গ্যাঞ্জাম বাঁধানোর ধরন দেখে সেটা আঁচ করা গেল। পলাশ দত্তের কবিতার সমালোচনা করতে গিয়ে যেরকম কৃপাণহস্ত এবং কনফিডেন্ট লাগল রূপককে, মনে হল তাঁর ওপর আবু হাসান শাহরিয়ারের আত্মা যেন ভর করেছে! মুজিব মেহদীর সাথে তর্ক করতে গিয়ে তিনি সেই স্বর অব্যাহত রাখলেন, এবং তাঁর সমর্থনে আরো আরো শাহরিয়ার-ভক্তের আবির্ভাব হতে থাকল সচলায়তনে। মজার বিষয় হল, নতুন এই ভক্তরা কেউ সচলায়তনের নিয়মিত ব্লগার নন, "অতিথি" মন্তব্যকারী। শেষ বোমাটা ফাটালেন সচলায়তন কর্তৃপক্ষ। তারা জানালেন যে রূপক কর্মকার এবং তার সমর্থক-মন্তব্যকারীদের আইপি একই। অর্থাৎ একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন নামে কাজ চালিয়েছেন! ভাগ্যিস আবু হাসান শাহরিয়ার-এর আইপি জানেন না তারা! অবশেষে এই ধরনের প্রতারণার অভিযোগে ব্যান খাইলেন রূপক বাবু!

আবু হাসান শাহরিয়ার-এর ইন্টারভিউ পড়ার পর মনে হচ্ছিল যে, তিনি সচলায়তনে প্রবেশ করতে চান। কিন্তু সচলায়তনের প্রবেশপথ তার আকৃতির তুলনায় বেশ ছোট, ততটুকু মাথা নুইয়ে ঢোকার ব্যাপারে শাহরিয়ারের মন হয়ত সায় দিচ্ছিল না। তাই সচলায়তনে রূপকবাবুর আগমন, দরজা বড় করার জন্য, "স্বাগতম" লেখা আলাদা গেট বানানোর জন্য। আইকন হয়ে প্রবেশ করতে চান তিনি, আইকন হয়েই বিহার করতে চান। আবার "প্রিয় কবি"কে এই ব্লগে দেখতে পাবার জন্য আকূল হয়ে উঠেছিলেন অনেকেই। তাতে রূপক বাবু হয়তো একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন! গুরুর স্টাইলে ছড়ি ঘোরানোর মকশো করতে গিয়েই তীরে এসে তরী ডুবলো তার! তরী ডুবলো কার?

আবু হাসান শাহরিয়ার-এর সাংগঠনিক প্রতিভা আছে, আবার অনেকেই তাঁকে কবি মনে করেন। আমি অবশ্য খুব পড়ে দেখি নি, বিচ্ছিন্ন দুচার লাইন এখানে ওখানে দেখেছি, তাতে পড়বার আগ্রহ তৈরি হয় নি। কিন্তু তারেক রহিমের কী হবে? তার মুখটা মনে করে আমার কষ্টই লাগছে, ডাই-হার্ড শাহরিয়ার-ফ্যান সে, রূপক-কর্মকার কেলেংকারির মূল প্রণোদনা কোত্থেকে এল, এটা বোঝার মত যথেষ্ট বুদ্ধি ওর আছে আমি জানি।

রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০০৮

হয়তো জীবন এদের কাছে এতো ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট নয়!

প্রবাসের মাটিতে বসে যেসব "শিক্ষিত" বাঙ্গালছানা "আস্তিক-নাস্তিক" জাতীয় সৌখিন, বস্তাপচা ও এলিটিস্ট তর্কে কম্যুনিটি ব্লগের তাওয়া গরম রাখেন তাদের বিদেহী বিবেচনাবোধের জন্য এই ভিডিওটি। এটি আল-জাজিরা টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদন, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন নিয়ে। এ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ আছে কিছু, পরবর্তীতে লিখবো। আমার মতো বৃত্তির নিরাপত্তা নিয়ে নয়, জমিবেচা টাকায় হাড়ভাঙ্গা শ্রম দিতে এরা বিদেশ গেছেন। মেয়াদ শেষে আমার মতো পারমানেন্ট রেসিডেন্টশিপের দরজায় দাঁড়াবেন না, ফিরে আসবেন পরিবারের মাঝে। তবু ক্রীতদাসের জীবন তাদের। তারা জানে ঈশ্বর তাদের পক্ষে নয়, তারা এও দেখেছে দেশের হাইকমিশন আরেক রক্তচোষা, তবু তারা উপাসনা করে, তবু তারা দেশের বাসি পত্রিকার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আমি ভাবি কেন এই অস্তি, কেন অস্বীকার নয়? কেন নিখিল নাস্তির স্রোতে ভেসে যাওয়া নয়?

হয়তো জীবন এদের কাছে এত ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট নয়!

শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০০৮

নিকনবীর অন্তর্ধান ও আমারব্লগের ভবিষ্যত

আগের পোস্টে হযরত মুহম্মদ নিকধারী এক ব্লগারের কথা লিখেছিলাম। আমার ধারণা ছিল আমারব্লগ কর্তৃপক্ষ তাকে ব্যান করেছেন। পরে জানা গেল তাকে ব্যান করা হয় নাই, নিজেই তিনি "প্রাইভেট" বলয়ে চলে গেছেন। আজকে সকালে উঠে দেখলাম ইনি আর নাই। শূন্য ভিটায় চোরছ্যাচ্চড়দের বিড়ির পাছা পড়ে আছে।

এই অন্তর্ধানের রহস্য কি? মনে রাখতে হবে গতকাল প্রতিবাদী ব্লগাররা যখন দলে দলে আমারব্লগ ছাড়ছিলেন, তখনো নিকনবী বুক ফুলিয়ে বহাল তবিয়তে তার ভিটাবাড়িতেই ছিলেন। অর্থাৎ তাদের প্রস্থানে নিকনবী এবং তার উম্মতরা ভয়ের কিছু দেখেন নি। হয়ত আরামই পেয়েছিলেন। হয়ত এটাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল।

কিন্তু মডারেশনহীন আমারব্লগের কারিগরদের জন্য এটা কাম্য ছিল না। বিশেষত যারা চলে যাচ্ছিলেন তারা মোটামুটি আমারব্লগেই ব্লগিং করতেন। রিলিজিয়াসলি। এদের তৎপরতার দ্বারা আমারব্লগের একটা চেহারা দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। আমারব্লগ নিজের পাটাতন খুঁজে পাচ্ছিল। কিন্তু সেটা অনেকেরই কাম্য নয়, অনুমান করি। তারা মুক্তচিন্তা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমারব্লগকে ডাম্পিং জোন বানিয়ে মজা দেখতে চান। এসব ধান্দাবাজ হিপোক্রেটদের কথা আমি আমার পোস্টে লিখেছিলাম। বলেছিলাম যে এইসব নিকেরা এখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে বড় বড় ভাষণ দেয়, কিন্তু সচলায়তনের পর্দায় ডান্ডাবেড়িসহ অনাবিল অভিনয় করে চলে। প্রশ্ন করেছিলাম এরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এত ডাইহার্ড সমর্থক হওয়া সত্বেও সচলায়তনে পড়ে আছে কেন? যেখানে আমারব্লগ তাদের মতপ্রকাশের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য "নো মডারেশন" পলিসি দিয়ে আপ্যায়ন করছে? বলেছিলাম, "একই লোক এক জায়গায় মডারেটেড হয়ে লিখছে, আবার এখানে এসে মডারেশন ছাড়া লিখছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তার ব্যক্তিগত কোনো অবস্থান নেই। এরা আসলে ভীষণরকম পজেসিভ, ওয়েবে যতরকম ঠাঁই আছে সবখানেই একটা ফাৎনা ফেলে রাখতে চায়। এদের আমি হিপোক্রেট মনে করি।

এখন দেখা যাচ্ছে, আমার ব্লগের “নো মডারেশন” নীতির সুযোগে এইসব হিপোক্রেসি পার পেয়ে যাচ্ছে। একদিকে আমার ব্লগ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে উচ্চাসন দিচ্ছে, আবার অন্যদিকে এইসমস্ত হিপোক্রেসিকেও প্রমোট করছে নিজের অজান্তে।"

সম্ভবত এগুলো আমারব্লগ কারিগরদেরও মনের কথা ছিল। আমি "মিনিমাম সেন্সিবল মডারেশন"এর প্রস্তাব দিয়েছিলাম আর সুশান্ত সেটার যৌক্তিকতা যেই খুঁজে পেলেন, আর অমনি নিকনবী হাওয়া! এ যেন ভুতের মুখে রসুন পড়ল! বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই নিকনবীর নাটক আমারব্লগে কারা শুরু করেছিল। আমি জানতাম তারা যে কোন মূল্যেই হোক আমারব্লগে মডারেশন চায় না, কারণ মডারেশন চালু হলে তাদের আন্তব্লগীয় রাজনীতি এবং বিকৃত মানসিকতার প্রদর্শন আর কোথায় করবে? ফলে পিশাচ আপাতত দরজার ওপাশে গেল, কিন্তু রসুনের মালা খসে পড়লেই আবার সে ঘাড়ে কামড় দিতে হাজির হবে ঠিক ঠিক।

আমারব্লগ "নো মডারেশন" নীতিতে চললে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি এই ব্লগে লিখিও না তেমন। বরং "নো মডারেশন" নিয়ে ব্লগটি কতদূর যায় সেটা একটা ইন্টারেস্টিং অবজার্ভেশন আমার। কেউ কেউ দেখলাম ব্লগারদের "বিবেকের মডারেশন"কেই সমাধান ভাবছেন। আমি একমত। তবে থিওরেটিক্যালি। যারা ভাবছেন এই ব্লগে সবাই একইরকম খোলা মনোভাব নিয়ে ব্লগিং করতে আসছে তারা ভুল ভাবছেন আমার ধারণা। এখানে নানারকমের আদম আছে, নানান উদ্দেশ্য তাদের। কারো কারো বিবেক আগে থেকেই মডারেটেড, বা প্রিকন্ডিশনড। বিবেকের থিওরি দিয়ে এদের জাগ্রত করা যাবে না।

আমারব্লগ আমি মাঝে মাঝে পড়ি। আমার বিবেচনায়, এই ব্লগে একমাত্র গালাগালি ছাড়া এমন কিছু দেখি নাই যা কোনো মডারেটেড ব্লগে করা সম্ভব নয়। গালাগালিগুলো বাদ দিলে বাদবাকি লেখাগুলো তো প্রথম আলো-র মত সুশীল পত্রিকাতেও ছাপা সম্ভব বলে আমার ধারণা! ফলে আমার ধারণা যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধুয়া তুলছেন তারা ইচ্ছামত গালাগালি করাকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে ভাবছেন। ফলে, এই প্রেক্ষিতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এক শ্রেণীর সাইকোপ্যাথদের যত্রতত্র মাস্টারবেশনের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মোল্লামার্কা আস্ফালনের তোপে আমারব্লগ তার মডারেশনভাবনা নিয়ে হয়ত ম্রিয়মান হয়ে গেছে। কী আর করা। বিষ্ঠাবহনের দায় থেকে আমারব্লগ নিজেকে মুক্ত করুক, একটা স্বতন্ত্র ব্লগ হয়ে টিকে থাকুক, আপাতত সেটাই চাওয়া।








শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০০৮

নবীর নামে নিক নিয়ে "আমার ব্লগ"এ তোলপাড়!

এবার সুনামি "আমার ব্লগ"এ। সেখানে এক ব্লগার নবী হযরত মুহম্মদ এর নিক নিয়ে ব্লগ লিখেছেন। আর তা নিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন অন্য ব্লগাররা। ঐ নিকধারীর চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছেড়েছেন। কেউ কেউ "আমার ব্লগ" থেকে নিজেদের (সাময়িক ভাবে) প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ঐ নিকটির অ্যাকাউন্ট ডিলিট করার জোর দাবি উঠেছে। ফলশ্রুতিতে, আমার ব্লগ কর্তৃপক্ষ যারা "নো মডারেশন" নীতিকে আশ্রয় করে এই ব্লগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারা অবশেষে হযরত মুহম্মদ নামক নিকটির অ্যাকাউন্ট আমার ব্লগ-এর পাতা থেকে ডিলিট করে দিয়েছেন।

কম্যুনিটি ব্লগিং প্লাটফর্ম হিসেবে "আমার ব্লগ"এর জন্মই হয়েছে মডারেশনের ধারণার বিপরীত প্রণোদনা থেকে। সম্ভবত সচলায়তনের স্বৈরাচারী মডারেশন পদ্ধতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে এইরকম একটি প্লাটফর্মের কথা ভাবেন তারা। যতদূর দেখেছি, এই ব্লগে মডারেটরের কোনো পদই সৃষ্টি করা হয় নি। কোনো মডারেশন নাই, ব্যান নাই, সদস্যপদের জন্য লম্বা কিউ নাই, তেল মারতে হয় না কাউকে, সব মিলিয়ে আমার ব্লগ যেন সেই মজারু দ্বীপ যেখানে সবই আছে, কিন্তু পুলিশ নাই!

ঠিক সেই মজার আহবানে নয়, একটা কম্যুনিটি ব্লগে লেখালেখি অব্যাহত রাখার ইচ্ছা থেকে আমার ব্লগ-এ আমিও অ্যাকাউন্ট খুলেছিলাম। ব্লগ লিখতেই দেখি... ওমা... সচলায়তনের সব ভ্যাম্পায়াররা এখানে হানা দিতে শুরু করলেন। আসলে গোড়া থেকেই এরা এখানে ছিলেন, নতুন কোনো কম্যুনিটি হলেই সেখানে তারা এজেন্সি নিয়ে রাখেন। তো, তাদের গায়ের গন্ধে আর পাখার ঝাপটে আমার ত্রাহি ত্রাহি দশা! গালাগালির চূড়ান্ত করে ছাড়লেন এরা। এই এরাই আবার সচলায়তনে যখন লেখেন, তখন কত নোক্ষী ছেলে! কী বোর্ড দিয়ে সব সোনা যেন বের হয়! বুঝলাম এরা সচলায়তনে সোনার ডিম পাড়েন আর আমার ব্লগ-এ লিজার্ড রিলিজ করতে আসেন। একই অভিযোগ সামহোয়ারইন-এর ব্লগাররাও করেছিলেন এদের বিরূদ্ধে, বেশ আগে। কিন্তু সামহোয়ার বড় কম্যুনিটি, এইসব হাগাহাগির থোড়াই কেয়ার করে। কিন্তু আমার ব্লগ একটা নতুন কম্যুনিটি, এখনো তার নিজস্ব কম্যুনিটি ঠিকমত গড়ে ওঠে নাই।

এখন কথা হচ্ছে, "আমার ব্লগ"এর কৌশল অনুযায়ী সেখানে হযরত মুহম্মদ নামে নিক থাকতেই পারে। কারণ এই ব্লগে কোনো নীতিমালাই নেই, মত প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ মানে না এরা। যারা এখানে লিখছেন তারা এই পজিশন মেনে নিয়েই লিখছেন, বা এই পজিশন থাকার কারণেই এখানে কন্টিনিউ করছেন। তাহলে কোন্ কারণে এরা হযরত মুহম্মদ নিককে ডিলিট করতে বলেন?

কারণ খুবই মানবিক। মুসলমানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করা যাবে না। হযরত মুহম্মদ নিকটি আদতে তাইই করতে এসেছিল বলে আমারো মনে হয়েছে। এতে ব্লগের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এটা স্বাভাবিক। আবার, আপনি যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানেন, তাহলে এইরকম নিক নিয়ে কোনো ব্লগার তার অনুভূতির কথা বলার স্বাধীনতা রাখেন এটাও মানেন। এখন সংক্ষুব্ধ ব্লগার মুকুল এবং আরো কেউ কেউ বলছেন, স্বাধীনতা মানেই যথেচ্ছাচার নয়। যা খুশি তাই করা মানেই স্বাধীনতা নয়। একটা সীমা থাকতে হবে। তাদের সীমাসন্ধানের নৈতিক চাপপ্রয়োগের ফলে আমার ব্লগ-এর মূল দর্শনের সীমানাপ্রাচীর ভেঙ্গে চুরমার। দেখলাম হযরত মুহম্মদ এর অ্যাকাউন্টটা অবশেষে ডিলিট করে দেয়া হয়েছে।

এটা বাংলা কম্যুনিটি ব্লগের ইতিহাসে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। "আমার ব্লগ" একটা অত্যন্ত সাহসী চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল যে তারা কিছুই মডারেশন করবে না। ওয়েব হবে অবারিত, স্বাধীন। এটি প্রমাণ করার মাধ্যমে তারা আসলে প্রমাণ করতে শুরু করেছিল যে সচলায়তনজাতীয় ওয়েব ব্লগিং মূলত প্রিন্টমিডিয়ার ভাবাদর্শকেই ওয়েবে ইমপোজ করার ব্যাপার। সেই একই বিধিনিষেধ, একই মানবিচার, একইরকম কাহিনী। "আমার ব্লগ"এর এই প্রজেক্ট এখন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ল। মডারেটরের অফিস খুলল তারাও।

তাহলে কি আমি বলতে চাইছি হযরত মুহম্মদ এর নিক ব্যান করা অযৌক্তিক হয়েছে? না, সেটা বলতে চাইছি না। কিন্তু এই প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর "আমার ব্লগ"এর প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে আমার পক্ষে দেয়াও সম্ভব নয়। নবীর নামে নিক যিনি নিয়েছেন তিনি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জায়গা থেকে নিয়েছেন, আবার যারা এর প্রতিবাদ করেছেন তারাও খুব অযৌক্তিক ছিলেন না। টেক্সটের শক্তি অসীম। হযরত মুহম্মদ-এর নামের সাথে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অপরপক্ষ একটু অসুবিধার মধ্যেই থাকবেন। আবার, এই নিক নিয়ে নিকধারী যা করতে শুরু করেছিলেন তাকে ম্যানিপুলেশন তো বলাই যায়। আমার মতে, একটা কম্যুনিটি ব্লগে সেটা তিনি করতে পারেন না। সেখানে নানারকম লোক আছে, তাদের নানা ধরনের বিশ্বাস বা অবস্থান আছে। কিন্তু তাই বলে তিনি অন্যায় করেছেন সেটাই বা বলি কী করে? তিনি তো এই ব্লগের চরম লিবারাল চরিত্রের সুযোগ নিয়েছেন মাত্র।

ঘুরে ঘুরে সেই পুরনো প্যাঁচাল: নৈরাজ্য না নিয়ন্ত্রণ? আমি সবসময় যেটা বলতে চেয়েছি, নৈরাজ্য যেমন নয়, তেমনি সচলায়তন-মার্কা নিয়ন্ত্রণও নয়, বরং নৈরাজ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ বরাবর একটা স্কেলে টেনে সেই স্কেলের কোন্ বিন্দুতে আপনি অবস্থান করছেন সেটা কম্যুনিটি ব্লগকে ঠিক করে নিতেই হবে। "আমার ব্লগ" ধীরেসুস্থে হয়ত সেই পথেরই পথিক হয়ে ওঠবে।


পোস্ট স্ক্রিপ্টাম: অলৌকিক হাসান তার পোস্টে জানিয়েছেন যে নিকনবীকে ব্যান করা হয় নাই, নিজেই তিনি "প্রাইভেটাইজড" হৈয়া গেছেন। সেই অর্থে আমার ব্লগের "নো মডারেশন" নীতি এখনো বহাল আছে। বিস্তারিত দেখুন http://amarblog.com/aloukik/13474 এই লিংকে।

০৩.১০.০৮


বুধবার, ১ অক্টোবর, ২০০৮

আমি দুঃখিত, অভিজিৎ!!

(আমার লেখা "ব্লগারের মৃত্যু ও ভার্চুয়াল শোকের চেহারা"কে উপলক্ষ করে মাননীয় অভিজিৎ রায় সচলায়তনের পাতায় আমার চরিত্রহননে কিঞ্চিৎ বাক্যব্যয় করেছেন। এই উপলক্ষে আমারো মনে পড়ল আমাদের পুরনো মোলাকাতের কথা। "পুরনো ক্ষতের দাগ আলো আবছায় হাসে"... বন্ধু মাহবুব পিয়ালের কবিতার লাইন। আবার "ক্ষতস্থান সেরে গেলে পুনর্বার তাতে রোম গজায় না" সেটি জানিয়েছিলেন বিনয় মজুমদার। রোম যে গজায় নাই তা আজ এতোদিন পরে টের পাইলাম। সেই অবকাশে ওয়েব খুঁজে কবিসভা থেকে পুরনো একটি লেখা পাওয়া গেল।)

অভিজিৎ রায়ের আলোচনা ও রেফারেন্স পড়লাম।

এক নম্বর পয়েন্টে তিনি আমার সাথে ঐকমত্য পোষণ করলেন দেইখা আরাম পাইলাম। অর্থাৎ তিনিও মনে করেন বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কের মধ্যে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ গুলায়া না ফেলাই উচিৎ।

দুই নম্বর পয়েন্টে তিনি আমার লেখার মধ্যে একটা ‘ভুল তুলনা’ খুঁইজা পাইছেন। অর্থাৎ, তার মতে, ধর্মগ্রন্থনির্ভর ধর্মীয় শাসনের সাথে গ্রন্থহীন সেক্যুলার শাসনের তুলনা হৈতে পারে না। মোটা হরফে লিখছেন, সাদ্দামের এট্রোসিটিকে জাস্টিফাই করে...এমন কোনো নীতি সেক্যুলারিজমে নাই।

এইখানে আইসা মানসের মত আমারও সন্দেহ হৈল। তিনি কি এই অধমের লেখাটি পড়েছেন ঠিকমত?

অভিজিৎ, আপনে খেয়াল করলে দেখবেন যে, আমি মূলত সেক্যুলারিজমের প্রাক্সিস-এর দিকটাই আলোচনা করতেছিলাম, যেহেতু, আমার জানা মতে, সেক্যুলারিজমের কোনো সর্বজনীন মূলনীতি কেউ লিখ্যা যান নাই। সেক্যুলারিজম শেষপর্যন্ত কিছু প্রাক্সিসেরই সমষ্টি। মডার্নিজমের একটা কম্পোনেন্ট হিসাবে এই বিষয়টা পশ্চিমে বিকশিত হৈছে রাষ্ট্রকে ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতা থিকা উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু, আমি বলতেছিলাম বাস্তবে কী হৈছে সেই কথা। বলতেছিলাম, সেক্যুলার রাষ্ট্রের বাতাবরণে থাইকাও রাষ্ট্রনায়কেরা যেভাবে বিধর্মী নিধন করছেন সেই কথা। তখন কিন্তু, মহান পশ্চিম, সেক্যুলার রাষ্ট্রের এইসব আচরণকে নন-সেক্যুলার আখ্যা দেয় নাই।

তারপরে, অনেকটা উপযাচক হৈয়া, জনাব অভিজিৎ একটা লিংক দিলেন, যাতে এই কবিসভার নাদান সদস্যরা বিশ্বাস, দর্শন ও ডগমার পার্থক্য ‘ভালমত বুঝতে’ পারে। আমি সেই লিংকে কিক করলাম। পাইলাম জনৈক অপার্থিব জামানের কিছু সংজ্ঞা। পইড়া বুঝতে বুঝতে আমারতো সংজ্ঞাহীন হৈবার দশা!

সংক্ষেপে বলি:

অপার্থিব ‘বিশ্বাস’ কে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়া লিখছেন 'ফেইথ' হৈল 'পারসনাল বিলিফ'.....। বাদবাকি পড়ার ধৈর্য আমার আর হয় নাই। ভাই অভিজিৎ, এইটারে টটলজি কয়, বাংলায় বলা যায়, পুনরুক্তিদোষ। ফেইথ হৈল বিলিফ! বাহ্! তারপরে আবার ‘পারসনাল’!! অর্থাৎ কোনো জনগোষ্ঠী, যেমন ধরেন ধীবর, যখন নদীর দেবতায় বিশ্বাস করে, তখন সেইটারে কিন্তু ‘ফেইথ’ কওয়া যাইব না! যেহেতু ‘পারসনাল’ না! চমেৎকার!!

অতঃপর ফিলসফির সংজ্ঞা। এইখানেও ‘পারসনাল’ আছে, সেই আলোচনা বাদ দেই, নাইলে আমার হালায় আবার টটলজি হৈয়া যাইব! ঐখানে বলা হৈছে, ফিলসফি হৈল অ্যা পারসনাল ভিউ অ্যাবাউট রিয়েলিটি....! আবার ধৈর্যহারা হৈয়া গেলাম। রিয়েলিটি কি জিনিস? যেসব বিষয় নন-রিয়াল (যেমন ঈশ্বর) সেসবের পারসনাল ভিউ তাইলে ফিলসফি হয় না? আমার রীতিমত মূহ্যমান অবস্থা!

শেষ চেষ্টা করার আর সাহস হৈল না। মাফ কৈরেন ভাই!

সাজ্জাদ শরিফ প্রায়ই বলেন, আমাদের দেশের ফিলসফিচর্চার দূরবস্থার কথা। এক্ষণে প্রমাণ পাইলাম।

..........................

বাকি থাকল, অভিজিৎ, আপনের লেখা, সেইটাও পড়লাম। আপনের লেখায় ফরহাদ মজহারের বিরূদ্ধে আপনের উত্তেজনাটাই শুধু ঠাহর করতে পারলাম। আপনের দর্শন অপার্থিব জামানের চেয়েও ভীতিকর। আপনে লিখছেন, প্লেটোর ‘অতীন্দ্রীয় রহস্যবাদী ভাববাদ’! কী জিনিস সেইটা?

এখন আমি বুঝতে পারতেছি না, কেন আপনে আমার সাথে একমত হৈলেন? আমি কৈছিলাম, ফরহাদ মজহারকে মোকাবেলা করা দরকার বুদ্ধিবৃত্তির জায়গা থিকা। আপনেও সায় দিলেন। কিন্তু আপনের লেখা পইড়া আমার মনে হৈল, ঠিক এই ধরনের চিন্তাহীন বিরোধিতার বাইরে থেকে আমি বিষয়টা দেখতে চাইছিলাম। আমার বক্তব্য রূঢ় শোনাইলে আমি দুঃখিত অভিজিৎ।


শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

ব্লগারের মৃত্যু ও ভার্চুয়াল শোকের চেহারা


মুহম্মদ জুবায়ের মারা গেছেন। ইনি প্রথম যৌবনে লেখক হওয়ার জন্য ঘর ছেড়েছিলেন এবং শেষ জীবনে লেখালেখি করবার জন্য বেছে নিয়েছিলেন ব্লগকে। সেই অর্থে ব্লগার ছিলেন তিনি, লিখতেন সচলায়তনে। আমি যখন সচলায়তনে প্রবেশ করেছিলাম, তিনি রীতিমত ছেলেমানুষের মত খুশি হয়েছিলেন। আমার দ্রুত সদস্যভূক্তির ব্যাপারে সচলায়তন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছিলেন। তারপর একদিন কথাচ্ছলে জানিয়েছিলেন যে, তিনি সচলায়তন অঙ্গনে আর লিখবেন না। সেটি সম্ভবত ডুয়াল পোস্টিং নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপের জবাবে তাঁর অভিমানী সিদ্ধান্ত ছিল। আমরা যথারীতি তাঁকে তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি তা করেছিলেন। তারপর আমি যখন সচলায়তন ছেড়ে আসি, তিনি আমার ছেড়ে আসার সিদ্ধান্তের সাথে একমত ছিলেন না। তাঁর মনে হয়েছিল আমি না ছেড়ে আসলেও পারতাম। এমনকি সচলায়তন বিষয়ে প্রথম আলো-তে লেখা আমার নিবন্ধের গীবতেও সামিল হয়েছিলেন তিনি।

মুহম্মদ জুবায়ের বিষয়ে এইটুকু লেখার পর আমি নিজে পরিষ্কার যে সচলায়তনের ব্যাপারে তাঁর শর্তহীন পক্ষপাত ছিল। খুবই ভালোবাসতেন এই ফোরামটিকে। কিছু খিটিমিটি হলেও সেখানেই লিখে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। এতই টান ছিল এই ফোরামের প্রতি যে, এই ফোরাম ত্যাগ করবার পর অন্য অনেকের মত তিনিও আমার সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রদ করে দিয়েছিলেন।

মুহম্মদ জুবায়ের-এর সাথে আমার প্রথম দেখা কবিসভায়। কবিসভা উত্তপ্ত তর্কবিতর্কের জায়গা, মনে পড়ে কোনো একটা বিষয়ে তাঁর সাথেও আমার তর্ক হয়েছিল। পরে অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিলেন কবিসভায়। মেইল করতেন মাঝে মাঝে, আমার একটি গল্পের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, শহীদ কাদরীর সাথে আমার গল্প নিয়ে তাঁর বিস্তর কথাবার্তা হওয়ার কথা। ফলে, মুহম্মদ জুবায়ের, যাঁকে আমি চর্মচক্ষে দেখি নি কোনোদিন, তাঁর ব্যাপারে একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি আমার ছিল সবসময়।

সচলায়তনে ব্লগ লিখতেন তিনি, সত্তর দশকের জীবনযাপন ও স্বপ্ন নিয়ে তাঁর চিন্তাজাগানিয়া পর্যবেক্ষণ ছিল। একটা ধারাবাহিক উপন্যাসও লিখেছিলেন। বন্ধু ও প্রবাসী লেখক লুৎফর রহমান রিটনকে সচলায়তনে নিয়ে এসেছিলেন। এই ব্লগের মডারেটরদের সাথে তাঁর দহরম মহরমও ছিল। ব্লগাতিরিক্ত যোগাযোগ ছিল। ব্লগারদের কারো কারো সাথেও। একবার তাঁর অসুস্থতা এবং ধূমপান করা নিয়ে তাঁর কন্যাটি একটি মর্মভেদী চিঠি লিখেছিলেন তাঁকে, সেই চিঠি সচলায়তনে অনেক প্রশংসাও পেয়েছিল।

এহেন মানুষটি, যিনি তাঁর যাবতীয় পক্ষপাত ও সমালোচনাসহ আমার কাছে আদ্যোপান্ত ভার্চুয়াল একটি চরিত্র, তাঁর মৃত্যুসংবাদ ঘিরে আমার ভেতর জমতে থাকা শোকের চেহারাটি আঁচ করতে চেষ্টা করি। আঁচ করতে চেষ্টা করি, মুহম্মদ জুবায়ের তাঁর ভার্চুয়াল অস্তিত্বের বাইরে কে ছিলেন, কী ছিলেন। তাঁর স্মৃতিকথা থেকে টের পাই তিনি এক স্বাপ্নিক মানুষ ছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন, সেই ধারাবাহিকতায় সমাজতন্ত্রের স্বপ্নও দেখেছিলেন। তাঁর লেখক হয়ে-উঠার স্বপ্নের সাথে সেইসব স্বপ্নকে তিনি মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিলেন। এভাবে অনেক খুইয়ে, একসময় জীবনকে গুছিয়ে নেয়ার তাড়না অনুভব করেছিলেন, বেছে নিয়েছিলেন প্রবাস জীবন। কিন্তু স্বপ্ন আর স্বপ্নকে বাস্তবে দেখতে না-পাবার বেদনা তাঁর পিছু নিয়েছিল। নিপুণ আততায়ীর মত। প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীর মত তিনিও তাঁর স্বদেশকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন। এর জন্য বেদনা পাবার দায় থেকে কখনো ছুটি নেন নি। ফলে, কর্মস্থলে, ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা স্বজনবেষ্টনীর মাঝেও তিনি ছিলেন একা। একেলা।

কিন্তু এ তো মুখস্ত গল্প। এই গল্পের উপসংহার আমরা জানি। কিন্তু আশ্চর্য হই ভেবে যে মুহম্মদ জুবায়ের সেই উপসংহারটি বেছে নেন নি। প্রৌঢ়ত্বকে জয় করে নেমে এসেছিলেন তরুণদের ব্লগে। তরুণদের চোখভরা স্বপ্নের জগতে হয়ে জুবায়ের যেন বুড়ো বাতিওলা! এ এক জয়ের নেশাই বটে! মনে পড়ে, এমনিতর নেশার টানেই সরকারি চাকুরি থেকে অবসর নেয়া কবি মুস্তাফা আনোয়ার আমাদের উদ্দাম জীবনের সাথে সমানে সমানে পাল্লা দিতেন। গ্রেস নিতেন না একদমই। মুহম্মদ জুবায়েরও তাই। জরাগ্রস্ততার অমোঘ খপ্পরে পড়বার আগে মানুষের শেষ রোমান্টিক দ্রোহ!

কিন্তু আজ যখন মুহম্মদ জুবায়ের মারা গেলেন, আমি বিষণ্ণ হয়ে থাকলাম এই ভেবে যে এই নামটিকে ঘিরে আমাদের অন্তহীন ভার্চুয়াল জগতে আর কোনো গালগল্প তৈরি হবে না। মুহম্মদ জুবায়ের এর নামে আর কোনো ব্লগ বা উপন্যাস আপলোড হবে না, যেগুলো পাঠ করে করে আমরা তাঁকে চিনতে থাকবো, তাঁর ব্যক্তিত্ব তৈরি হতে থাকবে আমাদের পারসেপশনের আঁকাবাঁকা গলির ভেতর। শোকের অক্ষর উপচে পড়ছে সচলায়তনে, অন্যান্য ব্লগেও। ভাবি, এই শোকটি কেমন? কিছু টেক্সটের জন্য কিছু টেক্সটের শোক, নাকি টেক্সট-উত্তর অচেনা যোগাযোগহীন ব্যবহারিক জীবনে এর কোনো অভিঘাত তৈরি হয়? মুহম্মদ জুবায়েরকে আমরা তো চিনেছি তাঁর টেক্সট দিয়েই, অর্থাৎ তাঁর লেখাকে তাঁর ব্যক্তিত্বের উপরে আরোপ করে নিয়েছি আমরা। রলা বার্থ যেমন বলেন, লেখকের অস্তিত্ব বা বিদ্যমানতা তাঁর লেখার স্বাতন্ত্র্যকে বাধাগ্রস্ত করে। সেই অর্থে, ব্লগার মুহম্মদ জুবায়ের-এর মৃত্যু যেন প্রতীকী! যেন তিনি তাঁর মরণ দিয়ে মুক্ত করে গেলেন তাঁর রচনারাশিকে, আমাদের মননে তাঁর ব্যক্তিত্বের সংগঠন প্রক্রিয়া থেকে। টেক্সটের বাইরে সত্যিকারের যিনি জুবায়ের, যার একটা ফুসফুস অকেজো ছিল অনেকদিন, যিনি অনেকের বন্ধু, ভাই বা পিতা, তার শরীরী মৃত্যুতে আমাদের ভার্চুয়াল-পেরোনো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীজীবন কতখানি শোকতপ্ত হবে? সেই অর্থে এটি অথরের মৃত্যু, একটি টেক্সচুয়াল মরণ। এই টেক্সচুয়াল মরণের স্মরণে আমরা যে শোকগ্রস্ত হচ্ছি সেটিও টেক্সচুয়াল, এবং টেক্সটের বাইরেও যদি এর সন্তাপ আমরা অনুভব করি, তবে সেও টেক্সটেরই সামর্থে।

আরেকটা বিষয়: মার্কেজ একটি উপন্যাসে যেমন লিখেছেন, কেবলমাত্র মৃত্যুই মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির যোগ ঘটাতে সক্ষম। অর্থাৎ যে মাটিতে আমার অধিষ্ঠান সেখানে আমার পূর্বপুরুষের কবর থাকলেই সেটা অনেক দৃঢ় হয়ে ওঠে। মুহম্মদ জুবায়ের-এর মৃত্যুশোক তাঁর ব্লগিং ফোরাম সচলায়তনে সেইরকম ইতিবাচক একটি প্রভাব ফেলবে মনে হয়।

বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

কখনো যাই নাই বিদ্যাকূট

চোখের সামনে পুড়ছে আমার মনসুন্দর গ্রাম
আমি যাই নাই রে, আমি যাই নাই

- কফিল আহমেদের গান

১.
কখনো যাই নাই বিদ্যাকূট!

উরখুলিয়া গেছি, বিদ্যাকূটের পাশের গ্রাম। এক সন্ধ্যার কথা মনে আছে, উরখুলিয়ার গ্রামছাড়া জোতদার রেজেক মিয়ার পোড়োবাড়িটা দেখতে গেছিলাম। বিশাল বাড়ি, সারি সারি টিনের চৌচালা ঘর, সেসব ঘরে কেউ নাই তখন, জিনিসপত্র সব টুকরা টুকরা করে ভাঙ্গা, টিনের প্রতিটা ঢেউ-য়ে দায়ের নিপুণ কোপ। উঠানের মাঝখানে ছোটখাট একটা পাহাড়, ভাঙ্গা সিরামিকের জিনিসপত্রের ।

উরখুলিয়া একটা অদ্ভূত মাথাগরম জায়গা। তিতাসের পাড় ধরে লম্বালম্বি একটা গ্রাম, ঠিক চিলি দেশটার স্টাইলে। গ্রামের অর্ধেক লোক থাকে ইটালি। তারা টাকা পাঠায়, আর সেই টাকায় দুই গোষ্ঠীর শতবছরের পুরানো ঝগড়াটা ফি বছর ঝালাই হয়।

ঝগড়ার উপলক্ষ?

শুনলে হাসবে উরখুলিয়ার লোকেরা। উপলক্ষ নো প্রবলেম, জিয়াউর রহমান স্টাইলে। কোনো উপলক্ষ পাওয়া যাইতেছেনা, ঠিকাছে, ঐ যে জালাইল্যা আছে না, জ্ঞাতিগোষ্ঠী নাই, এতিম পোলা, ঘরে মা একলা, ওরে ফালায়া দাও! তারপর কেইস নিয়া সোজা নবীনগর থানায়।

জালাইল্যাকে আমি চিনতাম। এক পা খোঁড়া, কিন্তু কাইজ্যার আগে সবসময়। ভ্যানগার্ড।

জালাইল্যার খুনের এই পরিকল্পনা কিন্তু প্রতিপক্ষের নয়, তার স্বপক্ষেরই। আবার এই স্বপক্ষের কোনো উপদলীয় কোন্দলের ফসল নয় এই সিদ্ধান্ত। যারা এই নীলনকশা করেছে তারা সবাই জালাইল্যার সমঝদার। কিন্তু কি করা? দুইশ বছরের পুরনো 'বাইশাবাইশি', অনেক রক্ত খায়! তার তৃষ্ণা মিটাতে গেলে নিজের পরের বাছাবাছি করনের সুযোগ কমই থাকে।

যারা জালাইল্যারে ফালাইয়া দিল, তারাই গায়ের কাপড় বদলায়া নবীনগর থানায় গিয়া ফৌজদারি মামলা ঠুকল। তারপর বাজার করল, টর্চলাইটের জন্য দোকান ঘুইরা একনম্বর সানলাইট ব্যাটারি কিনল, জালাইল্যার মায়ের জন্য নতুন জায়নামাজ ও তসবি কিনল, তারপর বাড়ি ফিরবার আগে হাউজির মাঠেও দুইচক্কর দিল।

আর যারা ঘুম থেকে উঠে শুনল তারা খুনের মামলার আসামি, তাদের হৈয়া অবাক হৈলেন বিধাতা। তারাও ঘরের কালার টেলিভিশন, অষ্ট্রেলিয়ান গাভী, ডেকসেট ও ক্যামেরা পাশের গ্রামের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠায়া দিল, ঘরের মেয়েমানুষের হাতে দরকারি টাকাপয়সা গুঁজল, তারপর সোজা লঞ্চে হয় ভৈরব না হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

সেই উরখুলিয়ার পাশের গ্রামই বিদ্যাকূট। আমি উত্তপ্ত উরখুলিয়ায় বসে বসে বিদ্যাকূট নিয়া ঈর্ষায় জ্বলতাম। বিদ্যাকূটে কোনো পুলিশ ক্যাম্প লাগে না, সেই গ্রাম থেকে শরনার্থী আসে নাই কোনো দিন এই উরখুলিয়ায়। দূর থেকে দেখেছি, অদ্ভূত একটা গ্রাম, খড়ের গাদায় রোদের ঝিলিক লেগে এখান থেকেও আমার চোখ চিকচিক করে।

কবে যাবো বিদ্যাকূট, ভাবতাম পুরুষশূন্য উরখুলিয়া গ্রামে হাঁটতে হাঁটতে।

ফরহাদ মজহার-এর সাম্প্রতিক কবিতা প্রসঙ্গে


বয়স বিচারে ফরহাদ মজহার কবিতা সঞ্চালনে সবচে বয়োজ্যেষ্ঠ কবি। বাঙালি কবিদের বয়োজ্যেষ্ঠতাকে আমরা, উত্তরসূরী হিসেবে, একটুখানি কৃপাসহযোগে পাঠ করতে অভ্যস্ত। কিন্তু ফরহাদ মজহার সেই আয়েশটুকুর সুযোগ রাখেন নাই এই কবিতাসমূহে। এবং তার অপরাপর কবিতায়। তিনি সবসময় তরুণতর, নিজেকে সমসাময়িক দেখতে ভালবাসেন। আমরাও তাকে অনেক বছর এভাবে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ফলে, এটা তাকেই মানায় যে তিনি ‘ফরিদার জন্য ক্যামেরাগিরি’ করবেন, 'সাড়ে সাতরকমভাবে' তাকাইবেন শালিখ পাখির দিকে।

নানারকমভাবে ফরহাদ মজহার-এর কবিতার বয়স বেড়েছে। ‘ভেজা কবিতা’য় বৃষ্টি তাকে তার দিদির জন্য উদ্বিগ্ন ও সজল করে তোলে। দিদির জন্য আকুল ফরহাদকে তখন আর প্রৌঢ় লাগে না, সেই কিশোরের মত লাগে যে চোখফুটে প্রথম বর্ষা দেখছে:

জলে জলে ভিজছে শহর, জলেতে ইস্পাত
একটি হলুদ মোটরগাড়ি জলেতে চিৎপাত।
দালানগুলো ভিজছে একা কারখানাতে পানি
জলের মধ্যে যুগল ভাসছে কবি ও বিজ্ঞানী।

বেড়েছে না বলে কমেছে বললেই মানায়। কেননা তিনি যখন বিছানা নিয়ে কবিতা রচনা করেন, যেখানে মানবশয্যার দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে জ্ঞান ফলানোর সুযোগও থাকে:

আমার ঘরের একপাশে আয়তত্রে হইয়া বিছানাটি কী সুন্দর অঙ্কিত হইয়া আছে
বিছানা অবধি পোঁছাইতে সভ্যতাকে কত পথ পাড়ি দিতে হইয়াছিল একবার ভাবিয়া দেখো


কিন্তু এরপর তিনি বিস্ময়কররকম ভাবে তার জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করেন। হামলে পড়তে দেন নি বেচারা বিছানার (এবং কবিতার) ওপর। অত্যন্ত শিক্ষণীয় এবং অনুকরণীয় নিরাসক্তি। তরুণদের জন্য। আমরা যারা আমাদের যৎসামান্য র‌্যাশনালিটিকে কবিতার পেছনে লেলিয়ে দিই। আসুন দেখি ঐ দুই লাইনের পর কবি ফরহাদ মজহার, যিনি আবার একাধারে সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতি বিশ্লেষক, উন্নয়ন-চিন্তক এবং তত্ত্বালোচক, কোনদিকে গেলেন:

বিছানার ওপর বালিশটি পড়িয়া আছে, একটি মস্তকের জন্য তার নীরব নিঃশব্দ অপেক্ষা
একটি শরীর পাইবার আশায় বিছানাটি মৃতদেহের মতো গভীর গর্ত হইয়া আছে।

তত্ত্ব নাই, ইতিহাস নাই, সমাজবিজ্ঞান নাই। তাদের নির্যাস আছে হয়ত। কিন্তু আক্রান্ত করে না। কারণ, এখানে কবিতা আছে।

মনে পড়ে, ১৯৭৫ এ লেখা একটি প্রবন্ধ সংকলনে (বইয়ের নাম ছিল "প্রস্তাব") ফরহাদ মজহার তার চেতনাপ্রবাহে বিজ্ঞান, কবিতা, দর্শন, নৃতত্ত্ব সবকিছুকে একীভূত করে দেখতে প্রয়াসী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সময় কত বদলায়! এখন ফরহাদ যখন কবিতা রচনা করেন, তখন তিনি একান্তভাবেই কবি থাকতে চান।

আরেকটা বিষয়। ফরহাদ মজহারই সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে এখন একমাত্র কবি যিনি তরুণদের একটা ভাষাপ্রকরণচিন্তা, যার মেনিফেস্টেশনও পুরোপুরি হওয়া বাকি, সেটা দিয়ে নিজেকে আক্রান্ত করার সাহস দেখাতে পারেন। জয় হোক তাঁর।

২০০৫


শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

অতিগরিবের ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনার ভেতরে কোনো এক দিপালীর আত্মহত্যা



ভৈরবের দিপালীদের পরিবারে এখন অন্য অবস্থা। চাল আসছে, ডাল আসছে, এনজিও আসছে, ভিজিএফ কার্ড আসছে, ওয়ার্ড কমিশনার এসে সকালসন্ধ্যা খোঁজ নিচ্ছে। মেঘ না চাইতেই ঝড়!

ঝড়-ই তো। দিপালী যখন গলায় দড়ি দিয়ে ক্ষুধার জ্বালা চিরতরে মিটাল, তখন দিপালীর পঙ্গু বাবা ভাবছিলেন মেয়ের অন্তিম সৎকারের অর্থ জোগান দেবেন কিভাবে? কিন্তু কোত্থেকে কী যেন ম্যাজিক হয়ে গেল, মেয়েটা মরে গেল, আর সঙ্গে-সঙ্গেই রূপকথার মত অদ্ভূত সব ঘটনা। যে সমস্ত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের স্বপ্নও তিনি দেখেন নি, তারা এসে হাজির: সমবেদনাসহ, খাদ্যসহ, চাকরিসহ। একের পর এক রিকশা আর মোটরসাইকেল এসে থামছে তার ছাপড়ার সামনে, হতভাগা মেয়েটার জন্য মনের মধ্যে এক পশলা শোকও জমতে দিচ্ছে না।

পালা করে খেত দিপালীর পরিবার। আটজনের এই পরিবারে নিয়ম ছিল, যে-চারজন দুপুরে খাবে, রাতে তারা উপোস করবে। রাতে খাবে অন্য-চারজন। এভাবেই চলছিল তাদের ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। ভালই চলছিল। গোলমালটা লাগল, যখন দিপালীর প্রতিবন্ধী এক ভাই নিয়ম ভেঙ্গে পরপর দুইবার খেয়ে বসল। তাতে দিপালীর কপাল পুড়ল, ক্ষুধার যন্ত্রণার চেয়ে তার কাছে মৃত্যুকেই বেশি শান্তির মনে হল।

এরকম হয়েই থাকে। ‘ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনা’র যে দেশব্যাপী নীরব দযজ্ঞ চলে, তার খোঁজ সরকার নেয় না, এনজিও-র ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে তাদের জায়গা নাই, সংবাদপত্রের পাতায় তার সংকুলান হয় না ঘটনাহীনতার কারণে। এরমধ্যে হঠাৎ কোনো এক দিপালী মাঝখান থেকে দুম করে মরে বসে, বিব্রত হয় মধ্যবিত্তের সিভিল বিবেকব্যবস্থা। কিন্তু না হলেও চলত! কারণ পরিসংখ্যানে ‘স্ট্যান্ডার্ড এরর’ বলে একটা বিষয় আছে না? ক্ষুধা ব্যবস্থাপনার এই যে সর্বব্যাপী আয়োজন, তাতে দুয়েকটা দিপালী তো পরিসংখ্যানের নিয়মেও ঝরে যেতে পারে! পারে না?

এই হল শাস্ত্রের আসল নাম: নিখাদ নিপাট ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। এসেটহারা গরিবের ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। এসেট নাই বলে সে ক্ষুদ্রঋণ পায় না, এনজিওর খাতা তার সামনে খোলে না। সরকারের তো দুইশ টাকার ভিজিএফ মশকরা, ক্ষুধার পেটে বয়স্কভাতার চুলকানি, তার দরজাতেও কত পেট-ভর্তি মানুষের ভিড়! আর বিত্তবান সমাজ? দিপালীর বাবা চেয়ে চেয়ে দেখেন ওদের। বুঝতেই পারেন না, জীবিত দিপালীর চেয়ে মৃত দিপালীর কদর এত বাড়ল কোন্ নিয়মে?


দিপালীদের পরিবারে যেভাবে ক্ষুধার ‘ব্যবস্থাপনা’ চলছিল, দিপালী আত্মহত্যা না করলে তা হয়ত সংবাদপত্রবাসী জানতই না। এভাবে নীরবে নিভৃতে ভয়ংকর ক্ষুধার সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে তাদের জীবন গড়িয়ে চলত। ষাট বছরের আয়ু তিরিশ বছরে ঠেকে যেত, অমর্ত্য সেন যাকে বলেছিলেন ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’। সেই অবসরে জিনি ইনডেক্স লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ত, ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল-এর বাৎসরিক প্রতিবেদনের মুখে মন্ত্রী বাহাদুরদের আস্ফালন দেখে খোদ দুর্নীতির দেবতাই বিব্রতমুখ হয়ে থাকত, আর পলিথিনের ছাউনি-দেয়া ছাপড়ার ঘরে বসে বসে সর্বগ্রাসী ক্ষুধার সাথে দিপালীদের এই কুটনীতি চলতেই থাকত!

এখনও তো চলবে সব-ই। প্রকল্প পরিচালকের পাজেরো চলবে, মাইক্রোক্রেডিট সামিট চলবে, দারিদ্র গবেষণায় দেশ সয়লাব হয়ে যাবে। চলবে না খালি দিপালীদের সাবেক ‘ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনা’। কিছু বিবেকবান মানুষের তৎপরতায় এখন তাদের খাওয়া হচ্ছে তিন বেলা (কিন্তু কতদিন?)। আবার গরিবের জন্য তিন বেলা খাওয়াও কম বিপত্তির নয়! কোষ্ঠ তরল হয়ে যায়, ঘন ঘন ল্যাট্রিনে যেতে হয়, একথা বেগুনটিলা বস্তির বৃদ্ধা গুলবানু বলেছিল।

দিপালীর পরিবার তাদের এই গরিবি জানান দিতে চায় নি। তাই নিজেরা নিজেদের ‘ব্যবস্থাপনা’ তৈরি করেছিলেন। দিপালী আত্মহত্যা করায় সিভিল সমাজের জ্ঞানপাপ হয়ে গেল! আমরা জেনে ফেললাম, গরিব কিভাবে তার সবচেয়ে মৌলিক চাহিদার সাথে খেলে। ফলে, দিপালীর পরিবারের মত আরো অতিগরিব যারা আছে, যাদের ধারণা গরিবি জানান দেয়ার বিষয় নয়, তারা আরো সতর্ক হয়ে যাবে। এমনিতেই তারা সমাজে অস্পৃশ্য হয়ে থাকে, এরপর থেকে অদৃশ্য হয়ে থাকবে। ক্ষুধার আরো নিবিড় ‘ব্যবস্থাপনা’ বের করবে তারা। যেখানে আত্মহত্যাজাতীয় কোনো স্ট্যান্ডার্ড এরর থাকবে না, ফলে সিভিল বিবেক আসন্ন ঈদের প্রাক্কালে রং ঝলমল প্লাজার সামনে কোনোরকম দংশনে পড়বে না।

‘অতিগরিব’ নামে সমাজের একটা অংশের কথা অনেকেই স্বীকার করেন শুনি, কিন্তু তাদের কাছে পৌঁছাবার কোনো ফর্মূলা এখনও বাজারে আসে নি। শোনা যায়, অতিগরিবের উন্নয়ন অনেক দুরূহ, কারণ তাদের এসেট নাই (ফলে বন্ধকী নেয়া যায় না!), তাদের ভয়েস নাই (ফলে ইন-ডেপথ ইন্টারভিউ দেয় না তারা!), তাদের এমনকি কোনো আকাঙ্ক্ষাও নাই (ফলে অ্যাডভোকেসী মাঠে মারা যায়!)। আপামর প্ররোচনাহীন এক জনগোষ্ঠী! তারা এমনিতেই তিলে তিলে মরে, তাদের মধ্যে দিপালীর মত কারো কারো হয়ত মৃত্যুর এই শম্বুক গতি পছন্দ হয় না। তখন অতিগরিবেরা শিরোনাম হয়।

দিপালীদের বাড়িতে আজ দেশের বিবেকবান মানুষের সাহায্য পৌঁছেছে, কিন্তু দরকার সুনির্দিষ্ট পলিসি, আর তার যথাযথ বাস্তবায়ন, এইসব অতিগরিব এবং বিপদাপন্ন মানুষের কার্যকরভাবে বেঁচে থাকার জন্য। নাহলে, ভেবে দেখুন, মাস ছয় পরে, দিপালীদের সাহায্যের টাকাই ফুরিয়ে যাবে না, এর সাথে তাদের এতদিনকার ‘ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা’র অভ্যাসটিও হারাবে তারা। সেইসাথে, আরেকবার সংবাদ শিরোনাম হবার ভয়ে সমাজে তারা আরো ইনভিজিবল হয়ে যাবে। ফলে, দিপালীর পরিবার তথ্যপ্রবাহ হয়ে আমাদের বিবেকে আর হয়ত কামড় বসাবে না, কিন্তু ক্ষুধার কামড় থেকে তারা কি মুক্তি পাবে?

২০০৫
সংবাদের লিংক:
http://www.thedailystar.net/2005/10/16/d51016110280.htm

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

"চন্দ্রবিন্দু" যেভাবে তৈরি হল




বিপুলা এই টেলিভিশন মিডিয়ার সম্ভাবনার কতটুকু জেনেছি আমরা? সর্বসাকুল্যে টেলিভিশন অনুষ্ঠান বলতে খালি দেখছি বিভিন্ন দৈর্ঘের নাটক, বিভিন্ন প্রস্থের টকশো, আর নানাবর্ণের আইডল প্রতিযোগিতা। এর বাইরে বিস্তীর্ণ অভিজ্ঞতার যে দেশ, সেখানে এই বাক্সটির সম্ভাবনা কীরকম? গতানুগতিক এই সমস্ত ফর্মাটের বাইরে নতুন কোনো বিনোদনের সুযোগ আছে কিনা টেলিভিশনে?

এরকম একটি জায়গা থেকেই চন্দ্রবিন্দুর কথা ভাবা। ২০০৫ সাল সেটি, আমি শিল্পসাহিত্যে দৃষ্টিসংবেদন নিয়ে গবেষণা করছি, একই বছরে এটি দেখা না-দেখার চোখ নামক বই হয়ে বেরোয়। ব্যতিক্রমধর্মী ঐ সংকলনের কাজ করতে করতে কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামানের সাথে চন্দ্রবিন্দু নিয়ে অনেক আলাপ, কবি সাজ্জাদ শরিফের সাথেও। চিন্তার জট খুলতে থাকে, বন্ধু এবং মেধাবী নির্মাতা নূরুল আলম আতিক প্রবল উৎসাহে এগিয়ে আসেন। তারপর অনেকদিন ধরে চন্দ্রবিন্দু এগিয়ে চলছিল এই চতুষ্টয়ের চিন্তার মিথষ্ক্রিয়ায়। এই পর্যায়ে একটা ছন্দোপতন: আমাকে চলে যেতে হয় দেশের বাইরে। কিন্তু থেমে থাকে নি চন্দ্রবিন্দু, বরং আতিকের সুযোগ্য চিন্তায় ও সৃজনী দক্ষতায় তরতর করে বেড়ে উঠতে থাকে। আমি দূরদেশে বসে খবর পাই। পরম আনন্দ হয়।


চন্দ্রবিন্দু বানানোর মূল প্রণোদনা কি? এক কথায় এর উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, শ্রেণীনির্বিশেষে মানুষে মানুষে যোগাযোগের একটা পাটাতন তৈরি হয় কিনা সেটা খতিয়ে দেখা। ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের এই কালে মানুষ তার ধর্মের কিংবা শ্রেণীর ঘেরাটোপে যেভাবে বন্দী হয়ে পড়ছে, তার ফলে কবুতরের খোপের ভেতর ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে আটকা পড়েছে চিরকালের কথকতা। কিন্তু ধনীর বারান্দায় যেমন বৃষ্টি পড়ে, গরিবের ঘরেও। তাদের প্রত্যেকেরই শৈশব আছে, আছে ভুতের ভয় কিংবা মায়ের কাছে যাবার আকূলতা। একই আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে পড়ছে বিভক্ত সমাজে, ফলে তার অর্থ ও অনর্থ স্থানবিশেষে ভিন্ন হয়ে যায়। আমরা ভিন্নবিভক্ত হয়েই একে মোকাবেলা করি, ভুলে যাই এর অভিন্ন উৎসের কথা। চন্দ্রবিন্দু আমাদের এই প্রতিদিনের খন্ডিত অনুভবগুলোকে আশ্রয় করেই চিরকালের বাঁশিটি বাজাতে চেয়েছে।

চিরকালের বাঁশি চিন্তায় বাজানো যত সহজ, পর্দায় বাজানো ততই কঠিন। বিশেষ করে যে পর্দায় স্টেরিওটাইপ ইমেজ আর বাণিজ্যের জংলীজটিল রাজনীতি দিয়ে মধ্যবিত্তের বিনোদন তৈরি হয়, সেখানে ভিন্নধারার একটি অনুষ্ঠানের জন্য জায়গা পাওয়া খুবই মুশকিল। কিন্তু নুরুল আলম আতিক দমে যাবার পাত্র নন, তাই তো নানান বৈরী অবস্থা পার হয়ে চন্দ্রবিন্দু আজ চ্যানেলআই-এর পর্দায়। এর মধ্যেই দর্শক এর প্রথম পর্বটি দেখে ফেলেছেন। চন্দ্রবিন্দু কতটা সফল কিংবা কতটা ব্যর্থ সে বিচারের ভার তাঁদের ওপর। কিন্তু আমি খুশি আমার একটি ভাঙাচোরা স্বপ্নকে এত নিপুণভাবে বাস্তবের পর্দায় হাজির হতে দেখে। আতিক সেটি করেছেন, তিনি এই স্বপ্নের যেমন সারথী ছিলেন তেমনি বাস্তবেরও রূপকার হয়ে দেখালেন। চমৎকার একটি সেটে অনবদ্য লাগছে শারমিন লাকী-র নাটকীয় উপস্থাপনা। চন্দ্রবিন্দু জয়যুক্ত হোক।