শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

ব্লগারের মৃত্যু ও ভার্চুয়াল শোকের চেহারা


মুহম্মদ জুবায়ের মারা গেছেন। ইনি প্রথম যৌবনে লেখক হওয়ার জন্য ঘর ছেড়েছিলেন এবং শেষ জীবনে লেখালেখি করবার জন্য বেছে নিয়েছিলেন ব্লগকে। সেই অর্থে ব্লগার ছিলেন তিনি, লিখতেন সচলায়তনে। আমি যখন সচলায়তনে প্রবেশ করেছিলাম, তিনি রীতিমত ছেলেমানুষের মত খুশি হয়েছিলেন। আমার দ্রুত সদস্যভূক্তির ব্যাপারে সচলায়তন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছিলেন। তারপর একদিন কথাচ্ছলে জানিয়েছিলেন যে, তিনি সচলায়তন অঙ্গনে আর লিখবেন না। সেটি সম্ভবত ডুয়াল পোস্টিং নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপের জবাবে তাঁর অভিমানী সিদ্ধান্ত ছিল। আমরা যথারীতি তাঁকে তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি তা করেছিলেন। তারপর আমি যখন সচলায়তন ছেড়ে আসি, তিনি আমার ছেড়ে আসার সিদ্ধান্তের সাথে একমত ছিলেন না। তাঁর মনে হয়েছিল আমি না ছেড়ে আসলেও পারতাম। এমনকি সচলায়তন বিষয়ে প্রথম আলো-তে লেখা আমার নিবন্ধের গীবতেও সামিল হয়েছিলেন তিনি।

মুহম্মদ জুবায়ের বিষয়ে এইটুকু লেখার পর আমি নিজে পরিষ্কার যে সচলায়তনের ব্যাপারে তাঁর শর্তহীন পক্ষপাত ছিল। খুবই ভালোবাসতেন এই ফোরামটিকে। কিছু খিটিমিটি হলেও সেখানেই লিখে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। এতই টান ছিল এই ফোরামের প্রতি যে, এই ফোরাম ত্যাগ করবার পর অন্য অনেকের মত তিনিও আমার সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রদ করে দিয়েছিলেন।

মুহম্মদ জুবায়ের-এর সাথে আমার প্রথম দেখা কবিসভায়। কবিসভা উত্তপ্ত তর্কবিতর্কের জায়গা, মনে পড়ে কোনো একটা বিষয়ে তাঁর সাথেও আমার তর্ক হয়েছিল। পরে অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিলেন কবিসভায়। মেইল করতেন মাঝে মাঝে, আমার একটি গল্পের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, শহীদ কাদরীর সাথে আমার গল্প নিয়ে তাঁর বিস্তর কথাবার্তা হওয়ার কথা। ফলে, মুহম্মদ জুবায়ের, যাঁকে আমি চর্মচক্ষে দেখি নি কোনোদিন, তাঁর ব্যাপারে একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি আমার ছিল সবসময়।

সচলায়তনে ব্লগ লিখতেন তিনি, সত্তর দশকের জীবনযাপন ও স্বপ্ন নিয়ে তাঁর চিন্তাজাগানিয়া পর্যবেক্ষণ ছিল। একটা ধারাবাহিক উপন্যাসও লিখেছিলেন। বন্ধু ও প্রবাসী লেখক লুৎফর রহমান রিটনকে সচলায়তনে নিয়ে এসেছিলেন। এই ব্লগের মডারেটরদের সাথে তাঁর দহরম মহরমও ছিল। ব্লগাতিরিক্ত যোগাযোগ ছিল। ব্লগারদের কারো কারো সাথেও। একবার তাঁর অসুস্থতা এবং ধূমপান করা নিয়ে তাঁর কন্যাটি একটি মর্মভেদী চিঠি লিখেছিলেন তাঁকে, সেই চিঠি সচলায়তনে অনেক প্রশংসাও পেয়েছিল।

এহেন মানুষটি, যিনি তাঁর যাবতীয় পক্ষপাত ও সমালোচনাসহ আমার কাছে আদ্যোপান্ত ভার্চুয়াল একটি চরিত্র, তাঁর মৃত্যুসংবাদ ঘিরে আমার ভেতর জমতে থাকা শোকের চেহারাটি আঁচ করতে চেষ্টা করি। আঁচ করতে চেষ্টা করি, মুহম্মদ জুবায়ের তাঁর ভার্চুয়াল অস্তিত্বের বাইরে কে ছিলেন, কী ছিলেন। তাঁর স্মৃতিকথা থেকে টের পাই তিনি এক স্বাপ্নিক মানুষ ছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন, সেই ধারাবাহিকতায় সমাজতন্ত্রের স্বপ্নও দেখেছিলেন। তাঁর লেখক হয়ে-উঠার স্বপ্নের সাথে সেইসব স্বপ্নকে তিনি মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিলেন। এভাবে অনেক খুইয়ে, একসময় জীবনকে গুছিয়ে নেয়ার তাড়না অনুভব করেছিলেন, বেছে নিয়েছিলেন প্রবাস জীবন। কিন্তু স্বপ্ন আর স্বপ্নকে বাস্তবে দেখতে না-পাবার বেদনা তাঁর পিছু নিয়েছিল। নিপুণ আততায়ীর মত। প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীর মত তিনিও তাঁর স্বদেশকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন। এর জন্য বেদনা পাবার দায় থেকে কখনো ছুটি নেন নি। ফলে, কর্মস্থলে, ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা স্বজনবেষ্টনীর মাঝেও তিনি ছিলেন একা। একেলা।

কিন্তু এ তো মুখস্ত গল্প। এই গল্পের উপসংহার আমরা জানি। কিন্তু আশ্চর্য হই ভেবে যে মুহম্মদ জুবায়ের সেই উপসংহারটি বেছে নেন নি। প্রৌঢ়ত্বকে জয় করে নেমে এসেছিলেন তরুণদের ব্লগে। তরুণদের চোখভরা স্বপ্নের জগতে হয়ে জুবায়ের যেন বুড়ো বাতিওলা! এ এক জয়ের নেশাই বটে! মনে পড়ে, এমনিতর নেশার টানেই সরকারি চাকুরি থেকে অবসর নেয়া কবি মুস্তাফা আনোয়ার আমাদের উদ্দাম জীবনের সাথে সমানে সমানে পাল্লা দিতেন। গ্রেস নিতেন না একদমই। মুহম্মদ জুবায়েরও তাই। জরাগ্রস্ততার অমোঘ খপ্পরে পড়বার আগে মানুষের শেষ রোমান্টিক দ্রোহ!

কিন্তু আজ যখন মুহম্মদ জুবায়ের মারা গেলেন, আমি বিষণ্ণ হয়ে থাকলাম এই ভেবে যে এই নামটিকে ঘিরে আমাদের অন্তহীন ভার্চুয়াল জগতে আর কোনো গালগল্প তৈরি হবে না। মুহম্মদ জুবায়ের এর নামে আর কোনো ব্লগ বা উপন্যাস আপলোড হবে না, যেগুলো পাঠ করে করে আমরা তাঁকে চিনতে থাকবো, তাঁর ব্যক্তিত্ব তৈরি হতে থাকবে আমাদের পারসেপশনের আঁকাবাঁকা গলির ভেতর। শোকের অক্ষর উপচে পড়ছে সচলায়তনে, অন্যান্য ব্লগেও। ভাবি, এই শোকটি কেমন? কিছু টেক্সটের জন্য কিছু টেক্সটের শোক, নাকি টেক্সট-উত্তর অচেনা যোগাযোগহীন ব্যবহারিক জীবনে এর কোনো অভিঘাত তৈরি হয়? মুহম্মদ জুবায়েরকে আমরা তো চিনেছি তাঁর টেক্সট দিয়েই, অর্থাৎ তাঁর লেখাকে তাঁর ব্যক্তিত্বের উপরে আরোপ করে নিয়েছি আমরা। রলা বার্থ যেমন বলেন, লেখকের অস্তিত্ব বা বিদ্যমানতা তাঁর লেখার স্বাতন্ত্র্যকে বাধাগ্রস্ত করে। সেই অর্থে, ব্লগার মুহম্মদ জুবায়ের-এর মৃত্যু যেন প্রতীকী! যেন তিনি তাঁর মরণ দিয়ে মুক্ত করে গেলেন তাঁর রচনারাশিকে, আমাদের মননে তাঁর ব্যক্তিত্বের সংগঠন প্রক্রিয়া থেকে। টেক্সটের বাইরে সত্যিকারের যিনি জুবায়ের, যার একটা ফুসফুস অকেজো ছিল অনেকদিন, যিনি অনেকের বন্ধু, ভাই বা পিতা, তার শরীরী মৃত্যুতে আমাদের ভার্চুয়াল-পেরোনো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীজীবন কতখানি শোকতপ্ত হবে? সেই অর্থে এটি অথরের মৃত্যু, একটি টেক্সচুয়াল মরণ। এই টেক্সচুয়াল মরণের স্মরণে আমরা যে শোকগ্রস্ত হচ্ছি সেটিও টেক্সচুয়াল, এবং টেক্সটের বাইরেও যদি এর সন্তাপ আমরা অনুভব করি, তবে সেও টেক্সটেরই সামর্থে।

আরেকটা বিষয়: মার্কেজ একটি উপন্যাসে যেমন লিখেছেন, কেবলমাত্র মৃত্যুই মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির যোগ ঘটাতে সক্ষম। অর্থাৎ যে মাটিতে আমার অধিষ্ঠান সেখানে আমার পূর্বপুরুষের কবর থাকলেই সেটা অনেক দৃঢ় হয়ে ওঠে। মুহম্মদ জুবায়ের-এর মৃত্যুশোক তাঁর ব্লগিং ফোরাম সচলায়তনে সেইরকম ইতিবাচক একটি প্রভাব ফেলবে মনে হয়।

বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

কখনো যাই নাই বিদ্যাকূট

চোখের সামনে পুড়ছে আমার মনসুন্দর গ্রাম
আমি যাই নাই রে, আমি যাই নাই

- কফিল আহমেদের গান

১.
কখনো যাই নাই বিদ্যাকূট!

উরখুলিয়া গেছি, বিদ্যাকূটের পাশের গ্রাম। এক সন্ধ্যার কথা মনে আছে, উরখুলিয়ার গ্রামছাড়া জোতদার রেজেক মিয়ার পোড়োবাড়িটা দেখতে গেছিলাম। বিশাল বাড়ি, সারি সারি টিনের চৌচালা ঘর, সেসব ঘরে কেউ নাই তখন, জিনিসপত্র সব টুকরা টুকরা করে ভাঙ্গা, টিনের প্রতিটা ঢেউ-য়ে দায়ের নিপুণ কোপ। উঠানের মাঝখানে ছোটখাট একটা পাহাড়, ভাঙ্গা সিরামিকের জিনিসপত্রের ।

উরখুলিয়া একটা অদ্ভূত মাথাগরম জায়গা। তিতাসের পাড় ধরে লম্বালম্বি একটা গ্রাম, ঠিক চিলি দেশটার স্টাইলে। গ্রামের অর্ধেক লোক থাকে ইটালি। তারা টাকা পাঠায়, আর সেই টাকায় দুই গোষ্ঠীর শতবছরের পুরানো ঝগড়াটা ফি বছর ঝালাই হয়।

ঝগড়ার উপলক্ষ?

শুনলে হাসবে উরখুলিয়ার লোকেরা। উপলক্ষ নো প্রবলেম, জিয়াউর রহমান স্টাইলে। কোনো উপলক্ষ পাওয়া যাইতেছেনা, ঠিকাছে, ঐ যে জালাইল্যা আছে না, জ্ঞাতিগোষ্ঠী নাই, এতিম পোলা, ঘরে মা একলা, ওরে ফালায়া দাও! তারপর কেইস নিয়া সোজা নবীনগর থানায়।

জালাইল্যাকে আমি চিনতাম। এক পা খোঁড়া, কিন্তু কাইজ্যার আগে সবসময়। ভ্যানগার্ড।

জালাইল্যার খুনের এই পরিকল্পনা কিন্তু প্রতিপক্ষের নয়, তার স্বপক্ষেরই। আবার এই স্বপক্ষের কোনো উপদলীয় কোন্দলের ফসল নয় এই সিদ্ধান্ত। যারা এই নীলনকশা করেছে তারা সবাই জালাইল্যার সমঝদার। কিন্তু কি করা? দুইশ বছরের পুরনো 'বাইশাবাইশি', অনেক রক্ত খায়! তার তৃষ্ণা মিটাতে গেলে নিজের পরের বাছাবাছি করনের সুযোগ কমই থাকে।

যারা জালাইল্যারে ফালাইয়া দিল, তারাই গায়ের কাপড় বদলায়া নবীনগর থানায় গিয়া ফৌজদারি মামলা ঠুকল। তারপর বাজার করল, টর্চলাইটের জন্য দোকান ঘুইরা একনম্বর সানলাইট ব্যাটারি কিনল, জালাইল্যার মায়ের জন্য নতুন জায়নামাজ ও তসবি কিনল, তারপর বাড়ি ফিরবার আগে হাউজির মাঠেও দুইচক্কর দিল।

আর যারা ঘুম থেকে উঠে শুনল তারা খুনের মামলার আসামি, তাদের হৈয়া অবাক হৈলেন বিধাতা। তারাও ঘরের কালার টেলিভিশন, অষ্ট্রেলিয়ান গাভী, ডেকসেট ও ক্যামেরা পাশের গ্রামের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠায়া দিল, ঘরের মেয়েমানুষের হাতে দরকারি টাকাপয়সা গুঁজল, তারপর সোজা লঞ্চে হয় ভৈরব না হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

সেই উরখুলিয়ার পাশের গ্রামই বিদ্যাকূট। আমি উত্তপ্ত উরখুলিয়ায় বসে বসে বিদ্যাকূট নিয়া ঈর্ষায় জ্বলতাম। বিদ্যাকূটে কোনো পুলিশ ক্যাম্প লাগে না, সেই গ্রাম থেকে শরনার্থী আসে নাই কোনো দিন এই উরখুলিয়ায়। দূর থেকে দেখেছি, অদ্ভূত একটা গ্রাম, খড়ের গাদায় রোদের ঝিলিক লেগে এখান থেকেও আমার চোখ চিকচিক করে।

কবে যাবো বিদ্যাকূট, ভাবতাম পুরুষশূন্য উরখুলিয়া গ্রামে হাঁটতে হাঁটতে।

ফরহাদ মজহার-এর সাম্প্রতিক কবিতা প্রসঙ্গে


বয়স বিচারে ফরহাদ মজহার কবিতা সঞ্চালনে সবচে বয়োজ্যেষ্ঠ কবি। বাঙালি কবিদের বয়োজ্যেষ্ঠতাকে আমরা, উত্তরসূরী হিসেবে, একটুখানি কৃপাসহযোগে পাঠ করতে অভ্যস্ত। কিন্তু ফরহাদ মজহার সেই আয়েশটুকুর সুযোগ রাখেন নাই এই কবিতাসমূহে। এবং তার অপরাপর কবিতায়। তিনি সবসময় তরুণতর, নিজেকে সমসাময়িক দেখতে ভালবাসেন। আমরাও তাকে অনেক বছর এভাবে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ফলে, এটা তাকেই মানায় যে তিনি ‘ফরিদার জন্য ক্যামেরাগিরি’ করবেন, 'সাড়ে সাতরকমভাবে' তাকাইবেন শালিখ পাখির দিকে।

নানারকমভাবে ফরহাদ মজহার-এর কবিতার বয়স বেড়েছে। ‘ভেজা কবিতা’য় বৃষ্টি তাকে তার দিদির জন্য উদ্বিগ্ন ও সজল করে তোলে। দিদির জন্য আকুল ফরহাদকে তখন আর প্রৌঢ় লাগে না, সেই কিশোরের মত লাগে যে চোখফুটে প্রথম বর্ষা দেখছে:

জলে জলে ভিজছে শহর, জলেতে ইস্পাত
একটি হলুদ মোটরগাড়ি জলেতে চিৎপাত।
দালানগুলো ভিজছে একা কারখানাতে পানি
জলের মধ্যে যুগল ভাসছে কবি ও বিজ্ঞানী।

বেড়েছে না বলে কমেছে বললেই মানায়। কেননা তিনি যখন বিছানা নিয়ে কবিতা রচনা করেন, যেখানে মানবশয্যার দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে জ্ঞান ফলানোর সুযোগও থাকে:

আমার ঘরের একপাশে আয়তত্রে হইয়া বিছানাটি কী সুন্দর অঙ্কিত হইয়া আছে
বিছানা অবধি পোঁছাইতে সভ্যতাকে কত পথ পাড়ি দিতে হইয়াছিল একবার ভাবিয়া দেখো


কিন্তু এরপর তিনি বিস্ময়কররকম ভাবে তার জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করেন। হামলে পড়তে দেন নি বেচারা বিছানার (এবং কবিতার) ওপর। অত্যন্ত শিক্ষণীয় এবং অনুকরণীয় নিরাসক্তি। তরুণদের জন্য। আমরা যারা আমাদের যৎসামান্য র‌্যাশনালিটিকে কবিতার পেছনে লেলিয়ে দিই। আসুন দেখি ঐ দুই লাইনের পর কবি ফরহাদ মজহার, যিনি আবার একাধারে সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতি বিশ্লেষক, উন্নয়ন-চিন্তক এবং তত্ত্বালোচক, কোনদিকে গেলেন:

বিছানার ওপর বালিশটি পড়িয়া আছে, একটি মস্তকের জন্য তার নীরব নিঃশব্দ অপেক্ষা
একটি শরীর পাইবার আশায় বিছানাটি মৃতদেহের মতো গভীর গর্ত হইয়া আছে।

তত্ত্ব নাই, ইতিহাস নাই, সমাজবিজ্ঞান নাই। তাদের নির্যাস আছে হয়ত। কিন্তু আক্রান্ত করে না। কারণ, এখানে কবিতা আছে।

মনে পড়ে, ১৯৭৫ এ লেখা একটি প্রবন্ধ সংকলনে (বইয়ের নাম ছিল "প্রস্তাব") ফরহাদ মজহার তার চেতনাপ্রবাহে বিজ্ঞান, কবিতা, দর্শন, নৃতত্ত্ব সবকিছুকে একীভূত করে দেখতে প্রয়াসী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সময় কত বদলায়! এখন ফরহাদ যখন কবিতা রচনা করেন, তখন তিনি একান্তভাবেই কবি থাকতে চান।

আরেকটা বিষয়। ফরহাদ মজহারই সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে এখন একমাত্র কবি যিনি তরুণদের একটা ভাষাপ্রকরণচিন্তা, যার মেনিফেস্টেশনও পুরোপুরি হওয়া বাকি, সেটা দিয়ে নিজেকে আক্রান্ত করার সাহস দেখাতে পারেন। জয় হোক তাঁর।

২০০৫


শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

অতিগরিবের ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনার ভেতরে কোনো এক দিপালীর আত্মহত্যা



ভৈরবের দিপালীদের পরিবারে এখন অন্য অবস্থা। চাল আসছে, ডাল আসছে, এনজিও আসছে, ভিজিএফ কার্ড আসছে, ওয়ার্ড কমিশনার এসে সকালসন্ধ্যা খোঁজ নিচ্ছে। মেঘ না চাইতেই ঝড়!

ঝড়-ই তো। দিপালী যখন গলায় দড়ি দিয়ে ক্ষুধার জ্বালা চিরতরে মিটাল, তখন দিপালীর পঙ্গু বাবা ভাবছিলেন মেয়ের অন্তিম সৎকারের অর্থ জোগান দেবেন কিভাবে? কিন্তু কোত্থেকে কী যেন ম্যাজিক হয়ে গেল, মেয়েটা মরে গেল, আর সঙ্গে-সঙ্গেই রূপকথার মত অদ্ভূত সব ঘটনা। যে সমস্ত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের স্বপ্নও তিনি দেখেন নি, তারা এসে হাজির: সমবেদনাসহ, খাদ্যসহ, চাকরিসহ। একের পর এক রিকশা আর মোটরসাইকেল এসে থামছে তার ছাপড়ার সামনে, হতভাগা মেয়েটার জন্য মনের মধ্যে এক পশলা শোকও জমতে দিচ্ছে না।

পালা করে খেত দিপালীর পরিবার। আটজনের এই পরিবারে নিয়ম ছিল, যে-চারজন দুপুরে খাবে, রাতে তারা উপোস করবে। রাতে খাবে অন্য-চারজন। এভাবেই চলছিল তাদের ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। ভালই চলছিল। গোলমালটা লাগল, যখন দিপালীর প্রতিবন্ধী এক ভাই নিয়ম ভেঙ্গে পরপর দুইবার খেয়ে বসল। তাতে দিপালীর কপাল পুড়ল, ক্ষুধার যন্ত্রণার চেয়ে তার কাছে মৃত্যুকেই বেশি শান্তির মনে হল।

এরকম হয়েই থাকে। ‘ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনা’র যে দেশব্যাপী নীরব দযজ্ঞ চলে, তার খোঁজ সরকার নেয় না, এনজিও-র ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে তাদের জায়গা নাই, সংবাদপত্রের পাতায় তার সংকুলান হয় না ঘটনাহীনতার কারণে। এরমধ্যে হঠাৎ কোনো এক দিপালী মাঝখান থেকে দুম করে মরে বসে, বিব্রত হয় মধ্যবিত্তের সিভিল বিবেকব্যবস্থা। কিন্তু না হলেও চলত! কারণ পরিসংখ্যানে ‘স্ট্যান্ডার্ড এরর’ বলে একটা বিষয় আছে না? ক্ষুধা ব্যবস্থাপনার এই যে সর্বব্যাপী আয়োজন, তাতে দুয়েকটা দিপালী তো পরিসংখ্যানের নিয়মেও ঝরে যেতে পারে! পারে না?

এই হল শাস্ত্রের আসল নাম: নিখাদ নিপাট ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। এসেটহারা গরিবের ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। এসেট নাই বলে সে ক্ষুদ্রঋণ পায় না, এনজিওর খাতা তার সামনে খোলে না। সরকারের তো দুইশ টাকার ভিজিএফ মশকরা, ক্ষুধার পেটে বয়স্কভাতার চুলকানি, তার দরজাতেও কত পেট-ভর্তি মানুষের ভিড়! আর বিত্তবান সমাজ? দিপালীর বাবা চেয়ে চেয়ে দেখেন ওদের। বুঝতেই পারেন না, জীবিত দিপালীর চেয়ে মৃত দিপালীর কদর এত বাড়ল কোন্ নিয়মে?


দিপালীদের পরিবারে যেভাবে ক্ষুধার ‘ব্যবস্থাপনা’ চলছিল, দিপালী আত্মহত্যা না করলে তা হয়ত সংবাদপত্রবাসী জানতই না। এভাবে নীরবে নিভৃতে ভয়ংকর ক্ষুধার সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে তাদের জীবন গড়িয়ে চলত। ষাট বছরের আয়ু তিরিশ বছরে ঠেকে যেত, অমর্ত্য সেন যাকে বলেছিলেন ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’। সেই অবসরে জিনি ইনডেক্স লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ত, ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল-এর বাৎসরিক প্রতিবেদনের মুখে মন্ত্রী বাহাদুরদের আস্ফালন দেখে খোদ দুর্নীতির দেবতাই বিব্রতমুখ হয়ে থাকত, আর পলিথিনের ছাউনি-দেয়া ছাপড়ার ঘরে বসে বসে সর্বগ্রাসী ক্ষুধার সাথে দিপালীদের এই কুটনীতি চলতেই থাকত!

এখনও তো চলবে সব-ই। প্রকল্প পরিচালকের পাজেরো চলবে, মাইক্রোক্রেডিট সামিট চলবে, দারিদ্র গবেষণায় দেশ সয়লাব হয়ে যাবে। চলবে না খালি দিপালীদের সাবেক ‘ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনা’। কিছু বিবেকবান মানুষের তৎপরতায় এখন তাদের খাওয়া হচ্ছে তিন বেলা (কিন্তু কতদিন?)। আবার গরিবের জন্য তিন বেলা খাওয়াও কম বিপত্তির নয়! কোষ্ঠ তরল হয়ে যায়, ঘন ঘন ল্যাট্রিনে যেতে হয়, একথা বেগুনটিলা বস্তির বৃদ্ধা গুলবানু বলেছিল।

দিপালীর পরিবার তাদের এই গরিবি জানান দিতে চায় নি। তাই নিজেরা নিজেদের ‘ব্যবস্থাপনা’ তৈরি করেছিলেন। দিপালী আত্মহত্যা করায় সিভিল সমাজের জ্ঞানপাপ হয়ে গেল! আমরা জেনে ফেললাম, গরিব কিভাবে তার সবচেয়ে মৌলিক চাহিদার সাথে খেলে। ফলে, দিপালীর পরিবারের মত আরো অতিগরিব যারা আছে, যাদের ধারণা গরিবি জানান দেয়ার বিষয় নয়, তারা আরো সতর্ক হয়ে যাবে। এমনিতেই তারা সমাজে অস্পৃশ্য হয়ে থাকে, এরপর থেকে অদৃশ্য হয়ে থাকবে। ক্ষুধার আরো নিবিড় ‘ব্যবস্থাপনা’ বের করবে তারা। যেখানে আত্মহত্যাজাতীয় কোনো স্ট্যান্ডার্ড এরর থাকবে না, ফলে সিভিল বিবেক আসন্ন ঈদের প্রাক্কালে রং ঝলমল প্লাজার সামনে কোনোরকম দংশনে পড়বে না।

‘অতিগরিব’ নামে সমাজের একটা অংশের কথা অনেকেই স্বীকার করেন শুনি, কিন্তু তাদের কাছে পৌঁছাবার কোনো ফর্মূলা এখনও বাজারে আসে নি। শোনা যায়, অতিগরিবের উন্নয়ন অনেক দুরূহ, কারণ তাদের এসেট নাই (ফলে বন্ধকী নেয়া যায় না!), তাদের ভয়েস নাই (ফলে ইন-ডেপথ ইন্টারভিউ দেয় না তারা!), তাদের এমনকি কোনো আকাঙ্ক্ষাও নাই (ফলে অ্যাডভোকেসী মাঠে মারা যায়!)। আপামর প্ররোচনাহীন এক জনগোষ্ঠী! তারা এমনিতেই তিলে তিলে মরে, তাদের মধ্যে দিপালীর মত কারো কারো হয়ত মৃত্যুর এই শম্বুক গতি পছন্দ হয় না। তখন অতিগরিবেরা শিরোনাম হয়।

দিপালীদের বাড়িতে আজ দেশের বিবেকবান মানুষের সাহায্য পৌঁছেছে, কিন্তু দরকার সুনির্দিষ্ট পলিসি, আর তার যথাযথ বাস্তবায়ন, এইসব অতিগরিব এবং বিপদাপন্ন মানুষের কার্যকরভাবে বেঁচে থাকার জন্য। নাহলে, ভেবে দেখুন, মাস ছয় পরে, দিপালীদের সাহায্যের টাকাই ফুরিয়ে যাবে না, এর সাথে তাদের এতদিনকার ‘ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা’র অভ্যাসটিও হারাবে তারা। সেইসাথে, আরেকবার সংবাদ শিরোনাম হবার ভয়ে সমাজে তারা আরো ইনভিজিবল হয়ে যাবে। ফলে, দিপালীর পরিবার তথ্যপ্রবাহ হয়ে আমাদের বিবেকে আর হয়ত কামড় বসাবে না, কিন্তু ক্ষুধার কামড় থেকে তারা কি মুক্তি পাবে?

২০০৫
সংবাদের লিংক:
http://www.thedailystar.net/2005/10/16/d51016110280.htm

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

"চন্দ্রবিন্দু" যেভাবে তৈরি হল




বিপুলা এই টেলিভিশন মিডিয়ার সম্ভাবনার কতটুকু জেনেছি আমরা? সর্বসাকুল্যে টেলিভিশন অনুষ্ঠান বলতে খালি দেখছি বিভিন্ন দৈর্ঘের নাটক, বিভিন্ন প্রস্থের টকশো, আর নানাবর্ণের আইডল প্রতিযোগিতা। এর বাইরে বিস্তীর্ণ অভিজ্ঞতার যে দেশ, সেখানে এই বাক্সটির সম্ভাবনা কীরকম? গতানুগতিক এই সমস্ত ফর্মাটের বাইরে নতুন কোনো বিনোদনের সুযোগ আছে কিনা টেলিভিশনে?

এরকম একটি জায়গা থেকেই চন্দ্রবিন্দুর কথা ভাবা। ২০০৫ সাল সেটি, আমি শিল্পসাহিত্যে দৃষ্টিসংবেদন নিয়ে গবেষণা করছি, একই বছরে এটি দেখা না-দেখার চোখ নামক বই হয়ে বেরোয়। ব্যতিক্রমধর্মী ঐ সংকলনের কাজ করতে করতে কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামানের সাথে চন্দ্রবিন্দু নিয়ে অনেক আলাপ, কবি সাজ্জাদ শরিফের সাথেও। চিন্তার জট খুলতে থাকে, বন্ধু এবং মেধাবী নির্মাতা নূরুল আলম আতিক প্রবল উৎসাহে এগিয়ে আসেন। তারপর অনেকদিন ধরে চন্দ্রবিন্দু এগিয়ে চলছিল এই চতুষ্টয়ের চিন্তার মিথষ্ক্রিয়ায়। এই পর্যায়ে একটা ছন্দোপতন: আমাকে চলে যেতে হয় দেশের বাইরে। কিন্তু থেমে থাকে নি চন্দ্রবিন্দু, বরং আতিকের সুযোগ্য চিন্তায় ও সৃজনী দক্ষতায় তরতর করে বেড়ে উঠতে থাকে। আমি দূরদেশে বসে খবর পাই। পরম আনন্দ হয়।


চন্দ্রবিন্দু বানানোর মূল প্রণোদনা কি? এক কথায় এর উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, শ্রেণীনির্বিশেষে মানুষে মানুষে যোগাযোগের একটা পাটাতন তৈরি হয় কিনা সেটা খতিয়ে দেখা। ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের এই কালে মানুষ তার ধর্মের কিংবা শ্রেণীর ঘেরাটোপে যেভাবে বন্দী হয়ে পড়ছে, তার ফলে কবুতরের খোপের ভেতর ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে আটকা পড়েছে চিরকালের কথকতা। কিন্তু ধনীর বারান্দায় যেমন বৃষ্টি পড়ে, গরিবের ঘরেও। তাদের প্রত্যেকেরই শৈশব আছে, আছে ভুতের ভয় কিংবা মায়ের কাছে যাবার আকূলতা। একই আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে পড়ছে বিভক্ত সমাজে, ফলে তার অর্থ ও অনর্থ স্থানবিশেষে ভিন্ন হয়ে যায়। আমরা ভিন্নবিভক্ত হয়েই একে মোকাবেলা করি, ভুলে যাই এর অভিন্ন উৎসের কথা। চন্দ্রবিন্দু আমাদের এই প্রতিদিনের খন্ডিত অনুভবগুলোকে আশ্রয় করেই চিরকালের বাঁশিটি বাজাতে চেয়েছে।

চিরকালের বাঁশি চিন্তায় বাজানো যত সহজ, পর্দায় বাজানো ততই কঠিন। বিশেষ করে যে পর্দায় স্টেরিওটাইপ ইমেজ আর বাণিজ্যের জংলীজটিল রাজনীতি দিয়ে মধ্যবিত্তের বিনোদন তৈরি হয়, সেখানে ভিন্নধারার একটি অনুষ্ঠানের জন্য জায়গা পাওয়া খুবই মুশকিল। কিন্তু নুরুল আলম আতিক দমে যাবার পাত্র নন, তাই তো নানান বৈরী অবস্থা পার হয়ে চন্দ্রবিন্দু আজ চ্যানেলআই-এর পর্দায়। এর মধ্যেই দর্শক এর প্রথম পর্বটি দেখে ফেলেছেন। চন্দ্রবিন্দু কতটা সফল কিংবা কতটা ব্যর্থ সে বিচারের ভার তাঁদের ওপর। কিন্তু আমি খুশি আমার একটি ভাঙাচোরা স্বপ্নকে এত নিপুণভাবে বাস্তবের পর্দায় হাজির হতে দেখে। আতিক সেটি করেছেন, তিনি এই স্বপ্নের যেমন সারথী ছিলেন তেমনি বাস্তবেরও রূপকার হয়ে দেখালেন। চমৎকার একটি সেটে অনবদ্য লাগছে শারমিন লাকী-র নাটকীয় উপস্থাপনা। চন্দ্রবিন্দু জয়যুক্ত হোক।


শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

দ্য ম্যাট্রিক্স মুভি নিয়ে জ্যাঁ বদ্রিয়াঁর সাথে আলাপ






দ্য ম্যাট্রিক্স (১৯৯৯) হলিউডের একটি ব্লকবাস্টার সাইন্স ফিকশন মুভি। ওয়াচোস্কি ভাইদের বানানো সেই মুভিতে নিও নামের এক কম্পিউটার হ্যাকারের সাথে মরফিউস নামে আরেক প্রবাদতুল্য হ্যাকারের দেখা হয় এবং সে তাকে ২০০ বছর পরের পৃথিবীতে নিয়ে যায় যেখানে সাইবার ইন্টেলিজেন্স দুনিয়াকে শাসন করছে। সেখানে এক যন্ত্রগোষ্ঠী মানুষের মধ্যে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে তাদের হৃদয়কে “ম্যাট্রিক্স” নামক একটি গাণিতিক বাস্তবতার মধ্যে বন্দী করে রাখছে। নিও, মরফিউস এবং ট্রিনিটি ম্যাট্রিক্সকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়।

জ্যাঁ বদ্রিঁয়া (১৯২৯-২০০৭) বর্তমান বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দার্শনিকদের একজন যার হাত ধরে উত্তরাধুনিকতাবাদের বিকাশ হয়েছে। জনপ্রিয় ও স্মরণীয় ইভেন্ট, সেলিব্রিটি এবং সংস্কৃতি নিয়ে তার অনেক চিন্তাজাগানিয়া রচনা আছে। “সিমুলেশন ও সিমুলাক্রা” তাঁর অসংখ্য রচনার একটি, যার উদ্ধৃতি এই সাক্ষাৎকারে আছে। ”সিমুলেশন” বলতে তিনি বোঝান সেই বানিয়ে তোলা বাস্তবতা বা ভার্চুয়াল-এর বর্ণন যা “সত্যিকারের” বাস্তবতা থেকেও সত্য ও শ্রেয়তর হতে আরম্ভ করে।

অদে ল্যান্সেলিন: ভার্চুয়াল ও বাস্তব নিয়ে তোমার ধারণাগুলোকে দ্য ম্যাট্রিক্স মুভির মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। ম্যাট্রিক্সের প্রথম পর্বটি তো একেবারে সরাসরি সেরকম ইঙ্গিত দিয়েছে। মনে হয়েছে “সিমুলাক্রা ও সিমুলেশন” এর প্রচ্ছদ যেন রূপালি পর্দায়! অবাক হয়েছো?

জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ: এখানে নিশ্চিতভাবেই একটা ভুল বোঝাবুঝি আছে, যে কারণে আমি এখনও দ্য ম্যাট্রিক্স নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। দ্য ম্যাট্রিক্স-এর প্রথম পর্ব মুক্তি পাবার পর ওয়াচোস্কি ভাইদের তরফ থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল পরের পর্বগুলোয় তারা আমার সঙ্গে কাজ করবেন। কিন্তু এরকম হবার প্রশ্নই ওঠে না (হাসি)। ১৯৮০ সালেও এরকম একবার হয়েছিল যখন ন্যু-ইয়র্কের সিমুলেশনবাদী চিত্রশিল্পীরা আমার সাথে দেখা করলেন। ভার্চুয়াল যে একটা অবধারিত বিষয়, আমার এই প্রকল্পকে তারা গ্রহণ করলেন এবং সেটাকে একটা পরিষ্কার ফ্যান্টাসির চেহারা দিয়ে দিলেন। কিন্তু আসলে এটা এমন এক জগত যেখানে বাস্তব জগতের ক্যাটাগরিগুলো খাটে না।

অদে ল্যান্সেলিন: কিন্তু ধরো, দ্য পারফেক্ট ক্রাইম-এ তুমি যে দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলছো, তার সাথে এই ফিল্ম অবিশ্বাস্যভাবে মিলে যায়। এই ফিল্ম যথার্থই “বাস্তবের পোড়োবাড়ি”র দিকে ধাবমান, যেখানে পুরোপুরি ভার্চুয়াল এবং কল্পনার মানুষেরা চিন্তাশীলতার সক্ষম বিষয়বস্তু থেকে খুব বেশি ভিন্ন কিছু না।

জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ: ঠিক, তবে বাস্তব ও ভার্চুয়ালের মুছে যেতে-থাকা সীমানা নিয়ে আরো অনেক ফিল্ম হয়েছে: দ্য টুম্যান শো, মাইনরিটি রিপোর্ট, বা এমনকি মালহল্যান্ড ড্রাইভ, যেটি ডেভিড লিঞ্চ-এর মাস্টারপিস। দ্য ম্যাট্রিক্স-এর মূল কৃতিত্ব হল যে সে এই বিষয়টাকে মারখাপ্পা আক্রমণ করেছে। যদিও সেটা করেছে অনেক সরলভাবে। তার ম্যাসেজ হল, হয় চরিত্রগুলো ম্যাট্রিক্স বা ডিজিটাল জগতের বাসিন্দা, না হয় তারা র‌্যাডিক্যালভাবে এর বাইরে, যেটা দেখা যায় দ্য ম্যাট্রিক্স-এ জিয়ন শহরের অধিবাসীদের মাঝে। এই দুই জগতের দেখা যখন হয় তখন কী ঘটতে পারে এটা দেখানো খুব ইন্টারেস্টিং হতে পারে। কিন্তু এই ফিল্মের সবচেয়ে বিব্রতকর অংশ হল, যে-সমস্যাটির উদয় হয়েছে সিমুলেশন থেকে, সেটিকে সে মোকাবেলা করতে চেয়েছে প্লাতোনিক ট্রিটমেন্ট দিয়ে। এটি একটি মারাত্মক ত্রুটি। জগত যে একটি বড়সড় বিভ্রম ছাড়া আর কিছু নয় - এই ধারণাটি প্রায় সব বড়-বড় সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং শিল্পচর্চা ও প্রতীকায়নের মাধ্যমে এর সুরাহা হয়েছে। আর একই ধরনের ভোগান্তি ঠেকাতে আমরা যা বানিয়েছি, সেটা হল একটা গাণিতিক বাস্তব যেটি সাবেকি বাস্তবকে প্রতিস্থাপন করতে সম। আর এভাবে একটা চূড়ান্ত সমাধানের দিকে যাওয়া: এমন একটি ভার্চুয়াল জগত যেখানে যাবতীয় বিপজ্জনক ও নেতিবাচক বিষয় আশয়ের জায়গা নেই। এটাই দ্য ম্যাট্রিক্স মুভি-র পদ্ধতি। যা কিছু স্বপ্নে, ইউটোপিয়ায় বা ফ্যান্টাসিতে করবার কথা, সেগুলোকে একটা চেহারা দেয়া হয়েছে, “বাস্তবায়িত” করা হয়েছে। এটা একটি নিটোল স্বচ্ছতার জগত। এই মুভিটি সেই ধরনের একটা ম্যাট্রিক্স নিয়ে এবং সেখানে এরকম একটি ম্যাট্রিক্স গড়ে তোলা যেতে পারতো।

অদে ল্যান্সেলিন: কিন্তু এটা তো সেই মুভিও যেখানে প্রকাশ্যে মানুষের প্রযুক্তিজাত বিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা করা হয়েছে। আবার একইসঙ্গে এটা সেই মুভি যেটা ডিজিটাল জগতের উন্মাদনা ও কম্পিউটারে-বানানো দৃশ্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেছে।

জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ: ম্যাটিক্স রিলোডেড মুভির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটাতে সেই পরিহাসের সামান্যতম কণাও আর অবশিষ্ট নেই, এমন কিছুই নেই যা দর্শককে মুভির এই বিপুল স্পেশাল ইফেক্ট-এর বাইরে কিছু ভাবাবে। এমন একটাও সিকোয়েন্স নেই ঐ মুভিতে যেখানে কোনো অবিশ্বাস্য ডিটেইল তোমাকে একটা সত্য ইমেজের সামনা সামনি দাঁড় করিয়ে দেবে। আসলে, প্র্রযুক্তি নিয়ে রূপালি পর্দার মানুষদের যে মোহগ্রস্থতা আছে, সেটাই এই মুভিটাকে স্রেফ একটা তথ্যের আকর বানিয়ে ছেড়েছে। বাস্তব আর কল্পনাকে আলাদা করার কোনো রাস্তাই আর ঐ ছবিতে নেই। কিন্তু দ্য ম্যাট্রিক্স আদতে একটি অনিঃশেষ বিষয়বস্তুর কথা বলেছিল, যা একইসঙ্গে সরাসরি ও বিরোধী, কারণ এটা বাস্তব জগতের কোনোখানেই নেই। মুভিটার শেষে যে ছদ্ম-ফ্রয়েডীয় ভাষণটি আছে, সেখানে এটা সুন্দরভাবে বলা হয়েছে: যা কিছু গতানুগতিক নয় তাকে সমীকরণের ছাঁদে ফেলে দিতে হলে ম্যাট্রিক্স-কে আবার ঢেলে সাজাতে (গাণিতিক ভাষায়, রিপ্রোগ্রামিং করা) হবে। আর তুমি, প্রতিরোধকারী, তুমিও সমীকরণের অংশ। মনে হচ্ছে, এরকম একটি ভার্চুয়াল সার্কিটে আমরা যেন চিরকালের জন্য আটকা পড়ে গেছি, যা থেকে বাইরে বেরুনোর কোনো রাস্তাই নেই। এই জায়গাটায় আবার আমি তাত্ত্বিকভাবে দ্বিমত পোষণ করি (হাসি)। দ্য ম্যাট্রিক্স এমন একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির চেহারা তুলে ধরেছে এবং তার বদলে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে, যার জুড়ি আজকাল বাস্তবে দেখা যায়। এটাকে একটা বৈশ্বিক মাপে দেখানো এই ছবির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। এখানে বরং মার্শাল ম্যাকলুহানের শরণ নেয়া ভাল: দ্য মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ, বা, বলবার মাধ্যমটিই হল বক্তব্য। যে উদ্দাম ও দুর্দমনীয় সংক্রমণের মাধ্যমে দ্য ম্যাট্রিক্স নিজেকে দর্শকের মাঝে সঞ্চার করছে, সেটিই হল তার বক্তব্য।

অদে ল্যান্সেলিন: এটা খুব মজার যে বাণিজ্যিক বিচারে প্রায়-সব আমেরিকার ব্লকবাস্টারগুলো, হোক সেটা দ্য ম্যাট্রিক্স কিংবা ম্যাডোনা-র সর্বশেষ অ্যালবাম, সবাই দাবি করছে যে এরা এমন একটি সিস্টেমের সমালোচনা করছে, যে সিস্টেমটি আবার ব্যাপকভাবে ওদের প্রমোট করে।

জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ: ঠিক এটাই আমাদের সময়টাকে এরকম নিপীড়নমূলক বানিয়েছে। বর্তমান সিস্টেমটা যে বিনোদন সামগ্রীগুলো উৎপাদন করছে তার মধ্যে কোথায় যেন একটা নেতিবাচক বিভ্রম গেঁথে দিচ্ছে সে। যেন কারখানা নিজেই মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস উৎপাদন করছে। সব ভাল ভাল বিকল্পগুলোকে ঠেকিয়ে রাখার এটাই হল কার্যকর পন্থা। জগত সম্পর্কে কারো প্রত্যক্ষণকে এক জায়গায় আটকে রাখবে, এমন কোনো ওমেগা পয়েন্ট নেই, এর বিপরীত ক্রিয়াটিও নেই; শুধু উদ্দীপনা নিয়ে লেগে-থাকা। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, একটা সিস্টেম যতই পূর্ণতার দিকে যায়, ততই সে একটা সার্বিক দুর্ঘটের দিকেও যায়। এই বস্তুগত পরিহাসটি সেই সত্যই প্রতিপাদন করে যে, কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনাও সেটি প্রমাণ করে। সন্ত্রাসবাদ বিকল্প কোনো মতার আধার নয়। পশ্চিমের ক্ষমতা যে রীতিমত আত্মহন্তারক হয়ে উঠছে নিজেকে বদলাতে গিয়ে, সন্ত্রাসবাদ একটু বড় করে সেটাকেই প্রতীকায়িত করেছে। সেই সময়েই এটা আমি সরাসরি বলেছিলাম, কেউ আমল দেয় নি। তবে এসব মোকাবেলা করতে গিয়ে আমাদের দুঃখবাদী বা নৈরাজ্যবাদী হওয়ার দরকার নেই। এই সিস্টেম, এই ভার্চুয়াল কিংবা এই ম্যাট্রিক্স ― সবই সম্ভবত ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ফিরে যাবে। কিন্তু এই যে বদলানোর প্রক্রিয়া, এই যে প্রতিরোধ এবং মোহময়তা ― এর কোনো বিনাশ নেই।


বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

হারিয়ে যাওয়া একটি কবিতা

তুমুল বিভ্রমে হঠাৎ তাকে পাই
তুমুল সচেতনে হেরে
তমাল তার পণ বেঁধেছে নিজ ডালে
সে আসে মৃতদেহ ছেড়ে

প্রবল বাকরোধ আমায় পেয়ে বসে
প্রবল বমনের ঘাতে
প্রাচীন অনীহার ত্রিশির তাড়া খেয়ে
শুয়েছি এই নদীখাতে

সে আসে পোড়াদেহ খোলস পালটিয়ে
কুমারী নবভাষা পেয়ে
নিকোনো ঘর থেকে পালিয়ে যাদুঘরে
বলেছি ফিরে যাও মেয়ে

তোমার ফলভার যেখানে উপগত
একদা আদিবাস জেনে
দেখেছি নদীটির শাসন দুরকম
ঋতু ও বিবাহের গানে

(১৯৯০?)


[বহুদিন আগে লেখা, ছন্দ শিখছি কেবল তখন। তারপর ছন্দ বিস্মরণ। কোথায় লুকিয়েছিল এই লেখাটি? আজ বহুদিন পর, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে নিশ্চয়। এরই মধ্যে দু-দুটো কবিতার বই, একে বাইরে রেখেই। তাই কাগজ নয়, ওয়েবই সমাধি হোক তার।]




মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

মানলে তালগাছ, না মানলে বালগাছ!!

বিনয় মজুমদারের একটা কবিতার উদ্ধৃতি আমি দিয়েছিলাম। ব্রাত্য রাইসু সেইটাকে ‘নর প্রাকৃতিক জৈব কবিতা’ অভিধায় আখ্যায়িত করেছেন। এই ধরনের অভিধার কথাও মনে হয় আর কেউ বলেন নাই। ফলে স্বত্ব রাইসুর, সন্দেহ নাই। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, সেই কবিতার শিরায় শিরায় রবীন্দ্রনাথের মনুমেন্টপ্রমাণ অবস্থান নিয়ে একটা পরিষ্কার বিদ্রুপ বহমান, যেটা রবীন্দ্রনাথের অবদানকে পাশ কাটায় না, সহমর্মী থাকে। বিনয়ের সময় হয়ত রবীন্দ্রনাথকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার স্পর্ধা অর্জন করে নাই, যেটা অর্জন করেছে ব্রাত্য রাইসুর সময়, বা তিনি হয়ত তার সময় থেকেও অনেকখানি এগিয়ে (এগিয়ে বলছি, যেহেতু তেমন কাউকেই পাচ্ছি না, যে, উইদ ফুল থ্রটল, রাইসুর সাথে একমত হইতে পারতেছে)।

আমি (ভুলক্রমে!) একটা পাটাতনের ইঙ্গিত করেছিলাম। যেহেতু আমি বিশ্বাস করি কোনোকিছুই রাতারাতি ডিম ফুইটা বাইর হয় না। আমার ধারণা ছিল, রবীন্দ্র প্রসঙ্গে ব্রাত্য রাইসুর র‌্যাডিক্যাল অবস্থান ঐতিহাসিকভাবেই বিকশিত হয়েছে। বিনয়কে একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে মানছিলাম। কিন্তু রাইসু’র মনে হয়েছে, এইটা উনার বক্তব্যের মেরিট যাবতীয় গরুগাধাকে বণ্টন করে দেয়ার একটি সুমন রহমানীয় চক্রান্ত। রাইসুর বক্তব্যের স্বত্ব তার কাছ থেকে ছিনায়া লইয়া যাওয়ার একটা স্নিগ্ধ চেষ্টা। সেই কোপ থেকে পাটাতনকে তিনি ‘পাঠাতন’ লিখলেন, তার মানে বিনয় বা অন্যান্য ‘পাঠা’দের সাথে একমঞ্চে উচ্চারিত হওয়ার কোনো খায়েশ উনার নাই।

ভাই রাইসু, আপনার বক্তব্যের মেরিট আপনারই। আমার বিবর্তনবাদ (বা ঐতিহাসিক বিকাশবাদ) আমারই থাক, ধইরা নিই যে আপনার রবীন্দ্র-অবধারণ মোটামুটি নবুয়তের ফর্মেই আপনের ওপর নাযিল হইছে। কিন্তু তাতেও একটা সমস্যা পাকাইতেছে আপনারই লেখা একটা কবিতা।

বিরহে পরাণ থরোথরো
ঘুরে মরিব একেলা
গাবো ঠাকুরের গান

এমন দিনেই তারে বলা যায়
যা বলিনি এতদিন
প্রথমত বৃষ্টির অভাবে

আর আমার জন্যই এল এই গান জলের ওপরে ভেসে ভেসে

(ব্রাত্য রাইসু, বর্ষামঙ্গল, আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি)

বিরহাক্রান্ত রাইসু একা একা ঘুরে ঘুরে ঠাকুরের গান গাইতেছে, এই কবিতার চিত্র যদি মোটামুটি এইরকমই হয়, তাইলে উহারে দয়া কইরা একটা অভিধা দিয়া দিবেন কি? আমাদের একটু বইলা দিবেন কি, এই কবিতার সাথে আপনের বর্তমান রবীন্দ্র-অবস্থানের কোনো ধারাবাহিকতা আছে কি না? জানতে ইচ্ছা করতেছে।

কবিসভা বড় অদ্ভূত জায়গা। এইখানে কোনো তর্কেরই মিমাংসা হয় না, এমন কি অনেক মিমাংসিত তর্কও এইখানে টগবগ কইরা ফোটে (এটা মন্দ না)। এইখানে প্রতিপক্ষ হইয়া যারা কোনো তর্ক আরম্ভ করেন, প্রতিপক্ষ থাইকাই তারা আলোচনা ক্ষান্ত দেন, বুঝি বা ক্লান্ত হৈয়া পড়ার কারণে। এইরকম অনেক ঈমানদারের সাক্ষাৎ এইখানে মিলে।

মানভাষা-ঊনভাষা তর্ক একটি পোস্ট কলনিয়াল চিন্তাদশা, এইটা বুঝতে আমার দুইটাকাও লাগে না। এই তর্কের পরিবেশ তৈরি হইছে ক্ষমতা-সম্পর্কের নানান ইতিহাস, নানান তত্ত্ব ও ঘটনার পাটাতনের (পাটাতনই লিখলাম, কী আর করা!) ওপর দাঁড়িয়ে। জাস্ট অ্যা মেয়ার পোস্ট-কলোনিয়াল ইমপ্লিকেশন! এইটা একটা ভাল এজেন্ডা বইলা আমার ধারণা, আমি এই এজেন্ডার খুব ভক্ত। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন এইটা কোনো ইতিহাস-নিরপেক্ষ দশা থেইকা তার ওপর হঠাৎ কইরা নাযিল হইছে, সেইটা তার ভাবনা, তার সুখ।

আরো স্পেসিফিক হইয়া বলি: ধরা যাক, বাংলা সাহিত্যে যত রবীন্দ্র বিরোধিতা আছে সব একজাতের, শুধু রাইসুরটা আলাদা জাতের। এক্ষণে আমি জানতে চাই, ব্রাত্য রাইসু তার রবীন্দ্র বিরোধিতায় এ পর্যন্ত যত বাক্য লিখেছেন, তাত্ত্বিকভাবে তার মধ্যে এমন কোনো বক্তব্য কি আছে, যেটি পোস্ট-কলোনিয়াল চিন্তার ধারাবাহিকতা ছাড়া এসেছে?

আমাদের গ্রামে লোকজন কয়, মানলে তালগাছ না মানলে বালগাছ। যারা এইটা কয়, বা যে অবস্থায় কয়, সেইটা হইল কাউরে তালগাছও না বানানো, বালগাছও না বানানো। কারণ, কাউরে তালগাছ বানানো সহজ, এর চেয়ে সহজ বালগাছ বানানো।


ঢাকা, ১৬ মে ২০০৫


শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০০৮

কবিতার পাঠ: ইমরুল হাসানের একটি কবিতা

ইমরুল হাসানের কবিতাটি এল ইমেইলে:


পাগল

কেউ কি আর চেষ্টা করে যাচ্ছে না, তোমার কি মনে হয়?
আড়ালে আড়ালে কতই না শ্রেণীভেদ, শাসিয়ে যাচ্ছে
রাস্তার পাশে তোমাকে দাঁড় করিয়ে যাচ্ছে একা!

ইচ্ছা হয়, উবু হয়ে বসে থাকি, রাস্তার কোণায়
ড্রেনের পাশে, মাথানিচু; আগে, অনেক অনেক আগে যেমন
বসে থাকতো, পাগল! কিছুটা সুশ্রী আর যার সুস্থ হওয়ার আশা
মরে যাই নাই তখনো, তাকে দেখলে মনে হতো যে, সে আর
পাগল হতে চায় নাই, কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বসে পড়েছে
যা আর স্বাভাবিক নয়, যাকে কিনা বলা হচ্ছে, ভাবা হচ্ছে
সে আর যা নয়, যা সে হতে চায় নাই, যা আসলে আর কিছুই না ...

এমনই একটা র্নিবিকল্প সময়, সন্ধ্যাবেলায়
কতকিছুই না ভাবছে মানুষ-জন, চলে যাচ্ছে, ফুসফাস করে
হাঁপাতে হাঁপাতে পার হয়ে যাচ্ছে, কতকিছুই তো করছে ...
কেউ কি আর ড্রেনের ভিতর থেকে টাকা খোঁজার মতো করে
অন্যকিছু বের করে আনার চেষ্টাটা করে যাচ্ছে না?
তোমার কি মনে হয়?

২৯.০৮.০৮


একঝলক পাঠ, তারপর আবার প্রতিদিনের জীবনে। কিন্তু সেই যে পাগল, যে কিছুটা সুশ্রী, এবং সুস্থ হবার আশা এখনো শেষ হয়ে যায় নাই যার, তাকে তাড়ানো গেল না। আশাহীন যে পাগলামি তাকে ভুলে যাওয়া সহজ, হয়ত জরুরিও, আবার পাগলামিহীনতায়ও কোনো গল্প নেই, মনে রাখাও নেই। প্রতিদিনের এই যে জীবন, পথে-পাওয়া জীবন, এই যে সব মৃদু অস্বস্তি বাড়ি ফিরবার পথে, এই যে একটুকরা বিষাদ... এগুলোই ইমরুলকে কবিতায় উবু করে। মনে হবে যেন মাখনে ছুরি চালাচ্ছে সে, কিন্তু আলাদা যে ইমেজটা হাজির থাকে মনে, কবিতাটি পড়বার বহুদিন পরেও, আমি খেয়াল করি ক্রমে সেটা গ্রানাইটের মত শক্ত হয়ে যায়!

একেকটা ইমেজের এত শক্তি! ভাবি।

ইমরুলের এই কবিতায় (অন্য অনেক কবিতায়ও বোধ করি) কবি কথা বলছে যার সাথে, বা যাকে আসলে কবিতাটি শোনানো হচ্ছে, তার ব্যক্তিত্ব অন্যরকম। সে যেন সব কিছু ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট বোঝে, তাই ইমরুল তাকে নানান ইমেজ দিয়ে, ইমেজের ভেতর গুপ্তির মত প্রশ্ন গুঁজে দিয়ে সংশয়ী করে তুলতে চায়। কবিতা পাড়ার জন্য এমন একজন সঙ্গী পেয়ে যাওয়া বেশ আরামের, কবির জন্য। জরুরিও বটে।

ইমরুলের কবিতা কানের কাছে ফিসফিস করে বলার মত, এবং বলার পর, যিনি বললেন এবং যিনি শুনলেন তারা ভুলে যাওয়ার ভান করবেন সত্যি, কিন্তু ঐ একটা-দুটা ইমেজ থাকবে যা আপনার সংবেদনার নরম মাটিতে গ্রানাইটের মত অনড় হয়ে পড়ে থাকবে। আপনি ভাববেন, ঠিক আছে পরে সরিয়ে দেবেন 'খন, কিন্তু... হাহাহা.... পারছেন কি?

পাগলা ভক্তের ধাওয়া!!


কবিসভায় ব্রাত্য রাইসু এবং আমি (ইমরুল এবং ভাস্করও) দুয়েকটি বিষয় নিয়া তর্ক করিতেছিলাম। আমরা পরস্পরের কিছু কিছু বিষয়ে একমত আর কিছু কিছু বিষয়ে দুইমত হইতেছিলাম। তাতে অনেক বিষয় আমার নাদান-চক্ষে পরিষ্কার হইবার সুযোগ পাইতেছিল, মান্যবর রাইসু-ও তর্কটিকে উপভোগ্য বইলা সায় দিতেছিলেন।

কিন্তু পাগলা ভক্তের মন ইহাতে মানিবে কেন?

ভক্তের মন তাই নানান মোক্ষম কৌশলের আশ্রয় খুঁজিল। একজন বেনামে সুমন রহমানের ভক্ত সাজিলেন। বিপরীত লিঙ্গের এই চরিত্রটি আমার কাছে সুমন রহমানের অনেক লেখা বিষয়ে আপ্লূত প্রশংসা করিলেন, যাতে আমার মহিলাবাঞ্ছা আর ভক্তবাঞ্ছা দুইটাই পুরা হয়। অনেক ইনায়া বিনায়া শেষে তিনি আমার ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর চাহিলেন। কিন্তু ততক্ষণে আমি আমার জানের ওপর খতরা টের পাইয়া গিয়াছি। তাই দরজায় রসুনের মালা ঝোলাইয়া হাতে ক্রুশ লইয়া বইসা রহিলাম। কোনো সাড়া দিলাম না। ফোন নম্বর দিলাম না। এরপর সেই ভক্তের প্রশংসা ক্রমে নিন্দায় পর্যবসিত হইতে থাকিল। স্বস্তি পাইলাম। মনে হইল এই যাত্রা ফাঁড়া কাটিয়া গেছে। বন্ধ দরজার ওপারের মোহনীয় হাসিখানি অবশেষে গগনবিদারী প্রেতচিৎকারিণীরূপে পাহাড়েপর্বতে প্রতিধ্বনি তুলিয়া বিদায় নিলেন।


স্ত্রীজাতীয় আরেকজন নিজনামে কবিসভার যৌথ ডাকবাক্স থিকা আমার ব্যক্তিগত মেইলবাক্সে আছর করিলেন। তিনি আসিলেন এক ‘ভয়ংকর’ ভালবাসার পয়গাম লইয়া। আমাকে নানান বিষয়াদি জিজ্ঞাস করিলেন, যথা: আমি বিবাহিত কি না, আমি দেখিতে ‘উত্তেজক’ কি না, ইত্যাদি। তিনি আমাকে লম্বা লম্বা চিঠি লিখিতে লাগিলেন এবং আমাকেও সেইমত আদেশ করিলেন। কিন্তু আমি একজন ভীতুবিবাহিত মানুষ বিধায় উনার উদাত্ত ডাকে সাড়া দিবার পারি নাই। শেষে আমার ‘অক্ষম’ পুরুষত্বে কুপিত হইয়া তিনি নিজ অভিসন্ধি সরাসরি প্রকাশ করিলেন: আর কোনোদিন যদি আপনি রাইসুরে.......

ইমেইল বাক্স খুলিলেই এইসব ভয়ংকর ভয়ংকর সব হুমকিতে ভরা চিঠি দেখিতে পাই, শেষে মনের দুঃখে ইমেইল ছাইড়া এমএসএন চ্যাটবাক্সে গিয়া ঢুকিলাম। সেইখানে ঘাপটি মাইরা ছিলেন আরেকজন, আমাকে দেখিবামাত্র একখানি জল্লাদের ইমোটিকন দেখায়া ভাগায়া দিলেন। আমি খাবি খায়া পলায়া যাইবার প্রাক্কালে তিনি আবার পেছন পেছন দুইখান ভাইরাস লেলাইয়া দিলেন। ইহার একটি লাগিল আমার কম্পিউটারের উইন্ডোজে। কম্পিউটার ক্র্যাশ করিল। আরেকটি লাগিল আমার ইমিউন সিস্টেমে। আমিও ক্র্যাশ করিলাম।

ভাবিলাম, ভালই হইল একদিকে, পাগলা ভক্তের মন শান্ত হইবেক। আমি ও আমার কম্পিউটার চুপচাপ পইড়া থাকি, মুক ও বধির ইস্কুলে যাওয়া-আসা করি বরং!!

কিন্তু টেলিফোন নামক আরেকটি যন্ত্র যে আছে এই জগতে! সেইখানে হানা দিলেন আরেকজন। বলিলেন, দেখছেন নাকি, আপনেরে নিয়া চিঠি লিখছে আইজগা....

তখনও দেখি নাই। পরে ল্যাচড়াইতে ল্যাচড়াইতে এক সাইবার ক্যাফেতে গিয়া দেখিলাম আরেক ভক্ত। টিপু সাহেব লেখছেন। ভালই লেখছেন। আমার বলিবার কিছু নাই। কারণ উনার স্কুলবিতর্কমার্কা বক্তব্যের উত্তরে আমার যা বলার তা আগের চিঠিতেই বলা আছে। সাশ্রয় করি বরঞ্চ!

একটা প্রস্তাব নিয়া ভাবিতেছি। রাইসু একদা নিন্দাসভার ডাক দিয়াছিলেন। তখন আমি অন্যরকম তর্কে মজিয়াছিলাম। এখন মনে হইতেছে নিন্দাসভা না হইলেও একখানি ভক্তসভা তৈয়ার করা অত্যন্ত জরুরি। যাবতীয় ভক্তকুলের একটা জন্য অভয়ারণ্য খুলিয়া দিলে উনারা যেমন নিজ নিজ আইকনদের ধামা ধরিয়া স্বচ্ছন্দে বিহার করিতে পারিবেন, তেমনি আমাদেরও অনেক তর্কসাশ্রয় হইয়া যাইবে।




ঢাকা, ৩১ মে ২০০৫