দ্রুতপঠন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দ্রুতপঠন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১০

তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ

আপনি কি সেলিব্রিটি? পাঠক, প্রশ্নটা আপনাকেই করছি। এই প্রশ্নে ভড়কে যাওয়ার কোনো কারণ নেই, বিশেষত অযূত গণমাধ্যম-অধ্যূষিত বাংলাদেশে। আপনার সামনে গোটাদশেক টেলিভিশন চ্যানেলের গোটা অর্ধশত রিয়েলিটি শো-র যে কোনো একটিতে আপনি অংশগ্রহণ করতেই পারেন। আপনি হতে পারেন ক্লোজ-আপ ওয়ান, শাহ সিমেন্ট নির্মাণ শ্রমিক কিংবা ম্যাজিক তিনচাকার তারকা, “ইত্যাদি” ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ, রকমারি টক শো-র নিয়মিত অতিথি, লাক্স-চ্যানেলআই সেরা সুন্দরী, প্রথম আলো-র সেরা তারুণ্য, এফ এম রেডিও-র জকি, এবং আরো বহু কিছু। আবার আপনি হতেই পারেন বাংলা ব্লগোস্ফিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ লেখক, আপনার ফেসবুক নোট হতে পারে বহুলপঠিত, আপনার বানানো ভিডিও কিংবা আপনার তোলা আলোকচিত্র ইউটিউবে বা ফ্লিকারে আপনাকে প্রচুর জনপ্রিয়তার উপলক্ষ এনে দিতেই পারে। ফলে, আপনাকে স্রেফ আমার মত নগণ্য লেখকের নাদান পাঠক ভাবার কোনো অবকাশ নেই, কোনো- না-কোনোভাবে দেখা যাবে আপনিও তারকা। সেলিব্রিটি।

তর্কের খাতিরে না হয় ধরেই নিই যে, দুর্ভাগ্যবশত আপনি এখনো সেলিব্রিটি নন। আপনার গানের গলা ভাল না, গুছিয়ে ঠিক কথা বলতে পারেন না, লেখালেখির অভ্যাস নেই, ছবি তোলা বা ভিডিও করার বাতিকও নেই, ইন্টারনেটে যান না, এবং দেখতেও ভাল নন। পাঠক, ভেবে দেখুন তো নিজের ওপরে ঠিক এতগুলো “না” কবুল করতে মন চায় কিনা? নিশ্চয়ই মানবেন কোথাও না কোথাও আপনার সেলিব্রিটি হয়ে উঠবার দারুণ সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, শুধু তার পরিচর্যা দরকার। এতদিন সে সুযোগ ছিল না, এখন তা আপনার দোরগোড়ায় এনে দিয়েছে গণমাধ্যম। তার এত রকমের রেসিপি, এর যে কোনো একটাতে আপনার খাপে-খাপ হয়ে যেতেই পারে। তখন আপনাকে ঠেকায় কে? আপনিই সেলিব্রিটি, আগামীর! আপনাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ!
আমি যেসব সেলিব্রিটির কথা এখানে বলছি, তারা কেউ সাবেকী সেলিব্রিটিদের মত বাক্সবন্দী নন। আপনি শপিং করছেন কোনো মলে, অপরিসর লিফটে দুয়েকজন লাক্সসুন্দরীর সাথে আপনার মোলাকাত হয়ে যেতে পারে; খালি ভেবে “এই সিএনজি” হাঁক দিতেই দেখলেন ভেতরে বসে আছেন ক্লোজআপ ওয়ান তারকা মাহাদী বা সালমা; চাকরি থেকে বছরদুই আগে অবসর নেয়া আপনার শ্বশুরমশাই হঠাৎ করেই হয়ে উঠতে পারেন কোনো টক-শোর ব্যস্ততম অতিথি; আপনার বাড়িওয়ালার স্ত্রী হয়ত ইতোমধ্যেই বার-দুই ডাক পেয়েছেন সিদ্দিকা কবীরের রেসিপির অনুষ্ঠানে; আপনি রিকশায় উঠে দেখলেন যে সেটা চালাচ্ছেন তিনচাকার তারকা ওমর আলী; হরতালের দিন রিকশা শেয়ার করে যাচ্ছেন কোথাও, পাশের লোকটাকে খুব চেনা-চেনা লাগছে, হঠাৎই ধরতে পারলেন যে আপনার রিকশাসঙ্গী আর কেউ নন, এভারেস্ট-বিজয়ী মুসা ইব্রাহিম!
আপনার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই যে তারকারাজি, আটপৌরে-প্রায় সেলিব্রিটিসমাজ, এটা কিন্তু নতুন ঘটনা। গণমাধ্যম প্রতিনিয়ত তাদের উৎপাদন করছে। এটা একটা নিয়ত চলমান প্রক্রিয়া: ফলে আগের বছরের মলিন হয়ে-যাওয়া এক সেট তারকার বদলে নতুন বছরে আপনি পাচ্ছেন ঝকঝকে নতুন এক সেট সেলিব্রিটি। যেমন, ক্লোজআপ ওয়ানের প্রথম দশজনের সবাই তারকাখ্যাতি পান। ২০০৫ থেকে চলমান এই অনুষ্ঠান সেই হিসেবে মাত্র চারবছরে প্রায় গোটা চল্লিশেক তারকার জন্ম দিয়েছে। একই কথা খাটে লাক্স-চ্যানেলআই এর ক্ষেত্রেও। তবে, এই উৎপাদিত তারকাস্রোতকে অক্ষয় করে রাখার ব্রত গণমাধ্যম নেয় না। একজন যখন ক্লোজআপ তারকা হন, তিনি প্রথমে টেলিভিশনে নন্দিত হন, তারপর তার অডিও অ্যালবাম বেরয়, কাগজে সাক্ষাৎকার আসে, টক শোতে ডাক পান, লাইভ অনুষ্ঠানে গান গাইবার আমন্ত্রণ পান দেশে ও বিদেশে। এভাবে তিনি তার অমরতার রাস্তা বানাতে থাকেন। সবাই পারেন না, অনেকেই ঝরে যান। ঝরে-পড়া তারাদের কথা আকাশই মনে রাখে না, গণমাধ্যম তো কোন্ ছার! সে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তারকার উৎপাদনে ব্যস্ত। এই ঝরে-পড়া তার পরিকল্পনারই অংশ।
প্রশ্ন হচ্ছে, গণমাধ্যম হঠাৎ করে আমজনতার মধ্যে এমন গরুখোঁজার মত তারকা খুঁজতে শুরু করল কেন? এক কথায় এর উত্তর দেয়া কঠিন। গণমাধ্যম-বিশেষজ্ঞ জন হার্টলি মনে করেন এটা গণমাধ্যম এবং সমাজব্যবস্থার গণতন্ত্রায়নের (ফবসড়পৎধঃরপ ঃঁৎহ)ফলে ঘটছে। আবার গ্রায়েম টার্নার এর মতে,গণমাধ্যম সাধারণ্যে মুখ ঘুরিয়েছে (ফবসড়ঃরপ ঃঁৎহ) সত্যি, কিন্তু এর মধ্যে ‘গণতান্ত্রিকতা’ কতটুকু আছে সন্দেহ। প্রথমত, আমজনতা থেকে প্রতিনিয়ত তারকা উৎপাদনের এই প্রক্রিয়া গণমাধ্যমে বিদ্যমান রিয়েলিটি শো-গুলোকে স্থায়িত্ব দেয়। ফলে সে একদিকে যেমন ব্যয়-সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে, অন্যদিকে তার দর্শকের মধ্যে উচ্চাভিলাষ জাগানোর মাধ্যমে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। দ্বিতীয়ত, নতুন নতুন তারকাপ্রবাহ গণমাধ্যমকে সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয় বিনির্মাণের স্বাধীনতা দেয়। কারণ এই নতুন সেলিব্রিটিরা স্বীয় গণমাধ্যমের পতাকা বাই-ডিফল্ট বহন করেন, ক্ষীণ আয়ুর কারণেই হয়ত তাদের ব্যক্তিত্ব গণমাধ্যমের রাজনীতির জন্য নিরাপদ থাকে। এভাবে, নতুন নতুন তারকাপ্রবাহের মাধ্যমে গণমাধ্যম প্রতিনিয়ত নিজের ভেতরে ঢুকে নিজেকেই পুনর্নির্মাণ করে চলেছে, জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ যাকে বলেন “দ্য ইমপ্লোসন অব মিডিয়া”। আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যে, গণমাধ্যম ইদানিংকালে শুধু “মাধ্যম” নয় আর, পুরাদস্তুর নির্মাতা হয়ে উঠেছে। সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয় বিনির্মাণের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে সে নিজে-নিজেই।
এই যে অসংখ্য রিয়েলিটি শো, অনন্ত বিস্তৃত ইন্টারনেটের স্বাধীন চারণভূমি -- সেখানে আমজনতার এই তারকালীলা কিন্তু বাংলাদেশেই প্রথম শুরু হয় নি। বরং বাংলাদেশ খানিকটা পরেই সেই ইঁদুরদৌড়ে সামিল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো “বিগ ব্রাদার” বা “আমেরিকান আইডল” বিশ্বের নানান দেশে নানান উপায়ে পুনরুৎপাদন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলকভাবে কম বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থার একটি যোগাযোগপ্রক্রিয়াকে ভারত কিংবা বাংলাদেশের মত দেশের নির্বিচারে অনুসরণ করার বিপদ আছে অনেক। যুক্তরাষ্ট্রে “আমজনতা” বলতে যা বোঝায়, আমাদের মত প্রকট শ্রেণীবৈষম্য ও নানান স্তরের দারিদ্রের দেশে সেটা বোঝা মুশকিল। ২০০৮ সালে এটিএন বাঙলা টেলিভিশনের আলোচিত অনুষ্ঠান “তিনচাকার তারকা” নিয়ে একটি প্রবন্ধে আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি কীভাবে এই নবলব্ধ তারকাখ্যাতি গরিব রিকশাচালকদের দীর্ঘস্থায়ী পরিচয়সংকটে ফেলে দিয়েছে, তাদের বিদ্যমান দারিদ্রের কোনো উপশম না-করেই। অবশ্য দারিদ্রের উপশম গণমাধ্যমের কাজ নয়, রাষ্ট্রের কাজ। এমনকি সাংস্কৃতিক পরিচয় বিনির্মাণকেও রাষ্ট্র নিজের এখতিয়ারভূক্ত কাজ ভাবে, যার ফলে সে সবসময় গণমাধ্যমকে তেরচা চোখে দেখে। নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু গণমাধ্যম রাবনের দশমুন্ডুর মত যেভাবে বিন্দু বিন্দু সম্ভাবনা ও প্রযুক্তির অগ্রগতিকে আঠার আনা কাজে লাগিয়ে বিকশিত হয়ে চলেছে, মান্ধাতার আমলের রাষ্ট্রীয় পলিসি দিয়ে তার মতিগতি বোঝাই দুষ্কর, নিয়ন্ত্রণ তো পরের আলাপ। এই কিছুদিন আগেও জিপিও একটা ইমেইল শাখা চালু করার তোড়জোড় করছিল, খোদা মালুম কেন!
যাক। সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয় বিনির্মাণ নিয়ে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের মধ্যে এই বিসম্বাদ উত্তরোত্তর বাড়বে বলেই মনে হয়। কিন্তু তাতে আপনার সেলিব্রিটি হওয়া আটকাবে না। নানারকম গণমাধ্যমের হাজারো রকম গলিঘুপচির ভেতর কোথাও না কোথাও আপনার জন্য চেয়ার পাতা আছে, সন্দেহ নেই। প্রিয় পাঠক, হে অদূর ভবিষ্যতের সেলিব্রিটি, আপনাকে আগাম সালাম!
ব্রিসবেন ২৭ জুলাই ২০১০

শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০০৮

প্রথম আলো-র ১০ বছরের ১০ বই: কিছু পর্যবেক্ষণ

প্রথম আলো বছরে বেশ কয়েকবার বই নির্বাচন করে থাকে। সেরা ১০ মননশীল বই, সেরা ১০ সৃজনশীল বই, তরুণদের সেরা ১০ বই, প্রথম আলো বছরের সেরা মননশীল ও সৃজনশীল বই, ইত্যাদি। বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। ফলে এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনারও শেষ নেই। সব মিলিয়ে এই উদ্যোগ খুবই উৎসাহব্যঞ্জক।

এবার, পত্রিকার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকী আরেকটি বাছাই উপহার দিয়েছে। ১০ বছরের ১০ বই। লেখক তালিকায় আছেন সর্বজনাব হাসান আজিজুল হক, গোলাম মুরশিদ, হুমায়ুন আহমেদ, আবদুশ শাকুর, আনিসুজ্জামান, আনিসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, আলতাফ হোসেন, শহীদুল জহির এবং অদিতি ফাল্গুনী। বলাবাহুল্য ১০ বছরে ১০টি বই নির্বাচন করা খুবই দুঃসাধ্য কাজ এবং এরকম নির্বাচনকে সর্বতোভাবে প্রতিনিধিত্বশীল ভাবা মুশকিল। তালিকায় যাঁরা আছেন এঁদের অনেকেই ভাল লেখক। কিন্তু যারা প্রথম আলো-র এই স্বীকৃতি প্রদানের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে খেয়াল করছেন তাদের মনে এই তালিকা কিছু পর্যবেক্ষণের জন্ম দেবে। যেমন:


১. তালিকায় হুমায়ুন আহমেদ এর "জ্যোছনা ও জননীর গল্প" আছে, কিন্তু এই বইটিকে হারিয়ে দিয়ে যে বইটি প্রথম আলো পুরষ্কার জিতে নিয়েছিল ("প্রেম ও প্রার্থনার গল্প" - সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) সেটি নেই।

২. তালিকায় শহীদুল জহির আছেন, কিন্তু শাহীন আখতার নেই। স্মর্তব্য, শাহীন আখতার-এর "তালাশ" প্রথম আলো পুরষ্কার পেয়েছিল শহীদুল জহিরকে বইকে পেছনে ফেলে।

আরো আরো প্রশ্ন হয়ত করা যায়। তবে এই ইস্যুতে প্রশ্ন জাগে: কেন প্রথম আলো পুরষ্কার পাওয়া শাহীন আখতার এবং সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের জায়গা নিয়ে নিলেন তাদের রানার-আপবৃন্দ? এটা কি কোনো কনপেনসেশন প্যাকেজের আওতায় ঘটল? নাকি প্রথম আলো এখন ভাবছে হুমায়ুন আহমেদ কিংবা শহীদুল জহিরকে রেখে শাহীন আখতার কিংবা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে সেরা লেখক নির্বাচন করা যথাযথ বিবেচনা ছিল না তাদের?

শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০০৮

মিজান মল্লিক-এর কবিতা: পাঠপ্রতিক্রিয়া

যারা সময়াভাবে মিজান মল্লিকের কবিতা পড়বার সুযোগ পান নাই, তাদের জন্য আমার এই বাড়তি বদান্যতা। দয়া কৈরা মিজান মল্লিকের কবিতার দুইটা স্যাম্পল একবার পড়েন আপনেরা ...


মনোরঞ্জন


দেখলাম, বরই বিষয়ে লোকেদের উৎসাহ অনেক।
বাচ্চাদের কৌতূহল বিস্ময়কর! বড়রা অভিজ্ঞ থাকায় ছল-চাতুরী করে।
দেখলাম, গাছে চড়ে অনেকেই বরই পাড়ে আর যারা গাছে উঠতে পারে না তারা
দূর থেকে ঢিল ছোঁড়ে-আঁকশি ব্যবহার করে। অবশ্য বরই বিকি-কিনি হয় বাজারে।
ঠিক কবে থেকে? সেই ইতিহাস আমার ম্মরণে নাই।

যারা ইকনোমিক্স ভালো বোঝে-তারা গাছেরটাও খায় তলারটাও।
এমন কিছু মুখ আমার চেনা, যারা কদাচিৎ চেখে দেখেছে, আর কিছু-
(আমার জানামতে অন্তত এক জন) জীবনে একবারও বরই না খেয়ে পটোল তুলেছে।
তারা নিতান্তই হত-দরিদ্র আর সংস্কারাচ্ছন্ন কিনা ভেবে দেখছি।
এ কথা নিশ্চিত যে লোকেরা বরই খায়। কেউ কেউ আচার তৈরি করে-
রোদে শুকায়, সময় বুঝে আয়েশ করে খায়।

ভেবে দেখলাম। লোকেরা পরনারী আর পরদেশি ভাষা চর্চা করে।

২৪/৬/৪


কালচারের সন তারিখ

শাওন মাসের তৃতীয় দিবস। রোজ বৃহস্পতিবার ভোরবেলা আমার জন্ম।
সাল জানা নাই। তবে সংগ্রামের চেয়ে বয়সে আমি ছোট। আমার আম্মা
নিরর না। আরবিতে কোরান পড়তে সম। আর জনক নিরীহ ইশকুল
মাস্টার। রিটায়ার্ড। সৎ। কর্মঠ। সকাল-সন্ধ্যা ননস্টপ কাজ করেন। কথা বলেন কম।
বিষয় আশ্চর্যের তবে বিবরণ সত্য। আমার বাপের বাপও ছিলেন মাস্টার। উপরন্তু পাঠান।
ঘোড়ায় চড়ে তিনি মক্কা-মদিনায় যান। তাঁরে আমি শুনেছি বটে নয়নে দেখি নাই।

দাদার ইন্তেকালের সময় আমার বাপের বয়স ছিল নিতান্তই কম। মাত্র সেভেন কাসের ছাত্র।

বাপেরে দেখি। তার লগে আমার দারুণ সখ্য। যদিও আমার জন্মবিত্তান্ত তিনি লিখে রাখেন নাই।
অবশ্য তাঁর বাপেও তাঁর জন্মতারিখ লিখে রাখে নাই। আমরা কালচারের নিচে সন তারিখ দিই।

.......
পাঠক, আপনি কি স্বীয় স্মৃতিবিভ্রাট বা লেখকের নামের বিভ্রাটের আশংকা করতেছেন। আসেন আপনেরে আশংকামুক্ত করি। এর কোনোটাই ঘটে নাই। কবিতাগুলো নিশ্চিতভাবেই মিজান মল্লিকের লেখা, তবে, সম্ভবত আগে জন্মানোর সুযোগে পশ্চিমবঙ্গের করি বিনয় মজুমদার উনার ‘পূর্বকরণ’ (অনুকরণের সম্ভাব্য উল্টাশব্দ) করনের মওকা পাইয়া গেছিলেন! তবে মিজান কিন্তু এতকিছুর পরও নিজেরে আলাদা কৈরা চিনাইতে সমর্থ। বিনয়ের ঐসমস্ত বিবৃতিধর্মী কবিতার সাবটেক্সটে ভাবনার অনেক বুদবুদ উড়াউড়ি করে। মিজান তার কবিতায় এইসব ‘অহেতুক’ উড়াউড়ির রাস্তা সিলগালা কৈরা দিছেন। উনার কবিতার সারফেস ইটের মত শক্ত। ঐটাই উনারে চিননের রাস্তা।

বিনয় মজুমদার বছরে ছয়মাস হাসপাতালে থাকেন শুনেছি। হয়ত ধরাধামেও বেশিদিন থাকবেন না। উনার বন্ধুরা অনেকেই গত হৈয়া গেছেন। বিনয়ের সম্ভাব্য প্রয়াণে যারা ব্যথিত হৈবার প্রস্তুতি মনে মনে লৈতেছিলেন, উনাদেরও বাড়াভাতে ছাই দিলেন মিজান মল্লিক। মনে হৈতেছে এখন থিকা উনিই এই ট্রাডিশন চালায়া লয়া যাইবেন। সাথে আরো থাকতেছে পূর্ববাংলার কনটেক্সট, একদম ফ্রি! বিনয়-ভক্তরা এখন থিকাই চাইলে ক্যাবলা ঘুরায়া বসতে পারেন। আর বিদেশ নয়...এখন থেকে বাংলাদেশেই...! অবশ্য, এই দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে কবি বিনয় মজুমদার এবং কবি মিজান মল্লিকের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চুক্তিস্বাক্ষর হৈছে কিনা আমার জানা নাই।

2005

বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০০৮

রূপক কর্মকারের শাহরিয়ার-প্রজেক্ট!

ঘটনাটি ঘটেছে সচলায়তনে। কদিন আগে রূপক কর্মকার নামে এক "অতিথি ব্লগার" সেখানে নাযিল হলেন। তাঁর লক্ষ্য ব্লগের খাতায় কবি আবু হাসান শাহরিয়ারকে প্রমোট করা। সচলায়তনের কেউ কেউ শাহরিয়ার-ভক্ত, ফলে কাজটি তেমন কঠিন নয়। তিনি নাযিল হলেন আবু হাসান শাহরিয়ার-এর একটি সাক্ষাৎকারসহ। সেখানে আ হা শা সচলায়তনের ব্লগারদের "বিশ্ব নাগরিক" জাতীয় বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন। আর যায় কই? সচলায়তনের ব্লগাররা ঝাঁপিখোলা কৃতজ্ঞতা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন ঐ পোস্টে, শাহরিয়ার-বন্দনায় এবং আত্মতুষ্টিতে সচলায়তন বরাবরের মত মুখর হয়ে উঠল। অভিষিক্ত হলেন রূপক কর্মকার নিজেও, তবে সেটি শাহরিয়ার-এর বার্তা পৌঁছে দেয়ার কারণেই। নিজেও তিনি কোনোভাবেই নিজেকে বিশিষ্ট করে তুললেন না, নির্লোভ বার্তাবাহকের মতই দায়িত্ব পালন করলেন। অবাক লাগল! কে এই শাহরিয়ারময় রূপক কর্মকার, শাহরিয়ারের সিগনেচার ছাড়া ত্রিভূবনে যার অস্তিত্ব কিছু নাই। ভাবলাম হতে পারে, কতরকম ভক্তই না জগতে থাকে, প্রভুর পায়ে জীবন সঁপে দেয়া ভক্তেরই কাজ বটে।

কিছুপরই বুঝলাম, যত নখদন্তহীন নির্লোভ ভাবা হচ্ছিল তিনি ততটা নন। সচলায়তনের ব্লগার পলাশ দত্ত ও মুজিব মেহদীর সাথে রীতিমত পায়ে পা দিয়ে গ্যাঞ্জাম বাঁধানোর ধরন দেখে সেটা আঁচ করা গেল। পলাশ দত্তের কবিতার সমালোচনা করতে গিয়ে যেরকম কৃপাণহস্ত এবং কনফিডেন্ট লাগল রূপককে, মনে হল তাঁর ওপর আবু হাসান শাহরিয়ারের আত্মা যেন ভর করেছে! মুজিব মেহদীর সাথে তর্ক করতে গিয়ে তিনি সেই স্বর অব্যাহত রাখলেন, এবং তাঁর সমর্থনে আরো আরো শাহরিয়ার-ভক্তের আবির্ভাব হতে থাকল সচলায়তনে। মজার বিষয় হল, নতুন এই ভক্তরা কেউ সচলায়তনের নিয়মিত ব্লগার নন, "অতিথি" মন্তব্যকারী। শেষ বোমাটা ফাটালেন সচলায়তন কর্তৃপক্ষ। তারা জানালেন যে রূপক কর্মকার এবং তার সমর্থক-মন্তব্যকারীদের আইপি একই। অর্থাৎ একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন নামে কাজ চালিয়েছেন! ভাগ্যিস আবু হাসান শাহরিয়ার-এর আইপি জানেন না তারা! অবশেষে এই ধরনের প্রতারণার অভিযোগে ব্যান খাইলেন রূপক বাবু!

আবু হাসান শাহরিয়ার-এর ইন্টারভিউ পড়ার পর মনে হচ্ছিল যে, তিনি সচলায়তনে প্রবেশ করতে চান। কিন্তু সচলায়তনের প্রবেশপথ তার আকৃতির তুলনায় বেশ ছোট, ততটুকু মাথা নুইয়ে ঢোকার ব্যাপারে শাহরিয়ারের মন হয়ত সায় দিচ্ছিল না। তাই সচলায়তনে রূপকবাবুর আগমন, দরজা বড় করার জন্য, "স্বাগতম" লেখা আলাদা গেট বানানোর জন্য। আইকন হয়ে প্রবেশ করতে চান তিনি, আইকন হয়েই বিহার করতে চান। আবার "প্রিয় কবি"কে এই ব্লগে দেখতে পাবার জন্য আকূল হয়ে উঠেছিলেন অনেকেই। তাতে রূপক বাবু হয়তো একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন! গুরুর স্টাইলে ছড়ি ঘোরানোর মকশো করতে গিয়েই তীরে এসে তরী ডুবলো তার! তরী ডুবলো কার?

আবু হাসান শাহরিয়ার-এর সাংগঠনিক প্রতিভা আছে, আবার অনেকেই তাঁকে কবি মনে করেন। আমি অবশ্য খুব পড়ে দেখি নি, বিচ্ছিন্ন দুচার লাইন এখানে ওখানে দেখেছি, তাতে পড়বার আগ্রহ তৈরি হয় নি। কিন্তু তারেক রহিমের কী হবে? তার মুখটা মনে করে আমার কষ্টই লাগছে, ডাই-হার্ড শাহরিয়ার-ফ্যান সে, রূপক-কর্মকার কেলেংকারির মূল প্রণোদনা কোত্থেকে এল, এটা বোঝার মত যথেষ্ট বুদ্ধি ওর আছে আমি জানি।

রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০০৮

হয়তো জীবন এদের কাছে এতো ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট নয়!

প্রবাসের মাটিতে বসে যেসব "শিক্ষিত" বাঙ্গালছানা "আস্তিক-নাস্তিক" জাতীয় সৌখিন, বস্তাপচা ও এলিটিস্ট তর্কে কম্যুনিটি ব্লগের তাওয়া গরম রাখেন তাদের বিদেহী বিবেচনাবোধের জন্য এই ভিডিওটি। এটি আল-জাজিরা টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদন, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন নিয়ে। এ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ আছে কিছু, পরবর্তীতে লিখবো। আমার মতো বৃত্তির নিরাপত্তা নিয়ে নয়, জমিবেচা টাকায় হাড়ভাঙ্গা শ্রম দিতে এরা বিদেশ গেছেন। মেয়াদ শেষে আমার মতো পারমানেন্ট রেসিডেন্টশিপের দরজায় দাঁড়াবেন না, ফিরে আসবেন পরিবারের মাঝে। তবু ক্রীতদাসের জীবন তাদের। তারা জানে ঈশ্বর তাদের পক্ষে নয়, তারা এও দেখেছে দেশের হাইকমিশন আরেক রক্তচোষা, তবু তারা উপাসনা করে, তবু তারা দেশের বাসি পত্রিকার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আমি ভাবি কেন এই অস্তি, কেন অস্বীকার নয়? কেন নিখিল নাস্তির স্রোতে ভেসে যাওয়া নয়?

হয়তো জীবন এদের কাছে এত ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট নয়!

শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০০৮

নিকনবীর অন্তর্ধান ও আমারব্লগের ভবিষ্যত

আগের পোস্টে হযরত মুহম্মদ নিকধারী এক ব্লগারের কথা লিখেছিলাম। আমার ধারণা ছিল আমারব্লগ কর্তৃপক্ষ তাকে ব্যান করেছেন। পরে জানা গেল তাকে ব্যান করা হয় নাই, নিজেই তিনি "প্রাইভেট" বলয়ে চলে গেছেন। আজকে সকালে উঠে দেখলাম ইনি আর নাই। শূন্য ভিটায় চোরছ্যাচ্চড়দের বিড়ির পাছা পড়ে আছে।

এই অন্তর্ধানের রহস্য কি? মনে রাখতে হবে গতকাল প্রতিবাদী ব্লগাররা যখন দলে দলে আমারব্লগ ছাড়ছিলেন, তখনো নিকনবী বুক ফুলিয়ে বহাল তবিয়তে তার ভিটাবাড়িতেই ছিলেন। অর্থাৎ তাদের প্রস্থানে নিকনবী এবং তার উম্মতরা ভয়ের কিছু দেখেন নি। হয়ত আরামই পেয়েছিলেন। হয়ত এটাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল।

কিন্তু মডারেশনহীন আমারব্লগের কারিগরদের জন্য এটা কাম্য ছিল না। বিশেষত যারা চলে যাচ্ছিলেন তারা মোটামুটি আমারব্লগেই ব্লগিং করতেন। রিলিজিয়াসলি। এদের তৎপরতার দ্বারা আমারব্লগের একটা চেহারা দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। আমারব্লগ নিজের পাটাতন খুঁজে পাচ্ছিল। কিন্তু সেটা অনেকেরই কাম্য নয়, অনুমান করি। তারা মুক্তচিন্তা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমারব্লগকে ডাম্পিং জোন বানিয়ে মজা দেখতে চান। এসব ধান্দাবাজ হিপোক্রেটদের কথা আমি আমার পোস্টে লিখেছিলাম। বলেছিলাম যে এইসব নিকেরা এখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে বড় বড় ভাষণ দেয়, কিন্তু সচলায়তনের পর্দায় ডান্ডাবেড়িসহ অনাবিল অভিনয় করে চলে। প্রশ্ন করেছিলাম এরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এত ডাইহার্ড সমর্থক হওয়া সত্বেও সচলায়তনে পড়ে আছে কেন? যেখানে আমারব্লগ তাদের মতপ্রকাশের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য "নো মডারেশন" পলিসি দিয়ে আপ্যায়ন করছে? বলেছিলাম, "একই লোক এক জায়গায় মডারেটেড হয়ে লিখছে, আবার এখানে এসে মডারেশন ছাড়া লিখছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তার ব্যক্তিগত কোনো অবস্থান নেই। এরা আসলে ভীষণরকম পজেসিভ, ওয়েবে যতরকম ঠাঁই আছে সবখানেই একটা ফাৎনা ফেলে রাখতে চায়। এদের আমি হিপোক্রেট মনে করি।

এখন দেখা যাচ্ছে, আমার ব্লগের “নো মডারেশন” নীতির সুযোগে এইসব হিপোক্রেসি পার পেয়ে যাচ্ছে। একদিকে আমার ব্লগ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে উচ্চাসন দিচ্ছে, আবার অন্যদিকে এইসমস্ত হিপোক্রেসিকেও প্রমোট করছে নিজের অজান্তে।"

সম্ভবত এগুলো আমারব্লগ কারিগরদেরও মনের কথা ছিল। আমি "মিনিমাম সেন্সিবল মডারেশন"এর প্রস্তাব দিয়েছিলাম আর সুশান্ত সেটার যৌক্তিকতা যেই খুঁজে পেলেন, আর অমনি নিকনবী হাওয়া! এ যেন ভুতের মুখে রসুন পড়ল! বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই নিকনবীর নাটক আমারব্লগে কারা শুরু করেছিল। আমি জানতাম তারা যে কোন মূল্যেই হোক আমারব্লগে মডারেশন চায় না, কারণ মডারেশন চালু হলে তাদের আন্তব্লগীয় রাজনীতি এবং বিকৃত মানসিকতার প্রদর্শন আর কোথায় করবে? ফলে পিশাচ আপাতত দরজার ওপাশে গেল, কিন্তু রসুনের মালা খসে পড়লেই আবার সে ঘাড়ে কামড় দিতে হাজির হবে ঠিক ঠিক।

আমারব্লগ "নো মডারেশন" নীতিতে চললে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি এই ব্লগে লিখিও না তেমন। বরং "নো মডারেশন" নিয়ে ব্লগটি কতদূর যায় সেটা একটা ইন্টারেস্টিং অবজার্ভেশন আমার। কেউ কেউ দেখলাম ব্লগারদের "বিবেকের মডারেশন"কেই সমাধান ভাবছেন। আমি একমত। তবে থিওরেটিক্যালি। যারা ভাবছেন এই ব্লগে সবাই একইরকম খোলা মনোভাব নিয়ে ব্লগিং করতে আসছে তারা ভুল ভাবছেন আমার ধারণা। এখানে নানারকমের আদম আছে, নানান উদ্দেশ্য তাদের। কারো কারো বিবেক আগে থেকেই মডারেটেড, বা প্রিকন্ডিশনড। বিবেকের থিওরি দিয়ে এদের জাগ্রত করা যাবে না।

আমারব্লগ আমি মাঝে মাঝে পড়ি। আমার বিবেচনায়, এই ব্লগে একমাত্র গালাগালি ছাড়া এমন কিছু দেখি নাই যা কোনো মডারেটেড ব্লগে করা সম্ভব নয়। গালাগালিগুলো বাদ দিলে বাদবাকি লেখাগুলো তো প্রথম আলো-র মত সুশীল পত্রিকাতেও ছাপা সম্ভব বলে আমার ধারণা! ফলে আমার ধারণা যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধুয়া তুলছেন তারা ইচ্ছামত গালাগালি করাকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে ভাবছেন। ফলে, এই প্রেক্ষিতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এক শ্রেণীর সাইকোপ্যাথদের যত্রতত্র মাস্টারবেশনের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মোল্লামার্কা আস্ফালনের তোপে আমারব্লগ তার মডারেশনভাবনা নিয়ে হয়ত ম্রিয়মান হয়ে গেছে। কী আর করা। বিষ্ঠাবহনের দায় থেকে আমারব্লগ নিজেকে মুক্ত করুক, একটা স্বতন্ত্র ব্লগ হয়ে টিকে থাকুক, আপাতত সেটাই চাওয়া।








শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০০৮

নবীর নামে নিক নিয়ে "আমার ব্লগ"এ তোলপাড়!

এবার সুনামি "আমার ব্লগ"এ। সেখানে এক ব্লগার নবী হযরত মুহম্মদ এর নিক নিয়ে ব্লগ লিখেছেন। আর তা নিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন অন্য ব্লগাররা। ঐ নিকধারীর চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছেড়েছেন। কেউ কেউ "আমার ব্লগ" থেকে নিজেদের (সাময়িক ভাবে) প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ঐ নিকটির অ্যাকাউন্ট ডিলিট করার জোর দাবি উঠেছে। ফলশ্রুতিতে, আমার ব্লগ কর্তৃপক্ষ যারা "নো মডারেশন" নীতিকে আশ্রয় করে এই ব্লগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারা অবশেষে হযরত মুহম্মদ নামক নিকটির অ্যাকাউন্ট আমার ব্লগ-এর পাতা থেকে ডিলিট করে দিয়েছেন।

কম্যুনিটি ব্লগিং প্লাটফর্ম হিসেবে "আমার ব্লগ"এর জন্মই হয়েছে মডারেশনের ধারণার বিপরীত প্রণোদনা থেকে। সম্ভবত সচলায়তনের স্বৈরাচারী মডারেশন পদ্ধতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে এইরকম একটি প্লাটফর্মের কথা ভাবেন তারা। যতদূর দেখেছি, এই ব্লগে মডারেটরের কোনো পদই সৃষ্টি করা হয় নি। কোনো মডারেশন নাই, ব্যান নাই, সদস্যপদের জন্য লম্বা কিউ নাই, তেল মারতে হয় না কাউকে, সব মিলিয়ে আমার ব্লগ যেন সেই মজারু দ্বীপ যেখানে সবই আছে, কিন্তু পুলিশ নাই!

ঠিক সেই মজার আহবানে নয়, একটা কম্যুনিটি ব্লগে লেখালেখি অব্যাহত রাখার ইচ্ছা থেকে আমার ব্লগ-এ আমিও অ্যাকাউন্ট খুলেছিলাম। ব্লগ লিখতেই দেখি... ওমা... সচলায়তনের সব ভ্যাম্পায়াররা এখানে হানা দিতে শুরু করলেন। আসলে গোড়া থেকেই এরা এখানে ছিলেন, নতুন কোনো কম্যুনিটি হলেই সেখানে তারা এজেন্সি নিয়ে রাখেন। তো, তাদের গায়ের গন্ধে আর পাখার ঝাপটে আমার ত্রাহি ত্রাহি দশা! গালাগালির চূড়ান্ত করে ছাড়লেন এরা। এই এরাই আবার সচলায়তনে যখন লেখেন, তখন কত নোক্ষী ছেলে! কী বোর্ড দিয়ে সব সোনা যেন বের হয়! বুঝলাম এরা সচলায়তনে সোনার ডিম পাড়েন আর আমার ব্লগ-এ লিজার্ড রিলিজ করতে আসেন। একই অভিযোগ সামহোয়ারইন-এর ব্লগাররাও করেছিলেন এদের বিরূদ্ধে, বেশ আগে। কিন্তু সামহোয়ার বড় কম্যুনিটি, এইসব হাগাহাগির থোড়াই কেয়ার করে। কিন্তু আমার ব্লগ একটা নতুন কম্যুনিটি, এখনো তার নিজস্ব কম্যুনিটি ঠিকমত গড়ে ওঠে নাই।

এখন কথা হচ্ছে, "আমার ব্লগ"এর কৌশল অনুযায়ী সেখানে হযরত মুহম্মদ নামে নিক থাকতেই পারে। কারণ এই ব্লগে কোনো নীতিমালাই নেই, মত প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ মানে না এরা। যারা এখানে লিখছেন তারা এই পজিশন মেনে নিয়েই লিখছেন, বা এই পজিশন থাকার কারণেই এখানে কন্টিনিউ করছেন। তাহলে কোন্ কারণে এরা হযরত মুহম্মদ নিককে ডিলিট করতে বলেন?

কারণ খুবই মানবিক। মুসলমানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করা যাবে না। হযরত মুহম্মদ নিকটি আদতে তাইই করতে এসেছিল বলে আমারো মনে হয়েছে। এতে ব্লগের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এটা স্বাভাবিক। আবার, আপনি যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানেন, তাহলে এইরকম নিক নিয়ে কোনো ব্লগার তার অনুভূতির কথা বলার স্বাধীনতা রাখেন এটাও মানেন। এখন সংক্ষুব্ধ ব্লগার মুকুল এবং আরো কেউ কেউ বলছেন, স্বাধীনতা মানেই যথেচ্ছাচার নয়। যা খুশি তাই করা মানেই স্বাধীনতা নয়। একটা সীমা থাকতে হবে। তাদের সীমাসন্ধানের নৈতিক চাপপ্রয়োগের ফলে আমার ব্লগ-এর মূল দর্শনের সীমানাপ্রাচীর ভেঙ্গে চুরমার। দেখলাম হযরত মুহম্মদ এর অ্যাকাউন্টটা অবশেষে ডিলিট করে দেয়া হয়েছে।

এটা বাংলা কম্যুনিটি ব্লগের ইতিহাসে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। "আমার ব্লগ" একটা অত্যন্ত সাহসী চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল যে তারা কিছুই মডারেশন করবে না। ওয়েব হবে অবারিত, স্বাধীন। এটি প্রমাণ করার মাধ্যমে তারা আসলে প্রমাণ করতে শুরু করেছিল যে সচলায়তনজাতীয় ওয়েব ব্লগিং মূলত প্রিন্টমিডিয়ার ভাবাদর্শকেই ওয়েবে ইমপোজ করার ব্যাপার। সেই একই বিধিনিষেধ, একই মানবিচার, একইরকম কাহিনী। "আমার ব্লগ"এর এই প্রজেক্ট এখন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ল। মডারেটরের অফিস খুলল তারাও।

তাহলে কি আমি বলতে চাইছি হযরত মুহম্মদ এর নিক ব্যান করা অযৌক্তিক হয়েছে? না, সেটা বলতে চাইছি না। কিন্তু এই প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর "আমার ব্লগ"এর প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে আমার পক্ষে দেয়াও সম্ভব নয়। নবীর নামে নিক যিনি নিয়েছেন তিনি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জায়গা থেকে নিয়েছেন, আবার যারা এর প্রতিবাদ করেছেন তারাও খুব অযৌক্তিক ছিলেন না। টেক্সটের শক্তি অসীম। হযরত মুহম্মদ-এর নামের সাথে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অপরপক্ষ একটু অসুবিধার মধ্যেই থাকবেন। আবার, এই নিক নিয়ে নিকধারী যা করতে শুরু করেছিলেন তাকে ম্যানিপুলেশন তো বলাই যায়। আমার মতে, একটা কম্যুনিটি ব্লগে সেটা তিনি করতে পারেন না। সেখানে নানারকম লোক আছে, তাদের নানা ধরনের বিশ্বাস বা অবস্থান আছে। কিন্তু তাই বলে তিনি অন্যায় করেছেন সেটাই বা বলি কী করে? তিনি তো এই ব্লগের চরম লিবারাল চরিত্রের সুযোগ নিয়েছেন মাত্র।

ঘুরে ঘুরে সেই পুরনো প্যাঁচাল: নৈরাজ্য না নিয়ন্ত্রণ? আমি সবসময় যেটা বলতে চেয়েছি, নৈরাজ্য যেমন নয়, তেমনি সচলায়তন-মার্কা নিয়ন্ত্রণও নয়, বরং নৈরাজ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ বরাবর একটা স্কেলে টেনে সেই স্কেলের কোন্ বিন্দুতে আপনি অবস্থান করছেন সেটা কম্যুনিটি ব্লগকে ঠিক করে নিতেই হবে। "আমার ব্লগ" ধীরেসুস্থে হয়ত সেই পথেরই পথিক হয়ে ওঠবে।


পোস্ট স্ক্রিপ্টাম: অলৌকিক হাসান তার পোস্টে জানিয়েছেন যে নিকনবীকে ব্যান করা হয় নাই, নিজেই তিনি "প্রাইভেটাইজড" হৈয়া গেছেন। সেই অর্থে আমার ব্লগের "নো মডারেশন" নীতি এখনো বহাল আছে। বিস্তারিত দেখুন http://amarblog.com/aloukik/13474 এই লিংকে।

০৩.১০.০৮


শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

ব্লগারের মৃত্যু ও ভার্চুয়াল শোকের চেহারা


মুহম্মদ জুবায়ের মারা গেছেন। ইনি প্রথম যৌবনে লেখক হওয়ার জন্য ঘর ছেড়েছিলেন এবং শেষ জীবনে লেখালেখি করবার জন্য বেছে নিয়েছিলেন ব্লগকে। সেই অর্থে ব্লগার ছিলেন তিনি, লিখতেন সচলায়তনে। আমি যখন সচলায়তনে প্রবেশ করেছিলাম, তিনি রীতিমত ছেলেমানুষের মত খুশি হয়েছিলেন। আমার দ্রুত সদস্যভূক্তির ব্যাপারে সচলায়তন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছিলেন। তারপর একদিন কথাচ্ছলে জানিয়েছিলেন যে, তিনি সচলায়তন অঙ্গনে আর লিখবেন না। সেটি সম্ভবত ডুয়াল পোস্টিং নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপের জবাবে তাঁর অভিমানী সিদ্ধান্ত ছিল। আমরা যথারীতি তাঁকে তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি তা করেছিলেন। তারপর আমি যখন সচলায়তন ছেড়ে আসি, তিনি আমার ছেড়ে আসার সিদ্ধান্তের সাথে একমত ছিলেন না। তাঁর মনে হয়েছিল আমি না ছেড়ে আসলেও পারতাম। এমনকি সচলায়তন বিষয়ে প্রথম আলো-তে লেখা আমার নিবন্ধের গীবতেও সামিল হয়েছিলেন তিনি।

মুহম্মদ জুবায়ের বিষয়ে এইটুকু লেখার পর আমি নিজে পরিষ্কার যে সচলায়তনের ব্যাপারে তাঁর শর্তহীন পক্ষপাত ছিল। খুবই ভালোবাসতেন এই ফোরামটিকে। কিছু খিটিমিটি হলেও সেখানেই লিখে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। এতই টান ছিল এই ফোরামের প্রতি যে, এই ফোরাম ত্যাগ করবার পর অন্য অনেকের মত তিনিও আমার সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রদ করে দিয়েছিলেন।

মুহম্মদ জুবায়ের-এর সাথে আমার প্রথম দেখা কবিসভায়। কবিসভা উত্তপ্ত তর্কবিতর্কের জায়গা, মনে পড়ে কোনো একটা বিষয়ে তাঁর সাথেও আমার তর্ক হয়েছিল। পরে অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিলেন কবিসভায়। মেইল করতেন মাঝে মাঝে, আমার একটি গল্পের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, শহীদ কাদরীর সাথে আমার গল্প নিয়ে তাঁর বিস্তর কথাবার্তা হওয়ার কথা। ফলে, মুহম্মদ জুবায়ের, যাঁকে আমি চর্মচক্ষে দেখি নি কোনোদিন, তাঁর ব্যাপারে একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি আমার ছিল সবসময়।

সচলায়তনে ব্লগ লিখতেন তিনি, সত্তর দশকের জীবনযাপন ও স্বপ্ন নিয়ে তাঁর চিন্তাজাগানিয়া পর্যবেক্ষণ ছিল। একটা ধারাবাহিক উপন্যাসও লিখেছিলেন। বন্ধু ও প্রবাসী লেখক লুৎফর রহমান রিটনকে সচলায়তনে নিয়ে এসেছিলেন। এই ব্লগের মডারেটরদের সাথে তাঁর দহরম মহরমও ছিল। ব্লগাতিরিক্ত যোগাযোগ ছিল। ব্লগারদের কারো কারো সাথেও। একবার তাঁর অসুস্থতা এবং ধূমপান করা নিয়ে তাঁর কন্যাটি একটি মর্মভেদী চিঠি লিখেছিলেন তাঁকে, সেই চিঠি সচলায়তনে অনেক প্রশংসাও পেয়েছিল।

এহেন মানুষটি, যিনি তাঁর যাবতীয় পক্ষপাত ও সমালোচনাসহ আমার কাছে আদ্যোপান্ত ভার্চুয়াল একটি চরিত্র, তাঁর মৃত্যুসংবাদ ঘিরে আমার ভেতর জমতে থাকা শোকের চেহারাটি আঁচ করতে চেষ্টা করি। আঁচ করতে চেষ্টা করি, মুহম্মদ জুবায়ের তাঁর ভার্চুয়াল অস্তিত্বের বাইরে কে ছিলেন, কী ছিলেন। তাঁর স্মৃতিকথা থেকে টের পাই তিনি এক স্বাপ্নিক মানুষ ছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন, সেই ধারাবাহিকতায় সমাজতন্ত্রের স্বপ্নও দেখেছিলেন। তাঁর লেখক হয়ে-উঠার স্বপ্নের সাথে সেইসব স্বপ্নকে তিনি মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিলেন। এভাবে অনেক খুইয়ে, একসময় জীবনকে গুছিয়ে নেয়ার তাড়না অনুভব করেছিলেন, বেছে নিয়েছিলেন প্রবাস জীবন। কিন্তু স্বপ্ন আর স্বপ্নকে বাস্তবে দেখতে না-পাবার বেদনা তাঁর পিছু নিয়েছিল। নিপুণ আততায়ীর মত। প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীর মত তিনিও তাঁর স্বদেশকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন। এর জন্য বেদনা পাবার দায় থেকে কখনো ছুটি নেন নি। ফলে, কর্মস্থলে, ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা স্বজনবেষ্টনীর মাঝেও তিনি ছিলেন একা। একেলা।

কিন্তু এ তো মুখস্ত গল্প। এই গল্পের উপসংহার আমরা জানি। কিন্তু আশ্চর্য হই ভেবে যে মুহম্মদ জুবায়ের সেই উপসংহারটি বেছে নেন নি। প্রৌঢ়ত্বকে জয় করে নেমে এসেছিলেন তরুণদের ব্লগে। তরুণদের চোখভরা স্বপ্নের জগতে হয়ে জুবায়ের যেন বুড়ো বাতিওলা! এ এক জয়ের নেশাই বটে! মনে পড়ে, এমনিতর নেশার টানেই সরকারি চাকুরি থেকে অবসর নেয়া কবি মুস্তাফা আনোয়ার আমাদের উদ্দাম জীবনের সাথে সমানে সমানে পাল্লা দিতেন। গ্রেস নিতেন না একদমই। মুহম্মদ জুবায়েরও তাই। জরাগ্রস্ততার অমোঘ খপ্পরে পড়বার আগে মানুষের শেষ রোমান্টিক দ্রোহ!

কিন্তু আজ যখন মুহম্মদ জুবায়ের মারা গেলেন, আমি বিষণ্ণ হয়ে থাকলাম এই ভেবে যে এই নামটিকে ঘিরে আমাদের অন্তহীন ভার্চুয়াল জগতে আর কোনো গালগল্প তৈরি হবে না। মুহম্মদ জুবায়ের এর নামে আর কোনো ব্লগ বা উপন্যাস আপলোড হবে না, যেগুলো পাঠ করে করে আমরা তাঁকে চিনতে থাকবো, তাঁর ব্যক্তিত্ব তৈরি হতে থাকবে আমাদের পারসেপশনের আঁকাবাঁকা গলির ভেতর। শোকের অক্ষর উপচে পড়ছে সচলায়তনে, অন্যান্য ব্লগেও। ভাবি, এই শোকটি কেমন? কিছু টেক্সটের জন্য কিছু টেক্সটের শোক, নাকি টেক্সট-উত্তর অচেনা যোগাযোগহীন ব্যবহারিক জীবনে এর কোনো অভিঘাত তৈরি হয়? মুহম্মদ জুবায়েরকে আমরা তো চিনেছি তাঁর টেক্সট দিয়েই, অর্থাৎ তাঁর লেখাকে তাঁর ব্যক্তিত্বের উপরে আরোপ করে নিয়েছি আমরা। রলা বার্থ যেমন বলেন, লেখকের অস্তিত্ব বা বিদ্যমানতা তাঁর লেখার স্বাতন্ত্র্যকে বাধাগ্রস্ত করে। সেই অর্থে, ব্লগার মুহম্মদ জুবায়ের-এর মৃত্যু যেন প্রতীকী! যেন তিনি তাঁর মরণ দিয়ে মুক্ত করে গেলেন তাঁর রচনারাশিকে, আমাদের মননে তাঁর ব্যক্তিত্বের সংগঠন প্রক্রিয়া থেকে। টেক্সটের বাইরে সত্যিকারের যিনি জুবায়ের, যার একটা ফুসফুস অকেজো ছিল অনেকদিন, যিনি অনেকের বন্ধু, ভাই বা পিতা, তার শরীরী মৃত্যুতে আমাদের ভার্চুয়াল-পেরোনো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীজীবন কতখানি শোকতপ্ত হবে? সেই অর্থে এটি অথরের মৃত্যু, একটি টেক্সচুয়াল মরণ। এই টেক্সচুয়াল মরণের স্মরণে আমরা যে শোকগ্রস্ত হচ্ছি সেটিও টেক্সচুয়াল, এবং টেক্সটের বাইরেও যদি এর সন্তাপ আমরা অনুভব করি, তবে সেও টেক্সটেরই সামর্থে।

আরেকটা বিষয়: মার্কেজ একটি উপন্যাসে যেমন লিখেছেন, কেবলমাত্র মৃত্যুই মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির যোগ ঘটাতে সক্ষম। অর্থাৎ যে মাটিতে আমার অধিষ্ঠান সেখানে আমার পূর্বপুরুষের কবর থাকলেই সেটা অনেক দৃঢ় হয়ে ওঠে। মুহম্মদ জুবায়ের-এর মৃত্যুশোক তাঁর ব্লগিং ফোরাম সচলায়তনে সেইরকম ইতিবাচক একটি প্রভাব ফেলবে মনে হয়।

বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

ফরহাদ মজহার-এর সাম্প্রতিক কবিতা প্রসঙ্গে


বয়স বিচারে ফরহাদ মজহার কবিতা সঞ্চালনে সবচে বয়োজ্যেষ্ঠ কবি। বাঙালি কবিদের বয়োজ্যেষ্ঠতাকে আমরা, উত্তরসূরী হিসেবে, একটুখানি কৃপাসহযোগে পাঠ করতে অভ্যস্ত। কিন্তু ফরহাদ মজহার সেই আয়েশটুকুর সুযোগ রাখেন নাই এই কবিতাসমূহে। এবং তার অপরাপর কবিতায়। তিনি সবসময় তরুণতর, নিজেকে সমসাময়িক দেখতে ভালবাসেন। আমরাও তাকে অনেক বছর এভাবে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ফলে, এটা তাকেই মানায় যে তিনি ‘ফরিদার জন্য ক্যামেরাগিরি’ করবেন, 'সাড়ে সাতরকমভাবে' তাকাইবেন শালিখ পাখির দিকে।

নানারকমভাবে ফরহাদ মজহার-এর কবিতার বয়স বেড়েছে। ‘ভেজা কবিতা’য় বৃষ্টি তাকে তার দিদির জন্য উদ্বিগ্ন ও সজল করে তোলে। দিদির জন্য আকুল ফরহাদকে তখন আর প্রৌঢ় লাগে না, সেই কিশোরের মত লাগে যে চোখফুটে প্রথম বর্ষা দেখছে:

জলে জলে ভিজছে শহর, জলেতে ইস্পাত
একটি হলুদ মোটরগাড়ি জলেতে চিৎপাত।
দালানগুলো ভিজছে একা কারখানাতে পানি
জলের মধ্যে যুগল ভাসছে কবি ও বিজ্ঞানী।

বেড়েছে না বলে কমেছে বললেই মানায়। কেননা তিনি যখন বিছানা নিয়ে কবিতা রচনা করেন, যেখানে মানবশয্যার দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে জ্ঞান ফলানোর সুযোগও থাকে:

আমার ঘরের একপাশে আয়তত্রে হইয়া বিছানাটি কী সুন্দর অঙ্কিত হইয়া আছে
বিছানা অবধি পোঁছাইতে সভ্যতাকে কত পথ পাড়ি দিতে হইয়াছিল একবার ভাবিয়া দেখো


কিন্তু এরপর তিনি বিস্ময়কররকম ভাবে তার জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করেন। হামলে পড়তে দেন নি বেচারা বিছানার (এবং কবিতার) ওপর। অত্যন্ত শিক্ষণীয় এবং অনুকরণীয় নিরাসক্তি। তরুণদের জন্য। আমরা যারা আমাদের যৎসামান্য র‌্যাশনালিটিকে কবিতার পেছনে লেলিয়ে দিই। আসুন দেখি ঐ দুই লাইনের পর কবি ফরহাদ মজহার, যিনি আবার একাধারে সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতি বিশ্লেষক, উন্নয়ন-চিন্তক এবং তত্ত্বালোচক, কোনদিকে গেলেন:

বিছানার ওপর বালিশটি পড়িয়া আছে, একটি মস্তকের জন্য তার নীরব নিঃশব্দ অপেক্ষা
একটি শরীর পাইবার আশায় বিছানাটি মৃতদেহের মতো গভীর গর্ত হইয়া আছে।

তত্ত্ব নাই, ইতিহাস নাই, সমাজবিজ্ঞান নাই। তাদের নির্যাস আছে হয়ত। কিন্তু আক্রান্ত করে না। কারণ, এখানে কবিতা আছে।

মনে পড়ে, ১৯৭৫ এ লেখা একটি প্রবন্ধ সংকলনে (বইয়ের নাম ছিল "প্রস্তাব") ফরহাদ মজহার তার চেতনাপ্রবাহে বিজ্ঞান, কবিতা, দর্শন, নৃতত্ত্ব সবকিছুকে একীভূত করে দেখতে প্রয়াসী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সময় কত বদলায়! এখন ফরহাদ যখন কবিতা রচনা করেন, তখন তিনি একান্তভাবেই কবি থাকতে চান।

আরেকটা বিষয়। ফরহাদ মজহারই সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে এখন একমাত্র কবি যিনি তরুণদের একটা ভাষাপ্রকরণচিন্তা, যার মেনিফেস্টেশনও পুরোপুরি হওয়া বাকি, সেটা দিয়ে নিজেকে আক্রান্ত করার সাহস দেখাতে পারেন। জয় হোক তাঁর।

২০০৫


শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০০৮

কবিতার পাঠ: ইমরুল হাসানের একটি কবিতা

ইমরুল হাসানের কবিতাটি এল ইমেইলে:


পাগল

কেউ কি আর চেষ্টা করে যাচ্ছে না, তোমার কি মনে হয়?
আড়ালে আড়ালে কতই না শ্রেণীভেদ, শাসিয়ে যাচ্ছে
রাস্তার পাশে তোমাকে দাঁড় করিয়ে যাচ্ছে একা!

ইচ্ছা হয়, উবু হয়ে বসে থাকি, রাস্তার কোণায়
ড্রেনের পাশে, মাথানিচু; আগে, অনেক অনেক আগে যেমন
বসে থাকতো, পাগল! কিছুটা সুশ্রী আর যার সুস্থ হওয়ার আশা
মরে যাই নাই তখনো, তাকে দেখলে মনে হতো যে, সে আর
পাগল হতে চায় নাই, কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বসে পড়েছে
যা আর স্বাভাবিক নয়, যাকে কিনা বলা হচ্ছে, ভাবা হচ্ছে
সে আর যা নয়, যা সে হতে চায় নাই, যা আসলে আর কিছুই না ...

এমনই একটা র্নিবিকল্প সময়, সন্ধ্যাবেলায়
কতকিছুই না ভাবছে মানুষ-জন, চলে যাচ্ছে, ফুসফাস করে
হাঁপাতে হাঁপাতে পার হয়ে যাচ্ছে, কতকিছুই তো করছে ...
কেউ কি আর ড্রেনের ভিতর থেকে টাকা খোঁজার মতো করে
অন্যকিছু বের করে আনার চেষ্টাটা করে যাচ্ছে না?
তোমার কি মনে হয়?

২৯.০৮.০৮


একঝলক পাঠ, তারপর আবার প্রতিদিনের জীবনে। কিন্তু সেই যে পাগল, যে কিছুটা সুশ্রী, এবং সুস্থ হবার আশা এখনো শেষ হয়ে যায় নাই যার, তাকে তাড়ানো গেল না। আশাহীন যে পাগলামি তাকে ভুলে যাওয়া সহজ, হয়ত জরুরিও, আবার পাগলামিহীনতায়ও কোনো গল্প নেই, মনে রাখাও নেই। প্রতিদিনের এই যে জীবন, পথে-পাওয়া জীবন, এই যে সব মৃদু অস্বস্তি বাড়ি ফিরবার পথে, এই যে একটুকরা বিষাদ... এগুলোই ইমরুলকে কবিতায় উবু করে। মনে হবে যেন মাখনে ছুরি চালাচ্ছে সে, কিন্তু আলাদা যে ইমেজটা হাজির থাকে মনে, কবিতাটি পড়বার বহুদিন পরেও, আমি খেয়াল করি ক্রমে সেটা গ্রানাইটের মত শক্ত হয়ে যায়!

একেকটা ইমেজের এত শক্তি! ভাবি।

ইমরুলের এই কবিতায় (অন্য অনেক কবিতায়ও বোধ করি) কবি কথা বলছে যার সাথে, বা যাকে আসলে কবিতাটি শোনানো হচ্ছে, তার ব্যক্তিত্ব অন্যরকম। সে যেন সব কিছু ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট বোঝে, তাই ইমরুল তাকে নানান ইমেজ দিয়ে, ইমেজের ভেতর গুপ্তির মত প্রশ্ন গুঁজে দিয়ে সংশয়ী করে তুলতে চায়। কবিতা পাড়ার জন্য এমন একজন সঙ্গী পেয়ে যাওয়া বেশ আরামের, কবির জন্য। জরুরিও বটে।

ইমরুলের কবিতা কানের কাছে ফিসফিস করে বলার মত, এবং বলার পর, যিনি বললেন এবং যিনি শুনলেন তারা ভুলে যাওয়ার ভান করবেন সত্যি, কিন্তু ঐ একটা-দুটা ইমেজ থাকবে যা আপনার সংবেদনার নরম মাটিতে গ্রানাইটের মত অনড় হয়ে পড়ে থাকবে। আপনি ভাববেন, ঠিক আছে পরে সরিয়ে দেবেন 'খন, কিন্তু... হাহাহা.... পারছেন কি?