২০০৩ সাল। দীর্ঘদিনের হাইবারনেশন কাটিয়ে ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছি। ঢাকায় এসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুরানো বন্ধুদের একসাথ করলাম। তাদের কেউ কেউ নেই, কেউ কেউ মুমূর্ষু, কারো কারো জীবনের পথই পাল্টে গেছে। আমাদের জং ধরা সব তলোয়ার, ঠিক করলাম পত্রিকা করবো একটা। জীবন থেকে জং ছাড়াতে হবে।
পত্রিকার নাম ঠিক হল "মান্দার"। একে ঘিরে রিফাত চৌধুরী, কাজল শাহনেওয়াজ, কফিল আহমেদ, শামসেত তাবরেজী, মাহবুব পিয়াল, আয়শা ঝর্ণা এবং আমি একত্র হলাম। কখনো শাহবাগ, কখনো কাজল শাহনেওয়াজের বাসায়, কখনো ধানমন্ডির কোনো রেস্তোরাঁয় বসে বসে পরিকল্পনা আগায় আমাদের।
এর মধ্যেই কফিল আহমেদ বললেন, কাগজ করতে হলে এখনকার যারা তরুণ তাদের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে তো জানতে হবে। আকাশ থেকে পড়লাম। তাইতো? আমরা তো আর তরুণ নই! আমাদের পর আরো দুটি প্রজন্ম চলে এসেছে এতদিনে। কী করছে তারা? কী লিখছে? তারা কি আমাদের নন্দনতত্ত্বের উত্তরাধিকার বহন করছে?
চোখে পড়ল "কালনেত্র" নামে একটা পত্রিকা। কী ঝকঝকে! শাহবাগের অন্যসব জটায়ুমার্কা লিটলম্যাগ নয়, কী প্রকরণে, কী লেখায়। একে একে আরো কয়েকটি কাগজ চোখে পড়ল। ভাবলাম "মান্দার" এসব তারুণ্যের সাথে আমাদের যোগাযোগের একটা পাটাতন হোক।
এমনি এক সময়ে সুমন প্রবাহনকে প্রথম দেখি। কফিল আহমেদ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। অন্তর্মুখী এক তরুণ। এমন নিচুস্বরে কথা বলেন যে কান খাড়া করে শুনতে হয়। বিভিন্ন জায়গায় ওর দুয়েকটা কবিতা পড়েছিলাম, ঠিক করলাম ওকে "মান্দার"এ লিখতে বলবো। বলাতে রাজি হয়ে গেলেন।
এভাবেই আমার সম্পাদিত একমাত্র সাহিত্য পত্রিকার একমাত্র ইস্যুতে সুমন প্রবাহনের নামটি আমাদের সাথে গেঁথে রইল। "মান্দার" প্রশংসা কুড়িয়েছিল, অঘটনও কম ঘটে নি এর প্রকাশনা ঘিরে। সেসব অন্য কোনো সময়ে বলা যাবে। কাগজ নাম কুড়ালেও এর হ্যাপা সামলাতে গিয়ে আমার দম শেষ হয়ে গেছিল। ফলে, আর সব প্রকৃত লিটলম্যাগের মত "মান্দার"ও প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় আটকে থাকল।
বলা বাহুল্য, সুমন প্রবাহনের সাথে আমাদের যোগাযোগটিও "মান্দার" দ্বিতীয় সংখ্যার মত পেন্ডিং হয়ে থাকল। দেখা হত শাহবাগে, মাঝে মাঝে একসাথে চা-সিগ্রেটও হত। আস্তে আস্তে খেয়াল করছিলাম আমাদের তরুণ কবিবন্ধুটি একটু একটু করে ছন্নছাড়া জীবনের দিকে যেন ঝুঁকছেন। দেখি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আশির দশকে এরকম বদলে যাওয়ার চিত্র অনেক দেখেছি। নতুন কিছু তো নয়। সুমন প্রবাহনকে দেখি, মনে পড়ে শাহেদ শাফায়েত এর কথা, বিষ্ণু বিশ্বাসের কথা, এমন কি শোয়েব শাদাব এর কথাও। কী সব অমিত প্রতিভাবানদের সেই সময়। কিন্তু কখনো মনে পড়ে নি শামীম কবির এর কথা। কখনো ভাবি নি আমাদের তরুণ এই কমরেড শামীম কবির এর পরিণতি নিজের জন্য নির্বাচন করবেন।
মাঝে মাঝে ভাবি, সেই আশির শুরু থেকে আমাদের প্রিয় প্রতিভাগুলোর ঘাড় মটকিয়ে বাঙলা কবিতা বেশ রক্তপায়ী হয়ে উঠেছে। রক্তের নেশা ওকে পেয়ে বসেছে। ইতোমধ্যে ঝরে যাওয়ার তালিকাটি কিন্তু ফুলে ফেঁপে উঠছে ক্রমশ: সুনীল সাইফুল্লাহ, সাবদার সিদ্দিকী, বিষ্ণু বিশ্বাস, শোয়েব শাদাব, শাহেদ শাফায়েত, শামীম কবির, সঞ্চয় প্রথম এবং সুমন প্রবাহন। এদের মধ্য সুনীল, শামীম আর সুমন বেছে নিয়েছেন স্বেচ্ছামৃত্যু। বাকিদের কেউ মৃত, কেউ বা নিখোঁজ, কেউ শেকলবন্দী, কেউ বা স্রেফ ভবঘুরে।
সুমন প্রবাহনের ৩৩তম জন্মদিবসের এই দিনে একে একে অন্য সবার মুখ মনে পড়ছে আমার। যেন একটা ছোটখাট মিছিল, বাঙলা কবিতার বলয় থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়া আমার ভাইদের।
কবিতা এসব অসম্পূর্ণ চেষ্টাগুলোকে, এই উল্কাপিন্ডের মত জীবনগুলোকে, এইসব তীব্র ভালোবাসাগুলোকে কিভাবে মনে রাখবে? তারা কি তাদের নিজ নিজ পরিবার আর বন্ধুদের স্মৃতির উপলক্ষই হয়ে থাকবেন?
জার্নাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জার্নাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০০৮
শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০০৮
প্রথম আলো-র ১০ বছরের ১০ বই: কিছু পর্যবেক্ষণ
প্রথম আলো বছরে বেশ কয়েকবার বই নির্বাচন করে থাকে। সেরা ১০ মননশীল বই, সেরা ১০ সৃজনশীল বই, তরুণদের সেরা ১০ বই, প্রথম আলো বছরের সেরা মননশীল ও সৃজনশীল বই, ইত্যাদি। বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। ফলে এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনারও শেষ নেই। সব মিলিয়ে এই উদ্যোগ খুবই উৎসাহব্যঞ্জক।
এবার, পত্রিকার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকী আরেকটি বাছাই উপহার দিয়েছে। ১০ বছরের ১০ বই। লেখক তালিকায় আছেন সর্বজনাব হাসান আজিজুল হক, গোলাম মুরশিদ, হুমায়ুন আহমেদ, আবদুশ শাকুর, আনিসুজ্জামান, আনিসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, আলতাফ হোসেন, শহীদুল জহির এবং অদিতি ফাল্গুনী। বলাবাহুল্য ১০ বছরে ১০টি বই নির্বাচন করা খুবই দুঃসাধ্য কাজ এবং এরকম নির্বাচনকে সর্বতোভাবে প্রতিনিধিত্বশীল ভাবা মুশকিল। তালিকায় যাঁরা আছেন এঁদের অনেকেই ভাল লেখক। কিন্তু যারা প্রথম আলো-র এই স্বীকৃতি প্রদানের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে খেয়াল করছেন তাদের মনে এই তালিকা কিছু পর্যবেক্ষণের জন্ম দেবে। যেমন:
১. তালিকায় হুমায়ুন আহমেদ এর "জ্যোছনা ও জননীর গল্প" আছে, কিন্তু এই বইটিকে হারিয়ে দিয়ে যে বইটি প্রথম আলো পুরষ্কার জিতে নিয়েছিল ("প্রেম ও প্রার্থনার গল্প" - সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) সেটি নেই।
২. তালিকায় শহীদুল জহির আছেন, কিন্তু শাহীন আখতার নেই। স্মর্তব্য, শাহীন আখতার-এর "তালাশ" প্রথম আলো পুরষ্কার পেয়েছিল শহীদুল জহিরকে বইকে পেছনে ফেলে।
আরো আরো প্রশ্ন হয়ত করা যায়। তবে এই ইস্যুতে প্রশ্ন জাগে: কেন প্রথম আলো পুরষ্কার পাওয়া শাহীন আখতার এবং সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের জায়গা নিয়ে নিলেন তাদের রানার-আপবৃন্দ? এটা কি কোনো কনপেনসেশন প্যাকেজের আওতায় ঘটল? নাকি প্রথম আলো এখন ভাবছে হুমায়ুন আহমেদ কিংবা শহীদুল জহিরকে রেখে শাহীন আখতার কিংবা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে সেরা লেখক নির্বাচন করা যথাযথ বিবেচনা ছিল না তাদের?
এবার, পত্রিকার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকী আরেকটি বাছাই উপহার দিয়েছে। ১০ বছরের ১০ বই। লেখক তালিকায় আছেন সর্বজনাব হাসান আজিজুল হক, গোলাম মুরশিদ, হুমায়ুন আহমেদ, আবদুশ শাকুর, আনিসুজ্জামান, আনিসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, আলতাফ হোসেন, শহীদুল জহির এবং অদিতি ফাল্গুনী। বলাবাহুল্য ১০ বছরে ১০টি বই নির্বাচন করা খুবই দুঃসাধ্য কাজ এবং এরকম নির্বাচনকে সর্বতোভাবে প্রতিনিধিত্বশীল ভাবা মুশকিল। তালিকায় যাঁরা আছেন এঁদের অনেকেই ভাল লেখক। কিন্তু যারা প্রথম আলো-র এই স্বীকৃতি প্রদানের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে খেয়াল করছেন তাদের মনে এই তালিকা কিছু পর্যবেক্ষণের জন্ম দেবে। যেমন:
১. তালিকায় হুমায়ুন আহমেদ এর "জ্যোছনা ও জননীর গল্প" আছে, কিন্তু এই বইটিকে হারিয়ে দিয়ে যে বইটি প্রথম আলো পুরষ্কার জিতে নিয়েছিল ("প্রেম ও প্রার্থনার গল্প" - সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) সেটি নেই।
২. তালিকায় শহীদুল জহির আছেন, কিন্তু শাহীন আখতার নেই। স্মর্তব্য, শাহীন আখতার-এর "তালাশ" প্রথম আলো পুরষ্কার পেয়েছিল শহীদুল জহিরকে বইকে পেছনে ফেলে।
আরো আরো প্রশ্ন হয়ত করা যায়। তবে এই ইস্যুতে প্রশ্ন জাগে: কেন প্রথম আলো পুরষ্কার পাওয়া শাহীন আখতার এবং সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের জায়গা নিয়ে নিলেন তাদের রানার-আপবৃন্দ? এটা কি কোনো কনপেনসেশন প্যাকেজের আওতায় ঘটল? নাকি প্রথম আলো এখন ভাবছে হুমায়ুন আহমেদ কিংবা শহীদুল জহিরকে রেখে শাহীন আখতার কিংবা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে সেরা লেখক নির্বাচন করা যথাযথ বিবেচনা ছিল না তাদের?
বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০০৮
রূপক কর্মকারের শাহরিয়ার-প্রজেক্ট!
ঘটনাটি ঘটেছে সচলায়তনে। কদিন আগে রূপক কর্মকার নামে এক "অতিথি ব্লগার" সেখানে নাযিল হলেন। তাঁর লক্ষ্য ব্লগের খাতায় কবি আবু হাসান শাহরিয়ারকে প্রমোট করা। সচলায়তনের কেউ কেউ শাহরিয়ার-ভক্ত, ফলে কাজটি তেমন কঠিন নয়। তিনি নাযিল হলেন আবু হাসান শাহরিয়ার-এর একটি সাক্ষাৎকারসহ। সেখানে আ হা শা সচলায়তনের ব্লগারদের "বিশ্ব নাগরিক" জাতীয় বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন। আর যায় কই? সচলায়তনের ব্লগাররা ঝাঁপিখোলা কৃতজ্ঞতা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন ঐ পোস্টে, শাহরিয়ার-বন্দনায় এবং আত্মতুষ্টিতে সচলায়তন বরাবরের মত মুখর হয়ে উঠল। অভিষিক্ত হলেন রূপক কর্মকার নিজেও, তবে সেটি শাহরিয়ার-এর বার্তা পৌঁছে দেয়ার কারণেই। নিজেও তিনি কোনোভাবেই নিজেকে বিশিষ্ট করে তুললেন না, নির্লোভ বার্তাবাহকের মতই দায়িত্ব পালন করলেন। অবাক লাগল! কে এই শাহরিয়ারময় রূপক কর্মকার, শাহরিয়ারের সিগনেচার ছাড়া ত্রিভূবনে যার অস্তিত্ব কিছু নাই। ভাবলাম হতে পারে, কতরকম ভক্তই না জগতে থাকে, প্রভুর পায়ে জীবন সঁপে দেয়া ভক্তেরই কাজ বটে।
কিছুপরই বুঝলাম, যত নখদন্তহীন নির্লোভ ভাবা হচ্ছিল তিনি ততটা নন। সচলায়তনের ব্লগার পলাশ দত্ত ও মুজিব মেহদীর সাথে রীতিমত পায়ে পা দিয়ে গ্যাঞ্জাম বাঁধানোর ধরন দেখে সেটা আঁচ করা গেল। পলাশ দত্তের কবিতার সমালোচনা করতে গিয়ে যেরকম কৃপাণহস্ত এবং কনফিডেন্ট লাগল রূপককে, মনে হল তাঁর ওপর আবু হাসান শাহরিয়ারের আত্মা যেন ভর করেছে! মুজিব মেহদীর সাথে তর্ক করতে গিয়ে তিনি সেই স্বর অব্যাহত রাখলেন, এবং তাঁর সমর্থনে আরো আরো শাহরিয়ার-ভক্তের আবির্ভাব হতে থাকল সচলায়তনে। মজার বিষয় হল, নতুন এই ভক্তরা কেউ সচলায়তনের নিয়মিত ব্লগার নন, "অতিথি" মন্তব্যকারী। শেষ বোমাটা ফাটালেন সচলায়তন কর্তৃপক্ষ। তারা জানালেন যে রূপক কর্মকার এবং তার সমর্থক-মন্তব্যকারীদের আইপি একই। অর্থাৎ একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন নামে কাজ চালিয়েছেন! ভাগ্যিস আবু হাসান শাহরিয়ার-এর আইপি জানেন না তারা! অবশেষে এই ধরনের প্রতারণার অভিযোগে ব্যান খাইলেন রূপক বাবু!
আবু হাসান শাহরিয়ার-এর ইন্টারভিউ পড়ার পর মনে হচ্ছিল যে, তিনি সচলায়তনে প্রবেশ করতে চান। কিন্তু সচলায়তনের প্রবেশপথ তার আকৃতির তুলনায় বেশ ছোট, ততটুকু মাথা নুইয়ে ঢোকার ব্যাপারে শাহরিয়ারের মন হয়ত সায় দিচ্ছিল না। তাই সচলায়তনে রূপকবাবুর আগমন, দরজা বড় করার জন্য, "স্বাগতম" লেখা আলাদা গেট বানানোর জন্য। আইকন হয়ে প্রবেশ করতে চান তিনি, আইকন হয়েই বিহার করতে চান। আবার "প্রিয় কবি"কে এই ব্লগে দেখতে পাবার জন্য আকূল হয়ে উঠেছিলেন অনেকেই। তাতে রূপক বাবু হয়তো একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন! গুরুর স্টাইলে ছড়ি ঘোরানোর মকশো করতে গিয়েই তীরে এসে তরী ডুবলো তার! তরী ডুবলো কার?
আবু হাসান শাহরিয়ার-এর সাংগঠনিক প্রতিভা আছে, আবার অনেকেই তাঁকে কবি মনে করেন। আমি অবশ্য খুব পড়ে দেখি নি, বিচ্ছিন্ন দুচার লাইন এখানে ওখানে দেখেছি, তাতে পড়বার আগ্রহ তৈরি হয় নি। কিন্তু তারেক রহিমের কী হবে? তার মুখটা মনে করে আমার কষ্টই লাগছে, ডাই-হার্ড শাহরিয়ার-ফ্যান সে, রূপক-কর্মকার কেলেংকারির মূল প্রণোদনা কোত্থেকে এল, এটা বোঝার মত যথেষ্ট বুদ্ধি ওর আছে আমি জানি।
কিছুপরই বুঝলাম, যত নখদন্তহীন নির্লোভ ভাবা হচ্ছিল তিনি ততটা নন। সচলায়তনের ব্লগার পলাশ দত্ত ও মুজিব মেহদীর সাথে রীতিমত পায়ে পা দিয়ে গ্যাঞ্জাম বাঁধানোর ধরন দেখে সেটা আঁচ করা গেল। পলাশ দত্তের কবিতার সমালোচনা করতে গিয়ে যেরকম কৃপাণহস্ত এবং কনফিডেন্ট লাগল রূপককে, মনে হল তাঁর ওপর আবু হাসান শাহরিয়ারের আত্মা যেন ভর করেছে! মুজিব মেহদীর সাথে তর্ক করতে গিয়ে তিনি সেই স্বর অব্যাহত রাখলেন, এবং তাঁর সমর্থনে আরো আরো শাহরিয়ার-ভক্তের আবির্ভাব হতে থাকল সচলায়তনে। মজার বিষয় হল, নতুন এই ভক্তরা কেউ সচলায়তনের নিয়মিত ব্লগার নন, "অতিথি" মন্তব্যকারী। শেষ বোমাটা ফাটালেন সচলায়তন কর্তৃপক্ষ। তারা জানালেন যে রূপক কর্মকার এবং তার সমর্থক-মন্তব্যকারীদের আইপি একই। অর্থাৎ একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন নামে কাজ চালিয়েছেন! ভাগ্যিস আবু হাসান শাহরিয়ার-এর আইপি জানেন না তারা! অবশেষে এই ধরনের প্রতারণার অভিযোগে ব্যান খাইলেন রূপক বাবু!
আবু হাসান শাহরিয়ার-এর ইন্টারভিউ পড়ার পর মনে হচ্ছিল যে, তিনি সচলায়তনে প্রবেশ করতে চান। কিন্তু সচলায়তনের প্রবেশপথ তার আকৃতির তুলনায় বেশ ছোট, ততটুকু মাথা নুইয়ে ঢোকার ব্যাপারে শাহরিয়ারের মন হয়ত সায় দিচ্ছিল না। তাই সচলায়তনে রূপকবাবুর আগমন, দরজা বড় করার জন্য, "স্বাগতম" লেখা আলাদা গেট বানানোর জন্য। আইকন হয়ে প্রবেশ করতে চান তিনি, আইকন হয়েই বিহার করতে চান। আবার "প্রিয় কবি"কে এই ব্লগে দেখতে পাবার জন্য আকূল হয়ে উঠেছিলেন অনেকেই। তাতে রূপক বাবু হয়তো একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন! গুরুর স্টাইলে ছড়ি ঘোরানোর মকশো করতে গিয়েই তীরে এসে তরী ডুবলো তার! তরী ডুবলো কার?
আবু হাসান শাহরিয়ার-এর সাংগঠনিক প্রতিভা আছে, আবার অনেকেই তাঁকে কবি মনে করেন। আমি অবশ্য খুব পড়ে দেখি নি, বিচ্ছিন্ন দুচার লাইন এখানে ওখানে দেখেছি, তাতে পড়বার আগ্রহ তৈরি হয় নি। কিন্তু তারেক রহিমের কী হবে? তার মুখটা মনে করে আমার কষ্টই লাগছে, ডাই-হার্ড শাহরিয়ার-ফ্যান সে, রূপক-কর্মকার কেলেংকারির মূল প্রণোদনা কোত্থেকে এল, এটা বোঝার মত যথেষ্ট বুদ্ধি ওর আছে আমি জানি।
রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০০৮
হয়তো জীবন এদের কাছে এতো ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট নয়!
প্রবাসের মাটিতে বসে যেসব "শিক্ষিত" বাঙ্গালছানা "আস্তিক-নাস্তিক" জাতীয় সৌখিন, বস্তাপচা ও এলিটিস্ট তর্কে কম্যুনিটি ব্লগের তাওয়া গরম রাখেন তাদের বিদেহী বিবেচনাবোধের জন্য এই ভিডিওটি। এটি আল-জাজিরা টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদন, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন নিয়ে। এ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ আছে কিছু, পরবর্তীতে লিখবো। আমার মতো বৃত্তির নিরাপত্তা নিয়ে নয়, জমিবেচা টাকায় হাড়ভাঙ্গা শ্রম দিতে এরা বিদেশ গেছেন। মেয়াদ শেষে আমার মতো পারমানেন্ট রেসিডেন্টশিপের দরজায় দাঁড়াবেন না, ফিরে আসবেন পরিবারের মাঝে। তবু ক্রীতদাসের জীবন তাদের। তারা জানে ঈশ্বর তাদের পক্ষে নয়, তারা এও দেখেছে দেশের হাইকমিশন আরেক রক্তচোষা, তবু তারা উপাসনা করে, তবু তারা দেশের বাসি পত্রিকার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আমি ভাবি কেন এই অস্তি, কেন অস্বীকার নয়? কেন নিখিল নাস্তির স্রোতে ভেসে যাওয়া নয়?
হয়তো জীবন এদের কাছে এত ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট নয়!
হয়তো জীবন এদের কাছে এত ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট নয়!
শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০০৮
নিকনবীর অন্তর্ধান ও আমারব্লগের ভবিষ্যত
আগের পোস্টে হযরত মুহম্মদ নিকধারী এক ব্লগারের কথা লিখেছিলাম। আমার ধারণা ছিল আমারব্লগ কর্তৃপক্ষ তাকে ব্যান করেছেন। পরে জানা গেল তাকে ব্যান করা হয় নাই, নিজেই তিনি "প্রাইভেট" বলয়ে চলে গেছেন। আজকে সকালে উঠে দেখলাম ইনি আর নাই। শূন্য ভিটায় চোরছ্যাচ্চড়দের বিড়ির পাছা পড়ে আছে।
এই অন্তর্ধানের রহস্য কি? মনে রাখতে হবে গতকাল প্রতিবাদী ব্লগাররা যখন দলে দলে আমারব্লগ ছাড়ছিলেন, তখনো নিকনবী বুক ফুলিয়ে বহাল তবিয়তে তার ভিটাবাড়িতেই ছিলেন। অর্থাৎ তাদের প্রস্থানে নিকনবী এবং তার উম্মতরা ভয়ের কিছু দেখেন নি। হয়ত আরামই পেয়েছিলেন। হয়ত এটাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল।
কিন্তু মডারেশনহীন আমারব্লগের কারিগরদের জন্য এটা কাম্য ছিল না। বিশেষত যারা চলে যাচ্ছিলেন তারা মোটামুটি আমারব্লগেই ব্লগিং করতেন। রিলিজিয়াসলি। এদের তৎপরতার দ্বারা আমারব্লগের একটা চেহারা দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। আমারব্লগ নিজের পাটাতন খুঁজে পাচ্ছিল। কিন্তু সেটা অনেকেরই কাম্য নয়, অনুমান করি। তারা মুক্তচিন্তা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমারব্লগকে ডাম্পিং জোন বানিয়ে মজা দেখতে চান। এসব ধান্দাবাজ হিপোক্রেটদের কথা আমি আমার পোস্টে লিখেছিলাম। বলেছিলাম যে এইসব নিকেরা এখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে বড় বড় ভাষণ দেয়, কিন্তু সচলায়তনের পর্দায় ডান্ডাবেড়িসহ অনাবিল অভিনয় করে চলে। প্রশ্ন করেছিলাম এরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এত ডাইহার্ড সমর্থক হওয়া সত্বেও সচলায়তনে পড়ে আছে কেন? যেখানে আমারব্লগ তাদের মতপ্রকাশের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য "নো মডারেশন" পলিসি দিয়ে আপ্যায়ন করছে? বলেছিলাম, "একই লোক এক জায়গায় মডারেটেড হয়ে লিখছে, আবার এখানে এসে মডারেশন ছাড়া লিখছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তার ব্যক্তিগত কোনো অবস্থান নেই। এরা আসলে ভীষণরকম পজেসিভ, ওয়েবে যতরকম ঠাঁই আছে সবখানেই একটা ফাৎনা ফেলে রাখতে চায়। এদের আমি হিপোক্রেট মনে করি।
এখন দেখা যাচ্ছে, আমার ব্লগের “নো মডারেশন” নীতির সুযোগে এইসব হিপোক্রেসি পার পেয়ে যাচ্ছে। একদিকে আমার ব্লগ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে উচ্চাসন দিচ্ছে, আবার অন্যদিকে এইসমস্ত হিপোক্রেসিকেও প্রমোট করছে নিজের অজান্তে।"
সম্ভবত এগুলো আমারব্লগ কারিগরদেরও মনের কথা ছিল। আমি "মিনিমাম সেন্সিবল মডারেশন"এর প্রস্তাব দিয়েছিলাম আর সুশান্ত সেটার যৌক্তিকতা যেই খুঁজে পেলেন, আর অমনি নিকনবী হাওয়া! এ যেন ভুতের মুখে রসুন পড়ল! বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই নিকনবীর নাটক আমারব্লগে কারা শুরু করেছিল। আমি জানতাম তারা যে কোন মূল্যেই হোক আমারব্লগে মডারেশন চায় না, কারণ মডারেশন চালু হলে তাদের আন্তব্লগীয় রাজনীতি এবং বিকৃত মানসিকতার প্রদর্শন আর কোথায় করবে? ফলে পিশাচ আপাতত দরজার ওপাশে গেল, কিন্তু রসুনের মালা খসে পড়লেই আবার সে ঘাড়ে কামড় দিতে হাজির হবে ঠিক ঠিক।
আমারব্লগ "নো মডারেশন" নীতিতে চললে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি এই ব্লগে লিখিও না তেমন। বরং "নো মডারেশন" নিয়ে ব্লগটি কতদূর যায় সেটা একটা ইন্টারেস্টিং অবজার্ভেশন আমার। কেউ কেউ দেখলাম ব্লগারদের "বিবেকের মডারেশন"কেই সমাধান ভাবছেন। আমি একমত। তবে থিওরেটিক্যালি। যারা ভাবছেন এই ব্লগে সবাই একইরকম খোলা মনোভাব নিয়ে ব্লগিং করতে আসছে তারা ভুল ভাবছেন আমার ধারণা। এখানে নানারকমের আদম আছে, নানান উদ্দেশ্য তাদের। কারো কারো বিবেক আগে থেকেই মডারেটেড, বা প্রিকন্ডিশনড। বিবেকের থিওরি দিয়ে এদের জাগ্রত করা যাবে না।
আমারব্লগ আমি মাঝে মাঝে পড়ি। আমার বিবেচনায়, এই ব্লগে একমাত্র গালাগালি ছাড়া এমন কিছু দেখি নাই যা কোনো মডারেটেড ব্লগে করা সম্ভব নয়। গালাগালিগুলো বাদ দিলে বাদবাকি লেখাগুলো তো প্রথম আলো-র মত সুশীল পত্রিকাতেও ছাপা সম্ভব বলে আমার ধারণা! ফলে আমার ধারণা যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধুয়া তুলছেন তারা ইচ্ছামত গালাগালি করাকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে ভাবছেন। ফলে, এই প্রেক্ষিতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এক শ্রেণীর সাইকোপ্যাথদের যত্রতত্র মাস্টারবেশনের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মোল্লামার্কা আস্ফালনের তোপে আমারব্লগ তার মডারেশনভাবনা নিয়ে হয়ত ম্রিয়মান হয়ে গেছে। কী আর করা। বিষ্ঠাবহনের দায় থেকে আমারব্লগ নিজেকে মুক্ত করুক, একটা স্বতন্ত্র ব্লগ হয়ে টিকে থাকুক, আপাতত সেটাই চাওয়া।
এই অন্তর্ধানের রহস্য কি? মনে রাখতে হবে গতকাল প্রতিবাদী ব্লগাররা যখন দলে দলে আমারব্লগ ছাড়ছিলেন, তখনো নিকনবী বুক ফুলিয়ে বহাল তবিয়তে তার ভিটাবাড়িতেই ছিলেন। অর্থাৎ তাদের প্রস্থানে নিকনবী এবং তার উম্মতরা ভয়ের কিছু দেখেন নি। হয়ত আরামই পেয়েছিলেন। হয়ত এটাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল।
কিন্তু মডারেশনহীন আমারব্লগের কারিগরদের জন্য এটা কাম্য ছিল না। বিশেষত যারা চলে যাচ্ছিলেন তারা মোটামুটি আমারব্লগেই ব্লগিং করতেন। রিলিজিয়াসলি। এদের তৎপরতার দ্বারা আমারব্লগের একটা চেহারা দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। আমারব্লগ নিজের পাটাতন খুঁজে পাচ্ছিল। কিন্তু সেটা অনেকেরই কাম্য নয়, অনুমান করি। তারা মুক্তচিন্তা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমারব্লগকে ডাম্পিং জোন বানিয়ে মজা দেখতে চান। এসব ধান্দাবাজ হিপোক্রেটদের কথা আমি আমার পোস্টে লিখেছিলাম। বলেছিলাম যে এইসব নিকেরা এখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে বড় বড় ভাষণ দেয়, কিন্তু সচলায়তনের পর্দায় ডান্ডাবেড়িসহ অনাবিল অভিনয় করে চলে। প্রশ্ন করেছিলাম এরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এত ডাইহার্ড সমর্থক হওয়া সত্বেও সচলায়তনে পড়ে আছে কেন? যেখানে আমারব্লগ তাদের মতপ্রকাশের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য "নো মডারেশন" পলিসি দিয়ে আপ্যায়ন করছে? বলেছিলাম, "একই লোক এক জায়গায় মডারেটেড হয়ে লিখছে, আবার এখানে এসে মডারেশন ছাড়া লিখছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তার ব্যক্তিগত কোনো অবস্থান নেই। এরা আসলে ভীষণরকম পজেসিভ, ওয়েবে যতরকম ঠাঁই আছে সবখানেই একটা ফাৎনা ফেলে রাখতে চায়। এদের আমি হিপোক্রেট মনে করি।
এখন দেখা যাচ্ছে, আমার ব্লগের “নো মডারেশন” নীতির সুযোগে এইসব হিপোক্রেসি পার পেয়ে যাচ্ছে। একদিকে আমার ব্লগ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে উচ্চাসন দিচ্ছে, আবার অন্যদিকে এইসমস্ত হিপোক্রেসিকেও প্রমোট করছে নিজের অজান্তে।"
সম্ভবত এগুলো আমারব্লগ কারিগরদেরও মনের কথা ছিল। আমি "মিনিমাম সেন্সিবল মডারেশন"এর প্রস্তাব দিয়েছিলাম আর সুশান্ত সেটার যৌক্তিকতা যেই খুঁজে পেলেন, আর অমনি নিকনবী হাওয়া! এ যেন ভুতের মুখে রসুন পড়ল! বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই নিকনবীর নাটক আমারব্লগে কারা শুরু করেছিল। আমি জানতাম তারা যে কোন মূল্যেই হোক আমারব্লগে মডারেশন চায় না, কারণ মডারেশন চালু হলে তাদের আন্তব্লগীয় রাজনীতি এবং বিকৃত মানসিকতার প্রদর্শন আর কোথায় করবে? ফলে পিশাচ আপাতত দরজার ওপাশে গেল, কিন্তু রসুনের মালা খসে পড়লেই আবার সে ঘাড়ে কামড় দিতে হাজির হবে ঠিক ঠিক।
আমারব্লগ "নো মডারেশন" নীতিতে চললে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি এই ব্লগে লিখিও না তেমন। বরং "নো মডারেশন" নিয়ে ব্লগটি কতদূর যায় সেটা একটা ইন্টারেস্টিং অবজার্ভেশন আমার। কেউ কেউ দেখলাম ব্লগারদের "বিবেকের মডারেশন"কেই সমাধান ভাবছেন। আমি একমত। তবে থিওরেটিক্যালি। যারা ভাবছেন এই ব্লগে সবাই একইরকম খোলা মনোভাব নিয়ে ব্লগিং করতে আসছে তারা ভুল ভাবছেন আমার ধারণা। এখানে নানারকমের আদম আছে, নানান উদ্দেশ্য তাদের। কারো কারো বিবেক আগে থেকেই মডারেটেড, বা প্রিকন্ডিশনড। বিবেকের থিওরি দিয়ে এদের জাগ্রত করা যাবে না।
আমারব্লগ আমি মাঝে মাঝে পড়ি। আমার বিবেচনায়, এই ব্লগে একমাত্র গালাগালি ছাড়া এমন কিছু দেখি নাই যা কোনো মডারেটেড ব্লগে করা সম্ভব নয়। গালাগালিগুলো বাদ দিলে বাদবাকি লেখাগুলো তো প্রথম আলো-র মত সুশীল পত্রিকাতেও ছাপা সম্ভব বলে আমার ধারণা! ফলে আমার ধারণা যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধুয়া তুলছেন তারা ইচ্ছামত গালাগালি করাকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে ভাবছেন। ফলে, এই প্রেক্ষিতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এক শ্রেণীর সাইকোপ্যাথদের যত্রতত্র মাস্টারবেশনের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মোল্লামার্কা আস্ফালনের তোপে আমারব্লগ তার মডারেশনভাবনা নিয়ে হয়ত ম্রিয়মান হয়ে গেছে। কী আর করা। বিষ্ঠাবহনের দায় থেকে আমারব্লগ নিজেকে মুক্ত করুক, একটা স্বতন্ত্র ব্লগ হয়ে টিকে থাকুক, আপাতত সেটাই চাওয়া।
শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০০৮
নবীর নামে নিক নিয়ে "আমার ব্লগ"এ তোলপাড়!
এবার সুনামি "আমার ব্লগ"এ। সেখানে এক ব্লগার নবী হযরত মুহম্মদ এর নিক নিয়ে ব্লগ লিখেছেন। আর তা নিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন অন্য ব্লগাররা। ঐ নিকধারীর চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছেড়েছেন। কেউ কেউ "আমার ব্লগ" থেকে নিজেদের (সাময়িক ভাবে) প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ঐ নিকটির অ্যাকাউন্ট ডিলিট করার জোর দাবি উঠেছে। ফলশ্রুতিতে, আমার ব্লগ কর্তৃপক্ষ যারা "নো মডারেশন" নীতিকে আশ্রয় করে এই ব্লগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারা অবশেষে হযরত মুহম্মদ নামক নিকটির অ্যাকাউন্ট আমার ব্লগ-এর পাতা থেকে ডিলিট করে দিয়েছেন।
কম্যুনিটি ব্লগিং প্লাটফর্ম হিসেবে "আমার ব্লগ"এর জন্মই হয়েছে মডারেশনের ধারণার বিপরীত প্রণোদনা থেকে। সম্ভবত সচলায়তনের স্বৈরাচারী মডারেশন পদ্ধতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে এইরকম একটি প্লাটফর্মের কথা ভাবেন তারা। যতদূর দেখেছি, এই ব্লগে মডারেটরের কোনো পদই সৃষ্টি করা হয় নি। কোনো মডারেশন নাই, ব্যান নাই, সদস্যপদের জন্য লম্বা কিউ নাই, তেল মারতে হয় না কাউকে, সব মিলিয়ে আমার ব্লগ যেন সেই মজারু দ্বীপ যেখানে সবই আছে, কিন্তু পুলিশ নাই!
ঠিক সেই মজার আহবানে নয়, একটা কম্যুনিটি ব্লগে লেখালেখি অব্যাহত রাখার ইচ্ছা থেকে আমার ব্লগ-এ আমিও অ্যাকাউন্ট খুলেছিলাম। ব্লগ লিখতেই দেখি... ওমা... সচলায়তনের সব ভ্যাম্পায়াররা এখানে হানা দিতে শুরু করলেন। আসলে গোড়া থেকেই এরা এখানে ছিলেন, নতুন কোনো কম্যুনিটি হলেই সেখানে তারা এজেন্সি নিয়ে রাখেন। তো, তাদের গায়ের গন্ধে আর পাখার ঝাপটে আমার ত্রাহি ত্রাহি দশা! গালাগালির চূড়ান্ত করে ছাড়লেন এরা। এই এরাই আবার সচলায়তনে যখন লেখেন, তখন কত নোক্ষী ছেলে! কী বোর্ড দিয়ে সব সোনা যেন বের হয়! বুঝলাম এরা সচলায়তনে সোনার ডিম পাড়েন আর আমার ব্লগ-এ লিজার্ড রিলিজ করতে আসেন। একই অভিযোগ সামহোয়ারইন-এর ব্লগাররাও করেছিলেন এদের বিরূদ্ধে, বেশ আগে। কিন্তু সামহোয়ার বড় কম্যুনিটি, এইসব হাগাহাগির থোড়াই কেয়ার করে। কিন্তু আমার ব্লগ একটা নতুন কম্যুনিটি, এখনো তার নিজস্ব কম্যুনিটি ঠিকমত গড়ে ওঠে নাই।
এখন কথা হচ্ছে, "আমার ব্লগ"এর কৌশল অনুযায়ী সেখানে হযরত মুহম্মদ নামে নিক থাকতেই পারে। কারণ এই ব্লগে কোনো নীতিমালাই নেই, মত প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ মানে না এরা। যারা এখানে লিখছেন তারা এই পজিশন মেনে নিয়েই লিখছেন, বা এই পজিশন থাকার কারণেই এখানে কন্টিনিউ করছেন। তাহলে কোন্ কারণে এরা হযরত মুহম্মদ নিককে ডিলিট করতে বলেন?
কারণ খুবই মানবিক। মুসলমানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করা যাবে না। হযরত মুহম্মদ নিকটি আদতে তাইই করতে এসেছিল বলে আমারো মনে হয়েছে। এতে ব্লগের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এটা স্বাভাবিক। আবার, আপনি যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানেন, তাহলে এইরকম নিক নিয়ে কোনো ব্লগার তার অনুভূতির কথা বলার স্বাধীনতা রাখেন এটাও মানেন। এখন সংক্ষুব্ধ ব্লগার মুকুল এবং আরো কেউ কেউ বলছেন, স্বাধীনতা মানেই যথেচ্ছাচার নয়। যা খুশি তাই করা মানেই স্বাধীনতা নয়। একটা সীমা থাকতে হবে। তাদের সীমাসন্ধানের নৈতিক চাপপ্রয়োগের ফলে আমার ব্লগ-এর মূল দর্শনের সীমানাপ্রাচীর ভেঙ্গে চুরমার। দেখলাম হযরত মুহম্মদ এর অ্যাকাউন্টটা অবশেষে ডিলিট করে দেয়া হয়েছে।
এটা বাংলা কম্যুনিটি ব্লগের ইতিহাসে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। "আমার ব্লগ" একটা অত্যন্ত সাহসী চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল যে তারা কিছুই মডারেশন করবে না। ওয়েব হবে অবারিত, স্বাধীন। এটি প্রমাণ করার মাধ্যমে তারা আসলে প্রমাণ করতে শুরু করেছিল যে সচলায়তনজাতীয় ওয়েব ব্লগিং মূলত প্রিন্টমিডিয়ার ভাবাদর্শকেই ওয়েবে ইমপোজ করার ব্যাপার। সেই একই বিধিনিষেধ, একই মানবিচার, একইরকম কাহিনী। "আমার ব্লগ"এর এই প্রজেক্ট এখন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ল। মডারেটরের অফিস খুলল তারাও।
তাহলে কি আমি বলতে চাইছি হযরত মুহম্মদ এর নিক ব্যান করা অযৌক্তিক হয়েছে? না, সেটা বলতে চাইছি না। কিন্তু এই প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর "আমার ব্লগ"এর প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে আমার পক্ষে দেয়াও সম্ভব নয়। নবীর নামে নিক যিনি নিয়েছেন তিনি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জায়গা থেকে নিয়েছেন, আবার যারা এর প্রতিবাদ করেছেন তারাও খুব অযৌক্তিক ছিলেন না। টেক্সটের শক্তি অসীম। হযরত মুহম্মদ-এর নামের সাথে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অপরপক্ষ একটু অসুবিধার মধ্যেই থাকবেন। আবার, এই নিক নিয়ে নিকধারী যা করতে শুরু করেছিলেন তাকে ম্যানিপুলেশন তো বলাই যায়। আমার মতে, একটা কম্যুনিটি ব্লগে সেটা তিনি করতে পারেন না। সেখানে নানারকম লোক আছে, তাদের নানা ধরনের বিশ্বাস বা অবস্থান আছে। কিন্তু তাই বলে তিনি অন্যায় করেছেন সেটাই বা বলি কী করে? তিনি তো এই ব্লগের চরম লিবারাল চরিত্রের সুযোগ নিয়েছেন মাত্র।
ঘুরে ঘুরে সেই পুরনো প্যাঁচাল: নৈরাজ্য না নিয়ন্ত্রণ? আমি সবসময় যেটা বলতে চেয়েছি, নৈরাজ্য যেমন নয়, তেমনি সচলায়তন-মার্কা নিয়ন্ত্রণও নয়, বরং নৈরাজ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ বরাবর একটা স্কেলে টেনে সেই স্কেলের কোন্ বিন্দুতে আপনি অবস্থান করছেন সেটা কম্যুনিটি ব্লগকে ঠিক করে নিতেই হবে। "আমার ব্লগ" ধীরেসুস্থে হয়ত সেই পথেরই পথিক হয়ে ওঠবে।
পোস্ট স্ক্রিপ্টাম: অলৌকিক হাসান তার পোস্টে জানিয়েছেন যে নিকনবীকে ব্যান করা হয় নাই, নিজেই তিনি "প্রাইভেটাইজড" হৈয়া গেছেন। সেই অর্থে আমার ব্লগের "নো মডারেশন" নীতি এখনো বহাল আছে। বিস্তারিত দেখুন http://amarblog.com/aloukik/13474 এই লিংকে।
০৩.১০.০৮
কম্যুনিটি ব্লগিং প্লাটফর্ম হিসেবে "আমার ব্লগ"এর জন্মই হয়েছে মডারেশনের ধারণার বিপরীত প্রণোদনা থেকে। সম্ভবত সচলায়তনের স্বৈরাচারী মডারেশন পদ্ধতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে এইরকম একটি প্লাটফর্মের কথা ভাবেন তারা। যতদূর দেখেছি, এই ব্লগে মডারেটরের কোনো পদই সৃষ্টি করা হয় নি। কোনো মডারেশন নাই, ব্যান নাই, সদস্যপদের জন্য লম্বা কিউ নাই, তেল মারতে হয় না কাউকে, সব মিলিয়ে আমার ব্লগ যেন সেই মজারু দ্বীপ যেখানে সবই আছে, কিন্তু পুলিশ নাই!
ঠিক সেই মজার আহবানে নয়, একটা কম্যুনিটি ব্লগে লেখালেখি অব্যাহত রাখার ইচ্ছা থেকে আমার ব্লগ-এ আমিও অ্যাকাউন্ট খুলেছিলাম। ব্লগ লিখতেই দেখি... ওমা... সচলায়তনের সব ভ্যাম্পায়াররা এখানে হানা দিতে শুরু করলেন। আসলে গোড়া থেকেই এরা এখানে ছিলেন, নতুন কোনো কম্যুনিটি হলেই সেখানে তারা এজেন্সি নিয়ে রাখেন। তো, তাদের গায়ের গন্ধে আর পাখার ঝাপটে আমার ত্রাহি ত্রাহি দশা! গালাগালির চূড়ান্ত করে ছাড়লেন এরা। এই এরাই আবার সচলায়তনে যখন লেখেন, তখন কত নোক্ষী ছেলে! কী বোর্ড দিয়ে সব সোনা যেন বের হয়! বুঝলাম এরা সচলায়তনে সোনার ডিম পাড়েন আর আমার ব্লগ-এ লিজার্ড রিলিজ করতে আসেন। একই অভিযোগ সামহোয়ারইন-এর ব্লগাররাও করেছিলেন এদের বিরূদ্ধে, বেশ আগে। কিন্তু সামহোয়ার বড় কম্যুনিটি, এইসব হাগাহাগির থোড়াই কেয়ার করে। কিন্তু আমার ব্লগ একটা নতুন কম্যুনিটি, এখনো তার নিজস্ব কম্যুনিটি ঠিকমত গড়ে ওঠে নাই।
এখন কথা হচ্ছে, "আমার ব্লগ"এর কৌশল অনুযায়ী সেখানে হযরত মুহম্মদ নামে নিক থাকতেই পারে। কারণ এই ব্লগে কোনো নীতিমালাই নেই, মত প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ মানে না এরা। যারা এখানে লিখছেন তারা এই পজিশন মেনে নিয়েই লিখছেন, বা এই পজিশন থাকার কারণেই এখানে কন্টিনিউ করছেন। তাহলে কোন্ কারণে এরা হযরত মুহম্মদ নিককে ডিলিট করতে বলেন?
কারণ খুবই মানবিক। মুসলমানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করা যাবে না। হযরত মুহম্মদ নিকটি আদতে তাইই করতে এসেছিল বলে আমারো মনে হয়েছে। এতে ব্লগের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এটা স্বাভাবিক। আবার, আপনি যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানেন, তাহলে এইরকম নিক নিয়ে কোনো ব্লগার তার অনুভূতির কথা বলার স্বাধীনতা রাখেন এটাও মানেন। এখন সংক্ষুব্ধ ব্লগার মুকুল এবং আরো কেউ কেউ বলছেন, স্বাধীনতা মানেই যথেচ্ছাচার নয়। যা খুশি তাই করা মানেই স্বাধীনতা নয়। একটা সীমা থাকতে হবে। তাদের সীমাসন্ধানের নৈতিক চাপপ্রয়োগের ফলে আমার ব্লগ-এর মূল দর্শনের সীমানাপ্রাচীর ভেঙ্গে চুরমার। দেখলাম হযরত মুহম্মদ এর অ্যাকাউন্টটা অবশেষে ডিলিট করে দেয়া হয়েছে।
এটা বাংলা কম্যুনিটি ব্লগের ইতিহাসে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। "আমার ব্লগ" একটা অত্যন্ত সাহসী চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল যে তারা কিছুই মডারেশন করবে না। ওয়েব হবে অবারিত, স্বাধীন। এটি প্রমাণ করার মাধ্যমে তারা আসলে প্রমাণ করতে শুরু করেছিল যে সচলায়তনজাতীয় ওয়েব ব্লগিং মূলত প্রিন্টমিডিয়ার ভাবাদর্শকেই ওয়েবে ইমপোজ করার ব্যাপার। সেই একই বিধিনিষেধ, একই মানবিচার, একইরকম কাহিনী। "আমার ব্লগ"এর এই প্রজেক্ট এখন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ল। মডারেটরের অফিস খুলল তারাও।
তাহলে কি আমি বলতে চাইছি হযরত মুহম্মদ এর নিক ব্যান করা অযৌক্তিক হয়েছে? না, সেটা বলতে চাইছি না। কিন্তু এই প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর "আমার ব্লগ"এর প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে আমার পক্ষে দেয়াও সম্ভব নয়। নবীর নামে নিক যিনি নিয়েছেন তিনি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জায়গা থেকে নিয়েছেন, আবার যারা এর প্রতিবাদ করেছেন তারাও খুব অযৌক্তিক ছিলেন না। টেক্সটের শক্তি অসীম। হযরত মুহম্মদ-এর নামের সাথে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অপরপক্ষ একটু অসুবিধার মধ্যেই থাকবেন। আবার, এই নিক নিয়ে নিকধারী যা করতে শুরু করেছিলেন তাকে ম্যানিপুলেশন তো বলাই যায়। আমার মতে, একটা কম্যুনিটি ব্লগে সেটা তিনি করতে পারেন না। সেখানে নানারকম লোক আছে, তাদের নানা ধরনের বিশ্বাস বা অবস্থান আছে। কিন্তু তাই বলে তিনি অন্যায় করেছেন সেটাই বা বলি কী করে? তিনি তো এই ব্লগের চরম লিবারাল চরিত্রের সুযোগ নিয়েছেন মাত্র।
ঘুরে ঘুরে সেই পুরনো প্যাঁচাল: নৈরাজ্য না নিয়ন্ত্রণ? আমি সবসময় যেটা বলতে চেয়েছি, নৈরাজ্য যেমন নয়, তেমনি সচলায়তন-মার্কা নিয়ন্ত্রণও নয়, বরং নৈরাজ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ বরাবর একটা স্কেলে টেনে সেই স্কেলের কোন্ বিন্দুতে আপনি অবস্থান করছেন সেটা কম্যুনিটি ব্লগকে ঠিক করে নিতেই হবে। "আমার ব্লগ" ধীরেসুস্থে হয়ত সেই পথেরই পথিক হয়ে ওঠবে।
পোস্ট স্ক্রিপ্টাম: অলৌকিক হাসান তার পোস্টে জানিয়েছেন যে নিকনবীকে ব্যান করা হয় নাই, নিজেই তিনি "প্রাইভেটাইজড" হৈয়া গেছেন। সেই অর্থে আমার ব্লগের "নো মডারেশন" নীতি এখনো বহাল আছে। বিস্তারিত দেখুন http://amarblog.com/aloukik/13474 এই লিংকে।
০৩.১০.০৮
বুধবার, ১ অক্টোবর, ২০০৮
আমি দুঃখিত, অভিজিৎ!!
(আমার লেখা "ব্লগারের মৃত্যু ও ভার্চুয়াল শোকের চেহারা"কে উপলক্ষ করে মাননীয় অভিজিৎ রায় সচলায়তনের পাতায় আমার চরিত্রহননে কিঞ্চিৎ বাক্যব্যয় করেছেন। এই উপলক্ষে আমারো মনে পড়ল আমাদের পুরনো মোলাকাতের কথা। "পুরনো ক্ষতের দাগ আলো আবছায় হাসে"... বন্ধু মাহবুব পিয়ালের কবিতার লাইন। আবার "ক্ষতস্থান সেরে গেলে পুনর্বার তাতে রোম গজায় না" সেটি জানিয়েছিলেন বিনয় মজুমদার। রোম যে গজায় নাই তা আজ এতোদিন পরে টের পাইলাম। সেই অবকাশে ওয়েব খুঁজে কবিসভা থেকে পুরনো একটি লেখা পাওয়া গেল।)
অভিজিৎ রায়ের আলোচনা ও রেফারেন্স পড়লাম।
এক নম্বর পয়েন্টে তিনি আমার সাথে ঐকমত্য পোষণ করলেন দেইখা আরাম পাইলাম। অর্থাৎ তিনিও মনে করেন বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কের মধ্যে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ গুলায়া না ফেলাই উচিৎ।
দুই নম্বর পয়েন্টে তিনি আমার লেখার মধ্যে একটা ‘ভুল তুলনা’ খুঁইজা পাইছেন। অর্থাৎ, তার মতে, ধর্মগ্রন্থনির্ভর ধর্মীয় শাসনের সাথে গ্রন্থহীন সেক্যুলার শাসনের তুলনা হৈতে পারে না। মোটা হরফে লিখছেন, সাদ্দামের এট্রোসিটিকে জাস্টিফাই করে...এমন কোনো নীতি সেক্যুলারিজমে নাই।
এইখানে আইসা মানসের মত আমারও সন্দেহ হৈল। তিনি কি এই অধমের লেখাটি পড়েছেন ঠিকমত?
অভিজিৎ, আপনে খেয়াল করলে দেখবেন যে, আমি মূলত সেক্যুলারিজমের প্রাক্সিস-এর দিকটাই আলোচনা করতেছিলাম, যেহেতু, আমার জানা মতে, সেক্যুলারিজমের কোনো সর্বজনীন মূলনীতি কেউ লিখ্যা যান নাই। সেক্যুলারিজম শেষপর্যন্ত কিছু প্রাক্সিসেরই সমষ্টি। মডার্নিজমের একটা কম্পোনেন্ট হিসাবে এই বিষয়টা পশ্চিমে বিকশিত হৈছে রাষ্ট্রকে ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতা থিকা উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু, আমি বলতেছিলাম বাস্তবে কী হৈছে সেই কথা। বলতেছিলাম, সেক্যুলার রাষ্ট্রের বাতাবরণে থাইকাও রাষ্ট্রনায়কেরা যেভাবে বিধর্মী নিধন করছেন সেই কথা। তখন কিন্তু, মহান পশ্চিম, সেক্যুলার রাষ্ট্রের এইসব আচরণকে নন-সেক্যুলার আখ্যা দেয় নাই।
তারপরে, অনেকটা উপযাচক হৈয়া, জনাব অভিজিৎ একটা লিংক দিলেন, যাতে এই কবিসভার নাদান সদস্যরা বিশ্বাস, দর্শন ও ডগমার পার্থক্য ‘ভালমত বুঝতে’ পারে। আমি সেই লিংকে কিক করলাম। পাইলাম জনৈক অপার্থিব জামানের কিছু সংজ্ঞা। পইড়া বুঝতে বুঝতে আমারতো সংজ্ঞাহীন হৈবার দশা!
সংক্ষেপে বলি:
অপার্থিব ‘বিশ্বাস’ কে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়া লিখছেন 'ফেইথ' হৈল 'পারসনাল বিলিফ'.....। বাদবাকি পড়ার ধৈর্য আমার আর হয় নাই। ভাই অভিজিৎ, এইটারে টটলজি কয়, বাংলায় বলা যায়, পুনরুক্তিদোষ। ফেইথ হৈল বিলিফ! বাহ্! তারপরে আবার ‘পারসনাল’!! অর্থাৎ কোনো জনগোষ্ঠী, যেমন ধরেন ধীবর, যখন নদীর দেবতায় বিশ্বাস করে, তখন সেইটারে কিন্তু ‘ফেইথ’ কওয়া যাইব না! যেহেতু ‘পারসনাল’ না! চমেৎকার!!
অতঃপর ফিলসফির সংজ্ঞা। এইখানেও ‘পারসনাল’ আছে, সেই আলোচনা বাদ দেই, নাইলে আমার হালায় আবার টটলজি হৈয়া যাইব! ঐখানে বলা হৈছে, ফিলসফি হৈল অ্যা পারসনাল ভিউ অ্যাবাউট রিয়েলিটি....! আবার ধৈর্যহারা হৈয়া গেলাম। রিয়েলিটি কি জিনিস? যেসব বিষয় নন-রিয়াল (যেমন ঈশ্বর) সেসবের পারসনাল ভিউ তাইলে ফিলসফি হয় না? আমার রীতিমত মূহ্যমান অবস্থা!
শেষ চেষ্টা করার আর সাহস হৈল না। মাফ কৈরেন ভাই!
সাজ্জাদ শরিফ প্রায়ই বলেন, আমাদের দেশের ফিলসফিচর্চার দূরবস্থার কথা। এক্ষণে প্রমাণ পাইলাম।
..........................
বাকি থাকল, অভিজিৎ, আপনের লেখা, সেইটাও পড়লাম। আপনের লেখায় ফরহাদ মজহারের বিরূদ্ধে আপনের উত্তেজনাটাই শুধু ঠাহর করতে পারলাম। আপনের দর্শন অপার্থিব জামানের চেয়েও ভীতিকর। আপনে লিখছেন, প্লেটোর ‘অতীন্দ্রীয় রহস্যবাদী ভাববাদ’! কী জিনিস সেইটা?
এখন আমি বুঝতে পারতেছি না, কেন আপনে আমার সাথে একমত হৈলেন? আমি কৈছিলাম, ফরহাদ মজহারকে মোকাবেলা করা দরকার বুদ্ধিবৃত্তির জায়গা থিকা। আপনেও সায় দিলেন। কিন্তু আপনের লেখা পইড়া আমার মনে হৈল, ঠিক এই ধরনের চিন্তাহীন বিরোধিতার বাইরে থেকে আমি বিষয়টা দেখতে চাইছিলাম। আমার বক্তব্য রূঢ় শোনাইলে আমি দুঃখিত অভিজিৎ।
অভিজিৎ রায়ের আলোচনা ও রেফারেন্স পড়লাম।
এক নম্বর পয়েন্টে তিনি আমার সাথে ঐকমত্য পোষণ করলেন দেইখা আরাম পাইলাম। অর্থাৎ তিনিও মনে করেন বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কের মধ্যে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ গুলায়া না ফেলাই উচিৎ।
দুই নম্বর পয়েন্টে তিনি আমার লেখার মধ্যে একটা ‘ভুল তুলনা’ খুঁইজা পাইছেন। অর্থাৎ, তার মতে, ধর্মগ্রন্থনির্ভর ধর্মীয় শাসনের সাথে গ্রন্থহীন সেক্যুলার শাসনের তুলনা হৈতে পারে না। মোটা হরফে লিখছেন, সাদ্দামের এট্রোসিটিকে জাস্টিফাই করে...এমন কোনো নীতি সেক্যুলারিজমে নাই।
এইখানে আইসা মানসের মত আমারও সন্দেহ হৈল। তিনি কি এই অধমের লেখাটি পড়েছেন ঠিকমত?
অভিজিৎ, আপনে খেয়াল করলে দেখবেন যে, আমি মূলত সেক্যুলারিজমের প্রাক্সিস-এর দিকটাই আলোচনা করতেছিলাম, যেহেতু, আমার জানা মতে, সেক্যুলারিজমের কোনো সর্বজনীন মূলনীতি কেউ লিখ্যা যান নাই। সেক্যুলারিজম শেষপর্যন্ত কিছু প্রাক্সিসেরই সমষ্টি। মডার্নিজমের একটা কম্পোনেন্ট হিসাবে এই বিষয়টা পশ্চিমে বিকশিত হৈছে রাষ্ট্রকে ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতা থিকা উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু, আমি বলতেছিলাম বাস্তবে কী হৈছে সেই কথা। বলতেছিলাম, সেক্যুলার রাষ্ট্রের বাতাবরণে থাইকাও রাষ্ট্রনায়কেরা যেভাবে বিধর্মী নিধন করছেন সেই কথা। তখন কিন্তু, মহান পশ্চিম, সেক্যুলার রাষ্ট্রের এইসব আচরণকে নন-সেক্যুলার আখ্যা দেয় নাই।
তারপরে, অনেকটা উপযাচক হৈয়া, জনাব অভিজিৎ একটা লিংক দিলেন, যাতে এই কবিসভার নাদান সদস্যরা বিশ্বাস, দর্শন ও ডগমার পার্থক্য ‘ভালমত বুঝতে’ পারে। আমি সেই লিংকে কিক করলাম। পাইলাম জনৈক অপার্থিব জামানের কিছু সংজ্ঞা। পইড়া বুঝতে বুঝতে আমারতো সংজ্ঞাহীন হৈবার দশা!
সংক্ষেপে বলি:
অপার্থিব ‘বিশ্বাস’ কে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়া লিখছেন 'ফেইথ' হৈল 'পারসনাল বিলিফ'.....। বাদবাকি পড়ার ধৈর্য আমার আর হয় নাই। ভাই অভিজিৎ, এইটারে টটলজি কয়, বাংলায় বলা যায়, পুনরুক্তিদোষ। ফেইথ হৈল বিলিফ! বাহ্! তারপরে আবার ‘পারসনাল’!! অর্থাৎ কোনো জনগোষ্ঠী, যেমন ধরেন ধীবর, যখন নদীর দেবতায় বিশ্বাস করে, তখন সেইটারে কিন্তু ‘ফেইথ’ কওয়া যাইব না! যেহেতু ‘পারসনাল’ না! চমেৎকার!!
অতঃপর ফিলসফির সংজ্ঞা। এইখানেও ‘পারসনাল’ আছে, সেই আলোচনা বাদ দেই, নাইলে আমার হালায় আবার টটলজি হৈয়া যাইব! ঐখানে বলা হৈছে, ফিলসফি হৈল অ্যা পারসনাল ভিউ অ্যাবাউট রিয়েলিটি....! আবার ধৈর্যহারা হৈয়া গেলাম। রিয়েলিটি কি জিনিস? যেসব বিষয় নন-রিয়াল (যেমন ঈশ্বর) সেসবের পারসনাল ভিউ তাইলে ফিলসফি হয় না? আমার রীতিমত মূহ্যমান অবস্থা!
শেষ চেষ্টা করার আর সাহস হৈল না। মাফ কৈরেন ভাই!
সাজ্জাদ শরিফ প্রায়ই বলেন, আমাদের দেশের ফিলসফিচর্চার দূরবস্থার কথা। এক্ষণে প্রমাণ পাইলাম।
..........................
বাকি থাকল, অভিজিৎ, আপনের লেখা, সেইটাও পড়লাম। আপনের লেখায় ফরহাদ মজহারের বিরূদ্ধে আপনের উত্তেজনাটাই শুধু ঠাহর করতে পারলাম। আপনের দর্শন অপার্থিব জামানের চেয়েও ভীতিকর। আপনে লিখছেন, প্লেটোর ‘অতীন্দ্রীয় রহস্যবাদী ভাববাদ’! কী জিনিস সেইটা?
এখন আমি বুঝতে পারতেছি না, কেন আপনে আমার সাথে একমত হৈলেন? আমি কৈছিলাম, ফরহাদ মজহারকে মোকাবেলা করা দরকার বুদ্ধিবৃত্তির জায়গা থিকা। আপনেও সায় দিলেন। কিন্তু আপনের লেখা পইড়া আমার মনে হৈল, ঠিক এই ধরনের চিন্তাহীন বিরোধিতার বাইরে থেকে আমি বিষয়টা দেখতে চাইছিলাম। আমার বক্তব্য রূঢ় শোনাইলে আমি দুঃখিত অভিজিৎ।
শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
ব্লগারের মৃত্যু ও ভার্চুয়াল শোকের চেহারা

মুহম্মদ জুবায়ের মারা গেছেন। ইনি প্রথম যৌবনে লেখক হওয়ার জন্য ঘর ছেড়েছিলেন এবং শেষ জীবনে লেখালেখি করবার জন্য বেছে নিয়েছিলেন ব্লগকে। সেই অর্থে ব্লগার ছিলেন তিনি, লিখতেন সচলায়তনে। আমি যখন সচলায়তনে প্রবেশ করেছিলাম, তিনি রীতিমত ছেলেমানুষের মত খুশি হয়েছিলেন। আমার দ্রুত সদস্যভূক্তির ব্যাপারে সচলায়তন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছিলেন। তারপর একদিন কথাচ্ছলে জানিয়েছিলেন যে, তিনি সচলায়তন অঙ্গনে আর লিখবেন না। সেটি সম্ভবত ডুয়াল পোস্টিং নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপের জবাবে তাঁর অভিমানী সিদ্ধান্ত ছিল। আমরা যথারীতি তাঁকে তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি তা করেছিলেন। তারপর আমি যখন সচলায়তন ছেড়ে আসি, তিনি আমার ছেড়ে আসার সিদ্ধান্তের সাথে একমত ছিলেন না। তাঁর মনে হয়েছিল আমি না ছেড়ে আসলেও পারতাম। এমনকি সচলায়তন বিষয়ে প্রথম আলো-তে লেখা আমার নিবন্ধের গীবতেও সামিল হয়েছিলেন তিনি।
মুহম্মদ জুবায়ের বিষয়ে এইটুকু লেখার পর আমি নিজে পরিষ্কার যে সচলায়তনের ব্যাপারে তাঁর শর্তহীন পক্ষপাত ছিল। খুবই ভালোবাসতেন এই ফোরামটিকে। কিছু খিটিমিটি হলেও সেখানেই লিখে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। এতই টান ছিল এই ফোরামের প্রতি যে, এই ফোরাম ত্যাগ করবার পর অন্য অনেকের মত তিনিও আমার সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রদ করে দিয়েছিলেন।
মুহম্মদ জুবায়ের-এর সাথে আমার প্রথম দেখা কবিসভায়। কবিসভা উত্তপ্ত তর্কবিতর্কের জায়গা, মনে পড়ে কোনো একটা বিষয়ে তাঁর সাথেও আমার তর্ক হয়েছিল। পরে অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিলেন কবিসভায়। মেইল করতেন মাঝে মাঝে, আমার একটি গল্পের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, শহীদ কাদরীর সাথে আমার গল্প নিয়ে তাঁর বিস্তর কথাবার্তা হওয়ার কথা। ফলে, মুহম্মদ জুবায়ের, যাঁকে আমি চর্মচক্ষে দেখি নি কোনোদিন, তাঁর ব্যাপারে একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি আমার ছিল সবসময়।
সচলায়তনে ব্লগ লিখতেন তিনি, সত্তর দশকের জীবনযাপন ও স্বপ্ন নিয়ে তাঁর চিন্তাজাগানিয়া পর্যবেক্ষণ ছিল। একটা ধারাবাহিক উপন্যাসও লিখেছিলেন। বন্ধু ও প্রবাসী লেখক লুৎফর রহমান রিটনকে সচলায়তনে নিয়ে এসেছিলেন। এই ব্লগের মডারেটরদের সাথে তাঁর দহরম মহরমও ছিল। ব্লগাতিরিক্ত যোগাযোগ ছিল। ব্লগারদের কারো কারো সাথেও। একবার তাঁর অসুস্থতা এবং ধূমপান করা নিয়ে তাঁর কন্যাটি একটি মর্মভেদী চিঠি লিখেছিলেন তাঁকে, সেই চিঠি সচলায়তনে অনেক প্রশংসাও পেয়েছিল।
এহেন মানুষটি, যিনি তাঁর যাবতীয় পক্ষপাত ও সমালোচনাসহ আমার কাছে আদ্যোপান্ত ভার্চুয়াল একটি চরিত্র, তাঁর মৃত্যুসংবাদ ঘিরে আমার ভেতর জমতে থাকা শোকের চেহারাটি আঁচ করতে চেষ্টা করি। আঁচ করতে চেষ্টা করি, মুহম্মদ জুবায়ের তাঁর ভার্চুয়াল অস্তিত্বের বাইরে কে ছিলেন, কী ছিলেন। তাঁর স্মৃতিকথা থেকে টের পাই তিনি এক স্বাপ্নিক মানুষ ছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন, সেই ধারাবাহিকতায় সমাজতন্ত্রের স্বপ্নও দেখেছিলেন। তাঁর লেখক হয়ে-উঠার স্বপ্নের সাথে সেইসব স্বপ্নকে তিনি মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিলেন। এভাবে অনেক খুইয়ে, একসময় জীবনকে গুছিয়ে নেয়ার তাড়না অনুভব করেছিলেন, বেছে নিয়েছিলেন প্রবাস জীবন। কিন্তু স্বপ্ন আর স্বপ্নকে বাস্তবে দেখতে না-পাবার বেদনা তাঁর পিছু নিয়েছিল। নিপুণ আততায়ীর মত। প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীর মত তিনিও তাঁর স্বদেশকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন। এর জন্য বেদনা পাবার দায় থেকে কখনো ছুটি নেন নি। ফলে, কর্মস্থলে, ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা স্বজনবেষ্টনীর মাঝেও তিনি ছিলেন একা। একেলা।
কিন্তু এ তো মুখস্ত গল্প। এই গল্পের উপসংহার আমরা জানি। কিন্তু আশ্চর্য হই ভেবে যে মুহম্মদ জুবায়ের সেই উপসংহারটি বেছে নেন নি। প্রৌঢ়ত্বকে জয় করে নেমে এসেছিলেন তরুণদের ব্লগে। তরুণদের চোখভরা স্বপ্নের জগতে হয়ে জুবায়ের যেন বুড়ো বাতিওলা! এ এক জয়ের নেশাই বটে! মনে পড়ে, এমনিতর নেশার টানেই সরকারি চাকুরি থেকে অবসর নেয়া কবি মুস্তাফা আনোয়ার আমাদের উদ্দাম জীবনের সাথে সমানে সমানে পাল্লা দিতেন। গ্রেস নিতেন না একদমই। মুহম্মদ জুবায়েরও তাই। জরাগ্রস্ততার অমোঘ খপ্পরে পড়বার আগে মানুষের শেষ রোমান্টিক দ্রোহ!
কিন্তু আজ যখন মুহম্মদ জুবায়ের মারা গেলেন, আমি বিষণ্ণ হয়ে থাকলাম এই ভেবে যে এই নামটিকে ঘিরে আমাদের অন্তহীন ভার্চুয়াল জগতে আর কোনো গালগল্প তৈরি হবে না। মুহম্মদ জুবায়ের এর নামে আর কোনো ব্লগ বা উপন্যাস আপলোড হবে না, যেগুলো পাঠ করে করে আমরা তাঁকে চিনতে থাকবো, তাঁর ব্যক্তিত্ব তৈরি হতে থাকবে আমাদের পারসেপশনের আঁকাবাঁকা গলির ভেতর। শোকের অক্ষর উপচে পড়ছে সচলায়তনে, অন্যান্য ব্লগেও। ভাবি, এই শোকটি কেমন? কিছু টেক্সটের জন্য কিছু টেক্সটের শোক, নাকি টেক্সট-উত্তর অচেনা যোগাযোগহীন ব্যবহারিক জীবনে এর কোনো অভিঘাত তৈরি হয়? মুহম্মদ জুবায়েরকে আমরা তো চিনেছি তাঁর টেক্সট দিয়েই, অর্থাৎ তাঁর লেখাকে তাঁর ব্যক্তিত্বের উপরে আরোপ করে নিয়েছি আমরা। রলা বার্থ যেমন বলেন, লেখকের অস্তিত্ব বা বিদ্যমানতা তাঁর লেখার স্বাতন্ত্র্যকে বাধাগ্রস্ত করে। সেই অর্থে, ব্লগার মুহম্মদ জুবায়ের-এর মৃত্যু যেন প্রতীকী! যেন তিনি তাঁর মরণ দিয়ে মুক্ত করে গেলেন তাঁর রচনারাশিকে, আমাদের মননে তাঁর ব্যক্তিত্বের সংগঠন প্রক্রিয়া থেকে। টেক্সটের বাইরে সত্যিকারের যিনি জুবায়ের, যার একটা ফুসফুস অকেজো ছিল অনেকদিন, যিনি অনেকের বন্ধু, ভাই বা পিতা, তার শরীরী মৃত্যুতে আমাদের ভার্চুয়াল-পেরোনো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীজীবন কতখানি শোকতপ্ত হবে? সেই অর্থে এটি অথরের মৃত্যু, একটি টেক্সচুয়াল মরণ। এই টেক্সচুয়াল মরণের স্মরণে আমরা যে শোকগ্রস্ত হচ্ছি সেটিও টেক্সচুয়াল, এবং টেক্সটের বাইরেও যদি এর সন্তাপ আমরা অনুভব করি, তবে সেও টেক্সটেরই সামর্থে।
আরেকটা বিষয়: মার্কেজ একটি উপন্যাসে যেমন লিখেছেন, কেবলমাত্র মৃত্যুই মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির যোগ ঘটাতে সক্ষম। অর্থাৎ যে মাটিতে আমার অধিষ্ঠান সেখানে আমার পূর্বপুরুষের কবর থাকলেই সেটা অনেক দৃঢ় হয়ে ওঠে। মুহম্মদ জুবায়ের-এর মৃত্যুশোক তাঁর ব্লগিং ফোরাম সচলায়তনে সেইরকম ইতিবাচক একটি প্রভাব ফেলবে মনে হয়।
বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
কখনো যাই নাই বিদ্যাকূট
চোখের সামনে পুড়ছে আমার মনসুন্দর গ্রাম
আমি যাই নাই রে, আমি যাই নাই
- কফিল আহমেদের গান
১.
কখনো যাই নাই বিদ্যাকূট!
উরখুলিয়া গেছি, বিদ্যাকূটের পাশের গ্রাম। এক সন্ধ্যার কথা মনে আছে, উরখুলিয়ার গ্রামছাড়া জোতদার রেজেক মিয়ার পোড়োবাড়িটা দেখতে গেছিলাম। বিশাল বাড়ি, সারি সারি টিনের চৌচালা ঘর, সেসব ঘরে কেউ নাই তখন, জিনিসপত্র সব টুকরা টুকরা করে ভাঙ্গা, টিনের প্রতিটা ঢেউ-য়ে দায়ের নিপুণ কোপ। উঠানের মাঝখানে ছোটখাট একটা পাহাড়, ভাঙ্গা সিরামিকের জিনিসপত্রের ।
উরখুলিয়া একটা অদ্ভূত মাথাগরম জায়গা। তিতাসের পাড় ধরে লম্বালম্বি একটা গ্রাম, ঠিক চিলি দেশটার স্টাইলে। গ্রামের অর্ধেক লোক থাকে ইটালি। তারা টাকা পাঠায়, আর সেই টাকায় দুই গোষ্ঠীর শতবছরের পুরানো ঝগড়াটা ফি বছর ঝালাই হয়।
ঝগড়ার উপলক্ষ?
শুনলে হাসবে উরখুলিয়ার লোকেরা। উপলক্ষ নো প্রবলেম, জিয়াউর রহমান স্টাইলে। কোনো উপলক্ষ পাওয়া যাইতেছেনা, ঠিকাছে, ঐ যে জালাইল্যা আছে না, জ্ঞাতিগোষ্ঠী নাই, এতিম পোলা, ঘরে মা একলা, ওরে ফালায়া দাও! তারপর কেইস নিয়া সোজা নবীনগর থানায়।
জালাইল্যাকে আমি চিনতাম। এক পা খোঁড়া, কিন্তু কাইজ্যার আগে সবসময়। ভ্যানগার্ড।
জালাইল্যার খুনের এই পরিকল্পনা কিন্তু প্রতিপক্ষের নয়, তার স্বপক্ষেরই। আবার এই স্বপক্ষের কোনো উপদলীয় কোন্দলের ফসল নয় এই সিদ্ধান্ত। যারা এই নীলনকশা করেছে তারা সবাই জালাইল্যার সমঝদার। কিন্তু কি করা? দুইশ বছরের পুরনো 'বাইশাবাইশি', অনেক রক্ত খায়! তার তৃষ্ণা মিটাতে গেলে নিজের পরের বাছাবাছি করনের সুযোগ কমই থাকে।
যারা জালাইল্যারে ফালাইয়া দিল, তারাই গায়ের কাপড় বদলায়া নবীনগর থানায় গিয়া ফৌজদারি মামলা ঠুকল। তারপর বাজার করল, টর্চলাইটের জন্য দোকান ঘুইরা একনম্বর সানলাইট ব্যাটারি কিনল, জালাইল্যার মায়ের জন্য নতুন জায়নামাজ ও তসবি কিনল, তারপর বাড়ি ফিরবার আগে হাউজির মাঠেও দুইচক্কর দিল।
আর যারা ঘুম থেকে উঠে শুনল তারা খুনের মামলার আসামি, তাদের হৈয়া অবাক হৈলেন বিধাতা। তারাও ঘরের কালার টেলিভিশন, অষ্ট্রেলিয়ান গাভী, ডেকসেট ও ক্যামেরা পাশের গ্রামের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠায়া দিল, ঘরের মেয়েমানুষের হাতে দরকারি টাকাপয়সা গুঁজল, তারপর সোজা লঞ্চে হয় ভৈরব না হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
সেই উরখুলিয়ার পাশের গ্রামই বিদ্যাকূট। আমি উত্তপ্ত উরখুলিয়ায় বসে বসে বিদ্যাকূট নিয়া ঈর্ষায় জ্বলতাম। বিদ্যাকূটে কোনো পুলিশ ক্যাম্প লাগে না, সেই গ্রাম থেকে শরনার্থী আসে নাই কোনো দিন এই উরখুলিয়ায়। দূর থেকে দেখেছি, অদ্ভূত একটা গ্রাম, খড়ের গাদায় রোদের ঝিলিক লেগে এখান থেকেও আমার চোখ চিকচিক করে।
কবে যাবো বিদ্যাকূট, ভাবতাম পুরুষশূন্য উরখুলিয়া গ্রামে হাঁটতে হাঁটতে।
আমি যাই নাই রে, আমি যাই নাই
- কফিল আহমেদের গান
১.
কখনো যাই নাই বিদ্যাকূট!
উরখুলিয়া গেছি, বিদ্যাকূটের পাশের গ্রাম। এক সন্ধ্যার কথা মনে আছে, উরখুলিয়ার গ্রামছাড়া জোতদার রেজেক মিয়ার পোড়োবাড়িটা দেখতে গেছিলাম। বিশাল বাড়ি, সারি সারি টিনের চৌচালা ঘর, সেসব ঘরে কেউ নাই তখন, জিনিসপত্র সব টুকরা টুকরা করে ভাঙ্গা, টিনের প্রতিটা ঢেউ-য়ে দায়ের নিপুণ কোপ। উঠানের মাঝখানে ছোটখাট একটা পাহাড়, ভাঙ্গা সিরামিকের জিনিসপত্রের ।
উরখুলিয়া একটা অদ্ভূত মাথাগরম জায়গা। তিতাসের পাড় ধরে লম্বালম্বি একটা গ্রাম, ঠিক চিলি দেশটার স্টাইলে। গ্রামের অর্ধেক লোক থাকে ইটালি। তারা টাকা পাঠায়, আর সেই টাকায় দুই গোষ্ঠীর শতবছরের পুরানো ঝগড়াটা ফি বছর ঝালাই হয়।
ঝগড়ার উপলক্ষ?
শুনলে হাসবে উরখুলিয়ার লোকেরা। উপলক্ষ নো প্রবলেম, জিয়াউর রহমান স্টাইলে। কোনো উপলক্ষ পাওয়া যাইতেছেনা, ঠিকাছে, ঐ যে জালাইল্যা আছে না, জ্ঞাতিগোষ্ঠী নাই, এতিম পোলা, ঘরে মা একলা, ওরে ফালায়া দাও! তারপর কেইস নিয়া সোজা নবীনগর থানায়।
জালাইল্যাকে আমি চিনতাম। এক পা খোঁড়া, কিন্তু কাইজ্যার আগে সবসময়। ভ্যানগার্ড।
জালাইল্যার খুনের এই পরিকল্পনা কিন্তু প্রতিপক্ষের নয়, তার স্বপক্ষেরই। আবার এই স্বপক্ষের কোনো উপদলীয় কোন্দলের ফসল নয় এই সিদ্ধান্ত। যারা এই নীলনকশা করেছে তারা সবাই জালাইল্যার সমঝদার। কিন্তু কি করা? দুইশ বছরের পুরনো 'বাইশাবাইশি', অনেক রক্ত খায়! তার তৃষ্ণা মিটাতে গেলে নিজের পরের বাছাবাছি করনের সুযোগ কমই থাকে।
যারা জালাইল্যারে ফালাইয়া দিল, তারাই গায়ের কাপড় বদলায়া নবীনগর থানায় গিয়া ফৌজদারি মামলা ঠুকল। তারপর বাজার করল, টর্চলাইটের জন্য দোকান ঘুইরা একনম্বর সানলাইট ব্যাটারি কিনল, জালাইল্যার মায়ের জন্য নতুন জায়নামাজ ও তসবি কিনল, তারপর বাড়ি ফিরবার আগে হাউজির মাঠেও দুইচক্কর দিল।
আর যারা ঘুম থেকে উঠে শুনল তারা খুনের মামলার আসামি, তাদের হৈয়া অবাক হৈলেন বিধাতা। তারাও ঘরের কালার টেলিভিশন, অষ্ট্রেলিয়ান গাভী, ডেকসেট ও ক্যামেরা পাশের গ্রামের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠায়া দিল, ঘরের মেয়েমানুষের হাতে দরকারি টাকাপয়সা গুঁজল, তারপর সোজা লঞ্চে হয় ভৈরব না হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
সেই উরখুলিয়ার পাশের গ্রামই বিদ্যাকূট। আমি উত্তপ্ত উরখুলিয়ায় বসে বসে বিদ্যাকূট নিয়া ঈর্ষায় জ্বলতাম। বিদ্যাকূটে কোনো পুলিশ ক্যাম্প লাগে না, সেই গ্রাম থেকে শরনার্থী আসে নাই কোনো দিন এই উরখুলিয়ায়। দূর থেকে দেখেছি, অদ্ভূত একটা গ্রাম, খড়ের গাদায় রোদের ঝিলিক লেগে এখান থেকেও আমার চোখ চিকচিক করে।
কবে যাবো বিদ্যাকূট, ভাবতাম পুরুষশূন্য উরখুলিয়া গ্রামে হাঁটতে হাঁটতে।
শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
অতিগরিবের ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনার ভেতরে কোনো এক দিপালীর আত্মহত্যা

ভৈরবের দিপালীদের পরিবারে এখন অন্য অবস্থা। চাল আসছে, ডাল আসছে, এনজিও আসছে, ভিজিএফ কার্ড আসছে, ওয়ার্ড কমিশনার এসে সকালসন্ধ্যা খোঁজ নিচ্ছে। মেঘ না চাইতেই ঝড়!
ঝড়-ই তো। দিপালী যখন গলায় দড়ি দিয়ে ক্ষুধার জ্বালা চিরতরে মিটাল, তখন দিপালীর পঙ্গু বাবা ভাবছিলেন মেয়ের অন্তিম সৎকারের অর্থ জোগান দেবেন কিভাবে? কিন্তু কোত্থেকে কী যেন ম্যাজিক হয়ে গেল, মেয়েটা মরে গেল, আর সঙ্গে-সঙ্গেই রূপকথার মত অদ্ভূত সব ঘটনা। যে সমস্ত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের স্বপ্নও তিনি দেখেন নি, তারা এসে হাজির: সমবেদনাসহ, খাদ্যসহ, চাকরিসহ। একের পর এক রিকশা আর মোটরসাইকেল এসে থামছে তার ছাপড়ার সামনে, হতভাগা মেয়েটার জন্য মনের মধ্যে এক পশলা শোকও জমতে দিচ্ছে না।
পালা করে খেত দিপালীর পরিবার। আটজনের এই পরিবারে নিয়ম ছিল, যে-চারজন দুপুরে খাবে, রাতে তারা উপোস করবে। রাতে খাবে অন্য-চারজন। এভাবেই চলছিল তাদের ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। ভালই চলছিল। গোলমালটা লাগল, যখন দিপালীর প্রতিবন্ধী এক ভাই নিয়ম ভেঙ্গে পরপর দুইবার খেয়ে বসল। তাতে দিপালীর কপাল পুড়ল, ক্ষুধার যন্ত্রণার চেয়ে তার কাছে মৃত্যুকেই বেশি শান্তির মনে হল।
এরকম হয়েই থাকে। ‘ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনা’র যে দেশব্যাপী নীরব দযজ্ঞ চলে, তার খোঁজ সরকার নেয় না, এনজিও-র ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে তাদের জায়গা নাই, সংবাদপত্রের পাতায় তার সংকুলান হয় না ঘটনাহীনতার কারণে। এরমধ্যে হঠাৎ কোনো এক দিপালী মাঝখান থেকে দুম করে মরে বসে, বিব্রত হয় মধ্যবিত্তের সিভিল বিবেকব্যবস্থা। কিন্তু না হলেও চলত! কারণ পরিসংখ্যানে ‘স্ট্যান্ডার্ড এরর’ বলে একটা বিষয় আছে না? ক্ষুধা ব্যবস্থাপনার এই যে সর্বব্যাপী আয়োজন, তাতে দুয়েকটা দিপালী তো পরিসংখ্যানের নিয়মেও ঝরে যেতে পারে! পারে না?
এই হল শাস্ত্রের আসল নাম: নিখাদ নিপাট ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। এসেটহারা গরিবের ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। এসেট নাই বলে সে ক্ষুদ্রঋণ পায় না, এনজিওর খাতা তার সামনে খোলে না। সরকারের তো দুইশ টাকার ভিজিএফ মশকরা, ক্ষুধার পেটে বয়স্কভাতার চুলকানি, তার দরজাতেও কত পেট-ভর্তি মানুষের ভিড়! আর বিত্তবান সমাজ? দিপালীর বাবা চেয়ে চেয়ে দেখেন ওদের। বুঝতেই পারেন না, জীবিত দিপালীর চেয়ে মৃত দিপালীর কদর এত বাড়ল কোন্ নিয়মে?
দিপালীদের পরিবারে যেভাবে ক্ষুধার ‘ব্যবস্থাপনা’ চলছিল, দিপালী আত্মহত্যা না করলে তা হয়ত সংবাদপত্রবাসী জানতই না। এভাবে নীরবে নিভৃতে ভয়ংকর ক্ষুধার সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে তাদের জীবন গড়িয়ে চলত। ষাট বছরের আয়ু তিরিশ বছরে ঠেকে যেত, অমর্ত্য সেন যাকে বলেছিলেন ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’। সেই অবসরে জিনি ইনডেক্স লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ত, ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল-এর বাৎসরিক প্রতিবেদনের মুখে মন্ত্রী বাহাদুরদের আস্ফালন দেখে খোদ দুর্নীতির দেবতাই বিব্রতমুখ হয়ে থাকত, আর পলিথিনের ছাউনি-দেয়া ছাপড়ার ঘরে বসে বসে সর্বগ্রাসী ক্ষুধার সাথে দিপালীদের এই কুটনীতি চলতেই থাকত!
এখনও তো চলবে সব-ই। প্রকল্প পরিচালকের পাজেরো চলবে, মাইক্রোক্রেডিট সামিট চলবে, দারিদ্র গবেষণায় দেশ সয়লাব হয়ে যাবে। চলবে না খালি দিপালীদের সাবেক ‘ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনা’। কিছু বিবেকবান মানুষের তৎপরতায় এখন তাদের খাওয়া হচ্ছে তিন বেলা (কিন্তু কতদিন?)। আবার গরিবের জন্য তিন বেলা খাওয়াও কম বিপত্তির নয়! কোষ্ঠ তরল হয়ে যায়, ঘন ঘন ল্যাট্রিনে যেতে হয়, একথা বেগুনটিলা বস্তির বৃদ্ধা গুলবানু বলেছিল।
দিপালীর পরিবার তাদের এই গরিবি জানান দিতে চায় নি। তাই নিজেরা নিজেদের ‘ব্যবস্থাপনা’ তৈরি করেছিলেন। দিপালী আত্মহত্যা করায় সিভিল সমাজের জ্ঞানপাপ হয়ে গেল! আমরা জেনে ফেললাম, গরিব কিভাবে তার সবচেয়ে মৌলিক চাহিদার সাথে খেলে। ফলে, দিপালীর পরিবারের মত আরো অতিগরিব যারা আছে, যাদের ধারণা গরিবি জানান দেয়ার বিষয় নয়, তারা আরো সতর্ক হয়ে যাবে। এমনিতেই তারা সমাজে অস্পৃশ্য হয়ে থাকে, এরপর থেকে অদৃশ্য হয়ে থাকবে। ক্ষুধার আরো নিবিড় ‘ব্যবস্থাপনা’ বের করবে তারা। যেখানে আত্মহত্যাজাতীয় কোনো স্ট্যান্ডার্ড এরর থাকবে না, ফলে সিভিল বিবেক আসন্ন ঈদের প্রাক্কালে রং ঝলমল প্লাজার সামনে কোনোরকম দংশনে পড়বে না।
‘অতিগরিব’ নামে সমাজের একটা অংশের কথা অনেকেই স্বীকার করেন শুনি, কিন্তু তাদের কাছে পৌঁছাবার কোনো ফর্মূলা এখনও বাজারে আসে নি। শোনা যায়, অতিগরিবের উন্নয়ন অনেক দুরূহ, কারণ তাদের এসেট নাই (ফলে বন্ধকী নেয়া যায় না!), তাদের ভয়েস নাই (ফলে ইন-ডেপথ ইন্টারভিউ দেয় না তারা!), তাদের এমনকি কোনো আকাঙ্ক্ষাও নাই (ফলে অ্যাডভোকেসী মাঠে মারা যায়!)। আপামর প্ররোচনাহীন এক জনগোষ্ঠী! তারা এমনিতেই তিলে তিলে মরে, তাদের মধ্যে দিপালীর মত কারো কারো হয়ত মৃত্যুর এই শম্বুক গতি পছন্দ হয় না। তখন অতিগরিবেরা শিরোনাম হয়।
দিপালীদের বাড়িতে আজ দেশের বিবেকবান মানুষের সাহায্য পৌঁছেছে, কিন্তু দরকার সুনির্দিষ্ট পলিসি, আর তার যথাযথ বাস্তবায়ন, এইসব অতিগরিব এবং বিপদাপন্ন মানুষের কার্যকরভাবে বেঁচে থাকার জন্য। নাহলে, ভেবে দেখুন, মাস ছয় পরে, দিপালীদের সাহায্যের টাকাই ফুরিয়ে যাবে না, এর সাথে তাদের এতদিনকার ‘ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা’র অভ্যাসটিও হারাবে তারা। সেইসাথে, আরেকবার সংবাদ শিরোনাম হবার ভয়ে সমাজে তারা আরো ইনভিজিবল হয়ে যাবে। ফলে, দিপালীর পরিবার তথ্যপ্রবাহ হয়ে আমাদের বিবেকে আর হয়ত কামড় বসাবে না, কিন্তু ক্ষুধার কামড় থেকে তারা কি মুক্তি পাবে?
২০০৫
সংবাদের লিংক:
http://www.thedailystar.net/2005/10/16/d51016110280.htm
বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
"চন্দ্রবিন্দু" যেভাবে তৈরি হল

বিপুলা এই টেলিভিশন মিডিয়ার সম্ভাবনার কতটুকু জেনেছি আমরা? সর্বসাকুল্যে টেলিভিশন অনুষ্ঠান বলতে খালি দেখছি বিভিন্ন দৈর্ঘের নাটক, বিভিন্ন প্রস্থের টকশো, আর নানাবর্ণের আইডল প্রতিযোগিতা। এর বাইরে বিস্তীর্ণ অভিজ্ঞতার যে দেশ, সেখানে এই বাক্সটির সম্ভাবনা কীরকম? গতানুগতিক এই সমস্ত ফর্মাটের বাইরে নতুন কোনো বিনোদনের সুযোগ আছে কিনা টেলিভিশনে?
এরকম একটি জায়গা থেকেই চন্দ্রবিন্দুর কথা ভাবা। ২০০৫ সাল সেটি, আমি শিল্পসাহিত্যে দৃষ্টিসংবেদন নিয়ে গবেষণা করছি, একই বছরে এটি দেখা না-দেখার চোখ নামক বই হয়ে বেরোয়। ব্যতিক্রমধর্মী ঐ সংকলনের কাজ করতে করতে কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামানের সাথে চন্দ্রবিন্দু নিয়ে অনেক আলাপ, কবি সাজ্জাদ শরিফের সাথেও। চিন্তার জট খুলতে থাকে, বন্ধু এবং মেধাবী নির্মাতা নূরুল আলম আতিক প্রবল উৎসাহে এগিয়ে আসেন। তারপর অনেকদিন ধরে চন্দ্রবিন্দু এগিয়ে চলছিল এই চতুষ্টয়ের চিন্তার মিথষ্ক্রিয়ায়। এই পর্যায়ে একটা ছন্দোপতন: আমাকে চলে যেতে হয় দেশের বাইরে। কিন্তু থেমে থাকে নি চন্দ্রবিন্দু, বরং আতিকের সুযোগ্য চিন্তায় ও সৃজনী দক্ষতায় তরতর করে বেড়ে উঠতে থাকে। আমি দূরদেশে বসে খবর পাই। পরম আনন্দ হয়।
চন্দ্রবিন্দু বানানোর মূল প্রণোদনা কি? এক কথায় এর উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, শ্রেণীনির্বিশেষে মানুষে মানুষে যোগাযোগের একটা পাটাতন তৈরি হয় কিনা সেটা খতিয়ে দেখা। ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের এই কালে মানুষ তার ধর্মের কিংবা শ্রেণীর ঘেরাটোপে যেভাবে বন্দী হয়ে পড়ছে, তার ফলে কবুতরের খোপের ভেতর ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে আটকা পড়েছে চিরকালের কথকতা। কিন্তু ধনীর বারান্দায় যেমন বৃষ্টি পড়ে, গরিবের ঘরেও। তাদের প্রত্যেকেরই শৈশব আছে, আছে ভুতের ভয় কিংবা মায়ের কাছে যাবার আকূলতা। একই আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে পড়ছে বিভক্ত সমাজে, ফলে তার অর্থ ও অনর্থ স্থানবিশেষে ভিন্ন হয়ে যায়। আমরা ভিন্নবিভক্ত হয়েই একে মোকাবেলা করি, ভুলে যাই এর অভিন্ন উৎসের কথা। চন্দ্রবিন্দু আমাদের এই প্রতিদিনের খন্ডিত অনুভবগুলোকে আশ্রয় করেই চিরকালের বাঁশিটি বাজাতে চেয়েছে।
চিরকালের বাঁশি চিন্তায় বাজানো যত সহজ, পর্দায় বাজানো ততই কঠিন। বিশেষ করে যে পর্দায় স্টেরিওটাইপ ইমেজ আর বাণিজ্যের জংলীজটিল রাজনীতি দিয়ে মধ্যবিত্তের বিনোদন তৈরি হয়, সেখানে ভিন্নধারার একটি অনুষ্ঠানের জন্য জায়গা পাওয়া খুবই মুশকিল। কিন্তু নুরুল আলম আতিক দমে যাবার পাত্র নন, তাই তো নানান বৈরী অবস্থা পার হয়ে চন্দ্রবিন্দু আজ চ্যানেলআই-এর পর্দায়। এর মধ্যেই দর্শক এর প্রথম পর্বটি দেখে ফেলেছেন। চন্দ্রবিন্দু কতটা সফল কিংবা কতটা ব্যর্থ সে বিচারের ভার তাঁদের ওপর। কিন্তু আমি খুশি আমার একটি ভাঙাচোরা স্বপ্নকে এত নিপুণভাবে বাস্তবের পর্দায় হাজির হতে দেখে। আতিক সেটি করেছেন, তিনি এই স্বপ্নের যেমন সারথী ছিলেন তেমনি বাস্তবেরও রূপকার হয়ে দেখালেন। চমৎকার একটি সেটে অনবদ্য লাগছে শারমিন লাকী-র নাটকীয় উপস্থাপনা। চন্দ্রবিন্দু জয়যুক্ত হোক।
মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
মানলে তালগাছ, না মানলে বালগাছ!!
বিনয় মজুমদারের একটা কবিতার উদ্ধৃতি আমি দিয়েছিলাম। ব্রাত্য রাইসু সেইটাকে ‘নর প্রাকৃতিক জৈব কবিতা’ অভিধায় আখ্যায়িত করেছেন। এই ধরনের অভিধার কথাও মনে হয় আর কেউ বলেন নাই। ফলে স্বত্ব রাইসুর, সন্দেহ নাই। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, সেই কবিতার শিরায় শিরায় রবীন্দ্রনাথের মনুমেন্টপ্রমাণ অবস্থান নিয়ে একটা পরিষ্কার বিদ্রুপ বহমান, যেটা রবীন্দ্রনাথের অবদানকে পাশ কাটায় না, সহমর্মী থাকে। বিনয়ের সময় হয়ত রবীন্দ্রনাথকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার স্পর্ধা অর্জন করে নাই, যেটা অর্জন করেছে ব্রাত্য রাইসুর সময়, বা তিনি হয়ত তার সময় থেকেও অনেকখানি এগিয়ে (এগিয়ে বলছি, যেহেতু তেমন কাউকেই পাচ্ছি না, যে, উইদ ফুল থ্রটল, রাইসুর সাথে একমত হইতে পারতেছে)।
আমি (ভুলক্রমে!) একটা পাটাতনের ইঙ্গিত করেছিলাম। যেহেতু আমি বিশ্বাস করি কোনোকিছুই রাতারাতি ডিম ফুইটা বাইর হয় না। আমার ধারণা ছিল, রবীন্দ্র প্রসঙ্গে ব্রাত্য রাইসুর র্যাডিক্যাল অবস্থান ঐতিহাসিকভাবেই বিকশিত হয়েছে। বিনয়কে একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে মানছিলাম। কিন্তু রাইসু’র মনে হয়েছে, এইটা উনার বক্তব্যের মেরিট যাবতীয় গরুগাধাকে বণ্টন করে দেয়ার একটি সুমন রহমানীয় চক্রান্ত। রাইসুর বক্তব্যের স্বত্ব তার কাছ থেকে ছিনায়া লইয়া যাওয়ার একটা স্নিগ্ধ চেষ্টা। সেই কোপ থেকে পাটাতনকে তিনি ‘পাঠাতন’ লিখলেন, তার মানে বিনয় বা অন্যান্য ‘পাঠা’দের সাথে একমঞ্চে উচ্চারিত হওয়ার কোনো খায়েশ উনার নাই।
ভাই রাইসু, আপনার বক্তব্যের মেরিট আপনারই। আমার বিবর্তনবাদ (বা ঐতিহাসিক বিকাশবাদ) আমারই থাক, ধইরা নিই যে আপনার রবীন্দ্র-অবধারণ মোটামুটি নবুয়তের ফর্মেই আপনের ওপর নাযিল হইছে। কিন্তু তাতেও একটা সমস্যা পাকাইতেছে আপনারই লেখা একটা কবিতা।
বিরহে পরাণ থরোথরো
ঘুরে মরিব একেলা
গাবো ঠাকুরের গান
এমন দিনেই তারে বলা যায়
যা বলিনি এতদিন
প্রথমত বৃষ্টির অভাবে
আর আমার জন্যই এল এই গান জলের ওপরে ভেসে ভেসে
(ব্রাত্য রাইসু, বর্ষামঙ্গল, আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি)
বিরহাক্রান্ত রাইসু একা একা ঘুরে ঘুরে ঠাকুরের গান গাইতেছে, এই কবিতার চিত্র যদি মোটামুটি এইরকমই হয়, তাইলে উহারে দয়া কইরা একটা অভিধা দিয়া দিবেন কি? আমাদের একটু বইলা দিবেন কি, এই কবিতার সাথে আপনের বর্তমান রবীন্দ্র-অবস্থানের কোনো ধারাবাহিকতা আছে কি না? জানতে ইচ্ছা করতেছে।
কবিসভা বড় অদ্ভূত জায়গা। এইখানে কোনো তর্কেরই মিমাংসা হয় না, এমন কি অনেক মিমাংসিত তর্কও এইখানে টগবগ কইরা ফোটে (এটা মন্দ না)। এইখানে প্রতিপক্ষ হইয়া যারা কোনো তর্ক আরম্ভ করেন, প্রতিপক্ষ থাইকাই তারা আলোচনা ক্ষান্ত দেন, বুঝি বা ক্লান্ত হৈয়া পড়ার কারণে। এইরকম অনেক ঈমানদারের সাক্ষাৎ এইখানে মিলে।
মানভাষা-ঊনভাষা তর্ক একটি পোস্ট কলনিয়াল চিন্তাদশা, এইটা বুঝতে আমার দুইটাকাও লাগে না। এই তর্কের পরিবেশ তৈরি হইছে ক্ষমতা-সম্পর্কের নানান ইতিহাস, নানান তত্ত্ব ও ঘটনার পাটাতনের (পাটাতনই লিখলাম, কী আর করা!) ওপর দাঁড়িয়ে। জাস্ট অ্যা মেয়ার পোস্ট-কলোনিয়াল ইমপ্লিকেশন! এইটা একটা ভাল এজেন্ডা বইলা আমার ধারণা, আমি এই এজেন্ডার খুব ভক্ত। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন এইটা কোনো ইতিহাস-নিরপেক্ষ দশা থেইকা তার ওপর হঠাৎ কইরা নাযিল হইছে, সেইটা তার ভাবনা, তার সুখ।
আরো স্পেসিফিক হইয়া বলি: ধরা যাক, বাংলা সাহিত্যে যত রবীন্দ্র বিরোধিতা আছে সব একজাতের, শুধু রাইসুরটা আলাদা জাতের। এক্ষণে আমি জানতে চাই, ব্রাত্য রাইসু তার রবীন্দ্র বিরোধিতায় এ পর্যন্ত যত বাক্য লিখেছেন, তাত্ত্বিকভাবে তার মধ্যে এমন কোনো বক্তব্য কি আছে, যেটি পোস্ট-কলোনিয়াল চিন্তার ধারাবাহিকতা ছাড়া এসেছে?
আমাদের গ্রামে লোকজন কয়, মানলে তালগাছ না মানলে বালগাছ। যারা এইটা কয়, বা যে অবস্থায় কয়, সেইটা হইল কাউরে তালগাছও না বানানো, বালগাছও না বানানো। কারণ, কাউরে তালগাছ বানানো সহজ, এর চেয়ে সহজ বালগাছ বানানো।
ঢাকা, ১৬ মে ২০০৫
আমি (ভুলক্রমে!) একটা পাটাতনের ইঙ্গিত করেছিলাম। যেহেতু আমি বিশ্বাস করি কোনোকিছুই রাতারাতি ডিম ফুইটা বাইর হয় না। আমার ধারণা ছিল, রবীন্দ্র প্রসঙ্গে ব্রাত্য রাইসুর র্যাডিক্যাল অবস্থান ঐতিহাসিকভাবেই বিকশিত হয়েছে। বিনয়কে একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে মানছিলাম। কিন্তু রাইসু’র মনে হয়েছে, এইটা উনার বক্তব্যের মেরিট যাবতীয় গরুগাধাকে বণ্টন করে দেয়ার একটি সুমন রহমানীয় চক্রান্ত। রাইসুর বক্তব্যের স্বত্ব তার কাছ থেকে ছিনায়া লইয়া যাওয়ার একটা স্নিগ্ধ চেষ্টা। সেই কোপ থেকে পাটাতনকে তিনি ‘পাঠাতন’ লিখলেন, তার মানে বিনয় বা অন্যান্য ‘পাঠা’দের সাথে একমঞ্চে উচ্চারিত হওয়ার কোনো খায়েশ উনার নাই।
ভাই রাইসু, আপনার বক্তব্যের মেরিট আপনারই। আমার বিবর্তনবাদ (বা ঐতিহাসিক বিকাশবাদ) আমারই থাক, ধইরা নিই যে আপনার রবীন্দ্র-অবধারণ মোটামুটি নবুয়তের ফর্মেই আপনের ওপর নাযিল হইছে। কিন্তু তাতেও একটা সমস্যা পাকাইতেছে আপনারই লেখা একটা কবিতা।
বিরহে পরাণ থরোথরো
ঘুরে মরিব একেলা
গাবো ঠাকুরের গান
এমন দিনেই তারে বলা যায়
যা বলিনি এতদিন
প্রথমত বৃষ্টির অভাবে
আর আমার জন্যই এল এই গান জলের ওপরে ভেসে ভেসে
(ব্রাত্য রাইসু, বর্ষামঙ্গল, আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি)
বিরহাক্রান্ত রাইসু একা একা ঘুরে ঘুরে ঠাকুরের গান গাইতেছে, এই কবিতার চিত্র যদি মোটামুটি এইরকমই হয়, তাইলে উহারে দয়া কইরা একটা অভিধা দিয়া দিবেন কি? আমাদের একটু বইলা দিবেন কি, এই কবিতার সাথে আপনের বর্তমান রবীন্দ্র-অবস্থানের কোনো ধারাবাহিকতা আছে কি না? জানতে ইচ্ছা করতেছে।
কবিসভা বড় অদ্ভূত জায়গা। এইখানে কোনো তর্কেরই মিমাংসা হয় না, এমন কি অনেক মিমাংসিত তর্কও এইখানে টগবগ কইরা ফোটে (এটা মন্দ না)। এইখানে প্রতিপক্ষ হইয়া যারা কোনো তর্ক আরম্ভ করেন, প্রতিপক্ষ থাইকাই তারা আলোচনা ক্ষান্ত দেন, বুঝি বা ক্লান্ত হৈয়া পড়ার কারণে। এইরকম অনেক ঈমানদারের সাক্ষাৎ এইখানে মিলে।
মানভাষা-ঊনভাষা তর্ক একটি পোস্ট কলনিয়াল চিন্তাদশা, এইটা বুঝতে আমার দুইটাকাও লাগে না। এই তর্কের পরিবেশ তৈরি হইছে ক্ষমতা-সম্পর্কের নানান ইতিহাস, নানান তত্ত্ব ও ঘটনার পাটাতনের (পাটাতনই লিখলাম, কী আর করা!) ওপর দাঁড়িয়ে। জাস্ট অ্যা মেয়ার পোস্ট-কলোনিয়াল ইমপ্লিকেশন! এইটা একটা ভাল এজেন্ডা বইলা আমার ধারণা, আমি এই এজেন্ডার খুব ভক্ত। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন এইটা কোনো ইতিহাস-নিরপেক্ষ দশা থেইকা তার ওপর হঠাৎ কইরা নাযিল হইছে, সেইটা তার ভাবনা, তার সুখ।
আরো স্পেসিফিক হইয়া বলি: ধরা যাক, বাংলা সাহিত্যে যত রবীন্দ্র বিরোধিতা আছে সব একজাতের, শুধু রাইসুরটা আলাদা জাতের। এক্ষণে আমি জানতে চাই, ব্রাত্য রাইসু তার রবীন্দ্র বিরোধিতায় এ পর্যন্ত যত বাক্য লিখেছেন, তাত্ত্বিকভাবে তার মধ্যে এমন কোনো বক্তব্য কি আছে, যেটি পোস্ট-কলোনিয়াল চিন্তার ধারাবাহিকতা ছাড়া এসেছে?
আমাদের গ্রামে লোকজন কয়, মানলে তালগাছ না মানলে বালগাছ। যারা এইটা কয়, বা যে অবস্থায় কয়, সেইটা হইল কাউরে তালগাছও না বানানো, বালগাছও না বানানো। কারণ, কাউরে তালগাছ বানানো সহজ, এর চেয়ে সহজ বালগাছ বানানো।
ঢাকা, ১৬ মে ২০০৫
শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০০৮
কবিতার পাঠ: ইমরুল হাসানের একটি কবিতা
ইমরুল হাসানের কবিতাটি এল ইমেইলে:
পাগল
কেউ কি আর চেষ্টা করে যাচ্ছে না, তোমার কি মনে হয়?
আড়ালে আড়ালে কতই না শ্রেণীভেদ, শাসিয়ে যাচ্ছে
রাস্তার পাশে তোমাকে দাঁড় করিয়ে যাচ্ছে একা!
ইচ্ছা হয়, উবু হয়ে বসে থাকি, রাস্তার কোণায়
ড্রেনের পাশে, মাথানিচু; আগে, অনেক অনেক আগে যেমন
বসে থাকতো, পাগল! কিছুটা সুশ্রী আর যার সুস্থ হওয়ার আশা
মরে যাই নাই তখনো, তাকে দেখলে মনে হতো যে, সে আর
পাগল হতে চায় নাই, কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বসে পড়েছে
যা আর স্বাভাবিক নয়, যাকে কিনা বলা হচ্ছে, ভাবা হচ্ছে
সে আর যা নয়, যা সে হতে চায় নাই, যা আসলে আর কিছুই না ...
এমনই একটা র্নিবিকল্প সময়, সন্ধ্যাবেলায়
কতকিছুই না ভাবছে মানুষ-জন, চলে যাচ্ছে, ফুসফাস করে
হাঁপাতে হাঁপাতে পার হয়ে যাচ্ছে, কতকিছুই তো করছে ...
কেউ কি আর ড্রেনের ভিতর থেকে টাকা খোঁজার মতো করে
অন্যকিছু বের করে আনার চেষ্টাটা করে যাচ্ছে না?
তোমার কি মনে হয়?
২৯.০৮.০৮
একঝলক পাঠ, তারপর আবার প্রতিদিনের জীবনে। কিন্তু সেই যে পাগল, যে কিছুটা সুশ্রী, এবং সুস্থ হবার আশা এখনো শেষ হয়ে যায় নাই যার, তাকে তাড়ানো গেল না। আশাহীন যে পাগলামি তাকে ভুলে যাওয়া সহজ, হয়ত জরুরিও, আবার পাগলামিহীনতায়ও কোনো গল্প নেই, মনে রাখাও নেই। প্রতিদিনের এই যে জীবন, পথে-পাওয়া জীবন, এই যে সব মৃদু অস্বস্তি বাড়ি ফিরবার পথে, এই যে একটুকরা বিষাদ... এগুলোই ইমরুলকে কবিতায় উবু করে। মনে হবে যেন মাখনে ছুরি চালাচ্ছে সে, কিন্তু আলাদা যে ইমেজটা হাজির থাকে মনে, কবিতাটি পড়বার বহুদিন পরেও, আমি খেয়াল করি ক্রমে সেটা গ্রানাইটের মত শক্ত হয়ে যায়!
একেকটা ইমেজের এত শক্তি! ভাবি।
ইমরুলের এই কবিতায় (অন্য অনেক কবিতায়ও বোধ করি) কবি কথা বলছে যার সাথে, বা যাকে আসলে কবিতাটি শোনানো হচ্ছে, তার ব্যক্তিত্ব অন্যরকম। সে যেন সব কিছু ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট বোঝে, তাই ইমরুল তাকে নানান ইমেজ দিয়ে, ইমেজের ভেতর গুপ্তির মত প্রশ্ন গুঁজে দিয়ে সংশয়ী করে তুলতে চায়। কবিতা পাড়ার জন্য এমন একজন সঙ্গী পেয়ে যাওয়া বেশ আরামের, কবির জন্য। জরুরিও বটে।
ইমরুলের কবিতা কানের কাছে ফিসফিস করে বলার মত, এবং বলার পর, যিনি বললেন এবং যিনি শুনলেন তারা ভুলে যাওয়ার ভান করবেন সত্যি, কিন্তু ঐ একটা-দুটা ইমেজ থাকবে যা আপনার সংবেদনার নরম মাটিতে গ্রানাইটের মত অনড় হয়ে পড়ে থাকবে। আপনি ভাববেন, ঠিক আছে পরে সরিয়ে দেবেন 'খন, কিন্তু... হাহাহা.... পারছেন কি?
পাগল
কেউ কি আর চেষ্টা করে যাচ্ছে না, তোমার কি মনে হয়?
আড়ালে আড়ালে কতই না শ্রেণীভেদ, শাসিয়ে যাচ্ছে
রাস্তার পাশে তোমাকে দাঁড় করিয়ে যাচ্ছে একা!
ইচ্ছা হয়, উবু হয়ে বসে থাকি, রাস্তার কোণায়
ড্রেনের পাশে, মাথানিচু; আগে, অনেক অনেক আগে যেমন
বসে থাকতো, পাগল! কিছুটা সুশ্রী আর যার সুস্থ হওয়ার আশা
মরে যাই নাই তখনো, তাকে দেখলে মনে হতো যে, সে আর
পাগল হতে চায় নাই, কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বসে পড়েছে
যা আর স্বাভাবিক নয়, যাকে কিনা বলা হচ্ছে, ভাবা হচ্ছে
সে আর যা নয়, যা সে হতে চায় নাই, যা আসলে আর কিছুই না ...
এমনই একটা র্নিবিকল্প সময়, সন্ধ্যাবেলায়
কতকিছুই না ভাবছে মানুষ-জন, চলে যাচ্ছে, ফুসফাস করে
হাঁপাতে হাঁপাতে পার হয়ে যাচ্ছে, কতকিছুই তো করছে ...
কেউ কি আর ড্রেনের ভিতর থেকে টাকা খোঁজার মতো করে
অন্যকিছু বের করে আনার চেষ্টাটা করে যাচ্ছে না?
তোমার কি মনে হয়?
২৯.০৮.০৮
একঝলক পাঠ, তারপর আবার প্রতিদিনের জীবনে। কিন্তু সেই যে পাগল, যে কিছুটা সুশ্রী, এবং সুস্থ হবার আশা এখনো শেষ হয়ে যায় নাই যার, তাকে তাড়ানো গেল না। আশাহীন যে পাগলামি তাকে ভুলে যাওয়া সহজ, হয়ত জরুরিও, আবার পাগলামিহীনতায়ও কোনো গল্প নেই, মনে রাখাও নেই। প্রতিদিনের এই যে জীবন, পথে-পাওয়া জীবন, এই যে সব মৃদু অস্বস্তি বাড়ি ফিরবার পথে, এই যে একটুকরা বিষাদ... এগুলোই ইমরুলকে কবিতায় উবু করে। মনে হবে যেন মাখনে ছুরি চালাচ্ছে সে, কিন্তু আলাদা যে ইমেজটা হাজির থাকে মনে, কবিতাটি পড়বার বহুদিন পরেও, আমি খেয়াল করি ক্রমে সেটা গ্রানাইটের মত শক্ত হয়ে যায়!
একেকটা ইমেজের এত শক্তি! ভাবি।
ইমরুলের এই কবিতায় (অন্য অনেক কবিতায়ও বোধ করি) কবি কথা বলছে যার সাথে, বা যাকে আসলে কবিতাটি শোনানো হচ্ছে, তার ব্যক্তিত্ব অন্যরকম। সে যেন সব কিছু ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট বোঝে, তাই ইমরুল তাকে নানান ইমেজ দিয়ে, ইমেজের ভেতর গুপ্তির মত প্রশ্ন গুঁজে দিয়ে সংশয়ী করে তুলতে চায়। কবিতা পাড়ার জন্য এমন একজন সঙ্গী পেয়ে যাওয়া বেশ আরামের, কবির জন্য। জরুরিও বটে।
ইমরুলের কবিতা কানের কাছে ফিসফিস করে বলার মত, এবং বলার পর, যিনি বললেন এবং যিনি শুনলেন তারা ভুলে যাওয়ার ভান করবেন সত্যি, কিন্তু ঐ একটা-দুটা ইমেজ থাকবে যা আপনার সংবেদনার নরম মাটিতে গ্রানাইটের মত অনড় হয়ে পড়ে থাকবে। আপনি ভাববেন, ঠিক আছে পরে সরিয়ে দেবেন 'খন, কিন্তু... হাহাহা.... পারছেন কি?
পাগলা ভক্তের ধাওয়া!!
কবিসভায় ব্রাত্য রাইসু এবং আমি (ইমরুল এবং ভাস্করও) দুয়েকটি বিষয় নিয়া তর্ক করিতেছিলাম। আমরা পরস্পরের কিছু কিছু বিষয়ে একমত আর কিছু কিছু বিষয়ে দুইমত হইতেছিলাম। তাতে অনেক বিষয় আমার নাদান-চক্ষে পরিষ্কার হইবার সুযোগ পাইতেছিল, মান্যবর রাইসু-ও তর্কটিকে উপভোগ্য বইলা সায় দিতেছিলেন।
কিন্তু পাগলা ভক্তের মন ইহাতে মানিবে কেন?
ভক্তের মন তাই নানান মোক্ষম কৌশলের আশ্রয় খুঁজিল। একজন বেনামে সুমন রহমানের ভক্ত সাজিলেন। বিপরীত লিঙ্গের এই চরিত্রটি আমার কাছে সুমন রহমানের অনেক লেখা বিষয়ে আপ্লূত প্রশংসা করিলেন, যাতে আমার মহিলাবাঞ্ছা আর ভক্তবাঞ্ছা দুইটাই পুরা হয়। অনেক ইনায়া বিনায়া শেষে তিনি আমার ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর চাহিলেন। কিন্তু ততক্ষণে আমি আমার জানের ওপর খতরা টের পাইয়া গিয়াছি। তাই দরজায় রসুনের মালা ঝোলাইয়া হাতে ক্রুশ লইয়া বইসা রহিলাম। কোনো সাড়া দিলাম না। ফোন নম্বর দিলাম না। এরপর সেই ভক্তের প্রশংসা ক্রমে নিন্দায় পর্যবসিত হইতে থাকিল। স্বস্তি পাইলাম। মনে হইল এই যাত্রা ফাঁড়া কাটিয়া গেছে। বন্ধ দরজার ওপারের মোহনীয় হাসিখানি অবশেষে গগনবিদারী প্রেতচিৎকারিণীরূপে পাহাড়েপর্বতে প্রতিধ্বনি তুলিয়া বিদায় নিলেন।
স্ত্রীজাতীয় আরেকজন নিজনামে কবিসভার যৌথ ডাকবাক্স থিকা আমার ব্যক্তিগত মেইলবাক্সে আছর করিলেন। তিনি আসিলেন এক ‘ভয়ংকর’ ভালবাসার পয়গাম লইয়া। আমাকে নানান বিষয়াদি জিজ্ঞাস করিলেন, যথা: আমি বিবাহিত কি না, আমি দেখিতে ‘উত্তেজক’ কি না, ইত্যাদি। তিনি আমাকে লম্বা লম্বা চিঠি লিখিতে লাগিলেন এবং আমাকেও সেইমত আদেশ করিলেন। কিন্তু আমি একজন ভীতুবিবাহিত মানুষ বিধায় উনার উদাত্ত ডাকে সাড়া দিবার পারি নাই। শেষে আমার ‘অক্ষম’ পুরুষত্বে কুপিত হইয়া তিনি নিজ অভিসন্ধি সরাসরি প্রকাশ করিলেন: আর কোনোদিন যদি আপনি রাইসুরে.......
ইমেইল বাক্স খুলিলেই এইসব ভয়ংকর ভয়ংকর সব হুমকিতে ভরা চিঠি দেখিতে পাই, শেষে মনের দুঃখে ইমেইল ছাইড়া এমএসএন চ্যাটবাক্সে গিয়া ঢুকিলাম। সেইখানে ঘাপটি মাইরা ছিলেন আরেকজন, আমাকে দেখিবামাত্র একখানি জল্লাদের ইমোটিকন দেখায়া ভাগায়া দিলেন। আমি খাবি খায়া পলায়া যাইবার প্রাক্কালে তিনি আবার পেছন পেছন দুইখান ভাইরাস লেলাইয়া দিলেন। ইহার একটি লাগিল আমার কম্পিউটারের উইন্ডোজে। কম্পিউটার ক্র্যাশ করিল। আরেকটি লাগিল আমার ইমিউন সিস্টেমে। আমিও ক্র্যাশ করিলাম।
ভাবিলাম, ভালই হইল একদিকে, পাগলা ভক্তের মন শান্ত হইবেক। আমি ও আমার কম্পিউটার চুপচাপ পইড়া থাকি, মুক ও বধির ইস্কুলে যাওয়া-আসা করি বরং!!
কিন্তু টেলিফোন নামক আরেকটি যন্ত্র যে আছে এই জগতে! সেইখানে হানা দিলেন আরেকজন। বলিলেন, দেখছেন নাকি, আপনেরে নিয়া চিঠি লিখছে আইজগা....
তখনও দেখি নাই। পরে ল্যাচড়াইতে ল্যাচড়াইতে এক সাইবার ক্যাফেতে গিয়া দেখিলাম আরেক ভক্ত। টিপু সাহেব লেখছেন। ভালই লেখছেন। আমার বলিবার কিছু নাই। কারণ উনার স্কুলবিতর্কমার্কা বক্তব্যের উত্তরে আমার যা বলার তা আগের চিঠিতেই বলা আছে। সাশ্রয় করি বরঞ্চ!
একটা প্রস্তাব নিয়া ভাবিতেছি। রাইসু একদা নিন্দাসভার ডাক দিয়াছিলেন। তখন আমি অন্যরকম তর্কে মজিয়াছিলাম। এখন মনে হইতেছে নিন্দাসভা না হইলেও একখানি ভক্তসভা তৈয়ার করা অত্যন্ত জরুরি। যাবতীয় ভক্তকুলের একটা জন্য অভয়ারণ্য খুলিয়া দিলে উনারা যেমন নিজ নিজ আইকনদের ধামা ধরিয়া স্বচ্ছন্দে বিহার করিতে পারিবেন, তেমনি আমাদেরও অনেক তর্কসাশ্রয় হইয়া যাইবে।
ঢাকা, ৩১ মে ২০০৫
রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০০৮
সাবঅল্টার্ন-লজিকো-লোয়ারমিডলক্লাশ
"What can be said can be said clearly; what we cannot talk about we must pass over in silence."
Wittgenstein, Tractatus Logico Philosophicus
কবিসভায় আমরা ভার্চুয়াল ভার্চুয়াল খেলি। তবু গতরের শান্তি খুঁজতে মাঝে মাঝে মন শাহবাগে ধায়।
আজকেও ধাইলো। গিয়া লিপুর সাথে কথা। লিপু মানে ইফতেখার মাহমুদ, কবিসভার প্রায়-সাইলেন্ট কমরেড। তার সাথে অনেক আলাপ। মধ্যবিত্তের সাবঅল্টার্ন সাহিত্য লৈয়া। তখন মানস আসলেন। রাইসু আসলেন। আবীর আসলেন। সাবঅল্টার্ন-রাও আসলেন। ভার্চুয়ালি।
তারপর হ্যালো করলাম আহমেদ নকীবকে। তিনিও কবিসভার নীরব গ্রাহক। জানাইলেন, সাবঅল্টার্ন প্রণোদনা নিয়া আমার পজিশন তার পছন্দ হৈছে। তবু যেন একটু ধোঁয়াশা আছে। কৈলেন, আচ্ছা আমি ঢাকাবাসী মানুষ কবিতায় যদি হলুদ ট্যাক্সি উঠায়া দেই.....
- সেইটা এলিটিজম হয়া যায় কি না?
এইবার ফতোয়া দিবার পালা আমার। জোরেশোরে কৈলাম, না। সেইটা এলিটিজম হয় না। হয় যখন আপনে ঢাকাবাসী হৈয়া না-দেখা গেরাম নিয়া পাতলা দরদে মাতেন।
কয় দিন আগে এক দৈনিকে আমি গেরামবর্তী একটা গল্প উল্টাইতেছিলাম। সেইখানে দেখলাম কিভাবে বাঁশের টাট্টি (হাগুখানা)তে যাইতে হয় এরকম একটা সহানুভূতিশীল ম্যানুয়াল আছে। সেইটা গল্পের বিষয়বস্তু ছিল না। তবু লেখক দিলেন। আটষট্টি হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে!
আমি ভাবতেছিলাম, ঐ লেখক যদি উনার ফ্যাটবাড়ির বাথরুমে যাওয়ার ঘটনা লেখেন, তাইলে কি তিনি ক্যামনে ফ্ল্যাশ করা লাগে সেইটা লেখতেন?
হয়ত লেখতেন না। কারণ ঐটাতো তিনি জানেন। ডেইলি যাওয়া-আসা করেনও। তাই লেখনের দরকার নাই। এগজটিক না হৈলে লেইখ্যা কি কোনো আরাম আছে!
তাই গেরাম নিয়া লেখছেন। কারণ গেরাম এগজটিক। মধ্যবিত্ত জাতির কাছে গেরাম প্রমোট করা লাগে। গেরাম থিকা মধ্যবিত্ত লেখকের দূরত্বও প্রমাণ করা লাগে। এইটা এলিটিজম।
সুতরাং বাঁশের টাট্টির ভিতরেও এলিটিজমের ভুত থাকতে পারে। আবার হলুদ ট্যাক্সির ভিতরে নাও থাকতে পারে।
শুইনা আহমেদ নকীবের শান্তি লাগল। কৈয়া আমার তো আরো বেশি।
এইবার মানস থিকা একটা রেফারেন্স দেই। তিনি লেখছেন:
আমি এখনো ঠাহর করে উঠতে পারিনি যে সাবঅল্টার্ন গল্পরীতি বলতে সুমন রহমান যা ব্যাখ্যা করেছেন, তা আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি কিনা; কিংবা সেটাকেই আমার অনুধাবনের পরিকাঠামো বিবেচনা করে আগাতে চাই কিনা।
বিবেচনায় আনেন কি ফালায়া দেন, সমস্যা নাই মানস। তার আগে চলেন একটু স্পষ্ট কৈরা লই। আপনেও বোঝেন। আমিও বুঝি।
মাহবুব পিয়ালের কাছে কয় দিন আগে একদল লেখক এসেছিলেন। উনারা কলকাতার। দলিত সাহিত্য করার মানসে ধোপদূরস্ত জীবন ছাইড়া অতি কষ্টে গ্রামে বাস করতেছেন (স্যাক্রিফাইস!)। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ উনাদের আইডল। দলিত সাহিত্য বলতে উনারা নিম্নবিত্তের জন্য এবং নিম্নবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা লয়া সাহিত্য বুঝান। সেইকথা শুইনা আমি ভুত দেখলাম। দলিত সাহিত্যের ভুত।
এইত সেদিন পিপলস এমপাওয়ারমেন্ট ট্রাস্ট নামে একটা সংস্থা শ্রমজীবী লেখকদের একটা সম্মেলন করল ঢাকায়। সেই উপলক্ষে একটা ম্যাগাজিনও বাইর করল। বিষয়টা আমার খুব মনেও ধরল। আমি খুশিমনে ম্যাগাজিনটা উল্টাইলাম। সেইখানে প্রথমেই দেখলাম, শ্রেণীসংগ্রাম নিয়া একটা বেশ ভারি প্রবন্ধ ঘরানার লেখা। লেখকের পরিচয় আছে, তিনি রিক্সা চালান। আমি চমকাইলাম। একজন রিক্সাওয়ালা প্রাবন্ধিক। তার ওপরে বামপন্থী। ঘটনা তো গুরুতর! তারপর সন্ধান কৈরা জানা গেল যে, উনার বামপন্থী ওরিয়েন্টেশনের ইতিহাস রিক্সা চালানের ইতিহাস থিকাও অনেক লম্বা। ভাবলাম উনার পাইচার্ট কেমন হৈতে পারে ? কত পার্সেন্ট রিক্সাওয়ালা তিনি, আর কত পার্সেন্ট বামপন্থী?
এইটা মনে হয় দলিত সাহিত্যের চেহারা, মানস। আপনে যেমন সেইখানে নাই, আমিও নাই।
এইবার চলেন ভিটগেনস্টাইন-স্টাইলে খোলাসা কৈরা কৈ। আমার পজিশন কিছু প্রিমাইজের ওপর দাঁড়ানো। যেমন:
১. আমার বিবেচনায় সাহিত্য একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিনোদন বা সৃষ্টিমাধ্যম। সাহিত্যের লেখক ও পাঠক উভয়ই মূলত মধ্যবিত্ত। লেখকের বিত্ত-প্রমোশন হৈলে তিনি আর সাহিত্য করেন না, আর বিত্ত-ডিমোশন হৈলে কিছুদিন রক্তবমি করেন, তারপর আস্তে আস্তে নদী নিস্তরঙ্গ হয়া যায়।
১.১ যেসব বিত্তশালী লোকদের আপনেরা লেখক হিসেবে দেখেন, উনাদের পয়সা থাকলেও উচ্চবিত্তের সংস্কৃতি নাই। কালচারালি উনারা মধ্যবিত্ত।
১.২ আবার যেনারা বস্তিতে থাকেন আর সাহিত্য করেন, আকারে বা প্রকারে তেনারা কোনোদিনই মধ্যবিত্তসীমানার বাইরে যাইতে চান নাই। আমি নিজে দেখছি, বস্তির মধ্যেও উনারা আপার কাশ তৈয়ার কৈরা রাখেন। ঘরে পর্দা টাঙ্গান।
২. এই আমাদের শ্রেণী। আমরা এই শ্রেণীমধ্যে গুরুসঙ্গ করি। তাহাদের কথা ভাবি। যাহারা ছোটলোক। গরীব। গ্রামে থাকে। বাঁশের টাট্টিতে হাগে। এই টাট্টি লৈয়া আমাদের মন সমব্যথায় ভৈরা ওঠে। অথচ টাট্টি থিকা বাইর হৈয়া গরীবের কত আরাম! আরাম নাই খালি আমাদের বিবেকের!
৩. এইটা হৈল বাংলাদেশের প্রগ্রেসিভ মধ্যবিত্ত লেখকের ক্যাসিক চেহারা। উনারা ভাবাদর্শের সন্তান। উনাদের শৈশব নীতিকথা-শাসিত।
৪. তাই, রাইসুরে আমি কৈতেছিলাম নিম্নমধ্যবিত্ত হওনের সাহিত্যিক সুবিধার কথা।
৪.১ আপওয়ার্ড মবিলিটি না থাকায় তাদের ভাবাদর্শের যন্ত্রণা খুব একটা পোহাইতে হয় না। পরন্তু, নীতিশাস্ত্রও তাদের জন্য ক্যারিয়ার হিসাবে ভাল দাঁড়ায় না। ফলে নীতিশাস্ত্র লংঘনের প্রশিণও লাগে না তার।
৪.২ মধ্যবিত্ত হৈয়াও সাবঅল্টার্ন শ্রেণীর নিকটতম দূরত্বে থাকে সে।
৪.৩ শ্রেণীচরিত্র লোপ পাইবার ভয় আছে তার। প্রগ্রেসিভ মধ্যবিত্ত লেখক নিজেরে ‘গ্রামবর্তী’ হিসেবে সখের ভাবনা ভাবতে পারে, কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত আরিক অর্থেই সাবঅল্টার্ন শ্রেণীতে পরিণত হৈবার ঝুঁকি মধ্যে থাকে। তাই সে আপন শ্রেণীর মিথলজি তৈয়ার করে। সেইখানে সাবঅল্টার্ন টেস্টের জন্য অনেক স্পেস রাখা লাগে তার। কিনশীপ নেটওয়ার্ক।
৪.৪ সাবঅল্টার্নের সাথে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লেখক যতটুকু দূরত্ব এবং নৈকট্য রক্ষা করেন, সেইটাই নতুন সাহিত্যের বড় প্লাসপয়েন্ট। তার নৈকট্য ভাবাদর্শজাত নয়, বরং অভিজ্ঞতাবলয়ের, আর দূরত্ব এলিটিজমের নয়, স্পেসের।
৪.৫ এই প্রেক্ষাপটে নন-এলিটিস্ট সাহিত্যের গ্যারান্টি কতটুকু? আমার মনে হয় এলিটিজমের ট্র্যাপ এইখানেও আছে, যেহেতু সে (নিম্ন)মধ্যবিত্ত। তবে সাহিত্যে এলিটিজম বিষয়টা আমার কাছে হার্ডল রেসের মত লাগে। দৌড়ানোর সময় যদি আপনের হার্ডল পইড়া যায়, তাইলে আপনি ডিসকোয়ালিফাই করেন না। কিন্তু পিছায়া যান।
সংস্কৃতি অধ্যয়নশাস্ত্র নয়, বা সাংস্কৃতিক ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদ নয়, বা অন্য কোনোরকম উৎপাতও নয়, আমি কৈছিলাম এইরকম সাদামাটা কয়েকটা কথা। ইহাদের নন্দনতাত্ত্বিক লেভেলিং আমার সাধ্যের/ইচ্ছার বাইরে, পদে পদে হঠকারী হৈয়া যাওনের ভয় তো আছেই। আমি শুধু ওয়ার্কিং ম্যানুয়াল খুঁজতেছি। বাঁশের টাট্টিতে হাগার ম্যানুয়াল না-বানাইবার সাহিত্য যাতে করতে পারি।
আসেন, এই প্রিমাইজগুলারে চ্যালেঞ্জ করা যাক।
ঢাকা, ১২/৮/৫
Wittgenstein, Tractatus Logico Philosophicus
কবিসভায় আমরা ভার্চুয়াল ভার্চুয়াল খেলি। তবু গতরের শান্তি খুঁজতে মাঝে মাঝে মন শাহবাগে ধায়।
আজকেও ধাইলো। গিয়া লিপুর সাথে কথা। লিপু মানে ইফতেখার মাহমুদ, কবিসভার প্রায়-সাইলেন্ট কমরেড। তার সাথে অনেক আলাপ। মধ্যবিত্তের সাবঅল্টার্ন সাহিত্য লৈয়া। তখন মানস আসলেন। রাইসু আসলেন। আবীর আসলেন। সাবঅল্টার্ন-রাও আসলেন। ভার্চুয়ালি।
তারপর হ্যালো করলাম আহমেদ নকীবকে। তিনিও কবিসভার নীরব গ্রাহক। জানাইলেন, সাবঅল্টার্ন প্রণোদনা নিয়া আমার পজিশন তার পছন্দ হৈছে। তবু যেন একটু ধোঁয়াশা আছে। কৈলেন, আচ্ছা আমি ঢাকাবাসী মানুষ কবিতায় যদি হলুদ ট্যাক্সি উঠায়া দেই.....
- সেইটা এলিটিজম হয়া যায় কি না?
এইবার ফতোয়া দিবার পালা আমার। জোরেশোরে কৈলাম, না। সেইটা এলিটিজম হয় না। হয় যখন আপনে ঢাকাবাসী হৈয়া না-দেখা গেরাম নিয়া পাতলা দরদে মাতেন।
কয় দিন আগে এক দৈনিকে আমি গেরামবর্তী একটা গল্প উল্টাইতেছিলাম। সেইখানে দেখলাম কিভাবে বাঁশের টাট্টি (হাগুখানা)তে যাইতে হয় এরকম একটা সহানুভূতিশীল ম্যানুয়াল আছে। সেইটা গল্পের বিষয়বস্তু ছিল না। তবু লেখক দিলেন। আটষট্টি হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে!
আমি ভাবতেছিলাম, ঐ লেখক যদি উনার ফ্যাটবাড়ির বাথরুমে যাওয়ার ঘটনা লেখেন, তাইলে কি তিনি ক্যামনে ফ্ল্যাশ করা লাগে সেইটা লেখতেন?
হয়ত লেখতেন না। কারণ ঐটাতো তিনি জানেন। ডেইলি যাওয়া-আসা করেনও। তাই লেখনের দরকার নাই। এগজটিক না হৈলে লেইখ্যা কি কোনো আরাম আছে!
তাই গেরাম নিয়া লেখছেন। কারণ গেরাম এগজটিক। মধ্যবিত্ত জাতির কাছে গেরাম প্রমোট করা লাগে। গেরাম থিকা মধ্যবিত্ত লেখকের দূরত্বও প্রমাণ করা লাগে। এইটা এলিটিজম।
সুতরাং বাঁশের টাট্টির ভিতরেও এলিটিজমের ভুত থাকতে পারে। আবার হলুদ ট্যাক্সির ভিতরে নাও থাকতে পারে।
শুইনা আহমেদ নকীবের শান্তি লাগল। কৈয়া আমার তো আরো বেশি।
এইবার মানস থিকা একটা রেফারেন্স দেই। তিনি লেখছেন:
আমি এখনো ঠাহর করে উঠতে পারিনি যে সাবঅল্টার্ন গল্পরীতি বলতে সুমন রহমান যা ব্যাখ্যা করেছেন, তা আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি কিনা; কিংবা সেটাকেই আমার অনুধাবনের পরিকাঠামো বিবেচনা করে আগাতে চাই কিনা।
বিবেচনায় আনেন কি ফালায়া দেন, সমস্যা নাই মানস। তার আগে চলেন একটু স্পষ্ট কৈরা লই। আপনেও বোঝেন। আমিও বুঝি।
মাহবুব পিয়ালের কাছে কয় দিন আগে একদল লেখক এসেছিলেন। উনারা কলকাতার। দলিত সাহিত্য করার মানসে ধোপদূরস্ত জীবন ছাইড়া অতি কষ্টে গ্রামে বাস করতেছেন (স্যাক্রিফাইস!)। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ উনাদের আইডল। দলিত সাহিত্য বলতে উনারা নিম্নবিত্তের জন্য এবং নিম্নবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা লয়া সাহিত্য বুঝান। সেইকথা শুইনা আমি ভুত দেখলাম। দলিত সাহিত্যের ভুত।
এইত সেদিন পিপলস এমপাওয়ারমেন্ট ট্রাস্ট নামে একটা সংস্থা শ্রমজীবী লেখকদের একটা সম্মেলন করল ঢাকায়। সেই উপলক্ষে একটা ম্যাগাজিনও বাইর করল। বিষয়টা আমার খুব মনেও ধরল। আমি খুশিমনে ম্যাগাজিনটা উল্টাইলাম। সেইখানে প্রথমেই দেখলাম, শ্রেণীসংগ্রাম নিয়া একটা বেশ ভারি প্রবন্ধ ঘরানার লেখা। লেখকের পরিচয় আছে, তিনি রিক্সা চালান। আমি চমকাইলাম। একজন রিক্সাওয়ালা প্রাবন্ধিক। তার ওপরে বামপন্থী। ঘটনা তো গুরুতর! তারপর সন্ধান কৈরা জানা গেল যে, উনার বামপন্থী ওরিয়েন্টেশনের ইতিহাস রিক্সা চালানের ইতিহাস থিকাও অনেক লম্বা। ভাবলাম উনার পাইচার্ট কেমন হৈতে পারে ? কত পার্সেন্ট রিক্সাওয়ালা তিনি, আর কত পার্সেন্ট বামপন্থী?
এইটা মনে হয় দলিত সাহিত্যের চেহারা, মানস। আপনে যেমন সেইখানে নাই, আমিও নাই।
এইবার চলেন ভিটগেনস্টাইন-স্টাইলে খোলাসা কৈরা কৈ। আমার পজিশন কিছু প্রিমাইজের ওপর দাঁড়ানো। যেমন:
১. আমার বিবেচনায় সাহিত্য একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিনোদন বা সৃষ্টিমাধ্যম। সাহিত্যের লেখক ও পাঠক উভয়ই মূলত মধ্যবিত্ত। লেখকের বিত্ত-প্রমোশন হৈলে তিনি আর সাহিত্য করেন না, আর বিত্ত-ডিমোশন হৈলে কিছুদিন রক্তবমি করেন, তারপর আস্তে আস্তে নদী নিস্তরঙ্গ হয়া যায়।
১.১ যেসব বিত্তশালী লোকদের আপনেরা লেখক হিসেবে দেখেন, উনাদের পয়সা থাকলেও উচ্চবিত্তের সংস্কৃতি নাই। কালচারালি উনারা মধ্যবিত্ত।
১.২ আবার যেনারা বস্তিতে থাকেন আর সাহিত্য করেন, আকারে বা প্রকারে তেনারা কোনোদিনই মধ্যবিত্তসীমানার বাইরে যাইতে চান নাই। আমি নিজে দেখছি, বস্তির মধ্যেও উনারা আপার কাশ তৈয়ার কৈরা রাখেন। ঘরে পর্দা টাঙ্গান।
২. এই আমাদের শ্রেণী। আমরা এই শ্রেণীমধ্যে গুরুসঙ্গ করি। তাহাদের কথা ভাবি। যাহারা ছোটলোক। গরীব। গ্রামে থাকে। বাঁশের টাট্টিতে হাগে। এই টাট্টি লৈয়া আমাদের মন সমব্যথায় ভৈরা ওঠে। অথচ টাট্টি থিকা বাইর হৈয়া গরীবের কত আরাম! আরাম নাই খালি আমাদের বিবেকের!
৩. এইটা হৈল বাংলাদেশের প্রগ্রেসিভ মধ্যবিত্ত লেখকের ক্যাসিক চেহারা। উনারা ভাবাদর্শের সন্তান। উনাদের শৈশব নীতিকথা-শাসিত।
৪. তাই, রাইসুরে আমি কৈতেছিলাম নিম্নমধ্যবিত্ত হওনের সাহিত্যিক সুবিধার কথা।
৪.১ আপওয়ার্ড মবিলিটি না থাকায় তাদের ভাবাদর্শের যন্ত্রণা খুব একটা পোহাইতে হয় না। পরন্তু, নীতিশাস্ত্রও তাদের জন্য ক্যারিয়ার হিসাবে ভাল দাঁড়ায় না। ফলে নীতিশাস্ত্র লংঘনের প্রশিণও লাগে না তার।
৪.২ মধ্যবিত্ত হৈয়াও সাবঅল্টার্ন শ্রেণীর নিকটতম দূরত্বে থাকে সে।
৪.৩ শ্রেণীচরিত্র লোপ পাইবার ভয় আছে তার। প্রগ্রেসিভ মধ্যবিত্ত লেখক নিজেরে ‘গ্রামবর্তী’ হিসেবে সখের ভাবনা ভাবতে পারে, কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত আরিক অর্থেই সাবঅল্টার্ন শ্রেণীতে পরিণত হৈবার ঝুঁকি মধ্যে থাকে। তাই সে আপন শ্রেণীর মিথলজি তৈয়ার করে। সেইখানে সাবঅল্টার্ন টেস্টের জন্য অনেক স্পেস রাখা লাগে তার। কিনশীপ নেটওয়ার্ক।
৪.৪ সাবঅল্টার্নের সাথে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লেখক যতটুকু দূরত্ব এবং নৈকট্য রক্ষা করেন, সেইটাই নতুন সাহিত্যের বড় প্লাসপয়েন্ট। তার নৈকট্য ভাবাদর্শজাত নয়, বরং অভিজ্ঞতাবলয়ের, আর দূরত্ব এলিটিজমের নয়, স্পেসের।
৪.৫ এই প্রেক্ষাপটে নন-এলিটিস্ট সাহিত্যের গ্যারান্টি কতটুকু? আমার মনে হয় এলিটিজমের ট্র্যাপ এইখানেও আছে, যেহেতু সে (নিম্ন)মধ্যবিত্ত। তবে সাহিত্যে এলিটিজম বিষয়টা আমার কাছে হার্ডল রেসের মত লাগে। দৌড়ানোর সময় যদি আপনের হার্ডল পইড়া যায়, তাইলে আপনি ডিসকোয়ালিফাই করেন না। কিন্তু পিছায়া যান।
সংস্কৃতি অধ্যয়নশাস্ত্র নয়, বা সাংস্কৃতিক ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদ নয়, বা অন্য কোনোরকম উৎপাতও নয়, আমি কৈছিলাম এইরকম সাদামাটা কয়েকটা কথা। ইহাদের নন্দনতাত্ত্বিক লেভেলিং আমার সাধ্যের/ইচ্ছার বাইরে, পদে পদে হঠকারী হৈয়া যাওনের ভয় তো আছেই। আমি শুধু ওয়ার্কিং ম্যানুয়াল খুঁজতেছি। বাঁশের টাট্টিতে হাগার ম্যানুয়াল না-বানাইবার সাহিত্য যাতে করতে পারি।
আসেন, এই প্রিমাইজগুলারে চ্যালেঞ্জ করা যাক।
ঢাকা, ১২/৮/৫
সাবঅল্টার্ন প্রণোদনা

কথা হৈতেছিল কিছু সাম্প্রতিক গল্পপাঠের অভিজ্ঞতা সামনে রাইখা। ‘সাবঅল্টার্ন’ নামে একটা মনোভাবের কথাও হৈতেছিল। মানিক বন্দোপাধ্যায় বা তারাশংকরকে সামনে রাখা হয় নাই। তবে সাবঅল্টার্ন মনোভাবের বার্তা লৈয়া উনাদের সামনে একদিন খাড়াইতে হৈতই। আবীর সেই সুযোগ কৈরা দিলেন।
একটা ভূমিকা দেই। কয়দিন আগে একটা লেখা পড়লাম। নাম “অন্ধত্ব : সাহিত্য কি আমাদের বিপক্ষে” এই লেখার লেখক কেনেথ জার্নিগান নিজে জন্মান্ধ। তিনি আমেরিকার ন্যাশনাল ফেডারেশন ফর দ্য ব্লাইন্ড-এর পরিচালক। এই অন্ধ লেখক তার ইংরেজি ও ফরাসী সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা থিকা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাইছেন যে, অন্ধত্ব নিয়া এ যাবত যত সাহিত্য হৈছে, এর প্রায় সব-ই অন্ধত্বের মূল জায়গাটারে ধরতে পারে নাই। ভুল ব্যাখ্যা করছে। এমন কি কবি জন মিল্টনও, যিনি নিজেও অন্ধ হৈয়া গেছিলেন!
এইখানে, কেনেথ নিজে অন্ধ এবং সাহিত্য-পাঠক হওয়ায় আমাদের পক্ষে অন্ধত্ব নিয়া সাহিত্যের প্রকৃত কৃতিত্ব সম্পর্কে জানা সম্ভব হৈল। এখন মানিক তার ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ তে কতটুকু ‘জাস্টিস’ করছেন, সেইটার সাক্ষ্য দিতে পারত পদ্মা নদীর মাঝিরাই। কিন্তু উনারা কেউ মানিকের উপন্যাস পড়েন নাই। বা পড়লেও সেইটা নিয়া কথাবার্তা বলেন নাই। আর আমরা যারা নানান কৌশলবিচারে একটা উপন্যাসের উৎকর্ষ বিচার করি, তাদের থিকা মানিক পদ্মা নদীর মাঝিমাল্লার জীবন হয়তো বেশিই দেখছেন। ফলে, তিনি তার অভিজ্ঞতা এবং তার দেখা জনগোষ্ঠীর ওপর তিনি কতখানি ‘ন্যায়পরায়ণ ব্যবহার’ করেছেন, সেইটা যাচাইয়ের মতা শ্রেণীগতভাবে আমাদের নাই।
কিন্তু যখন মালোপাড়ার ছেলে অদ্বৈত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ লেখেন, তখন আমরা কিন্তু ‘আহরিত’ অভিজ্ঞতার ফাঁকফোকড়গুলো ধরতে পারি। তবে মানিক বা তারাশংকর নিশ্চয়ই তিনদিনের আর্থসামাজিক সমীক্ষা কৈরা আইসা গল্প লেখতে বসেন নাই। কিন্তু তারপরও মানিকের পক্ষে অদ্বৈতমল্ল বর্মনের জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। মানিকের পদ্মা নদীর মাঝি শক্তিশালী উপন্যাস, কিন্তু তিতাসের মূল শক্তি তার সাবঅল্টার্নিটি। সেইটা আমরা বুঝি, যখন আমরা এই দুই উপন্যাসেরে পাশাপাশি রাইখা পড়ি। সবক্ষেত্রে তো এইরকম সুযোগ হয় না।
মানিক বা তারাশংকর উঁচুমাপের লেখক। তারা (বিশেষ কৈরা তারাশংকর) অন্য শ্রেণীর জীবন বর্ণনায় প্রায় কখনই এলিটিস্ট হন নাই। কিন্তু তারা (বিশেষ কৈরা মানিক) খুব সাবঅল্টার্ন-ও নন। তারাশংকরের বিষয়টা আমার কাছে একটু ভিন্ন লাগে। তিনি যখন ‘গণদেবতা’ বা ‘পঞ্চগ্রাম’ লেখেন, তখন এসব উপন্যাসের কেন্দ্রে তিনি যে চরিত্রটাকে রাখেন সেইটা কিন্তু একটা শিক্ষিত নিম্নমধ্যবিত্ত চরিত্র। এই স্পেসটা থাকায় তারাশংকর ঐ চরিত্রটির মধ্য দিয়া নিজের উপন্যাসে সশরীরে উপস্থিত থাকার সুযোগ পান। বা স্পেসটা তৈয়ার কৈরা রাখেন। এইটা কিন্তু সাবঅল্টার্ন প্রণোদনা।
আমি মনে করি একজন লেখক যে কোনো শ্রেণীর কথাই লিখতে পারেন। কিন্তু তিনি যেই শ্রেণীতে অবস্থান করেন না, সেই শ্রেণীর কথা জানার একটা জ্ঞানতত্ত্বীয় সীমাবদ্ধতা তো তার আছেই। সেইটাকে ডিঙায়া যাওয়া হয়ত সম্ভব না, তবে বিপুল অধ্যবসায় থাকলে হয়ত একটু সুবাস অন্তত পাওয়া সম্ভব। মানিকের বা তারাশংকরের সেই অধ্যবসায় ছিল। অনেকেরই আছে বা ছিল। আবার অনেকেরই নাই বা ছিল না।
সাবঅল্টার্ন সাহিত্য সেই অধ্যবসায় নিয়া আগায় না। আমি যখন লিখি, আমি আমার চারপাশ এবং সেই প্রেক্ষাপটে আমার অবস্থান লৈয়াই লিখি। সাবঅল্টার্ন মনোভাবের গল্প যিনি বলেন, তার পজিশন কখনই উপরে বা নিচে হয় না, তিনি বিষয়ের দিকে সোজাসুজি তাকাইতে পারেন। আর যাদের এইটা থাকে না, তারা সেই বিষয়ের অনুপস্থিতি ঢাকতে ক্যানভাসের ওপর মহত্ত্ব ঢালেন, যাতে বিমূঢ় পাঠক চুপ মাইরা যান। এইটা ছিল আমার সাম্প্রতিক গল্প পাঠের অনুভূতি।
সাবঅল্টার্ন মনোভাব লয়া আরো আলোচনা হৈতেই পারে।
৩০ জুলাই ২০০৫
সখী এলিটিজম কারে কয়?
Elitism kake bole, ami jani naa -- dhonira doridro loker 'taste' ke opochhondo korle take'i ki elitism bole?
....
Elitism kake bole ? ....income inequality'r birud'dhe lorai korte giye ki class er differential preference er birud'dhe lorai korte hoy ? Utopia te ki manushe manushe pochhondo opochhondo bhed thakte parbe
na ? Polash Rizia othoba Momtaz ke ki amake pochhondo kortei hobe ? Naa kole ki ami 'kharap manush' hoye jabo ?
(Abeer-er chithi theke)
“তোমরা যে বলো দিকস রজনী ভালোবাসা ভালোবাসা, সখী ভালোবাসা কারে কয়”
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান থিকা)
রবীন্দ্রনাথ জিগাইছেন ভালোবাসা কারে কয়। আর এদিকে আবীর জিগাইতেছেন এলিটিজম কারে কয়। ভালোবাসা কারে কয় এইটা রবীন্দ্রনাথ হাড়ে হাড়ে বোঝেন, তাই একটা আপাতসরল জিজ্ঞাসা নিজের ওপর ন্যস্ত করছেন। মধ্যবিত্তরে এলিটিজম বোঝানো আর দাদারে ..... শিখানো কি একরকম পণ্ডশ্রম হৈতেছে না?
আজকে আবার আরেক কাণ্ড হৈল। ডিজ্যাবিলিটি’র ওপর দিনব্যাপী একটা সেমিনারে বৈসা থাকতে হৈছিল। সেইখানে শুনতেছিলাম অটিজম (Autism) এর ওপর লেকচার আর ভাবতেছিলাম এলিটিজম নিয়া। অটিজম আর এলিটিজম মিল্যামিশ্যা সন্ধ্যাবেলা আমি হঠাৎ চলৎশক্তিহীন বোধ করলাম। মনে হৈল আমার পেশি যেন সংবেদনশীলতা হারায়া ফেলতেছে। অটিজম থিকা সাবধান, ভাই আবীর!
কেউ যখন কোনো সুবিধাজনক অবস্থানে থাইকা ডিসএডভান্টেজড কোনো শ্রেণীর রূচিকে নির্বাচন/পছন্দ করে, যে পছন্দের মধ্যে অনুমোদন ও করুণার মিশাল থাকে, কখনো প্রমোশনের প্রণোদনা থাকে, কখনো মতাদর্শের প্রেরণা ’বড়’ হয়া থাকে ....তখন সেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা মানুষটার নির্বাচন/পছন্দের মধ্যে এলিটিজমের ঝুঁকি থাকে। এইটা একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সিনড্রম, বাই ডিফল্ট। তবে, প্রত্যেকটা বেটার-অফ শ্রেণীর রূচি-ই তার চেয়ে ওরস-অফ (worse-off) শ্রেণীর রূচির কাছে, কখনো কখনো, মতার সহজাত গরমে, এলিটিস্ট হয়া উঠতে পারে।
আর প্রত্যাখ্যান কিন্তু একটা অনেক কম বিপদজনক অবস্থান। প্রত্যাখ্যানকারীর জন্যও, আবার প্রত্যাখ্যাতের জন্যও। এইখানে আধা গ্রহণবর্জনের সমস্যা তৈয়ার হয় না। মধ্যবিত্ত হৈয়া মমতাজরে অপছন্দ করা একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এইখানে কোনোই সমস্যা নাই। কিন্তু যদি আপনের পছন্দ হয়, দুইবার ভাবেন, দেখেন রেফারেন্স কোনখানে।
আয়-বৈষম্যের বিরূদ্ধে সমাজে কারে লড়াই করতে দেখলেন? আমি তো বছর বছর জিনি (Gini Index) বাইড়া যাইতেই দেখি। ভাইবা দেখেন তো, ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য বিষয়ে পুঁজিবাদ আর সাম্যবাদের পজিশনে কতটুকু ফারাক আছে? কিন্তু তারপরেও সাবঅল্টার্ন-এর রূচি কখনো কখনো ড্রাইভিং সিটে বৈসা পড়ে। যেমন, একটা উদাহরণ দিই: বাংলাদেশের অডিও ক্যাসেট ব্যবসা এখন গরিব মানুষের রূচি দিয়া নিয়ন্ত্রিত হৈতেছে। ফলে এখন শাকিলা জাফর থিকা মমতাজ অনেক বড় প্রেফারেন্স, গিটার ফালায়া হাসান দোতারা হাতে লৈছে, জেমসের কান্ধে গামছা উঠছে, জিন্স খুইলা আমাদের বিপ্লব গেরুয়া পৈরা মমতাজের লগে ডুয়েট অ্যালবাম করতেছে, রিক্সাওলা আকবর আইসা হিট হয়া যাইতেছে।
এইভাবে, সমাজের একটা সাইলেন্ট এবং এক্সক্লুডেড শ্রেণী নিজেরা নিজেদের বিনোদন ঠিক কৈরা নিছে, সেইখানে তাদের পপুলেশন তাদের শক্তি হৈয়া দাঁড়াইছে...আর তারা মধ্যবিত্তের হাত থিকা অডিও ক্যাসেট ইন্ডাস্ট্রি নিজেদের দখলে নিয়া নিছে। এই কারণেই আমারে মমতাজ লৈয়া থিসিস লেখতে হয়, নির্মলেন্দু গুণের কানে মমতাজের গান পৌঁছায়, আর মৌসুমী কাদের-এর বাসায় মমতাজের ক্যাসেটের কালেকশন তৈয়ার হৈতে থাকে।
মধ্যবিত্ত হিসাবে নিম্নবর্গীয় সংস্কৃতির ধারেকাছে যাওয়ার যে কৃতিত্ব আমরা নিতেছি, এইগুলাই সেইখানে ইনভিজিবল ফ্যাক্টর। আসেন, এইগুলারে উদঘাটন কৈরা আমাদের ‘কৃতিত্বরে’ চ্যালেঞ্জ কৈরা দেখি, কতদূর উনি অম্লান থাকতে পারেন!
ঢাকা, ০৫/০৮/০৫
....
Elitism kake bole ? ....income inequality'r birud'dhe lorai korte giye ki class er differential preference er birud'dhe lorai korte hoy ? Utopia te ki manushe manushe pochhondo opochhondo bhed thakte parbe
na ? Polash Rizia othoba Momtaz ke ki amake pochhondo kortei hobe ? Naa kole ki ami 'kharap manush' hoye jabo ?
(Abeer-er chithi theke)
“তোমরা যে বলো দিকস রজনী ভালোবাসা ভালোবাসা, সখী ভালোবাসা কারে কয়”
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান থিকা)
রবীন্দ্রনাথ জিগাইছেন ভালোবাসা কারে কয়। আর এদিকে আবীর জিগাইতেছেন এলিটিজম কারে কয়। ভালোবাসা কারে কয় এইটা রবীন্দ্রনাথ হাড়ে হাড়ে বোঝেন, তাই একটা আপাতসরল জিজ্ঞাসা নিজের ওপর ন্যস্ত করছেন। মধ্যবিত্তরে এলিটিজম বোঝানো আর দাদারে ..... শিখানো কি একরকম পণ্ডশ্রম হৈতেছে না?
আজকে আবার আরেক কাণ্ড হৈল। ডিজ্যাবিলিটি’র ওপর দিনব্যাপী একটা সেমিনারে বৈসা থাকতে হৈছিল। সেইখানে শুনতেছিলাম অটিজম (Autism) এর ওপর লেকচার আর ভাবতেছিলাম এলিটিজম নিয়া। অটিজম আর এলিটিজম মিল্যামিশ্যা সন্ধ্যাবেলা আমি হঠাৎ চলৎশক্তিহীন বোধ করলাম। মনে হৈল আমার পেশি যেন সংবেদনশীলতা হারায়া ফেলতেছে। অটিজম থিকা সাবধান, ভাই আবীর!
কেউ যখন কোনো সুবিধাজনক অবস্থানে থাইকা ডিসএডভান্টেজড কোনো শ্রেণীর রূচিকে নির্বাচন/পছন্দ করে, যে পছন্দের মধ্যে অনুমোদন ও করুণার মিশাল থাকে, কখনো প্রমোশনের প্রণোদনা থাকে, কখনো মতাদর্শের প্রেরণা ’বড়’ হয়া থাকে ....তখন সেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা মানুষটার নির্বাচন/পছন্দের মধ্যে এলিটিজমের ঝুঁকি থাকে। এইটা একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সিনড্রম, বাই ডিফল্ট। তবে, প্রত্যেকটা বেটার-অফ শ্রেণীর রূচি-ই তার চেয়ে ওরস-অফ (worse-off) শ্রেণীর রূচির কাছে, কখনো কখনো, মতার সহজাত গরমে, এলিটিস্ট হয়া উঠতে পারে।
আর প্রত্যাখ্যান কিন্তু একটা অনেক কম বিপদজনক অবস্থান। প্রত্যাখ্যানকারীর জন্যও, আবার প্রত্যাখ্যাতের জন্যও। এইখানে আধা গ্রহণবর্জনের সমস্যা তৈয়ার হয় না। মধ্যবিত্ত হৈয়া মমতাজরে অপছন্দ করা একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এইখানে কোনোই সমস্যা নাই। কিন্তু যদি আপনের পছন্দ হয়, দুইবার ভাবেন, দেখেন রেফারেন্স কোনখানে।
আয়-বৈষম্যের বিরূদ্ধে সমাজে কারে লড়াই করতে দেখলেন? আমি তো বছর বছর জিনি (Gini Index) বাইড়া যাইতেই দেখি। ভাইবা দেখেন তো, ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য বিষয়ে পুঁজিবাদ আর সাম্যবাদের পজিশনে কতটুকু ফারাক আছে? কিন্তু তারপরেও সাবঅল্টার্ন-এর রূচি কখনো কখনো ড্রাইভিং সিটে বৈসা পড়ে। যেমন, একটা উদাহরণ দিই: বাংলাদেশের অডিও ক্যাসেট ব্যবসা এখন গরিব মানুষের রূচি দিয়া নিয়ন্ত্রিত হৈতেছে। ফলে এখন শাকিলা জাফর থিকা মমতাজ অনেক বড় প্রেফারেন্স, গিটার ফালায়া হাসান দোতারা হাতে লৈছে, জেমসের কান্ধে গামছা উঠছে, জিন্স খুইলা আমাদের বিপ্লব গেরুয়া পৈরা মমতাজের লগে ডুয়েট অ্যালবাম করতেছে, রিক্সাওলা আকবর আইসা হিট হয়া যাইতেছে।
এইভাবে, সমাজের একটা সাইলেন্ট এবং এক্সক্লুডেড শ্রেণী নিজেরা নিজেদের বিনোদন ঠিক কৈরা নিছে, সেইখানে তাদের পপুলেশন তাদের শক্তি হৈয়া দাঁড়াইছে...আর তারা মধ্যবিত্তের হাত থিকা অডিও ক্যাসেট ইন্ডাস্ট্রি নিজেদের দখলে নিয়া নিছে। এই কারণেই আমারে মমতাজ লৈয়া থিসিস লেখতে হয়, নির্মলেন্দু গুণের কানে মমতাজের গান পৌঁছায়, আর মৌসুমী কাদের-এর বাসায় মমতাজের ক্যাসেটের কালেকশন তৈয়ার হৈতে থাকে।
মধ্যবিত্ত হিসাবে নিম্নবর্গীয় সংস্কৃতির ধারেকাছে যাওয়ার যে কৃতিত্ব আমরা নিতেছি, এইগুলাই সেইখানে ইনভিজিবল ফ্যাক্টর। আসেন, এইগুলারে উদঘাটন কৈরা আমাদের ‘কৃতিত্বরে’ চ্যালেঞ্জ কৈরা দেখি, কতদূর উনি অম্লান থাকতে পারেন!
ঢাকা, ০৫/০৮/০৫
শনিবার, ১৬ আগস্ট, ২০০৮
ভাষাবিতর্কের আগুনে আরো দুই ফোঁটা ঘি
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রে নাটকে এবং সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার ব্যবহার নিয়ে একটি উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। মেহতাব খানম, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও সৌমিত্র শেখরকে ধন্যবাদ জানাই বিষয়টি নিয়ে তাদের সুচিন্তিত মতামত জানানোর জন্য। মেহতাব খানমের উত্থাপিত প্রসঙ্গটি ছিল মূলত টেলিভিশন নাটকের সংলাপ নিয়ে, ফলে আশা ছিল নাট্যজনদের কেউ মতামত দেবেন এবং দেখলাম সরয়ার ফারুকী সেটা দিয়েছেনও। ফলোআপ হিসেবে ১১ নভেম্বর প্রথম আলো-য় সৌমিত্র শেখর তার আলোচনাটিকে শুধু নাটকের সংলাপে সীমিত রাখেন নি, বরং সাম্প্রতিক সাহিত্যচর্চায় আটপৌরে ভাষার “যথেচ্ছ” অনুপ্রবেশ নিয়েও তার উদ্বেগের কথা বলেছেন।
টেলিভিশন নাটকে, সিনেমায় বা সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার অনুপ্রবেশকে “যথেচ্ছ” মনে হওয়ার কারণ কি? সরয়ার ফারুকীর বক্তব্যে তো মনে হচ্ছিল যে, আটপৌরে ভাষার প্রয়োগ নিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট চিন্তা রয়েছে। কার ইচ্ছায় ও চিন্তায় তাহলে আটপৌরে ভাষা “মানভাষা”য় প্রবেশাধিকার পাবে? সৌমিত্র শেখর বলছেন সেটা শতবর্ষ আগের অবিভক্ত বাংলার ভাষাচিন্তক ও সংস্কৃতিবোদ্ধাদের ইচ্ছায় বা সিদ্ধান্তে। তারা বহু গবেষণা করে নদীয়া শান্তিপুর অঞ্চলের বাংলাকে প্রমিত বাংলা বলে ঠিক করে গিয়েছিলেন। তাদের সেই সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের পর একশ বছর গত হল, অবিভক্ত বাংলা বিভক্ত হল, এবং দুই বাংলার সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতা দুই মেরুর দিকে ধাবমান হল। অল্প কিছু সাহিত্য আর সামান্য কিছু “জীবনমুখী” গান ছাড়া আর কোন্ বিষয়টা দুই বাংলার কনজিউমাররা এখন শেয়ার করে বলা মুশকিল। একদা অবিভক্ত, কিন্তু বর্তমানে পরস্পর থেকে নানাভাবে দূরে সরতে- থাকা দুই বাংলা চিরকাল একইভাবে ভাষাব্যবহার করতে থাকবে, এটা কেমন আবদার? আর রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার কারণেই গ্লোবালাইজেশনের চাহিদা দুইবাংলার কাছে দুরকম, যেহেতু পশ্চিমবাংলা একটা বড় ন্যাশন স্টেটের অংশ আর পূর্ববাংলা নিজেই একটা ন্যাশন স্টেট। যে বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ আজ সাহিত্য সাংবাদিকতা কি টেলিভিশন নাটক করছে, তার মধ্যে হিন্দি বা “হিংলিশ” ভাষার দাপট কীরকম আছে? কতটা প্রমিত আজ প্রমিত বঙ্গের বাংলা? প্রমিত বাংলার জন্য শতবর্ষ আগে বেঁধে দেয়া সেই স্ট্যান্ডার্ড থেকে একা পূর্ববাংলাই সরে আসছে, এটা বোধহয় ঠিক নয়।
মেহতাব খানমের উদ্বেগ তবু সময়োচিত, ঢাকাই উচ্চবিত্তের “ডিজুস” কালচার দিয়ে আমাদের কল্পনার আবহমান বাংলা নিয়ন্ত্রিত হোক সেটা তিনি বা সরয়ার ফারুকী কেউই চান না। ফারুকীও তার লেখায় সেই উদ্বেগের পে সাফাই গেয়েছেন এবং “জাতীয়” মিডিয়াকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে উত্তরণের পথ বাতলেছেন। কিন্তু ভাষা মূলত মতাসম্পর্কের দ্যোতক, এবং সে কারণেই এই ধরনের উদ্বেগ মূলত মধ্যবিত্তের, যেহেতু মধ্যবিত্ত এটা ভাবতে পছন্দ করে যে তারাই “জাতীয়” সংস্কৃতির মুখ্য আধিকারিক। এই যুদ্ধ দৃশ্যত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যকার একটি সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধ যেখানে তাদের উভয়ের কুরুত্রে হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের নিজ নিজ শক্তিশেল তো আছেই। উচ্চবিত্তের টাকা থাকলেও মধ্যবিত্তের আছে লোকবল আর উচ্চকিত হবার নৈতিক অধিকার। মিডিয়াব্যক্তিত্ব সরয়ার ফারুকী যেভাবে মেহতাব খানমের উদ্বেগকে সমর্থন জানিয়েছেন তা দেখে মনে হচ্ছে এই কৌরব-পান্ডবের যুদ্ধে তিনি যেন কর্ণ! মন মধ্যবিত্তের দিকে, কাজ করছেন উচ্চবিত্তের ভাষায়!
বলাবাহুল্য, নিম্নবিত্ত সমাজ এই যুদ্ধে উপেতি। গরিব রিক্সাঅলার আবার ভাষা কি? সে তো আমাদেরই বেঁধে-দেয়া ভাষাব্যবস্থায় চলবে, নাকি? অথচ, আমরা খেয়াল করিনা যে, “ডিজুস” বাংলার আগেই নিম্নবিত্তের নিজস্ব বাংলা প্রমিত বাংলার বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তাদের মিডিয়ায়। তাদের মিডিয়া? কেন, দেখছেন না সেই মিডিয়ার দাপটে আমাদের নামী ব্যান্ডশিল্পীদের কাঁধে গামছা, পরনে জিনসের বদলে আলখাল্লা, আর মমতাজকেও দেখুন! সবচে বেশি এলবামের গায়িকা হিসেবে ইতোমধ্যেই গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ নাম উঠেছে তার। হ্যাঁ, অডিও ক্যাসেটই নিম্নবিত্তের মিডিয়া এবং এই কেন্দ্রাতিগ মিডিয়াটি কোনোরকম বিজ্ঞাপনী প্রশ্রয় ছাড়াই বর্তমানে দেশের সবচে দ্রুত বর্ধনশীল মিডিয়াগুলোর একটা। খেয়াল করে শুনে দেখুন, সেখানেও একরকমের বাংলার চল আছে, যা নিম্নবিত্ত বা নগর গরিবের বাংলা। আমার প্রস্তাব এই ধারার বাংলাকেও বর্তমান তর্কে সামিল করা হোক। তাকে পাশ কাটানোর একাডেমিক আভিজাত্য থেকে মুক্ত হোক ঢাকাই মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত।
এবার সাহিত্যের ভাষা প্রসঙ্গে আসা যাক, যেহেতু সৌমিত্র শেখর সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার ব্যবহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তার ঔচিত্যবোধ প্রখর, আটপৌরে বাংলায় রচিত সাহিত্য জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচার অনুচিত বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু কেন? ঢাকাই মিশ্র আটপৌরে বাংলা শেষবিচারে এক ধরনের আঞ্চলিক বাংলাই বটে। মেহতাব খানমের আপত্তির কারণ তো বোধগম্য, তিনি আজকালকার টেলিভিশন-দেখা ছেলেমেয়েদের “শুদ্ধ” বাংলায় কথা বলার েেত্র নাটকের ভাষাকে প্রতিবন্ধক ভাবছেন। কিন্তু আঞ্চলিক বাংলায় সাহিত্য তো নতুন কিছু নয়। তাহলে এখন আপত্তি উঠছে কেন? বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করি।
প্রথাগত ধারণাটি হল, আঞ্চলিক বাংলা ততণ পর্যন্ত “বৈধ”, যতণ তা উদ্ধৃতি এবং বন্ধনীচিহ্নের মধ্যে থাকে। যেমন, সংলাপ আঞ্চলিক হতে পারে, যদি সেই সাহিত্য কোনো এক আঞ্চলিক জীবনযাত্রার আখ্যান হয়। কিন্তু কথকের বা বর্ণনাকারীর ভাষা হতে হবে অবশ্যই “মানভাষা”, যেহেতু তিনি সাহিত্যিক হিসাবে বাইডিফল্ট মধ্যবিত্ত। তিনি “শুদ্ধ” বাংলায় চাষাভুষার জীবন নিয়ে আলেখ্য রচনা করবেন, আর সততার খাতিরে চাষাভুষার মুখের ভাষা সেরকমই বহাল রাখবেন। তাতে আপত্তি নেই। আপত্তিটা তখনই বাঁধে যখন সাহিত্যের ন্যারেটর বা বর্ণনাকারীর ভাষা প্রমিত বাংলা থেকে বিচ্যুত হয়। এ যেন সাহিত্যিকের এবং সাহিত্য-বিচারকের কেন্দ্রীয় চরিত্র থেকে মধ্যবিত্তের আধিপত্যকে খারিজ করে দেওয়ার সামিল! সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার ব্যবহার নিয়ে আপত্তির জায়গাটা, আমার ধারণা এখানেই।
বর্তমান পরিসরে এ নিয়ে বিস্তারিত বলবার সুযোগ নেই। ঐতিহাসিকভাবে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে কেন্দ্রে বিবেচনা করেই সাহিত্যের প্রতিষ্ঠান এবং নন্দনতত্ত্বের প্রতীকগুলো গড়ে ওঠেছে। এখন কোনো সাহিত্যিক যদি সেই নির্মাণকে মান্য না করেন, তবে আশংকার ঘণ্টি স্বাভাবিকভাবে প্রথমেই বাজবে সাহিত্যের প্রতিষ্ঠানগুলোতে। কারণ তারাই মানদন্ডের রক এবং এর মাধ্যমে সহজেই তাদের আধিপত্য ধরে রাখা যায়। কিন্তু এটা আমরা ভাবি না যে প্রাতিষ্ঠানিক মধ্যবিত্ত ভাবনা আর সমাজে বিদ্যমান মধ্যবিত্ত ভাবধারা এক নয়। আবার এটাও হাস্যকরভাবে মনে করি যে, কেবল মধ্যবিত্তই চিরকাল অপরাপর শ্রেনীসমূহের পে শিল্পসাহিত্য করবে। কিন্তু ভাষা তো প্রবহমান ঘটনা, সে সমাজে বিদ্যমান শ্রেনীসমূহের মতাসম্পর্কের দর্পণও বটে। তাকে “প্রমিত” বাংলা নাম দিয়ে শতবর্ষ আগের কোনো সমঝোতার ঘেরাটোপে আটকানোর চেষ্টা অর্থহীন, কিভাবে অর্থহীন ফারুকী সেটা সংেেপ বলেছেন। আমার বলবার বিষয় হল, যে বিচারে আমরা সাহিত্যের চরিত্রগুলোর মুখে আঞ্চলিক ভাষাকে বৈধ ভাবি, সেই একই বিচারে বর্ণনাকারীর আঞ্চলিক ভাষাকেও বৈধ ভাবতে পারি। সাহিত্যিকের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি থেকে মধ্যবিত্তকে রেহাই দেয়ার দরকার কিছু আছে, কারণ মুষ্টিমেয় কিছু বাদে মধ্যবিত্তের একটি বিরাট অংশ কিন্তু সাবঅল্টার্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে। বর্তমানের সাহিত্যিক মধ্যবিত্ত কিন্তু সেই উদ্বেগ থেকে বিকশিত হচ্ছে। ফলে, জীবনের প্রয়োজনে, হরহামেশাই তাকে প্রমিত বাংলার বাউন্ডারি টপকাতে হচ্ছে।
আরেকটা বিষয়, প্রমিত বাংলার সাথে শুধু যে উচ্চবিত্তের গ্লোবালাইজড ডিজুস বাংলা মিশছে তা নয়, মিশছে শাহআলম সরকার/মমতাজের “ফাইট্টা যায়” বাংলাও। একইভাবে, নিম্নবিত্তের বাংলায়ও গ্লোবালাইজেশনের প্রভাব পড়ছে এমন দেখতে পাই। এটাকে মিলনমেলা বা কুরুত্রে যাই বলুন, তা থেকে মধ্যবিত্তীয় প্রমিত দূরত্ব বজায় রাখা অসম্ভব, কার্যত সেটি প্রমিত বাংলাকে আরেকটা মৃতভাষায় পরিণত করার সামিল। বরঞ্চ এই নেয়াদেয়ার প্রক্রিয়ায়, শ্রেণীসমূহের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের এই প্রকাশ্য ও গোপন যুদ্ধে কোন্ শ্রেণীর ভাষা কিভাবে বদলাচ্ছে সেটা দেখার বিষয়। শিল্পসাহিত্য বা নাটক সেই যুদ্ধের ময়দান হতে প্রস্তুত, আর অন্যান্য “আনুষ্ঠানিক” প্রয়োজন মেটাবার জন্য না হয় প্রমিত বাংলাই থাকুক।
টেলিভিশন নাটকে, সিনেমায় বা সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার অনুপ্রবেশকে “যথেচ্ছ” মনে হওয়ার কারণ কি? সরয়ার ফারুকীর বক্তব্যে তো মনে হচ্ছিল যে, আটপৌরে ভাষার প্রয়োগ নিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট চিন্তা রয়েছে। কার ইচ্ছায় ও চিন্তায় তাহলে আটপৌরে ভাষা “মানভাষা”য় প্রবেশাধিকার পাবে? সৌমিত্র শেখর বলছেন সেটা শতবর্ষ আগের অবিভক্ত বাংলার ভাষাচিন্তক ও সংস্কৃতিবোদ্ধাদের ইচ্ছায় বা সিদ্ধান্তে। তারা বহু গবেষণা করে নদীয়া শান্তিপুর অঞ্চলের বাংলাকে প্রমিত বাংলা বলে ঠিক করে গিয়েছিলেন। তাদের সেই সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের পর একশ বছর গত হল, অবিভক্ত বাংলা বিভক্ত হল, এবং দুই বাংলার সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতা দুই মেরুর দিকে ধাবমান হল। অল্প কিছু সাহিত্য আর সামান্য কিছু “জীবনমুখী” গান ছাড়া আর কোন্ বিষয়টা দুই বাংলার কনজিউমাররা এখন শেয়ার করে বলা মুশকিল। একদা অবিভক্ত, কিন্তু বর্তমানে পরস্পর থেকে নানাভাবে দূরে সরতে- থাকা দুই বাংলা চিরকাল একইভাবে ভাষাব্যবহার করতে থাকবে, এটা কেমন আবদার? আর রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার কারণেই গ্লোবালাইজেশনের চাহিদা দুইবাংলার কাছে দুরকম, যেহেতু পশ্চিমবাংলা একটা বড় ন্যাশন স্টেটের অংশ আর পূর্ববাংলা নিজেই একটা ন্যাশন স্টেট। যে বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ আজ সাহিত্য সাংবাদিকতা কি টেলিভিশন নাটক করছে, তার মধ্যে হিন্দি বা “হিংলিশ” ভাষার দাপট কীরকম আছে? কতটা প্রমিত আজ প্রমিত বঙ্গের বাংলা? প্রমিত বাংলার জন্য শতবর্ষ আগে বেঁধে দেয়া সেই স্ট্যান্ডার্ড থেকে একা পূর্ববাংলাই সরে আসছে, এটা বোধহয় ঠিক নয়।
মেহতাব খানমের উদ্বেগ তবু সময়োচিত, ঢাকাই উচ্চবিত্তের “ডিজুস” কালচার দিয়ে আমাদের কল্পনার আবহমান বাংলা নিয়ন্ত্রিত হোক সেটা তিনি বা সরয়ার ফারুকী কেউই চান না। ফারুকীও তার লেখায় সেই উদ্বেগের পে সাফাই গেয়েছেন এবং “জাতীয়” মিডিয়াকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে উত্তরণের পথ বাতলেছেন। কিন্তু ভাষা মূলত মতাসম্পর্কের দ্যোতক, এবং সে কারণেই এই ধরনের উদ্বেগ মূলত মধ্যবিত্তের, যেহেতু মধ্যবিত্ত এটা ভাবতে পছন্দ করে যে তারাই “জাতীয়” সংস্কৃতির মুখ্য আধিকারিক। এই যুদ্ধ দৃশ্যত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যকার একটি সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধ যেখানে তাদের উভয়ের কুরুত্রে হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের নিজ নিজ শক্তিশেল তো আছেই। উচ্চবিত্তের টাকা থাকলেও মধ্যবিত্তের আছে লোকবল আর উচ্চকিত হবার নৈতিক অধিকার। মিডিয়াব্যক্তিত্ব সরয়ার ফারুকী যেভাবে মেহতাব খানমের উদ্বেগকে সমর্থন জানিয়েছেন তা দেখে মনে হচ্ছে এই কৌরব-পান্ডবের যুদ্ধে তিনি যেন কর্ণ! মন মধ্যবিত্তের দিকে, কাজ করছেন উচ্চবিত্তের ভাষায়!
বলাবাহুল্য, নিম্নবিত্ত সমাজ এই যুদ্ধে উপেতি। গরিব রিক্সাঅলার আবার ভাষা কি? সে তো আমাদেরই বেঁধে-দেয়া ভাষাব্যবস্থায় চলবে, নাকি? অথচ, আমরা খেয়াল করিনা যে, “ডিজুস” বাংলার আগেই নিম্নবিত্তের নিজস্ব বাংলা প্রমিত বাংলার বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তাদের মিডিয়ায়। তাদের মিডিয়া? কেন, দেখছেন না সেই মিডিয়ার দাপটে আমাদের নামী ব্যান্ডশিল্পীদের কাঁধে গামছা, পরনে জিনসের বদলে আলখাল্লা, আর মমতাজকেও দেখুন! সবচে বেশি এলবামের গায়িকা হিসেবে ইতোমধ্যেই গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ নাম উঠেছে তার। হ্যাঁ, অডিও ক্যাসেটই নিম্নবিত্তের মিডিয়া এবং এই কেন্দ্রাতিগ মিডিয়াটি কোনোরকম বিজ্ঞাপনী প্রশ্রয় ছাড়াই বর্তমানে দেশের সবচে দ্রুত বর্ধনশীল মিডিয়াগুলোর একটা। খেয়াল করে শুনে দেখুন, সেখানেও একরকমের বাংলার চল আছে, যা নিম্নবিত্ত বা নগর গরিবের বাংলা। আমার প্রস্তাব এই ধারার বাংলাকেও বর্তমান তর্কে সামিল করা হোক। তাকে পাশ কাটানোর একাডেমিক আভিজাত্য থেকে মুক্ত হোক ঢাকাই মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত।
এবার সাহিত্যের ভাষা প্রসঙ্গে আসা যাক, যেহেতু সৌমিত্র শেখর সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার ব্যবহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তার ঔচিত্যবোধ প্রখর, আটপৌরে বাংলায় রচিত সাহিত্য জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচার অনুচিত বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু কেন? ঢাকাই মিশ্র আটপৌরে বাংলা শেষবিচারে এক ধরনের আঞ্চলিক বাংলাই বটে। মেহতাব খানমের আপত্তির কারণ তো বোধগম্য, তিনি আজকালকার টেলিভিশন-দেখা ছেলেমেয়েদের “শুদ্ধ” বাংলায় কথা বলার েেত্র নাটকের ভাষাকে প্রতিবন্ধক ভাবছেন। কিন্তু আঞ্চলিক বাংলায় সাহিত্য তো নতুন কিছু নয়। তাহলে এখন আপত্তি উঠছে কেন? বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করি।
প্রথাগত ধারণাটি হল, আঞ্চলিক বাংলা ততণ পর্যন্ত “বৈধ”, যতণ তা উদ্ধৃতি এবং বন্ধনীচিহ্নের মধ্যে থাকে। যেমন, সংলাপ আঞ্চলিক হতে পারে, যদি সেই সাহিত্য কোনো এক আঞ্চলিক জীবনযাত্রার আখ্যান হয়। কিন্তু কথকের বা বর্ণনাকারীর ভাষা হতে হবে অবশ্যই “মানভাষা”, যেহেতু তিনি সাহিত্যিক হিসাবে বাইডিফল্ট মধ্যবিত্ত। তিনি “শুদ্ধ” বাংলায় চাষাভুষার জীবন নিয়ে আলেখ্য রচনা করবেন, আর সততার খাতিরে চাষাভুষার মুখের ভাষা সেরকমই বহাল রাখবেন। তাতে আপত্তি নেই। আপত্তিটা তখনই বাঁধে যখন সাহিত্যের ন্যারেটর বা বর্ণনাকারীর ভাষা প্রমিত বাংলা থেকে বিচ্যুত হয়। এ যেন সাহিত্যিকের এবং সাহিত্য-বিচারকের কেন্দ্রীয় চরিত্র থেকে মধ্যবিত্তের আধিপত্যকে খারিজ করে দেওয়ার সামিল! সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার ব্যবহার নিয়ে আপত্তির জায়গাটা, আমার ধারণা এখানেই।
বর্তমান পরিসরে এ নিয়ে বিস্তারিত বলবার সুযোগ নেই। ঐতিহাসিকভাবে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে কেন্দ্রে বিবেচনা করেই সাহিত্যের প্রতিষ্ঠান এবং নন্দনতত্ত্বের প্রতীকগুলো গড়ে ওঠেছে। এখন কোনো সাহিত্যিক যদি সেই নির্মাণকে মান্য না করেন, তবে আশংকার ঘণ্টি স্বাভাবিকভাবে প্রথমেই বাজবে সাহিত্যের প্রতিষ্ঠানগুলোতে। কারণ তারাই মানদন্ডের রক এবং এর মাধ্যমে সহজেই তাদের আধিপত্য ধরে রাখা যায়। কিন্তু এটা আমরা ভাবি না যে প্রাতিষ্ঠানিক মধ্যবিত্ত ভাবনা আর সমাজে বিদ্যমান মধ্যবিত্ত ভাবধারা এক নয়। আবার এটাও হাস্যকরভাবে মনে করি যে, কেবল মধ্যবিত্তই চিরকাল অপরাপর শ্রেনীসমূহের পে শিল্পসাহিত্য করবে। কিন্তু ভাষা তো প্রবহমান ঘটনা, সে সমাজে বিদ্যমান শ্রেনীসমূহের মতাসম্পর্কের দর্পণও বটে। তাকে “প্রমিত” বাংলা নাম দিয়ে শতবর্ষ আগের কোনো সমঝোতার ঘেরাটোপে আটকানোর চেষ্টা অর্থহীন, কিভাবে অর্থহীন ফারুকী সেটা সংেেপ বলেছেন। আমার বলবার বিষয় হল, যে বিচারে আমরা সাহিত্যের চরিত্রগুলোর মুখে আঞ্চলিক ভাষাকে বৈধ ভাবি, সেই একই বিচারে বর্ণনাকারীর আঞ্চলিক ভাষাকেও বৈধ ভাবতে পারি। সাহিত্যিকের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি থেকে মধ্যবিত্তকে রেহাই দেয়ার দরকার কিছু আছে, কারণ মুষ্টিমেয় কিছু বাদে মধ্যবিত্তের একটি বিরাট অংশ কিন্তু সাবঅল্টার্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে। বর্তমানের সাহিত্যিক মধ্যবিত্ত কিন্তু সেই উদ্বেগ থেকে বিকশিত হচ্ছে। ফলে, জীবনের প্রয়োজনে, হরহামেশাই তাকে প্রমিত বাংলার বাউন্ডারি টপকাতে হচ্ছে।
আরেকটা বিষয়, প্রমিত বাংলার সাথে শুধু যে উচ্চবিত্তের গ্লোবালাইজড ডিজুস বাংলা মিশছে তা নয়, মিশছে শাহআলম সরকার/মমতাজের “ফাইট্টা যায়” বাংলাও। একইভাবে, নিম্নবিত্তের বাংলায়ও গ্লোবালাইজেশনের প্রভাব পড়ছে এমন দেখতে পাই। এটাকে মিলনমেলা বা কুরুত্রে যাই বলুন, তা থেকে মধ্যবিত্তীয় প্রমিত দূরত্ব বজায় রাখা অসম্ভব, কার্যত সেটি প্রমিত বাংলাকে আরেকটা মৃতভাষায় পরিণত করার সামিল। বরঞ্চ এই নেয়াদেয়ার প্রক্রিয়ায়, শ্রেণীসমূহের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের এই প্রকাশ্য ও গোপন যুদ্ধে কোন্ শ্রেণীর ভাষা কিভাবে বদলাচ্ছে সেটা দেখার বিষয়। শিল্পসাহিত্য বা নাটক সেই যুদ্ধের ময়দান হতে প্রস্তুত, আর অন্যান্য “আনুষ্ঠানিক” প্রয়োজন মেটাবার জন্য না হয় প্রমিত বাংলাই থাকুক।
শুক্রবার, ১৫ আগস্ট, ২০০৮
বুড়ো হাবড়া তুঁত
এর মধ্যে এক টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক আর ক্যামেরাম্যানকে দেখে ডাক্তার রীতিমত থ। এসব কেন, কে ইনি? ডাক্তার-নার্সরা জিজ্ঞাসু। এতিমের মত প্রায়-একা পড়ে থাকে যে কোমা-নিবাসী লোকটা, তার জন্য ক্যামেরা কেন? আজকাল ক্যামেরা কি সস্তা হয়ে গেল নাকি? একজন এসে সাংবাদিককে নিরস্ত করতে চেষ্টা করলেন। বললেন, এখানে ছবি তুলতে পারমিশন লাগবে। পারমিশন নিয়ে আসেন। সাংবাদিক পোড় কম খান নাই। তিনি ান্ত দেয়ার ভাব করলেন, কিন্তু ক্যামেরা তার আপন গতিতে চলল।
হঠাৎ করেই ডিউটি নার্স আমাদের সবাইকে বাইরে যেতে বললেন। মুস্তফা ভাইয়ের বেডের চারপাশে দ্রুত পর্দা টেনে দেয়া হল। হাসপাতাল তার সবচেয়ে প্রিয়তম অকুস্থল, লিখেছিলেন তিনি। কিন্তু এখন পর্দা কেন? পর্দা মানে তো যবনিকা! তখনো তো তার বুক উঠানামা করছে। স্পষ্ট দেখছি যে!
ঐ টা আর্টিফিসিয়্যাল, ডাক্তার এবার আরো ঠান্ডা। মেশিনের ইফেক্ট। কার্ডিয়্যাক ম্যাসেজ দেয়া হল এই মাত্র, ফলাফল শূন্য। ‘এক্সপায়ার’ করার পরও এই ম্যাসেজ দিয়ে অনেককেই ‘ফেরত’ এনেছেন, ডাক্তার জানালেন ঐশ্বরিক হাসিযোগে। প্রযুক্তি মানুষের দেখার ধরণকেও বদলে বুঝি এভাবে। নইলে এখন বুক উঠানামা-করা কবি মুস্তফা আনোয়ারকে কত না সহজে একটি মৃতদেহ বলে মানছি আমরা! মৃতের সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে, মৃত্যুর সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে!
আইসিইউ-তে মড়াকান্না বারণ। তাই ভাইয়ের শোক প্রকাশের জন্য প্রৌঢ় বোনকে ব্লকের বাইরে আসতে হল। তিনি বুকফাটা কাঁদলেন আয়শা ঝর্নার গলা-ধরে। একাই। কী সব যেন বলছিলেনও? আমি শুনতে চেষ্টা করি। বোঝা যাচ্ছে না, ভাঙা ভাঙা সব বাক্য। হয়তো তাদের পিঠাপিঠি শৈশবের ফ্রেজিং, যার ধ্বনিমূল্য আছে। হয়তো তাদের অর্থমূল্য ভাইয়ের মৃত্যুর সাথে সাথে চিরকালের জন্য হারাল। হয়তো এই ধ্বনিগুলোরও মৃত্যু ঘটবে আজ। মনে পড়ল, মুস্তফা আনোয়ার লিখেছিলেন, এতোদিন রসায়ন লেখাপড়া শিখলাম খামাখা, চল্লাম, বিদায়।
কদিন ধরে বিকাল হলেই আকাশ কাল হতে আরম্ভ করে। শামিমা বিনতে রহমান বলছিলেন, তাড়াতাড়ি যেতে হবে। মেঘলা আকাশের জন্য হয়ত নয়, হয়ত এই মরণটুকুর নিউজমূল্য নিয়ে বার্তাপ্রধানের সাথে ফাইট দেয়ার জন্য! লাশ কোথায় যাবে? যশোরে? যশোরে কি তুঁতগাছ আছে? যার নিচে ‘দুই রফিকের’ জন্য অমেয় জলের ধারা খুলে দেবেন এই কবি? আমাদের এই চিরতরুণ নিভৃতিপ্রিয় বান্ধব?
নিচে নামতে নামতেই বৃষ্টি। বৃষ্টি টিপটিপ করে পড়ছে হাসপাতালে, ম্যানহোলে, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ আর স্যালাইন ব্যাগ যেখানে ফেলে দেয় সেই ডাস্টবিনে। লম্বা করিডোর দিয়ে এক রোগীকে চাকাওলা স্ট্রেচারে শুইয়ে ঠেলতে ঠেলতে লিফটে ঢোকাচ্ছে কয়েকজন। বৃষ্টি আর বাতাস মিলে হাসপাতালের মত নীরব আর দর্শনার্থীর মত উদ্বিগ্ন একটি দ্বৈততা। আমার খুব চায়ের ইচ্ছা পেল।
আলকাৎরার রাতে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকব কবে, এমনি-দিনে,
বৃষ্টিতে, আ! সে ঘরকাতর সিঁড়িপথ, অজগর লম্বা।
ওপরে, পিজি-র আইসিইউ-তে শেষ ঘুমে তলিয়ে গেছেন আমাদের প্রিয় কবি মুস্তফা আনোয়ার। জীবিতাবস্থায়, কী কবিতায় কী জীবনে, তরুণদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তিনি। সাহসী আর স্বত্বাভিমানশূন্য এই কবি তাঁর কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছিলেন আমাদের মত মাত্র বিশোর্ধ তরুণ কবিদের। চার দশকের কবিতাচর্চা দিয়েও যে নিভৃতিকে তিনি ভাঙেন নাই, একটি সাদামাটা মৃত্যুসংবাদ সম্বল করে আমি সেটা ভাঙার জন্য পত্রিকা অফিসে যাচ্ছি!
গরিবের বিনোদন
- আপনে গো টিভি-তে কি জি-সিনেমা আছে?
- আছে।
- স্টার প্লাস?
- স্টার প্লাস তো নাই!
- না থাকলে কেমনে চলে? স্টার প্লাসের সিরিয়াল না দেখলে আমার ঘুম আহে না।
শহুরে গরিবগোষ্ঠীর কাগুজে মতায়ন নিয়ে উচ্চ/মধ্যবিত্তের সমাজে নানান চুটকি চালু আছে। গার্মেন্টস শিল্পের প্রসারে সমাজ থেকে যেভাবে ‘কাজের বুয়া’ নামক শ্রেণীটি বিদায় নিচ্ছে, তা বিত্তবানের জন্য বেশ দুশ্চিন্তার। তাই, যারা গার্মেন্টস-মোহমায়ার চক্করে না গিয়ে এই প্রাচীন পেশায় বর্তমান আছেন, তারা পাণ্ডা প্রজাতি থেকে কিন্তু কোনো অংশে কম মহান নন। আর, বলা হয়, সেই মহত্বের পূর্ণ মূল্য আদায় করতেও সম তারা। ফলে, নিয়োগকর্তার টেলিভিশনে কী কী চিত্তাকর্ষক চ্যানেল আছে, সেইটা কখনও তাদের কর্মস্থল নির্বাচনের ক্রাইটেরিয়া হয়ে দাঁড়ায়। এরকম সম্ভাবনাকে চুটকি বানিয়ে খুব একচোট হাসেন তারা।
তারা আসলে হাসেন কী নিয়ে? স্পষ্টতই গরিবের বিনোদন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। যেন ‘বিনোদন’ নামক কর্মকাণ্ডে বিত্তবানেরই একচ্ছত্র অধিকার! গরিব বিনোদন চাইলে তাদের হাসি পায়। বিত্তবানের বুয়াসংকট বা ডিমান্ড-সাপ্লাই পেজগির চক্করে গরিব তার বিনোদন আদায় করে নিচ্ছে, এটাই হাসির উপলক্ষ।
বিনোদন-বাজারে গরিব ঢুকল কিভাবে
বাংলাদেশে সত্তর দশক পর্যন্ত অডিওভিজুয়াল বিনোদনমাধ্যমগুলো মোটামুটি মধ্যবিত্তের এখতিয়ারে ছিল। যারা বিনোদনমাধ্যমে ‘রুচির পতন’ দেখতে পান তারা সেটা দেখতে শুরু করেন আশি দশকের গোড়া থেকে। তার আগে Ñ কী চলচ্চিত্র, কী সঙ্গীত, কী টেলিভিশনে দাপট ছিল মধ্যবিত্তের। মূলধারার ভিতরে থেকেই আলমগীর কবির ‘সূর্যকন্যা’ বা ‘সীমানা পেরিয়ে’র মত ছবি বানাচ্ছেন, অডিওতে ধুন্ধুমার বাজছে হেমন্ত, মান্না দে বা শ্যামল মিত্র। আর টেলিভিশনের পক্ষে একটা হার্ডঅয়্যার হিসাবেও তখন মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমের বাইরে আসা সম্ভব ছিল না।
অডিও বাণিজ্যে গরিবের পক্ষে প্রথম সত্যিকারের ব্রেক-থ্রু ঘটে সঙ্গীতশিল্পী মুজিব পরদেশী-র আবির্ভাবের সাথে সাথে। তার আগে, সত্তর দশকে ব্যান্ডগুরু আযম খান ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’ গেয়ে গেয়ে একটা পরিবেশ তৈরি করেন বটে, কিন্তু সেই গান যতটা না ‘গরিবের গান’ তার চেয়ে বেশি ছিল ‘গরিবের জন্য গান’। শ্রেণীদূরত্ব কম থাকায় জনপ্রিয়তা বাড়ল বটে, কিন্তু সেই গানের জন্য গরিবের কানের তৃষ্ণা তৈরি হল না সেভাবে। একইভাবে, ফকির আলমগীর যেসব গান গেয়েছেন তা শেষপর্যন্ত গণসঙ্গীতের মধ্যবিত্তপনা। নিম্নবর্গের মানুষের বিদ্রোহ নিয়ে মধ্যবিত্তের নিজস্ব কল্পনা এবং ভ্যালু জাজমেন্ট।
আশির গোড়াতেই মুজিব পরদেশী এসে গাইলেন ‘আমি বন্দী কারাগারে’। হামলে পড়ল গরিব, কান ভারি হয়ে উঠল মধ্যবিত্তের। এসব আবার কী ধরনের গান? কাদের জন্য? প্রথম প্রশ্নের উত্তর তাদের দরবারে হয়ত এখনও পৌঁছায় নাই, কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব মিলল চটজলদি: এসব হচ্ছে গরিবের গান।
গরিব তাহলে গানও শোনে? তাও ক্যাসেট কিনে পয়সা খরচ করে? ততদিনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো পয়সায় গ্রামে গ্রামে ক্যাসেট প্লেয়ার ছড়িয়ে পড়ছে। মুজিব পরদেশীর ‘কলঙ্কের ঢোল’ এর কাটতি হল রেকর্ড পরিমাণ। সেই প্রেরণায় রেকর্ড কোম্পানিগুলো গ্রামে-গ্রামে ঘোরা বয়াতিদের ধরে-ধরে ক্যাসেট বের করল বেশ কিছু। সেগুলোও মন্দ চলল না।
শহুরে শিক্ষিত শ্রেণী এটাকে একটা আকস্মিক ঘটনা হিসাবেই দেখল শুরুতে। তাদের কেউ কেউ শংকা প্রকাশ করলেন রুচির পতন বিষয়ে, কারো কারো কাছে মনে হল এটা কোনো মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর কীর্তি। এরকম একটা সিদ্ধান্তহীনতা যখন চলছে, মমতাজ তখন দৃশ্যপটে এলেন ভীরু ভীরু পায়ে। সেটা আশি দশকের শেষাশেষি।
মাত্র পাঁচ বছর ব্যবধানে বাংলাদেশের অডিও বাজারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলেন মমতাজ। তার জন্য গান লিখতে থাকলেন আরেক বয়াতি শাহ আলম সরকার। এসব গানে চরিত্র হিসাবে আসতে থাকল শহরের অদৃশ্য আর বোবা জনগোষ্ঠী: গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাওলা, বাস ড্রাইভার, বেওয়ারিশ লাশ ইত্যাদি। এসব গানে প্রেম মানে হল অতি অল্প সময়ের মধ্যে কিছু জরুরি বোঝাপড়া, বিরহ মানে হচ্ছে ছেড়ে-আসা গ্রামের প্রতি টান বোধ করা, মৃত্যু মানে হচ্ছে দাফনকাফন ছাড়া ভূগর্ভস্থ হওয়া, নৈঃশব্দ মানে হচ্ছে চোখের সামনে বড়লোকের দুর্নীতি দেখে দেখে মুখ বন্ধ রাখার চর্চা। তারা এসে পপুলার বাংলা গান থেকে প্রবল বিক্রমে হটিয়ে দিলেন সংখ্যালঘু শিক্ষিত বেকার, বিলাসী এবং বিরহী প্রেমিকদের। সর্বাধিক একক এলবামের গায়িকা হিসাবে মমতাজের নাম উঠল গিনেস বইতে। ‘বুকটা ফাইট্টা’ গেল শিক্ষিত মধ্যবিত্তের! তাকে ‘অশ্লীল’ আখ্যা দেয়া হল নানান তরফ থেকে, বলা হল এগুলো ‘অপসংস্কৃতি’ এবং ক্ষতিকারক।
কিন্তু ঠেকানো গেল না তাকে: মমতাজই হয়ে উঠলেন গরিবের বিনোদন-আইকন। তাকে ঘিরে আশপাশের পালাবদল আরো মজাদার। ক্যাসেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সাউন্ডটেক আর সঙ্গীতার দীর্ঘদিনের আধিপত্যে ভাগ বসাল সিলেট বেজড শাহজালাল রেকর্ডিং। নিম্নবর্গের উত্থানের তাত্ত্বিক কিংবা কর্পোরেট প্রেরণায় ব্যান্ড শিল্পী জেমসের কাঁধে গামছা ওঠল, মাকসুদ আর বিপ্লব জিনস ছেড়ে বাউলের আলখাল্লার ভেতর ঢুকে পড়লেন। তাদের এলবামের প্রমোশনালে এবং স্টেজ শো-তে গীটারের সমান মর্যাদা পেতে শুরু করল দোতারা। ড্রামের চেয়ে কখনও কখনও দেশী ঢোল দড় হয়ে ওঠল। বাজার ফিরে পাওয়ার আশায় অবশেষে মমতাজের সাথে ডুয়েট এলবাম করলেন অনেক নামীদামী শিল্পী। একসময় যেটা ‘পাপ’ ছিল, ক্রমে সেটাই হল পাপস্খালন।
যে গরিব এতকাল দূর থেকে তার মনিবের টেলিভিশন বা মিউজিক প্লেয়ারের নীরব অনাকাঙ্ক্ষিত গ্রাহক হয়ে ছিল, ক্রমে তারাই হয়ে দাঁড়াল এর রুচিনির্ধারক। বিত্তবানের নিন্দা কিংবা ভ্রুকুটি কোনোটাই আর এই প্রবাহের রাশ টেনে ধরতে পারল না। গরিবের মমতাজ-বন্যায় ভেসে গেলেন ছোটবড় অনেক জনপ্রিয় সঙ্গীত তারকা। সিনেমা হলের দখল গরিব সত্তর দশকেই নিয়েছিল, এখন দখল নিল অনেকটা টেলিভিশন আর প্রায় সবটা অডিও বাজারের। ‘রুচিশীল’ বিত্তবানের জন্য কেবল বাকি থাকল রাইফেলস স্কয়ার, বসুন্ধরা কিংবা আইডিবি ভবনের দুয়েকটা ডিভিডি-র দোকান। কিন্তু কতদিন?
গরিব এত বিনোদন চায় কেন
সায়দাবাদ ধলপুর সিটিপল্লী বস্তিতে অডিও-ভিডিওর পাঁচ-পাঁচটা চালু দোকান দেখে আমার মনে এই প্রশ্নের উদয় হল। কথা বললাম একজন দোকান-মালিকের সাথে। এর আগে তার দোকান ছিল মধ্যবিত্ত এলাকা মালিবাগে। সেখান থেকে গুটিয়ে তিনি এসেছেন এই বস্তিতে, শ্রেয়তর ব্যবসার আশায়। তার অ্যাডভেঞ্চার যে সফল, সেটা আকর্ণ হাসি থেকেই বেশ বোঝা যাচ্ছিল। একটা বস্তিতে পাঁচ-পাঁচটা অডিও-ভিডিওর দোকান, একটাও ব্যাংক নেই, এনজিও আছে দুতিনটা।
ব্যাংক নাই, কিন্তু ব্যাঙের ছাতার মত সঞ্চয়ী সমিতি আছে বস্তিতে। তারাও এনজিও, নানান হারে গরিবকে টাকা জমাতে উদ্ধুদ্ধ করে, তারপর এক সুন্দর সকালে সবাই ঘুম ভেঙে উঠে দ্যাখে, সমিতির সাইনবোর্ড উধাও। বস্তির খুব কম লোককেই দেখেছি যাদের জীবনে একবার এরকম দু-দশহাজার টাকা খোয়া যায় নাই। সাইনবোর্ড উধাও হয়, নতুন সাইনবোর্ড আসে, নতুন নতুন মুচলেকা সহ। কিন্তু যে লাউ সেই কদু-ই শেষপর্যন্ত।
বস্তির গরিব আসলে কতটা আয়গরিব? স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন নিয়ে একবার বস্তিতে কাজ করতে গিয়ে তাদের রোজগারের ডাটা নিতে হয়েছিল। দেখলাম, তাদের অনেকের রোজগার আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের চেয়ে বেশি। কিন্তু তবু তারা গরিব, নিম্নমধ্যবিত্তও নয়। কারণ, নিম্নমধ্যবিত্ত উত্থানরহিত নয়। তাদের সম্ভাবনা আছে স্বচ্ছল জীবনের, বস্তির গরিবের সেটা নাই। তাদের জন্য আছে এক কঠিন পাপচক্কর:
গরিবের বিনোদন মানে চিত্তবিনোদন কেন
‘বিনোদন’ -- এই শব্দটাকে যেভাবেই বলা হোক, গরিবের তাতে স্পষ্ট আপত্তি থাকে। এটা আমি ঢাকা শহরের প্রায় সব বস্তিতে দেখেছি। টেলিভিশন দেখাকে তাদের কাছে ‘বিনোদন’ মনে হলেও গানবাজনা শোনা-কে তারা কোনোভাবেই স্রেফ ‘বিনোদন’ হিসেবে ভাবে না। ভাবলে কী তি, আমি ভ্যানচালক মজিবুরকে জিজ্ঞেস করি। মজিবুর অল্পকথার মানুষ, কিছুটা নাটকীয়তা পছন্দ করে। আমাকে সে নিয়ে গেল ধলপুর বস্তি-লাগোয়া সরকারি সিটিপল্লী নামক তিনতলা ভবনের ছাদে। বলল, দেখেন তো, আমাদের বস্তিরে কী মনে অয়?
নয়ন খুলে গেল আমার। দেখলাম প্রত্যেকটা ঘরের চালের ওপর হয় লাল না-হয় সবুজ পতাকা।
মজিবুর বলল, লাল মানে মাইজভাণ্ডার আর নীল মানে সুরেশ্বর। বস্তিগুলোতে এই দুইটাই তরীকা। লাল হোক আর নীল হোক, গান দিয়াই আমরা আল্লারে ডাকি। আর কোনো রাস্তা নাই। প্রত্যেক বিষ্যুদবার বস্তিতে সুরেশ্বর তরীকাপন্থীদের গানের মজমা হয়। সারারাত গান হয়, জ্ঞান হওয়ার পর এই নিয়মের ব্যতিক্রম কেউ দেখে নাই বস্তিতে। এটাও একটা সাংগঠনিক প্রক্রিয়া, সমবায়ের ভিত্তিতে এর খরচনির্বাহ হয়। শহুরে বস্তিতে নেয়া নানান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ব্যর্থতাকে ভেংচি কাটার জন্যই কি এই গানের মজমা চালু আছে?
ভিক্ষা করে নদীভাঙা গুলবানু। বলল, বাপজান, আমাগো রক্তের মইধ্যে গান গো। আমাগো আর কিছুই নাই। খালি গানই আছে। অন্ধ কুদ্দুসও একই কথা বলল।
গান কেন স্রেফ ‘বিনোদন’ নয়? বড় ক্যানভাসে ভাবা যাক। শহরে গরিব আসে নিরুপায় হয়ে, ভাগ্যান্বেষণে। নদীভাঙা, ভিটাবেচা, সহায়শূন্য উন্মুল এই জনগোষ্ঠী। হাড়পেঁষা শ্রমের বিনিময়ে শহর তাদের খাদ্য দেয়, কোনোরকম থাকার সংস্থান দেয়। বিনিময়ে কেড়ে নেয় স্বাধীন প্রকাশভঙ্গি, বাকস্বাধীনতা এবং আরো কিছু মূল্যবোধ। এই শহরে যে রিকশা চালায়, তার মুখ দেখি না আমরা, শুধু পাছা দেখি। যে ভিা করে, তার হাত দেখি। এইরকম অদেখার চাপে তাদেরও মুখে মুখোশ চেপে বসে। তারা মধ্যবিত্তের দাপুটে মূল্যবোধের উপরিগ্রাহক হয়ে যায়। হঠাৎ করে তাদের দেখলে মনে হবে, তারা যেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বড় গ্রহীতা। মনে হবে, যেন নগরসভ্যতার অ্যালিয়েনেশন তাদের মজ্জাগত। মনে হবে, অসহায় অভিবাসনের কোনোই বেদনা নাই এইসব উন্মুল মানুষের চোখেমুখে। শহরের রুচি অনুযায়ী এমনি একটি শাদা মুখ পরে থাকে শহুরে গরিব।
অন্ধ কুদ্দুস যেমন বলে, দিনশেষে বস্তিতে যখন ফিরে আসে কর্মকান্ত মানুষ, তখন তার আয়নার সামনে দাঁড়ানো ফরজ হয়ে যায়। একমাত্র সঙ্গীত-ই পারে তার সারাদিনের মুখোশ খুলে তাকে নিজের অতীতের সামনে, সত্যিকারের বেদনাগুলোর সামনে দাঁড় করাতে। উদর কিংবা যৌনবিনোদন তাকে সেই বিশ্রামটুকু দেয় না। নিজের আবছা হতে-থাকা অস্তিত্ব, সেটা যত বেদনাময় হোক, তাকে হারাতে না দেয়াই গরিবের সবচেয়ে বড় বিনোদন। এবং প্রয়োজন। এজন্যেই গান। আর সে কারণেই গানকে তারা বিনোদন বলতে রাজী নন। এই গানই তাদের ধাঁধিয়ে যাওয়া চোখ থেকে মেট্রোপলিটান শহরের নিয়নবাতিগুলো খুলে নেয়। একচিলতে ঘরে কয়েক ঘণ্টার ঘুম ঘুমায় তারা, যদিও সেখানে দুঃস্বপ্নের ভেতর তাড়া করে আগুন আর বুলডোজার।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
