অনুবাদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনুবাদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

দ্য ম্যাট্রিক্স মুভি নিয়ে জ্যাঁ বদ্রিয়াঁর সাথে আলাপ






দ্য ম্যাট্রিক্স (১৯৯৯) হলিউডের একটি ব্লকবাস্টার সাইন্স ফিকশন মুভি। ওয়াচোস্কি ভাইদের বানানো সেই মুভিতে নিও নামের এক কম্পিউটার হ্যাকারের সাথে মরফিউস নামে আরেক প্রবাদতুল্য হ্যাকারের দেখা হয় এবং সে তাকে ২০০ বছর পরের পৃথিবীতে নিয়ে যায় যেখানে সাইবার ইন্টেলিজেন্স দুনিয়াকে শাসন করছে। সেখানে এক যন্ত্রগোষ্ঠী মানুষের মধ্যে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে তাদের হৃদয়কে “ম্যাট্রিক্স” নামক একটি গাণিতিক বাস্তবতার মধ্যে বন্দী করে রাখছে। নিও, মরফিউস এবং ট্রিনিটি ম্যাট্রিক্সকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়।

জ্যাঁ বদ্রিঁয়া (১৯২৯-২০০৭) বর্তমান বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দার্শনিকদের একজন যার হাত ধরে উত্তরাধুনিকতাবাদের বিকাশ হয়েছে। জনপ্রিয় ও স্মরণীয় ইভেন্ট, সেলিব্রিটি এবং সংস্কৃতি নিয়ে তার অনেক চিন্তাজাগানিয়া রচনা আছে। “সিমুলেশন ও সিমুলাক্রা” তাঁর অসংখ্য রচনার একটি, যার উদ্ধৃতি এই সাক্ষাৎকারে আছে। ”সিমুলেশন” বলতে তিনি বোঝান সেই বানিয়ে তোলা বাস্তবতা বা ভার্চুয়াল-এর বর্ণন যা “সত্যিকারের” বাস্তবতা থেকেও সত্য ও শ্রেয়তর হতে আরম্ভ করে।

অদে ল্যান্সেলিন: ভার্চুয়াল ও বাস্তব নিয়ে তোমার ধারণাগুলোকে দ্য ম্যাট্রিক্স মুভির মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। ম্যাট্রিক্সের প্রথম পর্বটি তো একেবারে সরাসরি সেরকম ইঙ্গিত দিয়েছে। মনে হয়েছে “সিমুলাক্রা ও সিমুলেশন” এর প্রচ্ছদ যেন রূপালি পর্দায়! অবাক হয়েছো?

জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ: এখানে নিশ্চিতভাবেই একটা ভুল বোঝাবুঝি আছে, যে কারণে আমি এখনও দ্য ম্যাট্রিক্স নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। দ্য ম্যাট্রিক্স-এর প্রথম পর্ব মুক্তি পাবার পর ওয়াচোস্কি ভাইদের তরফ থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল পরের পর্বগুলোয় তারা আমার সঙ্গে কাজ করবেন। কিন্তু এরকম হবার প্রশ্নই ওঠে না (হাসি)। ১৯৮০ সালেও এরকম একবার হয়েছিল যখন ন্যু-ইয়র্কের সিমুলেশনবাদী চিত্রশিল্পীরা আমার সাথে দেখা করলেন। ভার্চুয়াল যে একটা অবধারিত বিষয়, আমার এই প্রকল্পকে তারা গ্রহণ করলেন এবং সেটাকে একটা পরিষ্কার ফ্যান্টাসির চেহারা দিয়ে দিলেন। কিন্তু আসলে এটা এমন এক জগত যেখানে বাস্তব জগতের ক্যাটাগরিগুলো খাটে না।

অদে ল্যান্সেলিন: কিন্তু ধরো, দ্য পারফেক্ট ক্রাইম-এ তুমি যে দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলছো, তার সাথে এই ফিল্ম অবিশ্বাস্যভাবে মিলে যায়। এই ফিল্ম যথার্থই “বাস্তবের পোড়োবাড়ি”র দিকে ধাবমান, যেখানে পুরোপুরি ভার্চুয়াল এবং কল্পনার মানুষেরা চিন্তাশীলতার সক্ষম বিষয়বস্তু থেকে খুব বেশি ভিন্ন কিছু না।

জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ: ঠিক, তবে বাস্তব ও ভার্চুয়ালের মুছে যেতে-থাকা সীমানা নিয়ে আরো অনেক ফিল্ম হয়েছে: দ্য টুম্যান শো, মাইনরিটি রিপোর্ট, বা এমনকি মালহল্যান্ড ড্রাইভ, যেটি ডেভিড লিঞ্চ-এর মাস্টারপিস। দ্য ম্যাট্রিক্স-এর মূল কৃতিত্ব হল যে সে এই বিষয়টাকে মারখাপ্পা আক্রমণ করেছে। যদিও সেটা করেছে অনেক সরলভাবে। তার ম্যাসেজ হল, হয় চরিত্রগুলো ম্যাট্রিক্স বা ডিজিটাল জগতের বাসিন্দা, না হয় তারা র‌্যাডিক্যালভাবে এর বাইরে, যেটা দেখা যায় দ্য ম্যাট্রিক্স-এ জিয়ন শহরের অধিবাসীদের মাঝে। এই দুই জগতের দেখা যখন হয় তখন কী ঘটতে পারে এটা দেখানো খুব ইন্টারেস্টিং হতে পারে। কিন্তু এই ফিল্মের সবচেয়ে বিব্রতকর অংশ হল, যে-সমস্যাটির উদয় হয়েছে সিমুলেশন থেকে, সেটিকে সে মোকাবেলা করতে চেয়েছে প্লাতোনিক ট্রিটমেন্ট দিয়ে। এটি একটি মারাত্মক ত্রুটি। জগত যে একটি বড়সড় বিভ্রম ছাড়া আর কিছু নয় - এই ধারণাটি প্রায় সব বড়-বড় সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং শিল্পচর্চা ও প্রতীকায়নের মাধ্যমে এর সুরাহা হয়েছে। আর একই ধরনের ভোগান্তি ঠেকাতে আমরা যা বানিয়েছি, সেটা হল একটা গাণিতিক বাস্তব যেটি সাবেকি বাস্তবকে প্রতিস্থাপন করতে সম। আর এভাবে একটা চূড়ান্ত সমাধানের দিকে যাওয়া: এমন একটি ভার্চুয়াল জগত যেখানে যাবতীয় বিপজ্জনক ও নেতিবাচক বিষয় আশয়ের জায়গা নেই। এটাই দ্য ম্যাট্রিক্স মুভি-র পদ্ধতি। যা কিছু স্বপ্নে, ইউটোপিয়ায় বা ফ্যান্টাসিতে করবার কথা, সেগুলোকে একটা চেহারা দেয়া হয়েছে, “বাস্তবায়িত” করা হয়েছে। এটা একটি নিটোল স্বচ্ছতার জগত। এই মুভিটি সেই ধরনের একটা ম্যাট্রিক্স নিয়ে এবং সেখানে এরকম একটি ম্যাট্রিক্স গড়ে তোলা যেতে পারতো।

অদে ল্যান্সেলিন: কিন্তু এটা তো সেই মুভিও যেখানে প্রকাশ্যে মানুষের প্রযুক্তিজাত বিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা করা হয়েছে। আবার একইসঙ্গে এটা সেই মুভি যেটা ডিজিটাল জগতের উন্মাদনা ও কম্পিউটারে-বানানো দৃশ্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেছে।

জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ: ম্যাটিক্স রিলোডেড মুভির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটাতে সেই পরিহাসের সামান্যতম কণাও আর অবশিষ্ট নেই, এমন কিছুই নেই যা দর্শককে মুভির এই বিপুল স্পেশাল ইফেক্ট-এর বাইরে কিছু ভাবাবে। এমন একটাও সিকোয়েন্স নেই ঐ মুভিতে যেখানে কোনো অবিশ্বাস্য ডিটেইল তোমাকে একটা সত্য ইমেজের সামনা সামনি দাঁড় করিয়ে দেবে। আসলে, প্র্রযুক্তি নিয়ে রূপালি পর্দার মানুষদের যে মোহগ্রস্থতা আছে, সেটাই এই মুভিটাকে স্রেফ একটা তথ্যের আকর বানিয়ে ছেড়েছে। বাস্তব আর কল্পনাকে আলাদা করার কোনো রাস্তাই আর ঐ ছবিতে নেই। কিন্তু দ্য ম্যাট্রিক্স আদতে একটি অনিঃশেষ বিষয়বস্তুর কথা বলেছিল, যা একইসঙ্গে সরাসরি ও বিরোধী, কারণ এটা বাস্তব জগতের কোনোখানেই নেই। মুভিটার শেষে যে ছদ্ম-ফ্রয়েডীয় ভাষণটি আছে, সেখানে এটা সুন্দরভাবে বলা হয়েছে: যা কিছু গতানুগতিক নয় তাকে সমীকরণের ছাঁদে ফেলে দিতে হলে ম্যাট্রিক্স-কে আবার ঢেলে সাজাতে (গাণিতিক ভাষায়, রিপ্রোগ্রামিং করা) হবে। আর তুমি, প্রতিরোধকারী, তুমিও সমীকরণের অংশ। মনে হচ্ছে, এরকম একটি ভার্চুয়াল সার্কিটে আমরা যেন চিরকালের জন্য আটকা পড়ে গেছি, যা থেকে বাইরে বেরুনোর কোনো রাস্তাই নেই। এই জায়গাটায় আবার আমি তাত্ত্বিকভাবে দ্বিমত পোষণ করি (হাসি)। দ্য ম্যাট্রিক্স এমন একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির চেহারা তুলে ধরেছে এবং তার বদলে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে, যার জুড়ি আজকাল বাস্তবে দেখা যায়। এটাকে একটা বৈশ্বিক মাপে দেখানো এই ছবির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। এখানে বরং মার্শাল ম্যাকলুহানের শরণ নেয়া ভাল: দ্য মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ, বা, বলবার মাধ্যমটিই হল বক্তব্য। যে উদ্দাম ও দুর্দমনীয় সংক্রমণের মাধ্যমে দ্য ম্যাট্রিক্স নিজেকে দর্শকের মাঝে সঞ্চার করছে, সেটিই হল তার বক্তব্য।

অদে ল্যান্সেলিন: এটা খুব মজার যে বাণিজ্যিক বিচারে প্রায়-সব আমেরিকার ব্লকবাস্টারগুলো, হোক সেটা দ্য ম্যাট্রিক্স কিংবা ম্যাডোনা-র সর্বশেষ অ্যালবাম, সবাই দাবি করছে যে এরা এমন একটি সিস্টেমের সমালোচনা করছে, যে সিস্টেমটি আবার ব্যাপকভাবে ওদের প্রমোট করে।

জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ: ঠিক এটাই আমাদের সময়টাকে এরকম নিপীড়নমূলক বানিয়েছে। বর্তমান সিস্টেমটা যে বিনোদন সামগ্রীগুলো উৎপাদন করছে তার মধ্যে কোথায় যেন একটা নেতিবাচক বিভ্রম গেঁথে দিচ্ছে সে। যেন কারখানা নিজেই মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস উৎপাদন করছে। সব ভাল ভাল বিকল্পগুলোকে ঠেকিয়ে রাখার এটাই হল কার্যকর পন্থা। জগত সম্পর্কে কারো প্রত্যক্ষণকে এক জায়গায় আটকে রাখবে, এমন কোনো ওমেগা পয়েন্ট নেই, এর বিপরীত ক্রিয়াটিও নেই; শুধু উদ্দীপনা নিয়ে লেগে-থাকা। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, একটা সিস্টেম যতই পূর্ণতার দিকে যায়, ততই সে একটা সার্বিক দুর্ঘটের দিকেও যায়। এই বস্তুগত পরিহাসটি সেই সত্যই প্রতিপাদন করে যে, কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনাও সেটি প্রমাণ করে। সন্ত্রাসবাদ বিকল্প কোনো মতার আধার নয়। পশ্চিমের ক্ষমতা যে রীতিমত আত্মহন্তারক হয়ে উঠছে নিজেকে বদলাতে গিয়ে, সন্ত্রাসবাদ একটু বড় করে সেটাকেই প্রতীকায়িত করেছে। সেই সময়েই এটা আমি সরাসরি বলেছিলাম, কেউ আমল দেয় নি। তবে এসব মোকাবেলা করতে গিয়ে আমাদের দুঃখবাদী বা নৈরাজ্যবাদী হওয়ার দরকার নেই। এই সিস্টেম, এই ভার্চুয়াল কিংবা এই ম্যাট্রিক্স ― সবই সম্ভবত ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ফিরে যাবে। কিন্তু এই যে বদলানোর প্রক্রিয়া, এই যে প্রতিরোধ এবং মোহময়তা ― এর কোনো বিনাশ নেই।


মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট, ২০০৮

সাহিত্য কি আমাদের বিপক্ষে? : অন্ধত্ব ও সাহিত্য নিয়ে কেনেথ জার্নিগান-এর রচনা



সাহিত্যের উপাদান হিসেবে অন্ধত্বকে খোদ অন্ধরা কিভাবে মূল্যায়ন করে? আমেরিকার ন্যাশনাল ফেডারেশন অব দ্য ব্লাইন্ড এর ড. কেনেথ জার্নিগান-এর এই লেখাটি সাহিত্যের সেই চেহারা তুলে ধরেছে যেখানে চক্ষুষ্মান সাহিত্যিকগণ চক্ষুহীন মানুষকে সাহিত্যের উপাদান করতে গিয়ে তাদের স্বাভাবিক জগতের বাইরে ছুঁড়ে দিয়েছেন। এমন কি জন মিল্টনের মত খ্যাতিমান অন্ধ সাহিত্যিকেরাও, কেনেথ বলছেন, এইসব জনপ্রিয় ধারণার ফাঁদে পড়ে গিয়ে অন্ধত্ব নিয়ে দৃষ্টিবান মানুষ যা ভাবতে পছন্দ করে তারই প্রতিধ্বনি করেছেন।

কেনেথ-এর মতে, অতীতকালের সাহিত্য যেখানে অন্ধত্ব বিষয় হিসেবে এসেছে তা মোটেও অন্ধদের বাস্তবতাকে সমর্থন করে না, ফলত অন্ধদের জীবনে সেসব মোটেও কোনো উৎসাহ জোগায় না। বর্তমানের সাহিত্যে বেশ কিছু ইতিবাচক মোড়বদলের কথা তিনি বলেছেন, যদিও রেফারেন্স দেন নি। অবশ্য কেনেথ-এর বক্তব্য তৈরি হয়েছে প্রধানত তার চিরায়ত ইংরেজি ও ফরাসী সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা থেকে। আর সাহিত্যের কাছে তার প্রত্যাশার ধরনটিও বিতর্কের বিষয় হতে পারে।

["দেখা না-দেখার চোখ" এ এই অনুবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল]



ইতিহাস যেমন মানুষের কৃতকর্মের সন্নিবেশ তেমনি সাহিত্য হল তার চিন্তার সমাবেশ। আমি এখন বলতে চেষ্টা করব সাহিত্যে অন্ধদের উপস্থাপনার ধরন নিয়ে। কীভাবে দেখা হয়েছে আমাদের সেখানে? আমাদের ভূমিকা কী? কবি, উপন্যাসিক, প্রবন্ধকার ও নাট্যকারগণ কী ভেবেছেন আমাদের নিয়ে? অন্ধত্ব জিনিসটা আসলে যেরকম তারা কি সেইরকমই দেখেছেন, নাকি তারা যেরকম দেখতে চেয়েছেন, অন্ধত্বকে সেইরকম করেই তুলে ধরেছেন?

সাহিত্যে অন্ধজীবন নিয়ে কোনো একক বা একটি সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি নেই। বরং দেখা যায় সাহিত্য অনেকগুলো বিচিত্র এবং পরস্পরবিরোধী অন্ধত্বের ইমেজ হাজির করছে, সেটি শুধু যুগ বা সংস্কৃতিভেদে নয়, শুধু লেখকভেদে নয়, এমন কি একই বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায়ও এই বৈপরীত্য বিদ্যমান।


বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাহিত্যে অন্ধত্বের বিষয়টি মোটামুটি নয় ধরনের বিষয়াশ্রিত হয়ে এসেছে: অলৌকিক ক্ষমতারূপে, নিরুদ্ধার ট্রাজেডী হিসেবে, নির্বুদ্ধিতা ও অসহায়ত্বের পূর্বগামী হয়ে, ধূর্ততা আর শয়তানি সহযোগে, নিখাদ পূণ্যের সহগামী হিসেবে, পাপের শাস্তিরূপে, অস্বাভাবিকতা এবং বিমানবিকীকরণের সূত্রপাত হিসেবে, শুদ্ধতার প্রতীকরূপে, অন্য কিছুর প্রতীক বা রূপক হিসেবে।

অলৌকিক বা আল্লাপ্রদত্ত ক্ষমতা হিসেবে অন্ধত্ব সাহিত্যে কিভাবে চিত্রিত? ধরা যাক আপনাদের কেউ আমায় জিজ্ঞেস করলেন, অন্ধ হওয়ার কি কি সুবিধা আছে বলে আমি মনে করি? এবং ধরা যাক আমি উত্তর দিলাম: কোনোই সুবিধা নেই, তবে এমন কিছু দিক আছে যা হয়ত আমরা ভেবে দেখি না। আবিষ্কারের জন্য একটা নতুন জগত, নতুন এবং অভিনব প্রত্যণ, নতুন জেগে উঠা মতা; অন্ধ জীবন চতুর্থ মাত্রার জীবন। এরকম শুনলে একজন অন্ধ হিসেবে আপনি কী বলবেন? অনুমান করি, হাসতে হাসতে বিষম খাবেন। আমার মনে হয় না এইসব বস্তাপচা বোকাভাষণ কাউকে আকৃষ্ট করবে। আপনারা এবং আমি নিজের মুখে ঝাল খাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, অন্ধত্বের কোনো চতুর্থ মাত্রা নেই, অন্ধ হলে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা জাগ্রত হয় না, কোনো অদ্ভূত অনুভূতি হয় না, উন্মোচিত হবার জন্য নতুন কোনো জগত এসে হাজির হয় না। কিন্তু আমি যে উদ্ধৃতি দিয়েছি সেটি কিছুকাল আগের এক জনপ্রিয় উপন্যাস থেকে নেয়া।

অলৌকিক বা প্রকৃতিপ্রদত্ত মতার সাথে অন্ধত্বের এই যে মেলবন্ধন, এটি সাহিত্যে একটি সর্বজনমান্য ঐতিহ্য, চিরায়ত পূরাণকাহিনীগুলোতেও এর শেকড় আছে। প্রাচীন গ্রিসের দেবতাদের মধ্যে মানুষকে শাস্তি দেয়ার একটা পছন্দনীয় প্রথা ছিল অন্ধ করে দেয়া। একে সাধারণভাবে মৃত্যুর চেয়েও খারাপ মনে করা হলেও, কখনো কখনো, দেবতার কৃপায় সেই অন্ধ হয়ে যাওয়া শাস্তিগ্রহীতা ব্যতিক্রমী কিছু ক্ষতিপূরণও পেয়ে যেতেন: যেমন ভবিষ্যকথন ক্ষমতা। মনে করা হয়, হোমার তার অন্ধত্বের ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেয়েছেন কবিত্বশক্তি। একইভাবে, সফোকিসের নাটকে যে টাইরেসিয়াসকে পাওয়া যায়, অন্ধ হবার বদলে নবুয়তপ্রাপ্তি ঘটেছিল তার।

উনবিংশ শতাব্দীর মহান উপন্যাসিক ভিক্টর হুগো’র ‘দ্য ম্যান হু লাফস’ উপন্যাসে অন্ধত্ব নিয়ে আধুনিক লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি মেলে। সেখানে অন্ধত্ব শুদ্ধতা ও আনন্দের সহযোগী হয়েছে, যা কোনোভাবে দৃষ্টিহীনতাকে পুষিয়ে দিচ্ছে। তার উপন্যাসের অন্ধ নায়িকা দিয়াকে দেখা যায় এক পরমানন্দে বিভোর হয়ে থাকতে, যেটা অন্ধের পক্ষে বেমানান ঠেকে। এই পরমানন্দ কখনো কখনো আত্মার গহীনে অনুধাবনের জন্য অন্ধদের এক সঙ্গীত উপহার দেয় এবং তার মাধ্যমে তাদের অন্ধকার জীবনকে আলোকিত করে তোলে। হুগো’র মতে অন্ধত্ব হল সেই অন্তহীন গুহা যার মধ্যে অসীমের ঐকতান ধরা দেয়।

সম্ভবত, জনপ্রিয় কল্পকাহিনীর অন্ধ গোয়েন্দাদের কীর্তিকলাপের মাধ্যমেই অন্ধত্বের সাথে ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের যোগাযোগ পরিস্ফুট হয়। ম্যাক্স ক্যারেডস নামের ফোর্থ ডাইমেনশনাল চরিত্রটি আবির্ভূত হয়েছিল ১৯১৪ সালে এবং গোটা বিশের দশক ধরে নানান অতিমানবীয় ঘটনার নায়ক হয়ে থেকেছে সে। ১৯১৫ সালে আমরা পাই ডেমন গন্ট নামক আরেকজন অন্ধ গোয়েন্দাকে, যিনি একটা কেসও হারেন নি। এই তালিকায় থর্নলে কল্টন, ডানকান ম্যাক্সেইনসহ আরো অনেক চরিত্রের নাম যোগ করা যায়। যেমন হয়েছে গোয়েন্দা ডানকানের চরিত্রের বেলায়। এখানে ডানকানের নৈপুণ্যের ছটায় তার স্রষ্টাই ঢাকা পড়ে গেছেন। তবু এমন কিছু মুহূর্ত আসে, ডানকানের স্রষ্টা লিখেছেন, যখন সাধারণ মরণশীল মানুষের ক্ষমতার অতিরিক্ত কিছু মতা ডানকানের অধিগত হতে দেখা যায়। এসব মুহূর্ত তাকে উদ্বিগ্ন করে।

তারা সেইসঙ্গে আমাদেরও উদ্বিগ্ন করেন। অন্ধত্বের সাথে এসব অস্বাভাবিক এবং অতিমানবিক ক্ষমতারোপ নিঃসঙ্গ ও আলাদা, অসহজ এবং উদ্ভট একটি বস্তাপচা চরিত্রের আদলে ভাবা থেকে অন্ধকে একটুও রেহাই দেয় না। বরং পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটায়।

এটি শুধু অসত্যই নয়, অন্ধদের জন্য নেতিবাচকও। কারণ এতে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, কোনো অন্ধ মানুষ যা অর্জন করল তা নিজের যোগ্যতায় নয়, বরং অন্ধত্বে নিহিত কোনো ম্যাজিকের বদৌলতে। অন্ধত্বের ওপর এহেন অতিমানবীয় ক্ষমতারোপ এক লহমায় সাধারণ বাস্তবতা থেকে উঠিয়ে নিয়ে অন্ধকে দাঁড় করায় অস্বাভাবিকতার উদ্ভট এক মঞ্চের ওপর। অথচ অতিমানবীয় বা অস্বাভাবিক যাই হোক, এটিই ধ্রুবসত্য যে, অন্ধের কোন দায় নেই, অধিকার নেই, সমাজ নেই এই পৃথিবীতে।

কৃতকর্মের পুরষ্কার হিসেবে প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতা অর্জনের ধারণা অন্ধের জন্য কোনোভাবেই প্রশংসাসূচক নয়, বরং অপমানকর। এই ধারণা আমাদের যাবতীয় অর্জনকে ছিনিয়ে নেয়, এমন কি আমাদের ব্যর্থতার দায়ও আমাদের বহন করতে দেয় না। এই ধারণা অন্ধের জন্য একটা সুষম সমাজ গঠনের দায় থেকে বিদ্যমান সমাজকে মুক্তি দিয়ে দেয়। চারপাশের জীবনে উদ্দাম ও সমান অংশগ্রহণের সামর্থ অর্জনে আমাদের মোটেও উদ্দীপ্ত করে না। সংক্ষেপে এই ধারণা অনুযায়ী, অন্ধ অসাধারণ হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই সাধারণ হতে পারে না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমরা অতি সাধারণ অন্ধলোক, আশির্বাদপুষ্টও নই, অভিশপ্তও নই।

অন্ধত্বের ওপর প্রকৃতিদত্ত মতারোপের ধারণা নেতিবাচক হলেও অনেক কম ক্ষতিকর, সাহিত্যে অন্ধত্বের সাথে এর চেয়েও ক্ষতিকর অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে। সবচেয়ে তিকর ধারণাটি আবার সবচেয়ে প্রাচীনও: সেটি হল অন্ধত্বকে একটি সম্পূর্ণ ট্রাজেডী হিসেবে দেখা। একটি হিব্রু প্রবাদ আছে, অন্ধলোক হল মৃত মানুষের মত। অন্ধকে জীবন্মৃত করে উপস্থাপনের চরম নিদর্শন পাওয়া যায় ইদিপাসকে নিয়ে লেখা গ্রিক নাটকগুলোতে। ইদিপাস রেক্সে রাজা নিজেই যখন নিজের চোখ তুলে ফেললেন তখন নাট্যকার বলছেন: অন্ধ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই ভাল ছিল। এই ঐতিহ্যের বিস্তার ঘটে ইংরেজি সাহিত্যেও। সেখানে একজন কবি, নিজেও যিনি অন্ধ, অন্ধত্বকে মহাদুর্যোগ আখ্যা দিয়ে শেষকথা বলছেন। স্যামসন অ্যাগনেষ্টিজ-এ জন মিল্টন:
শত্রুবেষ্টিত অন্ধের চেয়ে অনেক ভাল ছিল বন্দী হওয়া, পাতালে নিক্ষিপ্ত হওয়া, ভিক্ষা করা, বা ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া। তুচ্ছাতিতুচ্ছ পতঙ্গজীবনও আমার চেয়ে ভাল। তারা হামাগুড়ি দিয়ে চলে, তবুও তো দেখতে পায়। আমি, আলোর মধ্যে অন্ধকার, প্রতিদিনের প্রতারণা, প্ররোচনা, ঠগবাজি বা ভুলভালের কাছে প্রতিদিন ধরা খাই। দরজা খোলা থাকা না থাকা আমার জন্যে সমান, সেটা অন্যের বিষয়, আমার নয়। অর্ধেকের কম আমি জীবিত, অর্ধেকের বেশি আমি মৃত, একটা চলমান কবর।

এই মহাকাব্যিক কবিতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় এর মহাদুর্যোগ পরিস্থিতি নয়, উল্লেখযোগ্য হল আমাদের মহাকবি মিল্টন এর রচয়িতা। তার সব মহৎ রচনা (প্যারাডাইজ লস্ট সহ) লিখিত হয়েছে তিনি অন্ধ হয়ে যাবার পরে। তাহলে তিনি কেন অন্ধত্বকে এমনভাবে দেখতে গেলেন? উত্তরটা সহজ: আমরা অন্ধরা নিজেদের অবস্থাকে সেভাবে দেখতে চেষ্টা করি, যেভাবে চক্ষুষ্মান মানুষ আমাদের দেখতে চায়। এমন কি, যখন আমরা বুঝি ঐ দৃষ্টিভঙ্গি একদম ভুল, তারপরও সেই মতামতটিকেই আমরা নিজেদের ওপর চাপাতে দিই বা চাপিয়ে নিই। এভাবে অনেক সীমিত ও খণ্ডিত অনুধাবন আমাদেরই সহায়তায় আমাদের বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে থাকে। সাহিত্যের গতানুগতিক ঐতিহ্য দ্বারা চালিত হয়ে মিল্টন নিজের এবং তাবৎ অন্ধদের জন্য একটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি উপহার দিলেন। সত্যি বলতে কি, মিল্টন বরং অন্ধত্ব নিয়ে সাবেকী বস্তাপচা মতামতগুলোর পালেই হাওয়া দিলেন, এবং সেটি তিনি করলেন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিপক্ষে গিয়ে। সাহিত্যের ক্ষমতা সত্যিই অনেক!

এক শতাব্দী পর অন্ধত্বের দুর্যোগের ধারণাটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। কিপলিং-এর ‘দ্য লাইট দ্যাট ফেইলড’ পুস্তকে বলা হয়, অন্ধত্ব মৃত্যুর চেয়েও খারাপ। এই বইয়ের নায়ক যখন জানতে পারে যে, সে অন্ধ হতে চলেছে, তখন বলে: এটা হল চলমান মৃত্যু। অন্ধকারে আমাদের নিশ্চুপ হয়ে থাকতে হবে এবং আমরা কাউকেই দেখব না, যা চাই তা কোনোদিনই পাব না, শতবছরও যদি বাঁচি। পুস্তকটির পরবর্তী অংশে নায়ককে দেখা যায় সমগ্র পৃথিবীর বিরূদ্ধে আক্রোশে ফেটে পড়তে, যেহেতু সেই পৃথিবী দেখতে পায়, যেখানে সেই নায়ক অন্ধের মৃত্যুর মাঝে মৃত হয়ে আছে, সহযোগীদের কাঁধে দুর্বহ বোঝা হয়ে। যখন এই আত্ম-অনুকম্পায় ভরা চরিত্রটি আত্মহত্যা করতে সমর্থ হয় (কী যে স্বস্তির খবর!) কিপলিং বলে ওঠেন যে, এই অন্ধ নায়কের ভাগ্য শেষপর্যন্ত ওর সাথে প্রতারণা করে নাই, কারণ সে একটা দয়ালূ বুলেট অন্তত নিজের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে।

‘দ্য এন্ড অব দ্য টিদার’ উপন্যাসে জোসেফ কনরাড তার চরিত্র ক্যাপ্টেন হুয়েলীকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করেন, কারণ সেটি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে অনেক ভাল। ডি এইচ লরেন্সের উপন্যাস ‘দ্য ব্লাইন্ডম্যান’ এ মরিস যুদ্ধে অন্ধ হয়ে যায়, ভবিষ্যতের কোন সোনালি ইঙ্গিতই তার দুর্দশা লাঘব করে না। ‘ইনভাইটেশন টু দ্য ওয়াল্টজ’ উপন্যাসে লেখক রোজামন্ড লেম্যান আরো এককাঠি সরেস। তার উপন্যাসের যুদ্ধে-অন্ধ-হওয়া চরিত্রটি সমাজে সম্মানজনক জীবন যাপন করলেও, কোনো কাজে লাগে না, যেন একটা চলতে ফিরতে থাকা লাশ। যখন সে তার প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে নাচে তখন পরিস্থিতি খুব বেদনাদায়ক হয়ে উঠে। অন্ধলোকটি তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে নিবিড় করে ধরে রাখলেও প্রকৃত প্রস্তাবে সে তখন অনেক দূরে, সঙ্গীত থেকে, জীবন থেকে, সমাহিত এবং পছন্দশূন্য। আর প্রেমিকা আসলে ঐ অন্ধলোকটির চক্ষুষ্মান যুবক বয়স আর বর্তমানের মৃত্যুর সাথে নাচে।

এই লেখকেরা মনে করেন, অন্ধত্বের তথাকথিত ট্রাজেডী এতটাই দুর্বহ যে, খোলা আছে দুইটি রাস্তা: হয় চোখ ফিরে পাওয়া, নয় মরে যাওয়া।

দেখা যাক অন্ধত্বের সাথে নির্বুদ্ধিতা আর অসহায়ত্বের প্রসঙ্গকে কিভাবে মেলানো হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকেই অন্ধরা রগড় নাটক ও প্রহসনে উপহাসের বিষয় হয়ে থেকেছে। প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন রগড় নাটক ও প্রহসনে অন্ধরা উপহাসের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। মধ্যযুগে দেখা যেত অন্ধরা গাধার কান লাগিয়ে পথে পথে ঘুরছে, হাতপা নেড়ে উল্টাসিধা কথা বলে জনগণের মনোরঞ্জন করছে। এই ধারাবাহিকতায় চসার তার ‘মারচেন্টস টেল’এ এক তরুণী বধুর কথা বলেন যে এক অন্ধ বুড়োকে বিয়ে করে। স্বামীর সঙ্গে বাইরে ঘুরতে গিয়ে ঐ বধু তার গোপন প্রেমিকের সঙ্গে গাছের আড়ালে অভিসার করে অন্ধ স্বামীর সামনে। চসার সেখানেই থামেন না, বলতে থাকেন, সেই মোম সময়ে ঐ তরুণীর স্বামী হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় এবং স্ত্রীকে গোপন প্রেমিকের সাথে অভিসাররত দেখতে পায়। কিন্তু চালাক স্ত্রী সাথেসাথেই অজুহাত খাড়া করায়: ঐ অভিসার আসলে ছিল স্বামীর দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায়! শেক্সপিয়ারে অবস্থা আরো খারাপ। ‘কিং লিয়র’এ তিনি যে অন্ধ গ্লকেস্টারকে উপস্থাপন করেন, সে এতটাই অসহায় আর দ্বিধাগ্রস্থ যে, যেকোন কিছু দিয়েই তাকে ভজানো যায়, প্রতারিত হবার জন্য একেবারে আদর্শ চরিত্র।

অন্ধদের নিয়ে মজা করার রূঢ়তম দৃষ্টান্তটি পাওয়া যায় ষোড়শ শতাব্দীর এক জার্মান নাটকে। নাটকের নায়ক তিনজন অন্ধ ভিক্ষুককে একটা মূল্যবান মুদ্রা ভিক্ষা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন যেটা দিয়ে তারা খাদ্যসামগ্রী ও থাকার ব্যবস্থা করতে পারে। সেই মুদ্রা আসলে কাউকেই দেয়া হয়নি, আর তিনজন অন্ধের প্রত্যেকেই মনে করল অন্যজনকে মুদ্রাটি দেয়া হয়েছে। পরের অবস্থাটি সহজেই অনুমেয়।

অসহায় অন্ধলোক একটি সার্বজনীন ধারণা হয়ে উঠেছে। মেটারলিংক-এর ‘দ্য ব্লাইন্ড’ নাটকে দার্শনিক অবস্থান থেকে সবগুলো চরিত্রকে অন্ধ দেখানো হয়েছে। কিন্তু মঞ্চে গিয়ে দেখা গেল দর্শন নয়, বরং অন্ধদের হাস্যকর দলবাজি, হুমকিধামকিই ঐ নাটকের সার।

‘লা সিম্ফনি প্যাস্টোরাল’ এর আঁন্দ্রে জিদ হলেন অন্ধত্বের প্রকৃত সত্যের সবচেয়ে খারাপ বিরূদ্ধবাদীদের একজন। সেখানে অন্ধ কিশোরী গারট্রুড একেবারে নির্বোধ কিসিমের ছিল, প্যাস্টর এসে ওকে লেখাপড়া শিখাতে শুরু করার আগে। অন্ধত্বের কারণেই এই নির্বুদ্ধিতা, লেখক বলেন, দৃষ্টি না থাকায় কিশোরীটি সত্য সম্পর্কে জানতে পারে না। শিক প্যাস্টর তার ছাত্রী গারট্রুড-এর জন্য যে জগত তৈরি করে, সেখানেই অন্ধ গারট্রুড সুখেস্বাচ্ছন্দ্যে কাটায়। সত্যিকার জগতের খারাপ দিক সম্পর্কে কিশোরীটি কিছুই জানতে পারে না। দৃষ্টি না থাকায় সে পাপ সম্পর্কেও সচেতন নয়, আপেল খাওয়ার আগের আদম-ঈভের মত। গারট্রুড যখন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল, তখনই কেবল সে পাপ সম্পর্কে অবগত হল। না বুঝে প্যাস্টরের সাথে যেসব পাপকাজ সে করেছে, সেগুলোর অপরাধবোধ তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে।

সাহিত্যে অন্ধত্ব যেমন নির্বুদ্ধিতার অনুষঙ্গ হয়ে এসেছে, তেমনি এসেছে ধূর্ততার অনুষঙ্গ হয়েও: একেবারে খাঁটি শয়তানির মূর্ত মানবীয় রূপ হয়ে। স্টিভেনসনের ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ এর বুড়ো জলদস্যু অন্ধ পিউ এর জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। উপন্যাসের নায়ক কিশোর জিম হকিন্স অন্ধ পিউকে যখন প্রথম দেখে তখনই তার মনে হয়েছে এই মৃদুভাষী এবং চোখহীন মানুষটির চেয়ে ভয়াবহ কোন চরিত্র সে জীবনেও দেখে নাই। যখন পিউ তাকে ক্রাচ বাগিয়ে ধরে ফেলে, জিমের মনে হয়েছে, এই অন্ধ লোকটির কণ্ঠের চেয়ে নিষ্ঠুর, ঠাণ্ডা আর কুৎসিত কণ্ঠও সে কোনোদিন শোনে নাই।

বহুযুগ ধরেই অন্ধত্ব ও নিচুতার সম্পর্ক সাহিত্যিকদের একটা প্রিয় প্রসঙ্গ, এবং পাঠকদের মধ্যেও এই সম্পর্কের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, যেহেতু পাঠকেরা নানা লোককাহিনী থেকে শিক্ষা পেয়েছে যে, অন্ধত্ব মানবিক গুণাবলী হ্রাস করে। এই শিক্ষা অন্ধ বিষয়ে চক্ষুষ্মান সাধারণ মানুষের নিষ্ঠুরতার অ্যাটিচুডকে সমর্থন করে।

নিখাদ শয়তানির অনুষঙ্গে অন্ধত্বকে যেমন দেখা হয়েছে, এর বিপরীতে কোনো কোনো সাহিত্যে আবার অন্ধত্ব উপস্থাপিত হয়েছে পরম পূণ্যরূপে। আপাতভাবে এই দুটো দৃষ্টিভঙ্গিকে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে তারা একই মুদ্রার এপিঠওপিঠ। অন্ধত্বের প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরার মত জোরালো অন্তর্দৃষ্টি কোনটিতেই পাওয়া যায় না। একটা বিষয়ে এই দুই দলই একমত: অন্ধত্ব হচ্ছে একটা অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা যা তার বহনকারীকে স্বাভাবিক জীবন থেকে পুরোপুরি উৎপাটিত করে।

অন্ধত্বকে হয় পাপ বা শয়তানির ফসল হতে হবে, নয় তাকে হতে হবে পূণ্যের অনুষঙ্গ। লরা রিচার্ডস এর ‘দ্য ব্লাইন্ড চাইল্ড’এ দেখা যায় অন্ধ শিশুটি গাছের বাকলে হাত রেখে বলে দিচ্ছে গাছের নাম, বলে দিচ্ছে কখন ফুল আসবে এবং কিভাবে। গ্রামে এমন কোনো কুকুর বিড়াল নেই যে ঐ শিশুর একটি ডাকে প্রভুর নাম ভুলে ছুটে আসবে না। সে শুধু পূণ্যবতীই নয়, পাশাপাশি যাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী। অগ্নিকাণ্ড থেকে এক শিশুকে রা করে, গান গেয়ে মানুষকে রোগমুক্ত করে, পাঁড় মদ্যপের মদের নেশা ছাড়িয়ে দেয়।

অন্ধত্ব নিয়ে যাবতীয় রোমান্টিক হেঁয়ালিপনার মধ্যে সবচেয়ে উদ্ভট হল, অন্ধত্বকে ছদ্মবেশী আশির্বাদ মনে করা। জন জি মরিসের ‘দ্য ব্লাইন্ড গার্ল অব উইটিনবার্গ’এ অন্ধ নায়িকাকে বলা হচ্ছে: ঈশ্বর তোমায় চোখের আলো থেকে বঞ্চিত করেছেন বলেই তোমার হৃদয় আরো মহান আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। আমার পরিচিতি এমন কোনো অন্ধ মেয়ে নেই যে এরকম অপমানসূচক এবং উদ্ভট বক্তব্য প্রদানকারীর গালে অন্তত একটি চড় না বসিয়ে ছেড়ে দেবে। তারপর এই অন্ধ নায়িকাকে দিয়ে প্রত্যুত্তরে যা বলানো হল তা আরো মারাত্মক: সে বলল, মহাত্মন আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন আমাদের অন্তর্জগত আপনাদের চেয়ে সুন্দর, এবং আপনাদের সূর্যের চেয়ে আমাদের অন্তরের আলো উজ্জ্বলতর?

কল্পকাহিনীতে আরেকটা সুপ্রাচীন এবং অন্যতম নিষ্ঠুর ধারণা হল, অন্ধত্ব হচ্ছে পাপের ফল। ঈদিপাস অন্ধ হন মাতৃসহবাসের কারণে, বেলেল্লাপনার কারণে চোখ হারান শেক্সপিয়ারের গ্লুকেস্টার। এর অব্যবহিত পরের ঘটনা হল, অন্ধত্ব শুদ্ধতা অর্জনের একটা স্তর, যে স্তরে কোনো মানবীয় চরিত্র আগের পাপতাপ ঝেড়ে পূণ্যবান হয়ে উঠতে পারে। যেমন দেখা যায় কিংসলের ‘ওয়েস্টওয়ার্ড হো’ এ অ্যামেয়াস লেই বজ্রপাতে অন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাতারাতি অপরাধী থেকে সাধুতে পরিণত হয়।

এ সমস্ত বিখ্যাত কল্পকাহিনীর মধ্যে অন্ধত্বকে মানবিকতা-বহির্ভূত কিছু একটা দাঁড় করানোর একটা প্রবণতা থেকেই গেছে। অন্ধত্ব যেন স্বাভাবিক জীবন বা মানবিক সম্পর্ক থেকে নির্বাসনের দরজা। ডিকেন্সের বার্থাই হোক, বা লিটনের নিদিয়াই হোক, প্রেমে পড়ে তারা ভুলেও ভাবে না যে তাদের কাক্সিতজনেরা তাদের প্রেমে পড়বে।

সর্বশেষ যে প্রবণতাটি দেখা যায় তা হল, অন্ধত্বকে আক্ষরিক অর্থে না নিয়ে প্রতীকী অর্থে নেয়া, ব্যঙ্গ বা প্যারাবল তৈরির জন্যে। লোকসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র সর্বত্রই এই প্রবণতাটি অন্ধত্বকে মৃত্যু বা নরকযন্ত্রণার প্রতীক হিসেবে দাঁড় করায়, অথবা শারীরিক অন্ধত্বের প্রতীকে মানসিক অন্ধত্বকে মূর্ত করে তোলে। এই ক্যাটাগরিতে পড়বে এইচ জি ওয়েলস-এর ‘দ্য কান্ট্রি অব দ্য ব্লাইন্ড’, পল কোরে’র ‘দ্য প্লানেট অব দ্য ব্লাইন্ড’, মেটারলিংক-এর ‘দ্য ব্লাইন্ড’ ইত্যাদি। এছাড়াও কনরাড আইকেন-এর ছোটগল্প ‘সাইলেন্ট স্নো, সিক্রেট স্নো’-এ অন্ধত্বকে স্কিজোফ্রেনিয়ার রূপক হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এ সমস্ত উপস্থাপনায় অন্ধত্বকে দেখানো হয়েছে অজ্ঞতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের প্রতীকরূপে, স্বাভাবিক ধারণা ও মূল্যবোধের উল্টো অবস্থার প্রতীকরূপে, এবং মৃত্যুর চেয়ে খারাপ বা মৃত্যুসমান অবস্থার প্রতীকরূপে।

সাহিত্যের এই সমীক্ষা থেকে কী শিক্ষা নিতে পারি আমরা? কী বলতে চেয়েছে সাহিত্য আদতে? একটা শিক্ষা এটি যে, এই সমস্ত সাহিত্যকর্মের বদৌলতে আমরা এমন একদল তথাকথিত বিশেষজ্ঞ খুঁজে পেয়েছি যারা এই সাহিত্যের জ্ঞান সম্বল করে অন্ধত্ব নিয়ে গবেষণা করে নানান অশ্বডিম্ব প্রসব করছেন। তাদের মতে, অন্ধত্ব কেবল নিছক দৃষ্টিহীনতা নয়, বরং একজন মানুষের সম্পূর্ণ রূপান্তর। কোনো মানুষের কাছে তার অন্ধত্ব নিছক চোখ হারানোর গল্প দিয়েই শেষ হয় না, আসলে সেটি মৃত্যুসমান, সত্তার ওপর এক বিশাল আঘাত। তারা বলেন, চোখ হল সেক্স সিম্বল, তাই অন্ধ মানুষ কখনই পূর্ণ মানুষ নয়।

শিরোনামের প্রশ্নে ফিরে যাই: সাহিত্য কি আমাদের বিপক্ষে? এই প্রশ্নের সর্বজনগ্রাহ্য কোনো জবাব নেই। শুধু অতীত আমলের সাহিত্য নিয়ে যদি আলাপ হয়, তাহলে প্রশ্নের জবাব হবে, হ্যাঁ। সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে আলাপ হলে মিশ্রজবাব হবে। অন্ধত্বের ধারণায় অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন সমসাময়িক সাহিত্যে পাওয়া যায়, যদিও বস্তাপচা সাবেকী ধারণাগুলোই এখন পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় এটা যে, সমসাময়িক কালে এই সব ধারণা উৎসাহ পাচ্ছে আমাদের তথাকথিত অন্ধ বিশেষজ্ঞদের উদ্ভট গবেষণা থেকেই।

ভবিষ্যতের দিকে যদি ঐ প্রশ্ন নিয়ে তাকাই, জবাব হবে, ভবিষ্যতের সাহিত্য বর্তমান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, যেমন বর্তমানের জীবন পারে না ভবিষ্যতের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অন্ধ জীবনগুলোকে সাজিয়ে তোলার মাধ্যমে আমরাই ভবিষ্যতের সাহিত্যকে নির্দেশনা দিতে পারব। অন্ধত্ব একটা ট্রাজেডী ততক্ষণই, যতক্ষণ আমরা এই সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিটিকে মান্য করি। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ একটাই: আমাদের সময়কে অন্ধত্ব নিয়ে সচেতন ও সবিবেক হতে সাহায্য করা। কল্পকাহিনীর ফ্যান্টাসী থেকে মুক্ত হয়ে সেগুলোকে বাস্তবতার নির্যাস দিয়ে ভরে দিতে হবে। তখনই কেবল আমরা সেই সাহিত্যের জন্য রাস্তা তৈরি করতে পারব যা বাস্তবতার সুবাস ধারণ করবে, সত্যের অপলাপ হবে না, সাহিত্য পড়ে আমরা সেখানে নিজেদের খুঁজে পাব।


(ঈষৎ সংক্ষেপিত)


কৃত্রিম গোলাপগুলো: গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কোয়েজের গল্প


ভোরের আবছা আলোয় হাতড়ে হাতড়ে বিছানা থেকে নেমে মিনা হাতাছাড়া জামাটি গায়ে দিল যেটি সে গতরাতেই খাটের কাছে ঝুলিয়ে রেখেছিল, এবং জামার আলগা হাতাগুলোকে ট্রাংকের ভেতর গরুখোঁজা করে খুঁজল। তারপর দেয়ালের হুকগুলিতে, দরজার পেছনে ভালমত খুঁজল, যতদূর সম্ভব শব্দ না করে, যাতে ওর সঙ্গে একই ঘরে ঘুমানো অন্ধ দাদীর ঘুম ভেঙ্গে না যায়। ভোরের আবছা অন্ধকার ওর চোখে সয়ে এলে সে দেখল দাদী ইতিমধ্যেই উঠে গেছে। মিনা রান্নাঘরে গেল, জামার হাতাগুলোর কথা দাদীকে জিজ্ঞেস করার জন্য।

‘ঐগুলো গোসলখানায়’ অন্ধ দাদী বলল। ‘গতকাল সন্ধ্যায় ধুয়ে দিয়েছি’।

গোসলখানায় হাতাদুটো পেল সে, কাঠের কিপে ঝুলছে। তখনও ভেজা সপসপে। মিনা রান্নাঘরে গিয়ে হাতাগুলো চুলার আঁচে মেলে দিল। সামনে অন্ধ দাদী তখন কফি বানাচ্ছে, তার ভাবলেশহীন চোখের মনি স্থির হয়ে আছে বারান্দার কোনার দিকে, যেখানে একসারি ফুলদানির মধ্যে ঔষধি গাছ লাগানো।

‘আর কনো তুমি আমার জিনিষপত্র ধরবে না’, মিনা বলল। ‘এইসব দিনে সূর্যের আলোর কি কোনো বিশ্বাস আছে?’

অন্ধ মহিলা তার মুখ ঘোরাল, মিনার গলার স্বর লক্ষ্য করে।

‘ভুলেই গিয়েছিলাম আজ প্রথম শুক্রবার’, বলল অন্ধ দাদী।

কফি তৈরি হল কিনা বোঝার জন্য দাদী কেতলির উপরে মুখ নিয়ে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল, তারপর চুলা থেকে কফি নামিয়ে রাখল।

‘নিচে একটা কাগজ বিছিয়ে হাতাগুলো শুকাতে দিস, চূলার মেঝে কিন্তু নোংরা’, অন্ধ দাদী বলল।

মিনা চুলার মেঝেয় আঙ্গুল বুলিয়ে দেখল। পাথরগুলো নোংরা ঠিক, তবে নোংরাগুলোও শক্ত হয়ে সেঁটে গেছে মেঝেতে। ফলে হাতাগুলো মেঝেয় না ঘষলে সেখান থেকে নোংরা হাতায় লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

‘হাতাগুলো নোংরা হলে তুমি দায়ী থাকবে’, মিনা ওর দাদীকে বলল।

অন্ধ দাদী নিজের জন্য এককাপ কফি ঢালল। ‘তুই রেগে আছিস’, বারান্দার দিকে একটা চেয়ার টেনে নিতে নিতে বলল সে। ‘রাগ নিয়ে প্রার্থনায় গেলে অসম্মান হয়’। কফির কাপটা নিয়ে গোলাপগুলোর সামনের বারান্দার চাতালে বসল দাদী। প্রার্থনা শুরুর তিন নম্বর ঘণ্টাটি বাজলে মিনা চুলার উপর থেকে জামার হাতাগুলো নিয়ে এল এবং তখনও সেগুলো ভেজাই ছিল। সেগুলোই পরল সে। হাতাছাড়া জামা পরে গেলে ফাদার এঞ্জেল ওকে কখনই রুটি দেবেন না। মুখও ধোয় নি সে। তোয়ালে দিয়ে খালি একটু মুছে নিয়েছে। তারপর ঘর থেকে প্রার্থনার বই আর শালটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। ফিরে এল মিনিট পনের পর।

‘তুই যেতে যেতে যীশূর শিক্ষা পর্যন্ত শেষ হয়ে যাবে’, গোলাপগুলোর উল্টোদিকের চাতালে বসে দাদী বলল।

মিনা সোজা টয়লেটে ঢুকল। ‘আমি প্রার্থনায় যেতে পারব না’, বলল সে। ‘হাতাগুলো একদম ভেজা আর জামাটাও কোঁচকানো।’ অনুভব করল একটা জিজ্ঞাসু মন তাকে অনসরণ করছে।
‘প্রথম শুক্রবার, আর তুই কিনা প্রার্থনায় যাবি না’, অন্ধ দাদী বিস্মিত।

টয়লেট থেকে ফিরে মিনা নিজের জন্য এককাপ কফি ঢালল এবং বসল দরজার চুনকাম করা কপাটটার উল্টোদিকে, ওর অন্ধ দাদীর পাশে। কফির কাপে চুমুক দিল না।

‘কাঁদছিস তুই!’ অন্ধ মহিলাটি আরো আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘কাঁদছি রাগে’, মিনা বলল। আর দাদীর পাশ থেকে উঠে যেতে যেতে বলল, ‘তোমার স্বীকারোক্তি দিতে অবশ্যই চার্চে যাওয়া উচিত, যেহেতু তোমার কারণেই আমার প্রথম-শুক্রবারের প্রার্থনায় যাওয়া হল না।’

অন্ধ দাদী স্থানু হয়ে বসে রইল, মিনা শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়া পর্যন্ত। তারপর সে হেঁটে গেল বারান্দার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। মিনার রেখে যাওয়া কফির কাপটা তুলে নেয়ার জন্য সতর্কভাবে একটু একটু করে সামনের দিকে বাঁকা হল সে। কাপটিতে আবার কফি ঢালতে ঢালতে বলে চলল:

‘আল্লা জানেন আমার মন পরিষ্কার ছিল।’

শোবার ঘর থেকে মিনার মা বেরিয়ে এল।

‘কার সাথে কথা বলছ তুমি?’ মিনার মা তার অন্ধ মাকে জিজ্ঞেস করে।

‘কারও সাথেই না। তোকে তো বলেছি আমার মাথা খারাপ হতে চলেছে।’

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে মিনা ওর অন্তর্বাসের বোতাম খুলে তিনটা ছোট ছোট চাবি বের করল, সেগুলো সেফটি পিন দিয়ে ওর জামার সাথে আটকানো ছিল। এর একটা দিয়ে আলমারির নিচের ড্রয়ারটা খুলল এবং কাঠের একটা ছোট বাক্স বের করল। তারপর আরেকটি চাবি দিয়ে ঐ বাক্সটির তালা খুলল। বাক্সটির ভেতর একতাড়া রঙিন কাগজে লেখা চিঠি ছিল, রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। চিঠির তাড়াটা সে জামার ভেতরে লুকিয়ে নিল এবং বাক্সটি যথাস্থানে রেখে ড্রয়ারটায় তালা লাগিয়ে দিল। তারপর চিঠিগুলো টয়লেটে নিয়ে গিয়ে কমোডে ফেলে দিল।

‘আমি তো ভাবলাম তুই চার্চে চলে গেছিস’, মিনা রান্নাঘরে ঢুকলে ওর মা বলে।

‘নাহ, সে যেতে পারে নি’ অন্ধ দাদী বলে উঠল। ‘আমি শুক্রবারের কথা ভুলে গিয়ে কাল সন্ধ্যায় ওর জামার হাতাগুলো ধুয়ে দিয়েছিলাম।’

‘ওগুলো এখনও ভেজা’, মিনা বিড়বিড় করে।

‘খুব ধকল গেছে এই কয়দিন’, অন্ধ দাদী বলল।

‘ইস্টারের জন্য আমায় দেড়শ গোলাপ বানাতে হবে’, মিনা বলল।

সকাল সকালই সূর্য তেতে উঠল। সাতটা বাজার আগেই মিনা তাদের বসার ঘরে কৃত্রিম গোলাপের দোকানটা সাজিয়ে ফেলল: গোলাপের পাপড়ি এবং তারভর্তি একটা বাক্স, আরেক বাক্সে ক্রেপ কাগজ, দুইটি কাঁচি, একটা সূতাগুটি এবং এক পাত্র আঠা। এর কিছু পরই ত্রিনিদাদ ঢুকে সেখানে, তার হাতে পেস্টবোর্ডের বাক্সটা ধরা, জিজ্ঞেস করে মিনা কেন প্রার্থনায় যায় নি।

‘আমার জামার হাতা ছিল না’ মিনা বলে ওর বান্ধবীকে।
‘কারোটা ধার নিতে পারতি’, ত্রিনিদাদ বলে।

মিনা একটা চেয়ার টেনে পাপড়ির বাক্সটির কাছে বসে।

‘আমার দেরি হয়ে গিয়েছিল’, বলে সে।

একটা গোলাপ বানানো শেষ করল মিনা। তারপর কাঁচি দিয়ে পাপড়িগুলো ছাঁটার জন্যে বাক্সটি আরো কাছে টেনে আনে। ত্রিনিদাদও ওর বাক্সটি নিচে রেখে মিনার সাথে হাত লাগায়।

মিনা ত্রিনিদাদের বাক্সটি দেখে।

‘জুতা কিনলি নাকি?’ জিজ্ঞেস করে সে।

‘এটার ভেতরে মরা ইঁদুর’, বলে ত্রিনিদাদ।

ত্রিনিদাদ ভাল পাপড়ি বানাতে পারে, মিনা তাই সবুজ কাগজ ছেঁদা করে ভেতরে তার ঢুকিয়ে পাপড়ি বসানোর কাঠামো বানাতে থাকল। তারা নিঃশব্দে কাজ করতে থাকল, খেয়ালই করল না সূর্যের আলো এসে কখন পড়েছে বসার ঘরের পারিবারিক ফোটোগ্রাফগুলোর ওপর। কাঠামো বানানো শেষ করে মিনা ত্রিনিদাদের দিকে মুখ ঘোরাল, ওর দৃষ্টিতে কাজবহির্ভূত কিছু একটা ছিল। ত্রিনিদাদ কিন্তু নজরকাড়া নৈপুণ্যের সাথে কাজ চালিয়ে যেতে থাকল, মিনার আঙুলে-ধরা পাপড়িগুলোকে একটুও না নাড়িয়ে। মিনা খেয়াল করল বান্ধবীর পুরুষালি জুতোজোড়া। চোখাচোখি হবে, এমনটা ভেবে ত্রিনিদাদ মাথা তুলল না, নিজের পা যথাসম্ভব পেছনে চেপে রাখল, এবং এভাবে কাজ শেষ করল।

‘ব্যাপার কি?’ বলল সে।

মিনা তার দিকে ঝুঁকে এল।

‘সে চলে গেছে’, বলল মিনা।

ত্রিনিদাদের হাত থেকে কাঁচিটা তার কোলের উপর পড়ে গেল।

‘না’।

‘চলে গেছে সে’, মিনা আবার বলল।

শূন্য দৃষ্টিতে ত্রিনিদাদ মিনার দিকে তাকিয়ে থাকে। ভুরু কোঁচকানো, পুরো দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে ভুরু ওর।

‘এখন কী হবে?’ ত্রিনিদাদের প্রশ্ন।

মিনা দৃঢ় গলায় উত্তর দিল।

‘কিছুই না’।

বেলা দশটার আগেই ত্রিনিদাদ বিদায় নিল।

ত্রিনিদাদের নৈকট্যের ভারমুক্ত হয়ে মিনা মরা ইঁদুরগুলি টয়লেটে ফেলে দিতে চলল, যাবার আগে দাদীর কাছে একমুহূর্ত থামল। অন্ধ দাদী তখন গোলাপঝোঁপে ছাঁট দিচ্ছিলেন।

‘বাজি ধরতে পারি, এই বাক্সে কী আছে তুমি বলতে পারবে না’, পাশ দিয়ে যেতে যেতে মিনা ওর দাদীকে বলল।

বাক্সটি নাড়ায় মিনা।

অন্ধ মহিলা মনোযোগী হতে শুরু করে। ‘আবার নাড়া দে’, বলল দাদী। মিনা বাক্সের মরা ইঁদুরগুলি আবার নাড়ায়, কিন্তু পরপর তিনবার শুনেও দাদী বুঝতে পারল না বাক্সে কী আছে।

‘গতরাতে চার্চে পাতা-ফাঁদে ধরা-পড়া ইঁদুর এইগুলো’, মিনা বলে দাদীকে।

ফিরে আসার সময় সে অন্ধ দাদীর পাশ দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যায়। কিন্তু দাদী ওকে ঠিকই অনুধাবন করে এবং পেছন পেছন যায়। এভাবে বসার ঘরে, যেখানে মিনা একটা বন্ধ জানলার পাশে বসে গোলাপগুলো তৈরি করছে।

‘মিনা’, অন্ধ দাদী বলেন, ‘সুখী থাকতে চাইলে কখনই অচেনা কারো সামনে স্বীকারোক্তি দিস না’।

কিছু না বলে মিনা তাকিয়ে থাকল ওর দাদীর দিকে। অন্ধ মহিলাটি ঠুকে ঠুকে মিনার সামনের চেয়ারে গিয়ে বসল এবং ওর কাজে হাত লাগাতে উদ্যোগী হল। কিন্তু মিনা তা হতে দিল না।

‘তোকে অস্থির লাগছে’, অন্ধ দাদী বলে। ‘প্রার্থনায় যাস নি কেন?’ জিজ্ঞেস করে সে।

‘এটা তুমিই ভাল জান।’

‘এটা যদি জামার হাতা ভেজা থাকার কারণে হত, তাহলে তুই ঘরের বাইরে যেতে দ্বিধা করতিস না’, অন্ধ মহিলা বলতে থাকল, ‘কেউ একজন তোর জন্যে পথে অপেক্ষা করছিল, যার কোন বিষয় তোকে ছন্নছাড়া করে দিয়েছে আজ।’

মিনা দাদীর অন্ধ চোখের সামনে হাত দোলাল, মনে হল যেন মুছে দিচ্ছে কোনো অদৃশ্য কাঁচ।

‘তুমি একটা ডাইনী’, বলল মিনা।

‘সকালে দু’বার টয়লেটে গেছিস’, অন্ধ দাদী বলে। ‘তুই একবারের বেশি কখনই যাস না’।

মিনা গোলাপ বানাতেই থাকল।

‘আলমারির ড্রয়ারে কী রেখেছিস, দেখাবি আমায়?’ দাদী বলে।

মিনা ধীরেসুস্থে ওর অন্তর্বাসের ভেতর থেকে চাবি তিনটা বের করে এবং দাদীর হাতে দেয়। দিয়ে দাদীর হাতের মুঠো সজোরে বন্ধ করে দেয়।‘যাও, নিজের চোখে দেখে আসো’, বলে মিনা।

‘আমার চোখ তো টয়লেটের নিচে দেখতে পায় না’।

মিনা চোখ তুলল এবং তোলার পর ওর একটা অদ্ভূত অনুভূতি হল। মিনা অনুভব করে, অন্ধ মহিলাটি জানে যে এই মুহূর্তে মিনা তার দিকে তাকিয়ে।

‘টয়লেটের নিচে গিয়ে দেখ না কেন, আমার বিষয়ে যখন তোমার এত আগ্রহ’, বলে মিনা।

দাদী এই কথায় আমল দিল না।

‘রাতে শুয়ে শুয়ে ভোর পর্যন্ত কী যেন লিখিস তুই’, বলে দাদী।

‘তুমি তো বাতি নিভিয়েই দাও’, মিনা বলে।

‘আর সাথেসাথেই তুই হারিক্যানটা জ্বালাস’, অন্ধ দাদী বলে। ‘হারিক্যানের আলোয় সারারাত হৃদয়ের গতির সাথে লিখে যাস তুই’।

মিনা শান্ত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ‘চমৎকার’, মাথা না তুলেই বলল সে, ‘বুঝলাম তাইই করি আমি। তাতে হয়েছে কি?’

‘কিছুই না’ অন্ধ দাদী নিঃশ্বাস নেন। ‘শুধু তোর প্রথম-শুক্রবারের প্রার্থনা মিস হয়েছে।’

দুইহাতে মিনা সুতার গুটি, কাঁচি, আর শেষ-না-হওয়া কাজগুলো নিয়ে উঠে পড়ে। সবকিছু সে বাক্সে রেখে সে অন্ধ মহিলাটির মুখোমুখি হয়। ‘টয়লেটে আমি কেন গিয়েছিলাম, শুনতে চাও?’ জিজ্ঞেস করে মিনা। দু’জনেই একটা টানটান অবস্থার মধ্যে কিছুণ থাকে, যতণ না মিনা নিজেই ওর করা প্রশ্নটির জবাব দেয়:

‘হাগতে গিয়েছিলাম’।

অন্ধ মহিলা চাবি তিনটা বাক্সের ভেতর ছুঁড়ে দেয়। ‘এটা একটা ভাল অজুহাত হতে পারত’, বিড়বিড় করতে করতে দাদী রান্নাঘরের দিকে এগোয়। ‘আমি এটা বিশ্বাস করতাম যদি এই প্রথমবার তোকে আমি কসম কাটতে শুনতাম’। বারান্দার উল্টোদিক থেকে মিনার মা হেঁটে আসে, হাতে অনেকগুলো কাঁটাওলা গোলাপ।

‘কী কথা হচ্ছে?’ মিনার মা জিজ্ঞেস করে।

‘আমি একটা পাগল’, মিনার অন্ধ দাদী এবার নিজের মেয়ের উদ্দেশ্যে বলে। ‘কিন্তু যতক্ষণ না পাথর ছোঁড়া শুরু করি, ততদিন পর্যন্ত কিন্তু তোরা আমায় পাগলা গারদে পাঠানোর কথা ভাবতে পারবি না’।

শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০০৮

আয়না: আইজাক বাশেভিস সিঙ্গারের গল্প



১.
এক কিসিমের জাল আছে যেইটা মিথুসেলার মত আগিলা, মাকড়সার জালের মতন নরম ও ছ্যাঁদা-ছ্যাঁদা - কিন্তু শক্তিসামর্থে কমতি নাই। কোনো শয়তান যখন অতীতকালের পিছে বা বাতাসকলের চক্করে ঘুরতে ঘুরতে হয়রান হৈয়া পড়ে, তখন সে কোনো আয়নার ভিতর প্রবিষ্ট হৈয়া যায়। সেইখানে জাল বিছায়া সে মাকড়সার মতই বৈসা থাকে, মাছি ধরা পড়বেই। খোদা দুনিয়ার রমণীকূলে দিছেন অন্তঃসারশূন্যতা - বিশেষত যেসব রমণী ধনী, সুন্দরী, বাচ্চাকাচ্চাহীন, যুবতী এবং যাদের খরচ করার মত সময় বিস্তর আছে, অথচ সঙ্গীসাথী নাই।

ক্রাশনিক গ্রামে আমি সেইরকম এক রমণীর সাক্ষাৎ পাই। ওর পিতা ছিল কাঠব্যবসায়ী, স্বামী ডানজিগে খেয়ার কাজ করত। আর ওর মায়ের কবরে কেবল ঘাস গজাইতে শুরু করছে। মেয়েটা থাকত পুরনো ধাঁচের একটা বাড়িতে - ওককাঠের কাপবোর্ড, চামড়া-বাঁধান ক্যাশবাক্স আর সিল্ক দিয়ে মোড়ান নানান বইপত্রের মধ্যে। ওর চাকর ছিল দুইটা - এর মধ্যে বুড়াটা কানে শুনত কম আর জোয়ানটা ঘুরত এক বেহালাবাদকের পিছে-পিছে । ক্রাশনিকের অন্য গৃহবধুরা জুতা পরত পুরুষের, মেশিনের চোঙ্গার মধ্যে গম ঢালত সপাসপ, পাখপালক ছাড়াইত হাঁসমুরগির, রান্ধত স্যুপ, পালত বাচ্চাকাচ্চা আর যাইত জানাজায়। বলা বাহুল্য, সুন্দরী এবং শিক্ষিত জিরেল - যে বড় হৈছে ক্র্যাকো শহরে - এইসব গ্রাম্য প্রতিবেশীর সাথে কথা বলার মত বিষয়ই পাইত না। তারচে সে পছন্দ করত জার্মান গানের বই, বৈসা-বৈসা কাপড়ের মধ্যে এমব্রয়ডারি করত মুসা ও জিপোরা, আহসুইরাস ও রাণী এসথার, কিংবা দাউদ ও বাথশেবার ছবি। স্বামী ওর জন্য যেসব সুন্দর সুন্দর পোশাক আনত, সেগুলো কজেটেই ঝুলত, মুক্তা ও হীরার অলংকার বাক্সবন্দী হৈয়াই থাকত। কেউ কোনোদিন ওর সিল্কের অন্তর্বাস, লেস-লাগানো পেটিকোট বা লাল পরচুলা দেখে নাই - এমন কি ওর স্বামীও না। দেখবেই বা কখন? দিনের বেলায় তো প্রশ্নই ওঠে না, আর রাত্রে তো অন্ধকার।



জিরেলের ছিল একটা চিলেকোঠা, সেইখানে ছিল একখান আয়না যেটা ছিল ততটুকুই নীল - পানি বরফ হৈবার আগে যতটুকু নীল হৈয়া ওঠে। আয়নার মাঝবরাবর ফাটা ছিল একটা, আর তার চারপাশে যে সোনালি ফ্রেম ছিল তাতে সাপ, দরজার নব, গোলাপ এসবের বাহারি নকশাখোদাই ছিল। আয়নার সামনের মেঝেতে বিছানো ছিল ভালুকের চামড়া আর লাগোয়া পিছনেই ছিল একখান চেয়ার যার হাতল আইভরির আর গদী নরম মখমলের। নগ্নাবস্থায় সেই চেয়ারে বৈসা ভালুকের চামড়ায় পা রাইখা নিজেরে নিবিষ্টভাবে দেখার চাইতে আনন্দের আর কী হৈতে পারে? জিরেলের শরীরে তাকায়া থাকার মত ঐশ্বর্যও ছিল যথেষ্ট। ওর চামড়া ছিল সাটিনের মত শাদা, দুধজোড়া ছিল ফোলা ফোলা, চুল ছিল কাঁধ-ছাড়ানো আর পা দুইটা ছিল মাদী হরিণের পায়ের মত চিকন লম্বা। আয়নার সামনে বৈসা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে নিজের রূপ উপভোগ করতে পারত। ছিটকিনি আর ভারি হুড়কো দিয়া আটকানো থাকত দরজা, আর সে ভাবত এই বুঝি খুইলা যাইতেছে দরজা, ঘরে ঢুকতেছে কোনো রাজকুমার, শিকারী বা কোনো কবি। কারণ যা কিছু গোপন তার প্রকাশ্য হওয়া লাগবে, প্রতিটা গহীন ভাবনার ব্যক্ত হওয়া দরকার, প্রতিটা প্রেমেই আছে প্রতারণার আকাঙ্ক্ষা, যা কিছু পবিত্র তারই মর্যাদাহানি হওয়া প্রয়োজন। দুনিয়া ও পরকালের চক্করে যেকোনো সুন্দর শুরুর-ই খারাপ ধরনের সমাপ্তি হৈয়া যাইতে পারে। যখনি আমি এই স্বাদের কথা জানলাম, ঠিক করলাম এই রমণীটারেই ফুসলাইতে হবে। দরকার খালি একটু ধৈর্য। এক গরমের দিনে, আয়নার সামনে বৈসা সে ওর বাম স্তনের বোঁটা দেখতেছিল, তখনি আয়নার ওপর ওর চোখ আটকায়া গেল। হ্যাঁ, আমিই ছিলাম সেইখানে - আলকাৎরার মত কাল, বেলচার মত লম্বা, গাধার মত কান, ভেড়ার মত শিং, ব্যাঙের মত মুখ আর ছাগলের মত দাড়ি। আমার চোখ বলতে খালি দুইটা মনি। এত আশ্চর্য হৈছিল যে, ভয় পাওয়ার কথাই ভুইলা গেল। কান্নার বদলে সে ভাইঙ্গা পড়ল বাঁধভাঙা হাসির চ্ছটায়।

“ও আল্লা, কী বিশ্রী দেখতে তুমি!” বলল সে।
“ও আল্লা, কী সুন্দর দেখতে তুমি!” জবাব দিলাম আমি।

আমার প্রশংসায় ওকে খুশি মনে হৈল। “কে তুমি গো?” জিগাইল সে।

“ভয় পাইও না” বললাম, “আমি একটা পিচ্চি শয়তান, বড়সড় শক্তিশালী শয়তান আমি না। আমার আঙুলে নোউখ নাই, মুখে দাঁত নাই, আমার হাত গুড়ের মত, আর শিং মোমের মত। আমার যত শক্তি আমার জবানে। পেশাগত দিক থিকা আমি একটা ভোদাই, আসছি তোমারে আনন্দ দিতে কারণ তুমি একলা।”

“আগে ছিলা কৈ?”

“তোমার শোবার ঘরের স্টোভের পিছনে, যেইখানে ঝিঁঝি ডাক পাড়ে আর ইন্দুরে হল্লা করে। সেইখানে একটা শুকায়া যাওয়া ফুলতোড়া আর উইলোর মরা ডালের মাঝখানে ছিলাম গো।”

“কী করতা সেখানে তুমি?”
“দেখতাম তোমারে।”
“কবে থিকা?”
“তোমার বাসর রাইত থিকা।”
“খাওয়া দাওয়া?”
“তোমার শরীরের সুবাস, চুলের জ্বিলা, চোখের আলো আর মুখের বিষাদ।”
“শালা তেলবাজ” সে চিৎকার করল, “কে তুমি? কী কর এখানে? কৈ ত্থিকা আসছ? যাইবা কৈ?”

গল্প বানাইলাম একটা। বললাম, আমার বাপ ছিল স্বর্ণকার আর মা ছিল একটা মাদী ছাগল। তারা মিলিত হৈছিল এক গুদামের ভিতর বাতিল দড়ির স্তূপের ওপর, আমি ছিলাম তাদের জারজ সন্তান। কিছুদিনের জন্য উঠছিলাম মাউন্ট সিয়েরের শয়তানদের বস্তিতে, থাকতাম একটা খচ্চরের গুহায়। কিন্তু যখন জানাজানি হৈল যে, আমার বাপ একজন মানুষ - খেদায়া দিল আমারে। তখন থিকা আমি ঘরছাড়া। মাদী শয়তানগুলা আমারে এড়াইত কারণ, আমারে দেখলে নাকি ওদের আদমসন্তানের কথা মনে হৈত। আর মানবীরা আমারে দেইখ্যা ভাবত শয়তানের কথা। আমারে দেখলেই ঘেউ ঘেউ করত কুত্তাগুলান, মানুষের বাচ্চারা চেঁচাইত ভয়ে । কিন্তু কেন ভয় পাইত ওরা? আমি তো কারো ক্ষতি করি নাই। আমার একমাত্র শখ সুন্দরী নারী দেখা - দেখা আর ওদের সাথে আলাপ সালাপ করা।

“আলাপ সালাপ করা ক্যান? সুন্দরী হৈলেই কি জ্ঞানী হৈয়া যায় নাকি?”

“বেহেশতে জ্ঞানীরা সুন্দরীদের পায়ের নিচের পাওদানি।”

“আমার শিক্ষক তো অন্যকথা কয়।”

“তোমার শিক্ষক হালায় কি জানে? যারা বই লেখে তাদের বুদ্ধি ছারপোকার সমান। তারা একজন অন্যজনরে অনুকরণ করে। যখনি তুমি কিছু জানতে চাও, আমারে জিগাইও। জ্ঞান কখনই পয়লা বেহেশতের নিচে নামে নাই। আর পয়লা বেহেশতের পর জ্ঞান বৈলা যা আছে তার সবই হৈল লালসা। তুমি কি এও জান না যে, ফেরেশতারা সব মাথামোটা? গেরাসিম ফেরেশতা বালুর মধ্যে খেলাধুলা করে পোলাপানের মত, চেরুবিমটা তো গোনাগুনতিই পারে না, আর আরালিমটা ফেলনা জিনিস চিবায় খালি। খোদা নিজে সময় কাটান হাঙ্গরের লেজ টাইন্যা টাইন্যা, আর জংলী ষাঁড়ে তার পা চাটে। তিনি কাতুকুতু দেন শেখিনারে যাতে সে প্রতিদিন অনেক অনেক ডিম পাড়তে পারে; এই ডিমগুলারেই তোমরা আকাশের তারা কও।”

“বুঝলাম তুমি আমার সাথে মশকরা করতেছ।”

“এইগুলা মশকরা হৈলে আমার নাকের ওপরে হাড্ডি গজাক। আমার মিছাকথার কোটা আমি অনেক আগেই শেষ কৈরা ফালাইছি। এখন সত্য বলা ছাড়া আমার বিকল্প নাই।”

“আচ্ছা, তুমি কি বাচ্চা পয়দা করতে পার?”

“না গো আমার জান। খচ্চরের মতই অম আমি। কিন্তু তাতে আমার কামনা দমে নাই। শুধুমাত্র বিবাহিতাদের সাথে শুই আমি, দুর্দান্ত অ্যাকশনই আমার পাপ, আমার প্রার্থনা হৈল খোদা-কুৎসা, বিদ্বেষ আমার রুটি, ক্রোধ আমার মদ, ফুটানি আমার হাড্ডিমজ্জায়। বকবকানি ছাড়া এই একটা জিনিসেই ওস্তাদ আমি।”

আমার কথায় হাসি পাইল ওর। বলল, “শয়তানের বেশ্যা হৈতে জন্ম দেয় নাই আমারে আমার মা। যাঃ ফুট, নাইলে ওঝা ডাকুম কিন্তু।”

“উত্তেজিত হৈবার কিছু নাই”, বললাম আমি, “যাইতেছি। কারো ওপর জোর করি না আমি”।

তারপর মিলায়া গেলাম কুয়াশার মত।



২.
পরের সাতদিন জিরেল ওর আয়নাঘরে যাওয়া থিকা বিরত রাখল নিজেরে। আয়নার ভিতর আমি হালকা হালকা ঘুমাইলাম। জাল ছড়ান হৈছে; ভিকটিম রেডি। ওর মারাত্মক কৌতুহলের কথা জানতাম আমি। তাই এখন আমার কাজ হৈল খালি হাই তোলা। একজন খোদার বান্দারে এইরকম পটান কি উচিত আমার? উচিত কি নববধুরে তার পুরুষের সঙ্গ থিকা বঞ্চিত করা? সিনাগগের চিমনিতে আগুন দেয়া? সাবাথের মদকে ভিনেগার বানায়া দেয়া? কুমারীর জন্য বামনসোয়ামী উপহার দেয়া? বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে ভেড়ার শিং ঢুকায়া দেয়া? তেলাওয়াতের সুরের মধ্যে অসুর ঢুকায়া দেয়া? পিচ্চি শয়তানের এরকম কাজকামের অভাব তো নাই, বিশেষত আতংকদিবসগুলাতে, যখন পানির মধ্যে মাছগুলাও ভয়ে কাঁপতে থাকে। এমনি এক দিন আমি বৈসা বৈসা মুন জুস আর টার্কি সীডস-এর খোয়াব দেখতেছিলাম - তখনি ঢুকল সে। তাকাইল আমার দিকে, কিন্তু দেখতে পাইল না। আয়নার সামনেই বসল, আমি দেখা দিলাম না।

“নিশ্চয় আমি আগডুম বাগডুম ভাবতেছি”, ফিসফিস করতেছিল জিরেল, “ঐটা অবশ্যই গাঁজাখুরি স্বপ্ন ছিল আমার।”

নাইটগাউন খুইল্যা উদাম হৈয়া দাঁড়াইল সে ঐখানে। জানতাম ওর স্বামী শহরে গেছে এবং গতরাত্রে স্ত্রীর সঙ্গে শুইছে, যদিও জিরেল এখনও গোসল কৈরা পুতপবিত্র হয় নাই। অথচ তালমুদ শরীফে আছে, কোনো স্ত্রীলোকের পবিত্র হৈতে দশখান শর্ত পূরণ করা লাগে, আর বেলেল্লা হৈতে যে কোন একটা শর্তের অপমানই যথেষ্ট। রয়েজি গ্লাইনের কন্যা জিরেল আসলে আমাকেই খুঁজতেছিল এবং ওকে বিষণ্ন লাগতেছিল খুব। সে আমার, আমার, আমি ভাবলাম। আজরাইল তার বল্লমসহ তৈরি, হিংসুটে এক পিচ্চি শয়তান দোযখের মধ্যে মেয়েটার জন্য কড়াই বসাইতেছে, আরেক পাপী হতভাগির জন্য খড়িকাঠ টুকাইতেছে। সব তৈয়ার - বরফের চাঁই আর জীবন্ত কয়লা, ওর জিহ্বার জন্য আংটা, স্তনের জন্য প্লায়ার্স, ওর যকৃত খাওয়ার জন্য ইঁদুরের পাল, আর পাকস্থলিতে কামড় বসানোর জন্য কৃমি। কিন্তু আমার ছোট্ট শিকার এসবের কিছুই টের পাইল না। সে নিজের বাম স্তনে হাত বুলায়া নিল, তারপর ডান স্তনে। তলপেট দেখল, তারপর পায়ের পাতা। সে কি এখন বই পড়বে? নখে পালিশ লাগাবে? চুল আঁচড়াবে? স্বামীর আনা আতরের গন্ধ বাইর হচ্ছে ওর গা থিকা, ভুর ভুর গোলাপগন্ধ। স্বামী ওকে প্রবালের যে নেকলেসটা উপহার দিছিল, সেইটাই পরে আছে সে। কিন্তু সর্প না থাকলে হাওয়াবিবি কেমনে হয়? শয়তান না থাকলে খোদার মাহাত্ম্য কি? জিরেল ছিল কামনায় একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ। বেশ্যার মত আতিপাতি কৈরা খুঁজতেছিল আমারে। কাঁপা-কাঁপা ঠোঁটে আবৃত্তি করল:

হাওয়ার মতন বেগে
গহীন পাতাল থেকে
কালো বিড়াল তুমি
নাগালে আসো, চুমি!
সিংহ বিক্রমে
মাছের বোবা প্রেমে
স্তব্ধ দেশের দেশী
নাও, তোমার ফুলরাশি!

শেষ শব্দটা আউড়ানমাত্র দেখা দিলাম আমি। আমারে দেখামাত্র ওর মুখ উজ্জ্বল হৈয়া উঠল।

“ও। তুমি এখানে?”

“চলে গেছিলাম”, বললাম, “কিন্তু ফিরে এলাম।”

“কৈ ছিলা এই কদিন?”

“ছিলাম, যেখানে কোনো স্থান নাই সেইখানে। ছিলাম আসমোদিউসের দুর্গের কাছে, যে জঙ্গলটায় সোনার পাখি থাকে তার কাছে একটা বেশ্যাদের প্রাসাদ আছে সেইখানে।”

“এত দূরে?”

“আমার কথা একিন না হৈলে আসো আমার সাথে। পিঠে চাইপ্যা বস, শিং চাইপ্যা ধর, তোমারে লৈয়া পতপত ডানা ছড়াই আকাশে। দুইজনায় পাহাড়পর্বত ডিঙায়া উইড়া যামু সেইখানে।”

“কিন্তু আমার পরনে তো কিছুই নাই।”

“সেইখানে কেউ কাপড় পরে না।”

“আমার স্বামী জানবে না কোথায় গেছি আমি?”

“যা জানার তাড়াতাড়িই জানবে সে।”

“লাগবে কতক্ষণ যাইতে?”

“সেকেন্ডেরও কম।”

“ফিরব কখন?”

“সেইখানে গেলে কেউই ফিরতে চায় না।”

“কি করব আমি সেইখানে?”

“আসমোদিউসের কোলে বৈসা উনার দাড়ি দিয়া বেনী বানাইবা। আলমন্ড আর পোর্টার খাইবা। সন্ধ্যা হৈলে উনার সামনে নাচবা। তোমার গোড়ালিতে ঘণ্টি বাঁধা থাকবে, আর সব শয়তান নাচবে তোমারে ঘিরা।”

“তারপর?”

“আমার প্রভু খুশি হৈলে তুমি তারই হৈবা। আর না হৈলে উনার সাঙ্গপাঙ্গদের কেউ তোমার দায়িত্ব নিবে।”

“সকাল হৈলে?”

“সেইখানে সকাল নাই।”
“তুমি কি থাকবা আমার সঙ্গে?”

“তোমাকে নিতে পারলে আমার পুরস্কার জুটবে চূষার জন্য একখান হাড্ডি।”

“হায় রে অভাগা শয়তান, মায়া লাগতেছে তোর জন্য, কিন্তু আমি যাব না। আমার সোয়ামি আছে, পিতা আছে। সোনারূপা আছে, পোশাক আছে, ওল আছে। আমার জুতার হিল ক্রাশনিকে সবচে উঁচা।”

“ঠিক আছে। তাইলে বিদায়।”

“দাঁড়াও দাঁড়াও। এত তাড়াহুড়া ক্যান গো? কী করা লাগবে কও।”

“এইত লক্ষ্মী মেয়ের মত কথা। মন দিয়া শোন, সবচে শাদা যে ময়দা তার কাঁই বানাও প্রথম। তাতে মিশাও মধু, ঋতুস্রাব, নষ্ট ডিম, শুয়োরের চর্বি, ষাঁড়ের অন্ডকোষের চর্বি এক চামচ, এক কাপ মদ। সাবাথের দিন কয়লার আগুনে এইটা সিদ্ধ কর। তারপর স্বামীরে লৈয়া বিছানায় যাও এবং এইটা খাইতে দাও। মিছা কথা বৈলা বৈলা জাগায়া রাখ তারে, তারপর খোদা-না-খাস্তা কথা বৈলা ঘুম পাড়াও। যখন সে নাক ডাকতে শুরু করবে, তার অর্ধেক দাড়ি আর একটা কানের লতি কাইট্যা লও। লও যা সোনাদানা আছে, দেনমোহরের কাগজটা পুড়ায়া দাও, আর কাবিননামা ছিঁড়া ফালাও। সোনাদানা ফালায়া দাও কসাইটুলির জানলার নিচে, বাড়ি ছাড়ার আগে প্রার্থনার বই ডাস্টবিনে ফালায়া দাও, মেথুরা শরীফে থুথু ছিটাও, বিশেষত যেখানে যেখানে ‘শাদাই’ লেখা আছে সেই স্থানগুলায়। তারপর সোজা আস আমার কাছে। আমি তোমারে পিঠে নিয়া উড়ব ক্র্যাশনিক থিকা মরুভূমিতে। আমরা উড়ব ব্যাঙের বিষ্ঠাভরা মাঠের ওপর দিয়া, নেকড়েভরা জংলার ওপর দিয়া, সমকামীদের আখড়া ডিঙায়া - যেখানে সাপ হৈল পন্ডিত, হায়েনা হৈল শিল্পী, কাক হৈল মৌলভী, চোরে দেখাশুনা করে খয়রাতির টাকা। সেইখানে সকল অসুন্দর হৈল সুন্দর, বাঁকা হৈল সোজা, নির্যাতন হৈল আরামদায়ক, ব্যঙ্গ হৈল অতি উচ্চ প্রশংসা। তাড়াতাড়ি কর, সময় খুব কম।”

“ভয় লাগতেছে পিচ্চি শয়তান, আমার খুউব ভয় লাগতেছে।”

“আমাদের সাথে গেলে প্রথম প্রথম সবারই লাগে।”

আরো কিছু জিগাইবার ইচ্ছা ছিল জিরেলের, হয়ত আমার বক্তব্যের স্ববিরোধ ধরার জন্য, কিন্তু পালাইলাম আমি। সে ওর ঠোঁট চাইপ্যা ধরল আয়নার মধ্যে, কিন্তু আমার লেজের একটুখানি নাগাল পাইল খালি।


৩.
ওর বাবা কাঁদল। স্বামী মাথার চুল ছিঁড়ল। চাকরবাকরেরা ওরে খুঁজল সেলারে আর বাড়ি-লাগোয়া উঠানে। ওর শাশুড়ি বেলচা দিয়া চিমনীর ভিতরটা পর্যন্ত খুঁচায়া দেখল। গরুর গাড়ির গাড়িয়াল আর কসাইরা ওরে তন্ন তন্ন কৈরা খুঁজল জঙ্গলে। রাতে টর্চ জ্বলল এখানে ওখানে আর তালাশকারীদের গলা ইকো হয়: “জিরেল, কোথায় তুমি? জিরেল! জিরেল!” সন্দেহ হৈল যে, সে কনভেন্টে পালায়া গিয়া থাকতে পারে। কিন্তু পুরোত মশায় ক্রুশ ধৈরা কসম কাটল, জিরেলরে সে দেখে নাই। খোঁজাখুঁজির জন্য পাঠানো হৈল এক হাতসাফাইকারীকে, তারপর পাঠানো হৈল এক জাদুকর মহিলাকে যে কারো আদলে অবিকল মোমের মূর্তি বানাইতে পারে, শেষে পাঠানো হৈল আরেকজনকে যে জাদুর আয়না দিয়া মৃত বা নিখোঁজ মানুষের সন্ধান করতে পারে। কিন্তু যখন আমি আমার শিকার হাতে পাইয়া যাই, তখন দুনিয়ার কারো সাধ্য থাকে না তাকে ফিরায়া নিবার। ডানা ছড়াইলাম ওকে পিঠে নিয়া। জিরেল আমারে অনেক প্রশ্ন করল, কিন্তু জবাব দিলাম না। সোডম-এ পৌঁছার পর লট শালার বৌ-এর কাছে থামলাম একপলক। তিনটা বলদে তখন ঐ বেটির নাক চুষতে ছিল। লট শালা শুইছিল গুহায় ওর মাইয়াগুলার সাথে, বরাবরের মতই মাতাল।

ছায়ার এই জগতে সবকিছুই পরিবর্তনশীল, কিন্তু আমাদের জগতে সময় একেবারে স্থির। এইখানে বাবা আদম এখনও ল্যাংটা, হাওয়াকে এখনও সাপে ফুসলাইতেছে। হাবিল মারতেছে কাবিলকে, রক্তচোষা নীলমাছি শুইতেছে হাতির সাথে, বেহেশত থিকা নামতেছে ঝর্ণাধারা, মিশর দেশে হাতে কাদা ঠেলতেছে ইহুদীরা, শরীর চুলকাইতেছে জব। যতক্ষণ সময় প্রবাহিত হয়, চুলকাইতেই থাকবে সে, কিন্তু আরাম পাইবে না সে কোনোদিন।

জিরেল কী যেন কথা কৈতে চাইছিল, কিন্তু পাখা ঝাপটায়া আমি লাপাত্তা হৈয়া গেলাম। আমার কাজ শেষ। গিয়া প্রাসাদের অনেক উঁচু কার্ণিশে বাদুড়ের মত ঝুলতে থাকলাম, চোখ খোলা কিন্তু দৃষ্টি নাই চোখে। দুনিয়া হৈল বাদামি আর বেহেশত হৈল হলুদ। বৃত্তাকারে দাঁড়ায়া শয়তানগুলা লেজ নাচাইতেছিল। দুইটা কাছিম ছিল টাইট জড়াজড়ি অবস্থায়, একটা পুরুষ পাথর উপগত একটা নারীপাথরের ওপর। শাব্রিরি আর বারিরি উপস্থিত হৈল। শাব্রিরির জন্ম হৈছে একটা বর্গেেত্রর আকার থিকা। তার মাথায় টুপি, হাতে বাঁকা তলোয়ার। তার পা-গুলা হাঁসের, কিন্তু ছাগলের মত দাড়ি আছে মুখে। নাকের ওপরে জোড়া চশমা আছে তার, কথা বলে জর্মন উচ্চারণে। আর বারিরি একইসঙ্গে বানর, টিয়া, ইঁদুর এবং বাদুড়। শাব্রিরি আর বারিরি মাথা নোয়াইল একটু, তারপর শুরু করল বিদূষক স্টাইলে:

আর্গিন মার্গিন
সস্তায় বেছে নিন
কিউট এক দোয়েল
নাম তার জিরেল
(তার) খোলা দরজা
(তাই) প্রেমে খুব মজা!

শাব্রিরি যখন জিরেলকে বাহু বাঁধনে ধরতে গেল, চেঁচাইল বারিরি, “ওরে তোর শরীরে হাত দিতে দিবি না মাগি! মাথায় খুঁজলি-প্যাঁচড়া আছে ওর, পায়ের মধ্যে ঘা, মেয়েমানুষরে মজা দিবার মতা নাই ওর। মুখে ফটফট, খাসি করা মোরগও ওর থেইকা ভাল। এরকম ওর বাপেও ছিল, দাদাও। তার চাইতে আয়, প্রেম করবি আমার সাথে, আমি মিথ্যারাজের নাতি। তাছাড়া আমার মেলা টাকাপয়সা আছে, ফ্যামিলিও ভাল। আমার দাদী ছিল নামা-র কন্যা ম্যাকলাথের সখী। আসমোদিউসের পা ধোয়াইয়া দিত আমার মা। আমার বাবা, চির দোযখনসীব হোক তার, বইত শয়তানের নস্যির বাক্স।”

এইভাবে শাব্রিরি আর বারিরি জিরেলের চুল ধৈরা টানাটানি করতে আরম্ভ করল, প্রতিবার টানের সাথে তারা জিরেলের গোছা গোছা চুল উপড়ায়া ফেলতে লাগল। তখনি জিরেল তার অবস্থাটা পুরাপুরি বুঝল এবং ‘ছাইড়া দেও ছাইড়া দেও’ বলে চিৎকার করতে লাগল।

“কী নিয়া লোফালুফি চলতেছে?” কেটেভ মারিরি জিগায়।
“ক্রাশনিকের একটা ছিনাল।”
“ভাল কিছু পাওয়া গেল না?”
“নাহ। ঐটাই ঐখানে ভাল।”
“আনল কে?”
“একটা পিচ্চি শয়তান।”
“ঠিক আছে। আবার শুরু কর।”
“বাঁচাও বাঁচাও।” জিরেল গোঙ্গাইতে থাকল।
“ঝুলায়া দাও ঐটারে”, ক্রোধের পুত্র র‌্যাথ চেঁচাইল, “কাইন্দা কোনো লাভ নাই মাগী। এইখানে সময় লড়েচড়ে না। যা বলা হৈছে কর, তুই এখানে জোয়ানও না, বুড়িও না।”

জিরেল কান্নায় ভাইঙ্গা পড়ল। ওর হিক্কা আর বিলাপের শব্দে লিলিথের ঘুম চটকায়া গেল। আসমোদিউসের দাড়ির ভিতর থিকা মুখ বাইর করল সে, ওর মাথার প্রতিটা চুল হৈতেছে একেকটা কিলবিল-করা সাপ।

“মাগিটার সমস্যা কি?” জিগাইল লিলিথ, “চেঁচাইতেছে ক্যান?”
“ওরা শুরু করছে ওর ওপর।”
“আরো একটু লবণ মিশায়া নিতে ক”
“আর আগে চর্বি ছাড়ায়া নিতে ক”

এই মশকরা চলল হাজার হাজার বছর ধৈরা, তারপরেও প্রেতচক্রের কান্তি নাই। প্রতিটা শয়তান তার তার করণীয় সারল, প্রতিটা পিচ্চি শয়তান তার তার মত মজা নিল। ওরা টানল, ছিঁড়ল, কামড়াইল আর চিমটাইল। পুরুষ শয়তানগুলা এত খারাপ না, মাদী শয়তানগুলা হৈতেছে ভয়ানক - আদেশ দিল: খালি হাতে স্যুপ বানাবি! আঙুল ছাড়া বিনুনী করবি! পানি ছাড়া ধোয়ামোছা করবি! গরম বালুর মধ্যে মাছ ধরবি! না ভিজ্যা গোসল করবি! বাড়িতে থাকবি এবং রাস্তায় হাঁটবি! পাথর দিয়া মাখন তৈয়ার করবি! বোতল ভাঙ্গবি কিন্তু মদ ফেলতে পারবি না!!

খোদা বৈলা কি কেউ আছেন? তিনি কি আসলেই দয়াশীল? জিরেল কি কোনোদিন মুক্তি পাবে? সৃষ্টির গোড়াতেই কি সাপের সাথে অশুভের যোগ ছিল? আমি কেমনে বলি? আমি তো ছোট্ট একটা শয়তানমাত্র। পিচ্চি শয়তানদের পদোন্নতি হয় না খুব একটা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসে যায়, এক জিরেলের পর আরেক জিরেল, অযুত অযুত প্রতিচ্ছবির উস্কানি, অযুত অযুত আয়নার ভিতর।


(নর্বার্ট গাটারম্যান-এর ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সুমন রহমান)



ফেব্রুয়ারি ২০০৬

অন্ধ সঙ্গীতকার: ভ্লাদিমির করলেংকো



সে দ্রুত তার মাকে চিনতে শিখে ফেলল - পায়ের আওয়াজ শুনে, কাপড়ের খসখসানি শুনে, এবং অন্যান্য নানান শব্দের মাধ্যমে যেগুলো সেই-ই কেবল আলাদা করে বুঝতে পারত। ঘরে যত লোকই থাকুক না কেন অথবা তারা যেভাবেই চলাচল করুক না কেন - সে কোন ভুল না করেই তার মায়ের কাছে চলে যেতে পারত। মা যখন তাকে কোলে নিত - সেটা সে আশা করুক আর নাই করুক - সে সবসময়ই বুঝতে পারত যে এটা তার মা। অন্যরা যখন তাকে কোলে নিত, সে আলতোভাবে তাদের মুখের উপর আঙুল বুলাত এবং এভাবে ধীরে ধীরে চিনে ফেলল কোনটা তার নার্স, কোনটা ম্যাক্সিম চাচা এবং কোনটা তার বাবা। এর বাইরে অচেনা কেউ যখন তাকে কোলে নিত, ঐ মানুষটার মুখের উপর বুলাতে থাকা তার আঙুলগুলো শ্লথ হয়ে যেত। আস্তে আস্তে, কিন্তু সুনিশ্চিতভাবে, অচেনা মুখটিকে তার আঙুলগুলো সনাক্ত করে ফেলত, তার মুখমণ্ডলকে খুব নিবিষ্ট লাগত তখন, যেন তার আঙুলগুলো তার হয়ে ‘দেখছে’।



প্রকৃতিগতভাবে সে ছিল প্রাণবন্ত ধরনের শিশু। কিন্তু যতই দিন যেতে থাকল ততই যেন তার অন্ধত্বের ছাপ তার স্বভাবের উপর বসে যেতে থাকল। তার চলাফেরা হয়ে উঠতে থাকল কম চটপটে। ঘরের নিরিবিলি কোনাগুলোতে লুকিয়ে বসে থাকার একটা অভ্যাস গড়ে উঠল তার, সেখানে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত অচঞ্চল ভঙ্গিতে, এবং তার মুখ দেখে মনে হত যেন কিছু শোনার চেষ্টা করছে। ঘরে যখন কেউ থাকত না, এবং অন্যদের কথাবার্তা বা চলাফেরার শব্দ যখন তার মনোযোগ আকর্ষণ করত না, তাকে দেখে তখন নে হত গভীর চিন্তায় ডুবে গেছে এবং তখন তার সুন্দর মুখটাতে থাকত একটা বিপন্ন্ বিস্ময়ের আভা, সেটি মোটেও শিশুসুলভ ছিল না।

ম্যাক্সিম চাচা ঠিকই বলেছিলেন। অন্ধ শিশুটির প্রাণবন্ত ও অনুসন্ধানী চরিত্র তাকে অনেক সাহায্য করল। তার স্পর্শের বোধ হয়ে উঠল অসাধারণ। একটা সময়ে মনে হতে থাকল যেন, এমনকি, তার মধ্যে রঙ-এর অনুভব জেগে উঠছে: উজ্জ্বল রঙ-এর কোন জিনিসের উটর তার আঙুলগুলো বেশি সময় ধরে খেলা করত, এবং সেই সময়ে তার মুখে একটা অতিনিবিষ্ট মনোযোগের ভাব ফুটে উঠত। সবচেয়ে বিস্ময়কর উন্নতি, যেটি সময়ের সাথে সাথে পরিষ্কার হয়ে উঠল, সেটি হল তার শ্রবণশক্তি।

শিগগিরই সে বিভিন্ন শব্দের পার্থক্যের মাঝ দিয়ে এই বাড়ির প্রতিটি ঘরকে আলাদা করে চিনতে শিখল। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের পায়ের শব্দ আলাদা করে চিনল - তার পঙ্গু চাচার চেয়ারের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, মায়ের সেলাই মেশিনের একটানা ছন্দ এবং ঘড়ির একঘেয়ে টিকটিক। খখনো কখনো মেঝেয় হামাগুড়ি দিতে দিতে সে এমন কোন শব্দে থমকে যেত এবং কানখাড়া করত যা স্বাভাবিকভাবে কারো শ্রুতিগোচর হওয়ারই কথা নয়। দেখা গেল তখন সে হাত বাড়াচ্ছে ঘরের দেয়ালে অলসভাবে ঘুরতেফিরতে থাকা একটা মাছির দিকে। মাছিটা উড়ে গেলে তার মুখে কিন্তু একটা বেদনার আভা ফুটে উঠে, যেহেতু সে বুঝতে পারে না কোন দিকে মাছিটা উড়ে গেল। অবশ্য বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই বেদনাবোধ ফিকে হয়ে গেল তার। বরং মাছিটা যে দিকে উড়ে যেত, সেদিকে সে তার মাথা চকিতে ঘুরিয়ে ফেলতে পারত তখন। তার শ্রবণমতা এতটাই পোক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, মাছিটার ত্রস্ত পাখা-ঝাপটানিকে সে খুব ভাল করে চিনে ফেলেছিল ইতিমধ্যে।

তার চারপাশের পৃথিবী - গতি, শব্দ ও রঙের পৃথিবী - এই অন্ধ বালকটির কাছে মুখ্যত পৌঁছাল শব্দের আকারে; আর তার চারপাশের ধারণাবলী হয়ে উঠল শব্দের ধারণা। তার মুখে সবসময় থাকত একটা ব্যতিক্রমী ধরনের শোনার ভঙ্গি, এজন্য তার থুতুনিটা সবসময় সামনের দিকে একটু বাড়ানো থাকত। আশ্চর্যজনক ভাবে চোখের ভুরু নড়ত তার, কিন্তু সুন্দর চোখজোড়া থাকত অচঞ্চল। ফলে তার মুখ বয়ে বেড়াত শিশুসুলভ নিবিষ্টতা এবং দুঃখবোধের একটা যুগপৎ মনোভাব।




৬.

অন্ধ বালকের জীবনের তৃতীয় শীতকালটাও ক্রমে শেষ হয়ে এল। দরজাগুলো আটকে-দেয়া বরফ গলতে শুরু করল, এবং শুরু হতে লাগল বসন্তের ব্যস্তমস্ত জীবন। সারা শীতকাল সে অসুস্থ হয়ে ছিল ঘরের মধ্যে, বাইরের বাতাসের ছোঁয়া লাগে নি বলতে গেলে; বসন্তের ছোঁয়ায় তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে লাগল।

জানালার খড়খড়িগুলো উঠিয়ে দেয়া হল, বসন্তের আনন্দ বিপুল উদ্যমে ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। সূর্যের প্রফুল্লচ্ছটায় ঘরগুলোতে বয়ে যেতে লাগল আলোর বন্যা। সমুদ্র সৈকত, তখনও জনশূন্য, বরাবরের মতই জানালার বাইরে নিমন্ত্রণের মত দোলা দিতে লাগল। আর দূরে, ফসল কেটে-নেয়া কালো মাঠগুলো শুয়ে, স্থানে স্থানে বরফের আস্তর তখনও মিলায় নি। ঘাসগুলো অনেক জায়গাতেই বিবর্ণ ধরনের সবুজ রঙ পেতে আরম্ভ করছিল তখন। বাতাস ছিল নরম, বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য যথার্থ। পুরো বাড়িটারই নবায়ন হল বসন্তের যাদুকরী শক্তির পরশে।

অন্ধ বালকের কাছে বসন্ত উপস্থিত হল ঘর ভরে-দেয়া উচ্ছল শব্দরাশির রূপে। বসন্তের বন্ধনহারা জলরাশির শব্দ শুনতে পেল সে, ঢেউয়ের পেছনে ঢেউ ভাঙ্গছে নিরন্তর, পাথরের মাঝ দিয়ে কলকল করে বইছে, পথ করে নিচ্ছে নরম ও ভেজা মাটির বুক চিরে। বাতাসের কানে কানে কথা বলা সমুদ্র তীরের গান শুনল সে। ঘরের চাতালে যে বরফ জমেছিল, এখন তা সূর্যের আলোয় গলে গলে পড়ছে, কান পেতে সে শুনতে লাগল অবিরত জলবিন্দু পতনের টুপটাপ শব্দ। নিখুঁত ও পরিষ্কারভাবে এই শব্দসমূহ ঘরে এসে আছড়ে পড়তে থাকল, যেন বা গোল গোল নুড়ি পড়ছে এমন মনে হল। কখনো কখনো, এই শব্দসমূহের মাঝে সারসের ডাকও এসে মিশে যেতে লাগল, বিশেষত যখন সে সুদূর আকাশ থেকে মাটির দিকে ডাইভ দিয়ে নেমে আসে এবং তারপর সেই ডাক আস্তে আস্তে বাতাসে মিলিয়ে যায়।

বসন্তের এই মহড়া বালকটির মুখে এক ধরনের বিপন্নতা ও দুঃখবোধের আভা তৈরি করল। সে মুখ বাড়িয়ে, ভুরু কুঁচকে অনেক আয়েশ করে শুনত, তারপর, যেন এইসব শব্দ তাকে ভীত করছে, এমন ভঙ্গিতে মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিত এবং তার কোলের সঙ্গে লেপ্টে থাকত।

“ওর সমস্যা হচ্ছে কিসে?” মা ভাবল আর আশেপাশের সবাইকে জিজ্ঞেস করল।

ম্যাক্সিম চাচা অভিনিবেশ নিয়ে দীর্ঘসময় বালকটির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার সাম্প্রতিক আচরণের কোনো ব্যাখ্যা পাবার প্রত্যাশায়। কিন্তু ব্যাখ্যা মিলল না।

“সে আসলে....বুঝতে পারছে না” মা দ্বিধাজড়িত গলায় বলল, ছেলের মুখের বিপন্নতা খেয়াল করতে করতে।

সত্যিকার অর্থে, সে ভীত এবং অসহজ হয়ে পড়েছিল, আর এখন পুরোপুরি বিমূঢ় হয়ে পড়ল এইসমস্ত নতুন শব্দ ও ধ্বনির আগমনে, ভাবছিল পুরানো শব্দগুলো যেসব সে চিনত, সেগুলো মিলিয়ে গেল কোথায় ?


৭.

নতুন বসন্তের কলকাকলি ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এল। যতই দিন যেতে লাগল, সূর্যের উত্তাপ ততই প্রকৃতিকে তার নিজস্ব ছন্দ ফিরিয়ে দিতে লাগল। জীবন আবার পুরনো গতি পেতে শুরু করল। পুরো থ্রটল ঠেলে দেয়া ইঞ্জিনের মতই সে সামনের দিকে ছুটতে আরম্ভ করল। তৃণভূমি সবুজ হয়ে উঠল, বাতাস ভারী হয়ে উঠল আমের বোলের গন্ধে।

ঠিক হল যে, বালকটিকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হবে, মাঠের মাঝ দিয়ে কাছের নদীতীরে।

মা তাকে কোলে নিল। ম্যাক্সিম চাচা ক্রাচে ভর দিয়ে তাদের পাশে পাশে হেঁটে চলল। তারা মাঠ পার হয়ে নদীপারের একটা সবুজ-ছাওয়া টিলার দিকে হাঁটল, সূর্যের আলো ও বাতাস একে একেবারে খটখটে শুকনো করে দিয়েছে ইতিমধ্যে। টিলার উপর থেকে চারপাশের এলাকাটি আরো পরিষ্কার ও বিস্তৃতভাবে দেখা গেল।

মা হঠাৎ তার ধরে রাখা বালকের ছোট্ট মুঠির মধ্যে একটা চাপ অনুভব করল। বসন্তের প্রমত্ত যৌবন বালকটির মাকেও উতলা করে দিয়েছে আজ, ফলে বরাবরের মত ছেলের অস্বস্তিতে তাকে সংবেদনশীল দেখা গেল না। মা হেঁটেই চলল, মাথা উপরের দিকে তুলে, বসন্তের বাতাসে বুকভরা গভীর নিঃশ্বাস নিতে নিতে। নিচের দিকে যদি সে একমুহূর্তের জন্যও তাকাত, তাহলেও সে তার ছেলের বিপন্ন মুখভঙ্গি দেখতে পেত। বালকের অন্ধ চোখ সরাসরি সূর্যের দিকে ফেরানো, ঠোঁটদুটো ফাঁক হয়ে থাকা, পরিষ্কার বিস্ময়। সে খুব ছোট ছোট কিন্তু দ্রুত নিঃশ্বাস নিতে লাগল, ডাঙ্গায় তুললে মাছ যেমন করে। একসময়, তার বিপন্ন বিস্ময়ের আভা ভেদ করে মুখে ফুটে উঠল অনাবিল আনন্দের এক ভঙ্গি, বিপন্নতাকে এক লহমায় হটিয়ে দিয়ে ছোট্ট মুখটিকে আলোকিত করে তুলল সেই আভা। এর পরের মুহূর্তেই আবার সেই বোবা বিস্ময়, ভীত অনুসন্ধান। শুধু তার দেখার চোখজোড়া থাকল অচঞ্চল, দেখল না কিছুই, প্রকাশও করল না কিছু।

তারা ছোট্ট টিলাটির ওপরে উঠে ঘাসে ছাওয়া চূড়াটিতে বসল। অন্ধ শিশুটিকে তার মা তুলে নিয়ে এমনভাবে বসাল যেন তার আরাম হয় এবং তখনো সে তার মার হাত খামচি দিয়ে ধরে থাকল, যেন ভয় পাচ্ছে পড়ে যাবে, যেন তার পায়ের নিচে মাটি ঠিকমত খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু আবারও, বসন্তের সৌন্দর্যে বিমোহিত মা সেসব খেয়াল করল না।

সময়টা ছিল মধ্যদুপুর, ঘন নীল আকাশে সূর্যের অবিচল মূর্তি। আর নিচ দিয়ে চওড়া এবং গভীর নদীটি বসন্তের আশির্বাদে পূর্ণ হয়ে কলকল বয়ে যাচ্ছে। সবেমাত্র শীতের খোলস ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছে সে, এখানে ওখানে এখনও বরফের খণ্ড খণ্ড টুকরো ভাসছে - উজ্জ্বল আয়নার মধ্যে যেন সাদা সাদা ফোঁটা। তীরের জলঘাসগুলো প্লাবিত হওয়ায় গোটা এলাকাটিকে একটা বড়সড় বিলের মত দেখাচ্ছে; সেখানে মেঘের সাদা মিনার প্রতিফলিত হয়ে ফিরে ফিরে হারিয়ে যাচ্ছে, নদীর মধ্যে বরফের টুকরোর মতই। আর মাঝেমধ্যে বাতাস এসে জলের মধ্যে ঢেউয়ের দোলা তৈরি করে, সূর্যের আলোয় চকচক করে ওঠে নদী। নদী ছাড়িয়ে, দূরে, কালো, ভেজা ও আবাদযোগ্য সারিসারি মাঠ বিছিয়ে, আর কাঁপা কাঁপা কুয়াশার ঐ পাড়ে দেখা যায় কার যেন খড়ে-ছাওয়া গোয়াল, একেবারে বনের ঘন নীল কিনারায়। মনে হচ্ছে ধরিত্রী যেন শ্বাস ফেলছে, লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস, আকাশের উপাসনা করতে গিয়ে ধূপের সুগন্ধি জ্বালছে এখানে ওখানে।

সমগ্র প্রকৃতি আসলে একটা বিশাল মন্দির, যেখানে সে একটা ছুটির আয়োজনের মাঝে বিন্যস্ত হয়ে আছে। কিন্তু অন্ধ শিশুটির কাছে তা শুধুই অন্ধকার, বিশাল এবং সীমাহীন; একটা অন্ধকার যা অনভ্যস্ত ক্রোধের মত তাকে ঘিরে রাখে, যা প্রতিটি নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাকে নাড়ায়, ঝাঁকায়, বাজায় - এবং এত বিচিত্রভাবে যে তার হৃৎস্পন্দন বেদনাদায়কভাবে বাড়তেই থাকে।

যখন সে দরজার বাইরে প্রথম পা দিল, যখন সূর্যের আলো সরাসরি তার মুখে এসে পড়ল, তার চামড়ায় উত্তাপ ছড়াল, সে তখন সহজাত প্রবৃত্তির বশেই তার অন্ধ চোখজোড়া সূর্যের দিকে ফেরাল, যেন বুঝতে পেরেছে সে এটাই জগতের কেন্দ্র। চারপাশের দিগন্তবিস্তার, উপরের অসীম নীল - এসব সে কিছুই জানে নি তখন। সে শুধু বুঝতে পেরেছিল যে কিছু একটা জিনিস, হালকা, ছুঁয়ে যাওয়া, তার মুখ ছূঁয়েছে এবং মুখে উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। আর তারপর কিছু একটা, ঠাণ্ডা ও আলোময়, কিন্তু সৌর আলোর চেয়ে কম উত্তাপময় - তার মুখ থেকে ঐ উত্তাপকে ঝেঁটিয়ে দিয়ে ঠাণ্ডা এক আবেশে মুখখানি ভরিয়ে দিল। বাড়ির ভিতরে কিভাবে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে হয় সেটা শিশুটি শিখেছিল। সেখানে স্পেস ছিল শূন্য। কিন্তু এখানে - এখানে সে এমন কিছু দিয়ে বেষ্টিত যা ঢেউয়ের মত তার দিকে ছুটে-ছুটে আসছে, ব্যাখ্যার অতীত বৈচিত্র্য নিয়ে; এই বুলাচ্ছে নরম হাত, এই আবার পেশী জাগছে, জাগিয়ে দিচ্ছে। সূর্যের গরম ভাপ তাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, বাতাস তার গালে গ্রীবায় খেলছে, থুতুনি থেকে কপাল পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে, যতক্ষণ না তার কানে বেজে ওঠে বাতাসের মধুর সঙ্গীত, যেন তারা চাইছে এই অন্ধ বালকটিকে তুলে এমন এক জায়গায় নিয়ে যেতে যে জায়গাটি তার অন্ধ চোখের অধিগম্য নয়। এই অনুভূতি তার চেতনাকে বেভুলো করছে, অবসন্ন করে দিচ্ছে। শিশুটি তার মায়ের হাত জোরে আঁকড়ে ধরে রাখল, দ্রিম দ্রিম কাঁপছে তার হৃদপিণ্ড, বন্ধ হবার উপক্রম।


তাকে ঘাসের ওপর বসিয়ে দেয়া হলে সে প্রথমে কিছুটা সহজ বোধ করল। বিপন্নতার অনুভূতি তখনও তার ছিল, তার হৃদয় পূর্ণ করে ছিল, তবে এখন সে তার চারপাশের শব্দগুলোকে আলাদা করতে পারছে। অন্ধকার ও তার ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া ঢেউগুলো তখনও আগের মতই তার কাছে আসতেছিল। মনে হচ্ছিল ঢেউগুলো যেন তার শরীরের ভিতর ঢুকে পড়ছে; তার রক্তধারা শিরার ভিতর যেন সেই ছন্দেই বইছে। এখন অবশ্য নানান ধ্বনিও ভেসে আসছে: ভরত পাখির কাঁপা কাঁপা ডাক, বার্চ গাছের নতুন পাতার মৃদু মর্মর, নদীর ছলছলাৎ। কাছাকাছি একটা সোয়ালো পাখি চক্কর খেয়ে গেল, ওর হালকা ডানায় শিস ধরিয়ে; ডাঁশমাছিগুলো ভনভন করছিল, এবং, দূরের মাঠে কোন কৃষক তার হালের বলদজোড়াকে টেনে নিতে গিয়ে হেট হেট বলছিল, একটু থেমে থেমে, সেই বিষণ্ন শব্দগুলোই ভেসে ভেসে আসছিল।

কিন্তু অন্ধ শিশুটির পক্ষে এই সবগুলো শব্দকে তাদের ঐকতানের মধ্যে অনুধাবন করে ফেলা সম্ভবপর ছিল না। সে তাদেরকে একত্র করে বুঝতে পারছিল না, তাদের স্ব স্ব প্রেক্ষাপটের মধ্যে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বুঝতে পারছিল না। এগুলো সবই ছিল আলাদা আলাদা; এই দৃষ্টিহীন বালকের ছোট্ট মাথার ভিতরে একটা একটা করে ঢুকছিল: কোনোটা নরম, কোনোটা অস্পষ্ট, কোনোটা চড়া, পরিষ্কার এবং কানে তালা লাগানোর মত। কখনো কখনো শব্দগুলো একসঙ্গে আসে, একটা বেসুরো সমাবেশের মধ্যে যেন একটা অপরটার ওপর হামলে পড়ে। তখনো মাঠের শিস ধরানো বাতাস তার কানে শিস ধরিয়েই চলছিল।


[ভ্লাদিমির করলেংকো-র "দ্য ব্লাইন্ড মিউজিশিয়ান" উপন্যাসের একটা অংশ, অনুবাদ করেছিলাম "দেখা না-দেখার চোখ" বইটির জন্য]