প্রথম আলো বছরে বেশ কয়েকবার বই নির্বাচন করে থাকে। সেরা ১০ মননশীল বই, সেরা ১০ সৃজনশীল বই, তরুণদের সেরা ১০ বই, প্রথম আলো বছরের সেরা মননশীল ও সৃজনশীল বই, ইত্যাদি। বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। ফলে এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনারও শেষ নেই। সব মিলিয়ে এই উদ্যোগ খুবই উৎসাহব্যঞ্জক।
এবার, পত্রিকার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকী আরেকটি বাছাই উপহার দিয়েছে। ১০ বছরের ১০ বই। লেখক তালিকায় আছেন সর্বজনাব হাসান আজিজুল হক, গোলাম মুরশিদ, হুমায়ুন আহমেদ, আবদুশ শাকুর, আনিসুজ্জামান, আনিসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, আলতাফ হোসেন, শহীদুল জহির এবং অদিতি ফাল্গুনী। বলাবাহুল্য ১০ বছরে ১০টি বই নির্বাচন করা খুবই দুঃসাধ্য কাজ এবং এরকম নির্বাচনকে সর্বতোভাবে প্রতিনিধিত্বশীল ভাবা মুশকিল। তালিকায় যাঁরা আছেন এঁদের অনেকেই ভাল লেখক। কিন্তু যারা প্রথম আলো-র এই স্বীকৃতি প্রদানের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে খেয়াল করছেন তাদের মনে এই তালিকা কিছু পর্যবেক্ষণের জন্ম দেবে। যেমন:
১. তালিকায় হুমায়ুন আহমেদ এর "জ্যোছনা ও জননীর গল্প" আছে, কিন্তু এই বইটিকে হারিয়ে দিয়ে যে বইটি প্রথম আলো পুরষ্কার জিতে নিয়েছিল ("প্রেম ও প্রার্থনার গল্প" - সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) সেটি নেই।
২. তালিকায় শহীদুল জহির আছেন, কিন্তু শাহীন আখতার নেই। স্মর্তব্য, শাহীন আখতার-এর "তালাশ" প্রথম আলো পুরষ্কার পেয়েছিল শহীদুল জহিরকে বইকে পেছনে ফেলে।
আরো আরো প্রশ্ন হয়ত করা যায়। তবে এই ইস্যুতে প্রশ্ন জাগে: কেন প্রথম আলো পুরষ্কার পাওয়া শাহীন আখতার এবং সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের জায়গা নিয়ে নিলেন তাদের রানার-আপবৃন্দ? এটা কি কোনো কনপেনসেশন প্যাকেজের আওতায় ঘটল? নাকি প্রথম আলো এখন ভাবছে হুমায়ুন আহমেদ কিংবা শহীদুল জহিরকে রেখে শাহীন আখতার কিংবা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে সেরা লেখক নির্বাচন করা যথাযথ বিবেচনা ছিল না তাদের?
সমালোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমালোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০০৮
শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০০৮
মিজান মল্লিক-এর কবিতা: পাঠপ্রতিক্রিয়া
যারা সময়াভাবে মিজান মল্লিকের কবিতা পড়বার সুযোগ পান নাই, তাদের জন্য আমার এই বাড়তি বদান্যতা। দয়া কৈরা মিজান মল্লিকের কবিতার দুইটা স্যাম্পল একবার পড়েন আপনেরা ...
মনোরঞ্জন
দেখলাম, বরই বিষয়ে লোকেদের উৎসাহ অনেক।
বাচ্চাদের কৌতূহল বিস্ময়কর! বড়রা অভিজ্ঞ থাকায় ছল-চাতুরী করে।
দেখলাম, গাছে চড়ে অনেকেই বরই পাড়ে আর যারা গাছে উঠতে পারে না তারা
দূর থেকে ঢিল ছোঁড়ে-আঁকশি ব্যবহার করে। অবশ্য বরই বিকি-কিনি হয় বাজারে।
ঠিক কবে থেকে? সেই ইতিহাস আমার ম্মরণে নাই।
যারা ইকনোমিক্স ভালো বোঝে-তারা গাছেরটাও খায় তলারটাও।
এমন কিছু মুখ আমার চেনা, যারা কদাচিৎ চেখে দেখেছে, আর কিছু-
(আমার জানামতে অন্তত এক জন) জীবনে একবারও বরই না খেয়ে পটোল তুলেছে।
তারা নিতান্তই হত-দরিদ্র আর সংস্কারাচ্ছন্ন কিনা ভেবে দেখছি।
এ কথা নিশ্চিত যে লোকেরা বরই খায়। কেউ কেউ আচার তৈরি করে-
রোদে শুকায়, সময় বুঝে আয়েশ করে খায়।
ভেবে দেখলাম। লোকেরা পরনারী আর পরদেশি ভাষা চর্চা করে।
২৪/৬/৪
কালচারের সন তারিখ
শাওন মাসের তৃতীয় দিবস। রোজ বৃহস্পতিবার ভোরবেলা আমার জন্ম।
সাল জানা নাই। তবে সংগ্রামের চেয়ে বয়সে আমি ছোট। আমার আম্মা
নিরর না। আরবিতে কোরান পড়তে সম। আর জনক নিরীহ ইশকুল
মাস্টার। রিটায়ার্ড। সৎ। কর্মঠ। সকাল-সন্ধ্যা ননস্টপ কাজ করেন। কথা বলেন কম।
বিষয় আশ্চর্যের তবে বিবরণ সত্য। আমার বাপের বাপও ছিলেন মাস্টার। উপরন্তু পাঠান।
ঘোড়ায় চড়ে তিনি মক্কা-মদিনায় যান। তাঁরে আমি শুনেছি বটে নয়নে দেখি নাই।
দাদার ইন্তেকালের সময় আমার বাপের বয়স ছিল নিতান্তই কম। মাত্র সেভেন কাসের ছাত্র।
বাপেরে দেখি। তার লগে আমার দারুণ সখ্য। যদিও আমার জন্মবিত্তান্ত তিনি লিখে রাখেন নাই।
অবশ্য তাঁর বাপেও তাঁর জন্মতারিখ লিখে রাখে নাই। আমরা কালচারের নিচে সন তারিখ দিই।
.......
পাঠক, আপনি কি স্বীয় স্মৃতিবিভ্রাট বা লেখকের নামের বিভ্রাটের আশংকা করতেছেন। আসেন আপনেরে আশংকামুক্ত করি। এর কোনোটাই ঘটে নাই। কবিতাগুলো নিশ্চিতভাবেই মিজান মল্লিকের লেখা, তবে, সম্ভবত আগে জন্মানোর সুযোগে পশ্চিমবঙ্গের করি বিনয় মজুমদার উনার ‘পূর্বকরণ’ (অনুকরণের সম্ভাব্য উল্টাশব্দ) করনের মওকা পাইয়া গেছিলেন! তবে মিজান কিন্তু এতকিছুর পরও নিজেরে আলাদা কৈরা চিনাইতে সমর্থ। বিনয়ের ঐসমস্ত বিবৃতিধর্মী কবিতার সাবটেক্সটে ভাবনার অনেক বুদবুদ উড়াউড়ি করে। মিজান তার কবিতায় এইসব ‘অহেতুক’ উড়াউড়ির রাস্তা সিলগালা কৈরা দিছেন। উনার কবিতার সারফেস ইটের মত শক্ত। ঐটাই উনারে চিননের রাস্তা।
বিনয় মজুমদার বছরে ছয়মাস হাসপাতালে থাকেন শুনেছি। হয়ত ধরাধামেও বেশিদিন থাকবেন না। উনার বন্ধুরা অনেকেই গত হৈয়া গেছেন। বিনয়ের সম্ভাব্য প্রয়াণে যারা ব্যথিত হৈবার প্রস্তুতি মনে মনে লৈতেছিলেন, উনাদেরও বাড়াভাতে ছাই দিলেন মিজান মল্লিক। মনে হৈতেছে এখন থিকা উনিই এই ট্রাডিশন চালায়া লয়া যাইবেন। সাথে আরো থাকতেছে পূর্ববাংলার কনটেক্সট, একদম ফ্রি! বিনয়-ভক্তরা এখন থিকাই চাইলে ক্যাবলা ঘুরায়া বসতে পারেন। আর বিদেশ নয়...এখন থেকে বাংলাদেশেই...! অবশ্য, এই দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে কবি বিনয় মজুমদার এবং কবি মিজান মল্লিকের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চুক্তিস্বাক্ষর হৈছে কিনা আমার জানা নাই।
2005
মনোরঞ্জন
দেখলাম, বরই বিষয়ে লোকেদের উৎসাহ অনেক।
বাচ্চাদের কৌতূহল বিস্ময়কর! বড়রা অভিজ্ঞ থাকায় ছল-চাতুরী করে।
দেখলাম, গাছে চড়ে অনেকেই বরই পাড়ে আর যারা গাছে উঠতে পারে না তারা
দূর থেকে ঢিল ছোঁড়ে-আঁকশি ব্যবহার করে। অবশ্য বরই বিকি-কিনি হয় বাজারে।
ঠিক কবে থেকে? সেই ইতিহাস আমার ম্মরণে নাই।
যারা ইকনোমিক্স ভালো বোঝে-তারা গাছেরটাও খায় তলারটাও।
এমন কিছু মুখ আমার চেনা, যারা কদাচিৎ চেখে দেখেছে, আর কিছু-
(আমার জানামতে অন্তত এক জন) জীবনে একবারও বরই না খেয়ে পটোল তুলেছে।
তারা নিতান্তই হত-দরিদ্র আর সংস্কারাচ্ছন্ন কিনা ভেবে দেখছি।
এ কথা নিশ্চিত যে লোকেরা বরই খায়। কেউ কেউ আচার তৈরি করে-
রোদে শুকায়, সময় বুঝে আয়েশ করে খায়।
ভেবে দেখলাম। লোকেরা পরনারী আর পরদেশি ভাষা চর্চা করে।
২৪/৬/৪
কালচারের সন তারিখ
শাওন মাসের তৃতীয় দিবস। রোজ বৃহস্পতিবার ভোরবেলা আমার জন্ম।
সাল জানা নাই। তবে সংগ্রামের চেয়ে বয়সে আমি ছোট। আমার আম্মা
নিরর না। আরবিতে কোরান পড়তে সম। আর জনক নিরীহ ইশকুল
মাস্টার। রিটায়ার্ড। সৎ। কর্মঠ। সকাল-সন্ধ্যা ননস্টপ কাজ করেন। কথা বলেন কম।
বিষয় আশ্চর্যের তবে বিবরণ সত্য। আমার বাপের বাপও ছিলেন মাস্টার। উপরন্তু পাঠান।
ঘোড়ায় চড়ে তিনি মক্কা-মদিনায় যান। তাঁরে আমি শুনেছি বটে নয়নে দেখি নাই।
দাদার ইন্তেকালের সময় আমার বাপের বয়স ছিল নিতান্তই কম। মাত্র সেভেন কাসের ছাত্র।
বাপেরে দেখি। তার লগে আমার দারুণ সখ্য। যদিও আমার জন্মবিত্তান্ত তিনি লিখে রাখেন নাই।
অবশ্য তাঁর বাপেও তাঁর জন্মতারিখ লিখে রাখে নাই। আমরা কালচারের নিচে সন তারিখ দিই।
.......
পাঠক, আপনি কি স্বীয় স্মৃতিবিভ্রাট বা লেখকের নামের বিভ্রাটের আশংকা করতেছেন। আসেন আপনেরে আশংকামুক্ত করি। এর কোনোটাই ঘটে নাই। কবিতাগুলো নিশ্চিতভাবেই মিজান মল্লিকের লেখা, তবে, সম্ভবত আগে জন্মানোর সুযোগে পশ্চিমবঙ্গের করি বিনয় মজুমদার উনার ‘পূর্বকরণ’ (অনুকরণের সম্ভাব্য উল্টাশব্দ) করনের মওকা পাইয়া গেছিলেন! তবে মিজান কিন্তু এতকিছুর পরও নিজেরে আলাদা কৈরা চিনাইতে সমর্থ। বিনয়ের ঐসমস্ত বিবৃতিধর্মী কবিতার সাবটেক্সটে ভাবনার অনেক বুদবুদ উড়াউড়ি করে। মিজান তার কবিতায় এইসব ‘অহেতুক’ উড়াউড়ির রাস্তা সিলগালা কৈরা দিছেন। উনার কবিতার সারফেস ইটের মত শক্ত। ঐটাই উনারে চিননের রাস্তা।
বিনয় মজুমদার বছরে ছয়মাস হাসপাতালে থাকেন শুনেছি। হয়ত ধরাধামেও বেশিদিন থাকবেন না। উনার বন্ধুরা অনেকেই গত হৈয়া গেছেন। বিনয়ের সম্ভাব্য প্রয়াণে যারা ব্যথিত হৈবার প্রস্তুতি মনে মনে লৈতেছিলেন, উনাদেরও বাড়াভাতে ছাই দিলেন মিজান মল্লিক। মনে হৈতেছে এখন থিকা উনিই এই ট্রাডিশন চালায়া লয়া যাইবেন। সাথে আরো থাকতেছে পূর্ববাংলার কনটেক্সট, একদম ফ্রি! বিনয়-ভক্তরা এখন থিকাই চাইলে ক্যাবলা ঘুরায়া বসতে পারেন। আর বিদেশ নয়...এখন থেকে বাংলাদেশেই...! অবশ্য, এই দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে কবি বিনয় মজুমদার এবং কবি মিজান মল্লিকের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চুক্তিস্বাক্ষর হৈছে কিনা আমার জানা নাই।
2005
বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
ফরহাদ মজহার-এর সাম্প্রতিক কবিতা প্রসঙ্গে

বয়স বিচারে ফরহাদ মজহার কবিতা সঞ্চালনে সবচে বয়োজ্যেষ্ঠ কবি। বাঙালি কবিদের বয়োজ্যেষ্ঠতাকে আমরা, উত্তরসূরী হিসেবে, একটুখানি কৃপাসহযোগে পাঠ করতে অভ্যস্ত। কিন্তু ফরহাদ মজহার সেই আয়েশটুকুর সুযোগ রাখেন নাই এই কবিতাসমূহে। এবং তার অপরাপর কবিতায়। তিনি সবসময় তরুণতর, নিজেকে সমসাময়িক দেখতে ভালবাসেন। আমরাও তাকে অনেক বছর এভাবে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ফলে, এটা তাকেই মানায় যে তিনি ‘ফরিদার জন্য ক্যামেরাগিরি’ করবেন, 'সাড়ে সাতরকমভাবে' তাকাইবেন শালিখ পাখির দিকে।
নানারকমভাবে ফরহাদ মজহার-এর কবিতার বয়স বেড়েছে। ‘ভেজা কবিতা’য় বৃষ্টি তাকে তার দিদির জন্য উদ্বিগ্ন ও সজল করে তোলে। দিদির জন্য আকুল ফরহাদকে তখন আর প্রৌঢ় লাগে না, সেই কিশোরের মত লাগে যে চোখফুটে প্রথম বর্ষা দেখছে:
জলে জলে ভিজছে শহর, জলেতে ইস্পাত
একটি হলুদ মোটরগাড়ি জলেতে চিৎপাত।
দালানগুলো ভিজছে একা কারখানাতে পানি
জলের মধ্যে যুগল ভাসছে কবি ও বিজ্ঞানী।
বেড়েছে না বলে কমেছে বললেই মানায়। কেননা তিনি যখন বিছানা নিয়ে কবিতা রচনা করেন, যেখানে মানবশয্যার দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে জ্ঞান ফলানোর সুযোগও থাকে:
আমার ঘরের একপাশে আয়তত্রে হইয়া বিছানাটি কী সুন্দর অঙ্কিত হইয়া আছে
বিছানা অবধি পোঁছাইতে সভ্যতাকে কত পথ পাড়ি দিতে হইয়াছিল একবার ভাবিয়া দেখো
কিন্তু এরপর তিনি বিস্ময়কররকম ভাবে তার জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করেন। হামলে পড়তে দেন নি বেচারা বিছানার (এবং কবিতার) ওপর। অত্যন্ত শিক্ষণীয় এবং অনুকরণীয় নিরাসক্তি। তরুণদের জন্য। আমরা যারা আমাদের যৎসামান্য র্যাশনালিটিকে কবিতার পেছনে লেলিয়ে দিই। আসুন দেখি ঐ দুই লাইনের পর কবি ফরহাদ মজহার, যিনি আবার একাধারে সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতি বিশ্লেষক, উন্নয়ন-চিন্তক এবং তত্ত্বালোচক, কোনদিকে গেলেন:
বিছানার ওপর বালিশটি পড়িয়া আছে, একটি মস্তকের জন্য তার নীরব নিঃশব্দ অপেক্ষা
একটি শরীর পাইবার আশায় বিছানাটি মৃতদেহের মতো গভীর গর্ত হইয়া আছে।
তত্ত্ব নাই, ইতিহাস নাই, সমাজবিজ্ঞান নাই। তাদের নির্যাস আছে হয়ত। কিন্তু আক্রান্ত করে না। কারণ, এখানে কবিতা আছে।
মনে পড়ে, ১৯৭৫ এ লেখা একটি প্রবন্ধ সংকলনে (বইয়ের নাম ছিল "প্রস্তাব") ফরহাদ মজহার তার চেতনাপ্রবাহে বিজ্ঞান, কবিতা, দর্শন, নৃতত্ত্ব সবকিছুকে একীভূত করে দেখতে প্রয়াসী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সময় কত বদলায়! এখন ফরহাদ যখন কবিতা রচনা করেন, তখন তিনি একান্তভাবেই কবি থাকতে চান।
আরেকটা বিষয়। ফরহাদ মজহারই সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে এখন একমাত্র কবি যিনি তরুণদের একটা ভাষাপ্রকরণচিন্তা, যার মেনিফেস্টেশনও পুরোপুরি হওয়া বাকি, সেটা দিয়ে নিজেকে আক্রান্ত করার সাহস দেখাতে পারেন। জয় হোক তাঁর।
২০০৫
বুধবার, ২৭ আগস্ট, ২০০৮
"মধ্যরাতের নদী" নিয়ে মুজিব মেহদীর আলোচনা

পড়েছিলাম 'ময়মনসিংহ জং' নামক একটি লিটল ম্যাগাজিনে। কবি মুজিব মেহদী এই কাগজের সাথে সাক্ষাৎকারে সমসাময়িককালে তাঁর পছন্দের একটি কবিতার কথা বলতে গিয়ে "মধ্যরাতের নদী" কবিতাটির কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিছু আলোচনাও করেছিলেন। সাক্ষাৎকারের সেই অংশটি এখানে ব্লগস্থ হল:
......................
ময়মনসিংহ জং : একটি প্রিয় (অন্যের) কবিতার কথা বলুন। ভালো লাগার কার্যকারণসহ।
মুজিব মেহদী : একজন নিয়মিত পাঠক তাঁর পাঠেতিহাসে অনেক প্রিয় কবিতার সংস্পর্শে আসেন। এই প্রিয়তা আবার সময়ে বদলে বদলে যায়। সময়ে কোনো-কোনোটার প্রতি ভালো লাগা আরো প্রগাঢ় হয়, কোনোটা আর ভালো লাগে না। আবার নতুন নতুন ভালো লাগার কবিতা প্রিয়তালিকায় যুক্তও হয়। আমারও এমন হয়েছে। আমার ভালো লাগা কবিতার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তার ভিতর থেকে একটি কবিতা বেছে নিতে গিয়ে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মোকাবেলা করতে হলো। কোনটি রেখে কোনটির কথা বলব। যেটির কথা বলব সেটি কি প্রিয়দের সেরা ? তা না হলে তো অবশ্যই অন্য কোনো বিবেচনা দরকার। সেটা কী হতে পারে ? ঠিক করে নিলাম নির্বাচিত কবিতাটিকে হতে হবে বাংলাদেশের কোনো কবির কবিতা এবং আমার সমসাময়িক কোনো কবির। এখানেও দেখলাম অনেক কবিতাই নির্বাচনপ্রার্থী। শেষাবধি আরেকটি বিবেচনা সামনে আনতে হলো। সেটা এই যে, জন্মে না হোক অন্তত কাব্যচর্চায় হলেও কবিকে হতে হবে আমার চেয়ে জ্যেষ্ঠ। এবার বেছে নেয়া গেল সুমন রহমান (১৯৭০) এর ‘মধ্যরাতের নদী’।
সুমন রহমান কবি হিসেবে আমাদের সমসাময়িক, তবে তাঁর কাব্যঅভিযাত্রার সূচনা অন্তিমআশিতে। ঈশান জয়দ্রথ লেখকনামে ১৯৯৪-এ বোরোয় তাঁর ‘ঝিঁঝিট’ নামক প্রথম কাব্যগ্রন্থ। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর সুমন রহমান লেখকনামে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া’ বেরিয়েছে ২০০৮-এ। কবিতাটি সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া’য় অন্তর্ভুক্ত হবারও আগে একাধিকবার পঠিত ওয়েবব্লগ ‘সচলায়তন’ এবং সম্ভবত লিটলম্যাগ ‘মান্দার’-এ।
কোনো শিল্পকর্মের প্রতি ভালো লাগা ব্যাপারটা সবসময় ব্যাখ্যাযোগ্য হয় না। ব্যাখ্যা যাও-বা কোনোরূপে সম্পন্ন করা যায় তা কখনো সর্বজনীন হয় না, ফলত হয় খণ্ডিত ও একপেশে। তবু খণ্ডিতকরণেরই কিছু চেষ্টা হোক।
নদীবহুল বাংলাদেশের কবিতা ও গানে নদীকে নিজের দুঃখের কথা শোনানোর রীতিটি আমাদের ঐতিহ্যসম্পৃক্তই। তবু কবিতাটি অন্যান্য নদীবচন থেকে আলাদা। সাধারণত নদী নিয়ে যেরকম কবিতা লিখিত হয়, কবিতাটিতে সেসব উপাদানের কোনো-কোনোটি হাজির থাকলেও এটি মোটেই সেরকম নয়। নদীসংক্রান্ত লেখায় নদীর চপলতা, নিষ্কলূষতা, সুদূরগমন ক্ষমতা ইত্যাদির প্রশস্তি গান থাকে, কিংবা রাতের নদী হলে তাতে পড়া চাঁদের ছায়ায় প্রিয়তমার মুখাবয়ব দেখাজনিত অধ্যাসের বর্ণনাও থাকে। এখানে সেসব নেই। এই কবিতাটি মহিমান্বিত নদীকে সাক্ষী মেনে একজন কবির নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার শিল্পসৌকর্যে। কবিতাটি পড়তে পড়তে নদীর মতো দীর্ঘ একটি হাহাকার হাতকয় দূর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়, দূরাগত কৃত্রিম আলোকসজ্জাকে ছাপিয়েও একটা নৈশ অন্ধকার সমাসীন বলে যা বস্তুত দেখা যায় না, কিন্তু জেলেনৌকার মৃদুআলোয় বোঝা যায় যে কথকের চোখজোড়া ভিজে উঠছে কবিতার সাথে সম্পর্কের টানাপড়েনে। অন্তত আমার অনুভবে ব্যাপারটি এরকমভাবেই ধরা দেয়। মৃদু অথচ বৃহদায়তন এ বিষাদ আমাকে ছুঁয়ে যায়, কেননা এরকম সংশয় আমার ঝোলায়ও আছে যে, কবিতা আমাকে বুঝতে পারছে কি না বা আমি কবিতাকে। এ বিবেচনায় আমি ভাবি যে, কবিতাকর্মী মাত্রকেই হয়ত কবিতাটি স্পর্শ করবে।
কালের ভারে কাবু শীর্ণতোয়া নদীর পাঁচমিশালী ক্যাজুয়াল গতিভঙ্গির মতো এ কবিতাটিরও কোথাও কোনো দ্রুততা নেই, এখানেও এসে মিশেছে অনেকস্রোত: জলদূষণ কারণে মাছের শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে কবিতা উসকে দেয়া খেয়ালী বালিকা, উঠতি শহরের অকার্যকর ও অপ্রতুল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, কারখানা শ্রমিকের দলবদ্ধ স্নান এবং সবিশেষ কবিতাদাম্পত্যের সাফল্যব্যর্থতা। পরিপার্শ্বকে দেখার বিরল দক্ষতা এবং সেসবকে রঙঢংতাৎপর্যসমেত মূর্ত করে তুলবার যে স্ফূর্তিময় সাফল্য কবি কবিতাটিতে দেখিয়েছেন, তা অনবদ্য। কবিতাটিতে একটি বাড়তি পাওনাও জুটে গেছে উপজাত হয়ে। সেটি এর পরিবেশ চিন্তন। ফলত এটি একটি পরিবেশবান্ধব কবিতারও উদাহরণ হয়ে গেছে।
সুমন রহমান এই কবিতায় কবিতাশিল্পের ক্লিশে অলংকার উপমা ব্যবহারে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। ধরা যাক, শুরুর দিকের ধীরে চলা নীরব নদীর বর্ণনার ব্যাপারটা। কেমন নীরব ও শ্লথ ওই চলন? কবি বলছেন, ‘যেন কারো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যাচ্ছে মধ্যরাতের নদী’। কিংবা তৃতীয় অনুচ্ছেদে বর্ণিত ইউরিয়া ফ্যাক্টরির বর্জ্য-জঞ্জালে কাতর ইলিশের পরিণতি বর্ণনা: ‘তবু গুনগুনিয়ে যাচ্ছে নদী, যেন ওর গানের ভেতর ইলিশের/ বোকা-বোকা শ্বাসকষ্ট আছে। সহজ মরণ আছে।’ কিংবা শেষাংশে নিজেদের কবিতাপ্রয়াসকে ছোট শহরের অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সাথে করা তুলনাটা: ‘যেন আমার সম্ভাব্য কবিতা/ঐ উঠতি শহরের পয়ঃনিষ্কাশনের মতোই/একপেশে একটি বধির ব্যবস্থামাত্র!’
আমি কবিতাটির শব্দ নির্বাচন ও সজ্জার শৈল্পিক কারিগরিতে বিশেষভাবে মুগ্ধ। মুগ্ধ এর কেন্দ্রকে পরিপাটি রেখেও পরিপার্শ্বকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে পারার বিরল ক্ষমতাদৃষ্টে। সুমন রহমানের এ ভ্রমণ কাজেই যুক্ত হয়ে যায় আমার প্রিয় তালিকায়।
মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট, ২০০৮
সাহিত্য কি আমাদের বিপক্ষে? : অন্ধত্ব ও সাহিত্য নিয়ে কেনেথ জার্নিগান-এর রচনা

সাহিত্যের উপাদান হিসেবে অন্ধত্বকে খোদ অন্ধরা কিভাবে মূল্যায়ন করে? আমেরিকার ন্যাশনাল ফেডারেশন অব দ্য ব্লাইন্ড এর ড. কেনেথ জার্নিগান-এর এই লেখাটি সাহিত্যের সেই চেহারা তুলে ধরেছে যেখানে চক্ষুষ্মান সাহিত্যিকগণ চক্ষুহীন মানুষকে সাহিত্যের উপাদান করতে গিয়ে তাদের স্বাভাবিক জগতের বাইরে ছুঁড়ে দিয়েছেন। এমন কি জন মিল্টনের মত খ্যাতিমান অন্ধ সাহিত্যিকেরাও, কেনেথ বলছেন, এইসব জনপ্রিয় ধারণার ফাঁদে পড়ে গিয়ে অন্ধত্ব নিয়ে দৃষ্টিবান মানুষ যা ভাবতে পছন্দ করে তারই প্রতিধ্বনি করেছেন।
কেনেথ-এর মতে, অতীতকালের সাহিত্য যেখানে অন্ধত্ব বিষয় হিসেবে এসেছে তা মোটেও অন্ধদের বাস্তবতাকে সমর্থন করে না, ফলত অন্ধদের জীবনে সেসব মোটেও কোনো উৎসাহ জোগায় না। বর্তমানের সাহিত্যে বেশ কিছু ইতিবাচক মোড়বদলের কথা তিনি বলেছেন, যদিও রেফারেন্স দেন নি। অবশ্য কেনেথ-এর বক্তব্য তৈরি হয়েছে প্রধানত তার চিরায়ত ইংরেজি ও ফরাসী সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা থেকে। আর সাহিত্যের কাছে তার প্রত্যাশার ধরনটিও বিতর্কের বিষয় হতে পারে।
["দেখা না-দেখার চোখ" এ এই অনুবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল]
ইতিহাস যেমন মানুষের কৃতকর্মের সন্নিবেশ তেমনি সাহিত্য হল তার চিন্তার সমাবেশ। আমি এখন বলতে চেষ্টা করব সাহিত্যে অন্ধদের উপস্থাপনার ধরন নিয়ে। কীভাবে দেখা হয়েছে আমাদের সেখানে? আমাদের ভূমিকা কী? কবি, উপন্যাসিক, প্রবন্ধকার ও নাট্যকারগণ কী ভেবেছেন আমাদের নিয়ে? অন্ধত্ব জিনিসটা আসলে যেরকম তারা কি সেইরকমই দেখেছেন, নাকি তারা যেরকম দেখতে চেয়েছেন, অন্ধত্বকে সেইরকম করেই তুলে ধরেছেন?
সাহিত্যে অন্ধজীবন নিয়ে কোনো একক বা একটি সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি নেই। বরং দেখা যায় সাহিত্য অনেকগুলো বিচিত্র এবং পরস্পরবিরোধী অন্ধত্বের ইমেজ হাজির করছে, সেটি শুধু যুগ বা সংস্কৃতিভেদে নয়, শুধু লেখকভেদে নয়, এমন কি একই বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায়ও এই বৈপরীত্য বিদ্যমান।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাহিত্যে অন্ধত্বের বিষয়টি মোটামুটি নয় ধরনের বিষয়াশ্রিত হয়ে এসেছে: অলৌকিক ক্ষমতারূপে, নিরুদ্ধার ট্রাজেডী হিসেবে, নির্বুদ্ধিতা ও অসহায়ত্বের পূর্বগামী হয়ে, ধূর্ততা আর শয়তানি সহযোগে, নিখাদ পূণ্যের সহগামী হিসেবে, পাপের শাস্তিরূপে, অস্বাভাবিকতা এবং বিমানবিকীকরণের সূত্রপাত হিসেবে, শুদ্ধতার প্রতীকরূপে, অন্য কিছুর প্রতীক বা রূপক হিসেবে।
অলৌকিক বা আল্লাপ্রদত্ত ক্ষমতা হিসেবে অন্ধত্ব সাহিত্যে কিভাবে চিত্রিত? ধরা যাক আপনাদের কেউ আমায় জিজ্ঞেস করলেন, অন্ধ হওয়ার কি কি সুবিধা আছে বলে আমি মনে করি? এবং ধরা যাক আমি উত্তর দিলাম: কোনোই সুবিধা নেই, তবে এমন কিছু দিক আছে যা হয়ত আমরা ভেবে দেখি না। আবিষ্কারের জন্য একটা নতুন জগত, নতুন এবং অভিনব প্রত্যণ, নতুন জেগে উঠা মতা; অন্ধ জীবন চতুর্থ মাত্রার জীবন। এরকম শুনলে একজন অন্ধ হিসেবে আপনি কী বলবেন? অনুমান করি, হাসতে হাসতে বিষম খাবেন। আমার মনে হয় না এইসব বস্তাপচা বোকাভাষণ কাউকে আকৃষ্ট করবে। আপনারা এবং আমি নিজের মুখে ঝাল খাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, অন্ধত্বের কোনো চতুর্থ মাত্রা নেই, অন্ধ হলে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা জাগ্রত হয় না, কোনো অদ্ভূত অনুভূতি হয় না, উন্মোচিত হবার জন্য নতুন কোনো জগত এসে হাজির হয় না। কিন্তু আমি যে উদ্ধৃতি দিয়েছি সেটি কিছুকাল আগের এক জনপ্রিয় উপন্যাস থেকে নেয়া।
অলৌকিক বা প্রকৃতিপ্রদত্ত মতার সাথে অন্ধত্বের এই যে মেলবন্ধন, এটি সাহিত্যে একটি সর্বজনমান্য ঐতিহ্য, চিরায়ত পূরাণকাহিনীগুলোতেও এর শেকড় আছে। প্রাচীন গ্রিসের দেবতাদের মধ্যে মানুষকে শাস্তি দেয়ার একটা পছন্দনীয় প্রথা ছিল অন্ধ করে দেয়া। একে সাধারণভাবে মৃত্যুর চেয়েও খারাপ মনে করা হলেও, কখনো কখনো, দেবতার কৃপায় সেই অন্ধ হয়ে যাওয়া শাস্তিগ্রহীতা ব্যতিক্রমী কিছু ক্ষতিপূরণও পেয়ে যেতেন: যেমন ভবিষ্যকথন ক্ষমতা। মনে করা হয়, হোমার তার অন্ধত্বের ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেয়েছেন কবিত্বশক্তি। একইভাবে, সফোকিসের নাটকে যে টাইরেসিয়াসকে পাওয়া যায়, অন্ধ হবার বদলে নবুয়তপ্রাপ্তি ঘটেছিল তার।
উনবিংশ শতাব্দীর মহান উপন্যাসিক ভিক্টর হুগো’র ‘দ্য ম্যান হু লাফস’ উপন্যাসে অন্ধত্ব নিয়ে আধুনিক লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি মেলে। সেখানে অন্ধত্ব শুদ্ধতা ও আনন্দের সহযোগী হয়েছে, যা কোনোভাবে দৃষ্টিহীনতাকে পুষিয়ে দিচ্ছে। তার উপন্যাসের অন্ধ নায়িকা দিয়াকে দেখা যায় এক পরমানন্দে বিভোর হয়ে থাকতে, যেটা অন্ধের পক্ষে বেমানান ঠেকে। এই পরমানন্দ কখনো কখনো আত্মার গহীনে অনুধাবনের জন্য অন্ধদের এক সঙ্গীত উপহার দেয় এবং তার মাধ্যমে তাদের অন্ধকার জীবনকে আলোকিত করে তোলে। হুগো’র মতে অন্ধত্ব হল সেই অন্তহীন গুহা যার মধ্যে অসীমের ঐকতান ধরা দেয়।
সম্ভবত, জনপ্রিয় কল্পকাহিনীর অন্ধ গোয়েন্দাদের কীর্তিকলাপের মাধ্যমেই অন্ধত্বের সাথে ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের যোগাযোগ পরিস্ফুট হয়। ম্যাক্স ক্যারেডস নামের ফোর্থ ডাইমেনশনাল চরিত্রটি আবির্ভূত হয়েছিল ১৯১৪ সালে এবং গোটা বিশের দশক ধরে নানান অতিমানবীয় ঘটনার নায়ক হয়ে থেকেছে সে। ১৯১৫ সালে আমরা পাই ডেমন গন্ট নামক আরেকজন অন্ধ গোয়েন্দাকে, যিনি একটা কেসও হারেন নি। এই তালিকায় থর্নলে কল্টন, ডানকান ম্যাক্সেইনসহ আরো অনেক চরিত্রের নাম যোগ করা যায়। যেমন হয়েছে গোয়েন্দা ডানকানের চরিত্রের বেলায়। এখানে ডানকানের নৈপুণ্যের ছটায় তার স্রষ্টাই ঢাকা পড়ে গেছেন। তবু এমন কিছু মুহূর্ত আসে, ডানকানের স্রষ্টা লিখেছেন, যখন সাধারণ মরণশীল মানুষের ক্ষমতার অতিরিক্ত কিছু মতা ডানকানের অধিগত হতে দেখা যায়। এসব মুহূর্ত তাকে উদ্বিগ্ন করে।
তারা সেইসঙ্গে আমাদেরও উদ্বিগ্ন করেন। অন্ধত্বের সাথে এসব অস্বাভাবিক এবং অতিমানবিক ক্ষমতারোপ নিঃসঙ্গ ও আলাদা, অসহজ এবং উদ্ভট একটি বস্তাপচা চরিত্রের আদলে ভাবা থেকে অন্ধকে একটুও রেহাই দেয় না। বরং পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটায়।
এটি শুধু অসত্যই নয়, অন্ধদের জন্য নেতিবাচকও। কারণ এতে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, কোনো অন্ধ মানুষ যা অর্জন করল তা নিজের যোগ্যতায় নয়, বরং অন্ধত্বে নিহিত কোনো ম্যাজিকের বদৌলতে। অন্ধত্বের ওপর এহেন অতিমানবীয় ক্ষমতারোপ এক লহমায় সাধারণ বাস্তবতা থেকে উঠিয়ে নিয়ে অন্ধকে দাঁড় করায় অস্বাভাবিকতার উদ্ভট এক মঞ্চের ওপর। অথচ অতিমানবীয় বা অস্বাভাবিক যাই হোক, এটিই ধ্রুবসত্য যে, অন্ধের কোন দায় নেই, অধিকার নেই, সমাজ নেই এই পৃথিবীতে।
কৃতকর্মের পুরষ্কার হিসেবে প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতা অর্জনের ধারণা অন্ধের জন্য কোনোভাবেই প্রশংসাসূচক নয়, বরং অপমানকর। এই ধারণা আমাদের যাবতীয় অর্জনকে ছিনিয়ে নেয়, এমন কি আমাদের ব্যর্থতার দায়ও আমাদের বহন করতে দেয় না। এই ধারণা অন্ধের জন্য একটা সুষম সমাজ গঠনের দায় থেকে বিদ্যমান সমাজকে মুক্তি দিয়ে দেয়। চারপাশের জীবনে উদ্দাম ও সমান অংশগ্রহণের সামর্থ অর্জনে আমাদের মোটেও উদ্দীপ্ত করে না। সংক্ষেপে এই ধারণা অনুযায়ী, অন্ধ অসাধারণ হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই সাধারণ হতে পারে না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমরা অতি সাধারণ অন্ধলোক, আশির্বাদপুষ্টও নই, অভিশপ্তও নই।
অন্ধত্বের ওপর প্রকৃতিদত্ত মতারোপের ধারণা নেতিবাচক হলেও অনেক কম ক্ষতিকর, সাহিত্যে অন্ধত্বের সাথে এর চেয়েও ক্ষতিকর অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে। সবচেয়ে তিকর ধারণাটি আবার সবচেয়ে প্রাচীনও: সেটি হল অন্ধত্বকে একটি সম্পূর্ণ ট্রাজেডী হিসেবে দেখা। একটি হিব্রু প্রবাদ আছে, অন্ধলোক হল মৃত মানুষের মত। অন্ধকে জীবন্মৃত করে উপস্থাপনের চরম নিদর্শন পাওয়া যায় ইদিপাসকে নিয়ে লেখা গ্রিক নাটকগুলোতে। ইদিপাস রেক্সে রাজা নিজেই যখন নিজের চোখ তুলে ফেললেন তখন নাট্যকার বলছেন: অন্ধ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই ভাল ছিল। এই ঐতিহ্যের বিস্তার ঘটে ইংরেজি সাহিত্যেও। সেখানে একজন কবি, নিজেও যিনি অন্ধ, অন্ধত্বকে মহাদুর্যোগ আখ্যা দিয়ে শেষকথা বলছেন। স্যামসন অ্যাগনেষ্টিজ-এ জন মিল্টন:
শত্রুবেষ্টিত অন্ধের চেয়ে অনেক ভাল ছিল বন্দী হওয়া, পাতালে নিক্ষিপ্ত হওয়া, ভিক্ষা করা, বা ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া। তুচ্ছাতিতুচ্ছ পতঙ্গজীবনও আমার চেয়ে ভাল। তারা হামাগুড়ি দিয়ে চলে, তবুও তো দেখতে পায়। আমি, আলোর মধ্যে অন্ধকার, প্রতিদিনের প্রতারণা, প্ররোচনা, ঠগবাজি বা ভুলভালের কাছে প্রতিদিন ধরা খাই। দরজা খোলা থাকা না থাকা আমার জন্যে সমান, সেটা অন্যের বিষয়, আমার নয়। অর্ধেকের কম আমি জীবিত, অর্ধেকের বেশি আমি মৃত, একটা চলমান কবর।
এই মহাকাব্যিক কবিতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় এর মহাদুর্যোগ পরিস্থিতি নয়, উল্লেখযোগ্য হল আমাদের মহাকবি মিল্টন এর রচয়িতা। তার সব মহৎ রচনা (প্যারাডাইজ লস্ট সহ) লিখিত হয়েছে তিনি অন্ধ হয়ে যাবার পরে। তাহলে তিনি কেন অন্ধত্বকে এমনভাবে দেখতে গেলেন? উত্তরটা সহজ: আমরা অন্ধরা নিজেদের অবস্থাকে সেভাবে দেখতে চেষ্টা করি, যেভাবে চক্ষুষ্মান মানুষ আমাদের দেখতে চায়। এমন কি, যখন আমরা বুঝি ঐ দৃষ্টিভঙ্গি একদম ভুল, তারপরও সেই মতামতটিকেই আমরা নিজেদের ওপর চাপাতে দিই বা চাপিয়ে নিই। এভাবে অনেক সীমিত ও খণ্ডিত অনুধাবন আমাদেরই সহায়তায় আমাদের বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে থাকে। সাহিত্যের গতানুগতিক ঐতিহ্য দ্বারা চালিত হয়ে মিল্টন নিজের এবং তাবৎ অন্ধদের জন্য একটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি উপহার দিলেন। সত্যি বলতে কি, মিল্টন বরং অন্ধত্ব নিয়ে সাবেকী বস্তাপচা মতামতগুলোর পালেই হাওয়া দিলেন, এবং সেটি তিনি করলেন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিপক্ষে গিয়ে। সাহিত্যের ক্ষমতা সত্যিই অনেক!
এক শতাব্দী পর অন্ধত্বের দুর্যোগের ধারণাটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। কিপলিং-এর ‘দ্য লাইট দ্যাট ফেইলড’ পুস্তকে বলা হয়, অন্ধত্ব মৃত্যুর চেয়েও খারাপ। এই বইয়ের নায়ক যখন জানতে পারে যে, সে অন্ধ হতে চলেছে, তখন বলে: এটা হল চলমান মৃত্যু। অন্ধকারে আমাদের নিশ্চুপ হয়ে থাকতে হবে এবং আমরা কাউকেই দেখব না, যা চাই তা কোনোদিনই পাব না, শতবছরও যদি বাঁচি। পুস্তকটির পরবর্তী অংশে নায়ককে দেখা যায় সমগ্র পৃথিবীর বিরূদ্ধে আক্রোশে ফেটে পড়তে, যেহেতু সেই পৃথিবী দেখতে পায়, যেখানে সেই নায়ক অন্ধের মৃত্যুর মাঝে মৃত হয়ে আছে, সহযোগীদের কাঁধে দুর্বহ বোঝা হয়ে। যখন এই আত্ম-অনুকম্পায় ভরা চরিত্রটি আত্মহত্যা করতে সমর্থ হয় (কী যে স্বস্তির খবর!) কিপলিং বলে ওঠেন যে, এই অন্ধ নায়কের ভাগ্য শেষপর্যন্ত ওর সাথে প্রতারণা করে নাই, কারণ সে একটা দয়ালূ বুলেট অন্তত নিজের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে।
‘দ্য এন্ড অব দ্য টিদার’ উপন্যাসে জোসেফ কনরাড তার চরিত্র ক্যাপ্টেন হুয়েলীকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করেন, কারণ সেটি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে অনেক ভাল। ডি এইচ লরেন্সের উপন্যাস ‘দ্য ব্লাইন্ডম্যান’ এ মরিস যুদ্ধে অন্ধ হয়ে যায়, ভবিষ্যতের কোন সোনালি ইঙ্গিতই তার দুর্দশা লাঘব করে না। ‘ইনভাইটেশন টু দ্য ওয়াল্টজ’ উপন্যাসে লেখক রোজামন্ড লেম্যান আরো এককাঠি সরেস। তার উপন্যাসের যুদ্ধে-অন্ধ-হওয়া চরিত্রটি সমাজে সম্মানজনক জীবন যাপন করলেও, কোনো কাজে লাগে না, যেন একটা চলতে ফিরতে থাকা লাশ। যখন সে তার প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে নাচে তখন পরিস্থিতি খুব বেদনাদায়ক হয়ে উঠে। অন্ধলোকটি তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে নিবিড় করে ধরে রাখলেও প্রকৃত প্রস্তাবে সে তখন অনেক দূরে, সঙ্গীত থেকে, জীবন থেকে, সমাহিত এবং পছন্দশূন্য। আর প্রেমিকা আসলে ঐ অন্ধলোকটির চক্ষুষ্মান যুবক বয়স আর বর্তমানের মৃত্যুর সাথে নাচে।
এই লেখকেরা মনে করেন, অন্ধত্বের তথাকথিত ট্রাজেডী এতটাই দুর্বহ যে, খোলা আছে দুইটি রাস্তা: হয় চোখ ফিরে পাওয়া, নয় মরে যাওয়া।
দেখা যাক অন্ধত্বের সাথে নির্বুদ্ধিতা আর অসহায়ত্বের প্রসঙ্গকে কিভাবে মেলানো হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকেই অন্ধরা রগড় নাটক ও প্রহসনে উপহাসের বিষয় হয়ে থেকেছে। প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন রগড় নাটক ও প্রহসনে অন্ধরা উপহাসের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। মধ্যযুগে দেখা যেত অন্ধরা গাধার কান লাগিয়ে পথে পথে ঘুরছে, হাতপা নেড়ে উল্টাসিধা কথা বলে জনগণের মনোরঞ্জন করছে। এই ধারাবাহিকতায় চসার তার ‘মারচেন্টস টেল’এ এক তরুণী বধুর কথা বলেন যে এক অন্ধ বুড়োকে বিয়ে করে। স্বামীর সঙ্গে বাইরে ঘুরতে গিয়ে ঐ বধু তার গোপন প্রেমিকের সঙ্গে গাছের আড়ালে অভিসার করে অন্ধ স্বামীর সামনে। চসার সেখানেই থামেন না, বলতে থাকেন, সেই মোম সময়ে ঐ তরুণীর স্বামী হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় এবং স্ত্রীকে গোপন প্রেমিকের সাথে অভিসাররত দেখতে পায়। কিন্তু চালাক স্ত্রী সাথেসাথেই অজুহাত খাড়া করায়: ঐ অভিসার আসলে ছিল স্বামীর দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায়! শেক্সপিয়ারে অবস্থা আরো খারাপ। ‘কিং লিয়র’এ তিনি যে অন্ধ গ্লকেস্টারকে উপস্থাপন করেন, সে এতটাই অসহায় আর দ্বিধাগ্রস্থ যে, যেকোন কিছু দিয়েই তাকে ভজানো যায়, প্রতারিত হবার জন্য একেবারে আদর্শ চরিত্র।
অন্ধদের নিয়ে মজা করার রূঢ়তম দৃষ্টান্তটি পাওয়া যায় ষোড়শ শতাব্দীর এক জার্মান নাটকে। নাটকের নায়ক তিনজন অন্ধ ভিক্ষুককে একটা মূল্যবান মুদ্রা ভিক্ষা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন যেটা দিয়ে তারা খাদ্যসামগ্রী ও থাকার ব্যবস্থা করতে পারে। সেই মুদ্রা আসলে কাউকেই দেয়া হয়নি, আর তিনজন অন্ধের প্রত্যেকেই মনে করল অন্যজনকে মুদ্রাটি দেয়া হয়েছে। পরের অবস্থাটি সহজেই অনুমেয়।
অসহায় অন্ধলোক একটি সার্বজনীন ধারণা হয়ে উঠেছে। মেটারলিংক-এর ‘দ্য ব্লাইন্ড’ নাটকে দার্শনিক অবস্থান থেকে সবগুলো চরিত্রকে অন্ধ দেখানো হয়েছে। কিন্তু মঞ্চে গিয়ে দেখা গেল দর্শন নয়, বরং অন্ধদের হাস্যকর দলবাজি, হুমকিধামকিই ঐ নাটকের সার।
‘লা সিম্ফনি প্যাস্টোরাল’ এর আঁন্দ্রে জিদ হলেন অন্ধত্বের প্রকৃত সত্যের সবচেয়ে খারাপ বিরূদ্ধবাদীদের একজন। সেখানে অন্ধ কিশোরী গারট্রুড একেবারে নির্বোধ কিসিমের ছিল, প্যাস্টর এসে ওকে লেখাপড়া শিখাতে শুরু করার আগে। অন্ধত্বের কারণেই এই নির্বুদ্ধিতা, লেখক বলেন, দৃষ্টি না থাকায় কিশোরীটি সত্য সম্পর্কে জানতে পারে না। শিক প্যাস্টর তার ছাত্রী গারট্রুড-এর জন্য যে জগত তৈরি করে, সেখানেই অন্ধ গারট্রুড সুখেস্বাচ্ছন্দ্যে কাটায়। সত্যিকার জগতের খারাপ দিক সম্পর্কে কিশোরীটি কিছুই জানতে পারে না। দৃষ্টি না থাকায় সে পাপ সম্পর্কেও সচেতন নয়, আপেল খাওয়ার আগের আদম-ঈভের মত। গারট্রুড যখন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল, তখনই কেবল সে পাপ সম্পর্কে অবগত হল। না বুঝে প্যাস্টরের সাথে যেসব পাপকাজ সে করেছে, সেগুলোর অপরাধবোধ তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে।
সাহিত্যে অন্ধত্ব যেমন নির্বুদ্ধিতার অনুষঙ্গ হয়ে এসেছে, তেমনি এসেছে ধূর্ততার অনুষঙ্গ হয়েও: একেবারে খাঁটি শয়তানির মূর্ত মানবীয় রূপ হয়ে। স্টিভেনসনের ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ এর বুড়ো জলদস্যু অন্ধ পিউ এর জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। উপন্যাসের নায়ক কিশোর জিম হকিন্স অন্ধ পিউকে যখন প্রথম দেখে তখনই তার মনে হয়েছে এই মৃদুভাষী এবং চোখহীন মানুষটির চেয়ে ভয়াবহ কোন চরিত্র সে জীবনেও দেখে নাই। যখন পিউ তাকে ক্রাচ বাগিয়ে ধরে ফেলে, জিমের মনে হয়েছে, এই অন্ধ লোকটির কণ্ঠের চেয়ে নিষ্ঠুর, ঠাণ্ডা আর কুৎসিত কণ্ঠও সে কোনোদিন শোনে নাই।
বহুযুগ ধরেই অন্ধত্ব ও নিচুতার সম্পর্ক সাহিত্যিকদের একটা প্রিয় প্রসঙ্গ, এবং পাঠকদের মধ্যেও এই সম্পর্কের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, যেহেতু পাঠকেরা নানা লোককাহিনী থেকে শিক্ষা পেয়েছে যে, অন্ধত্ব মানবিক গুণাবলী হ্রাস করে। এই শিক্ষা অন্ধ বিষয়ে চক্ষুষ্মান সাধারণ মানুষের নিষ্ঠুরতার অ্যাটিচুডকে সমর্থন করে।
নিখাদ শয়তানির অনুষঙ্গে অন্ধত্বকে যেমন দেখা হয়েছে, এর বিপরীতে কোনো কোনো সাহিত্যে আবার অন্ধত্ব উপস্থাপিত হয়েছে পরম পূণ্যরূপে। আপাতভাবে এই দুটো দৃষ্টিভঙ্গিকে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে তারা একই মুদ্রার এপিঠওপিঠ। অন্ধত্বের প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরার মত জোরালো অন্তর্দৃষ্টি কোনটিতেই পাওয়া যায় না। একটা বিষয়ে এই দুই দলই একমত: অন্ধত্ব হচ্ছে একটা অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা যা তার বহনকারীকে স্বাভাবিক জীবন থেকে পুরোপুরি উৎপাটিত করে।
অন্ধত্বকে হয় পাপ বা শয়তানির ফসল হতে হবে, নয় তাকে হতে হবে পূণ্যের অনুষঙ্গ। লরা রিচার্ডস এর ‘দ্য ব্লাইন্ড চাইল্ড’এ দেখা যায় অন্ধ শিশুটি গাছের বাকলে হাত রেখে বলে দিচ্ছে গাছের নাম, বলে দিচ্ছে কখন ফুল আসবে এবং কিভাবে। গ্রামে এমন কোনো কুকুর বিড়াল নেই যে ঐ শিশুর একটি ডাকে প্রভুর নাম ভুলে ছুটে আসবে না। সে শুধু পূণ্যবতীই নয়, পাশাপাশি যাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী। অগ্নিকাণ্ড থেকে এক শিশুকে রা করে, গান গেয়ে মানুষকে রোগমুক্ত করে, পাঁড় মদ্যপের মদের নেশা ছাড়িয়ে দেয়।
অন্ধত্ব নিয়ে যাবতীয় রোমান্টিক হেঁয়ালিপনার মধ্যে সবচেয়ে উদ্ভট হল, অন্ধত্বকে ছদ্মবেশী আশির্বাদ মনে করা। জন জি মরিসের ‘দ্য ব্লাইন্ড গার্ল অব উইটিনবার্গ’এ অন্ধ নায়িকাকে বলা হচ্ছে: ঈশ্বর তোমায় চোখের আলো থেকে বঞ্চিত করেছেন বলেই তোমার হৃদয় আরো মহান আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। আমার পরিচিতি এমন কোনো অন্ধ মেয়ে নেই যে এরকম অপমানসূচক এবং উদ্ভট বক্তব্য প্রদানকারীর গালে অন্তত একটি চড় না বসিয়ে ছেড়ে দেবে। তারপর এই অন্ধ নায়িকাকে দিয়ে প্রত্যুত্তরে যা বলানো হল তা আরো মারাত্মক: সে বলল, মহাত্মন আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন আমাদের অন্তর্জগত আপনাদের চেয়ে সুন্দর, এবং আপনাদের সূর্যের চেয়ে আমাদের অন্তরের আলো উজ্জ্বলতর?
কল্পকাহিনীতে আরেকটা সুপ্রাচীন এবং অন্যতম নিষ্ঠুর ধারণা হল, অন্ধত্ব হচ্ছে পাপের ফল। ঈদিপাস অন্ধ হন মাতৃসহবাসের কারণে, বেলেল্লাপনার কারণে চোখ হারান শেক্সপিয়ারের গ্লুকেস্টার। এর অব্যবহিত পরের ঘটনা হল, অন্ধত্ব শুদ্ধতা অর্জনের একটা স্তর, যে স্তরে কোনো মানবীয় চরিত্র আগের পাপতাপ ঝেড়ে পূণ্যবান হয়ে উঠতে পারে। যেমন দেখা যায় কিংসলের ‘ওয়েস্টওয়ার্ড হো’ এ অ্যামেয়াস লেই বজ্রপাতে অন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাতারাতি অপরাধী থেকে সাধুতে পরিণত হয়।
এ সমস্ত বিখ্যাত কল্পকাহিনীর মধ্যে অন্ধত্বকে মানবিকতা-বহির্ভূত কিছু একটা দাঁড় করানোর একটা প্রবণতা থেকেই গেছে। অন্ধত্ব যেন স্বাভাবিক জীবন বা মানবিক সম্পর্ক থেকে নির্বাসনের দরজা। ডিকেন্সের বার্থাই হোক, বা লিটনের নিদিয়াই হোক, প্রেমে পড়ে তারা ভুলেও ভাবে না যে তাদের কাক্সিতজনেরা তাদের প্রেমে পড়বে।
সর্বশেষ যে প্রবণতাটি দেখা যায় তা হল, অন্ধত্বকে আক্ষরিক অর্থে না নিয়ে প্রতীকী অর্থে নেয়া, ব্যঙ্গ বা প্যারাবল তৈরির জন্যে। লোকসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র সর্বত্রই এই প্রবণতাটি অন্ধত্বকে মৃত্যু বা নরকযন্ত্রণার প্রতীক হিসেবে দাঁড় করায়, অথবা শারীরিক অন্ধত্বের প্রতীকে মানসিক অন্ধত্বকে মূর্ত করে তোলে। এই ক্যাটাগরিতে পড়বে এইচ জি ওয়েলস-এর ‘দ্য কান্ট্রি অব দ্য ব্লাইন্ড’, পল কোরে’র ‘দ্য প্লানেট অব দ্য ব্লাইন্ড’, মেটারলিংক-এর ‘দ্য ব্লাইন্ড’ ইত্যাদি। এছাড়াও কনরাড আইকেন-এর ছোটগল্প ‘সাইলেন্ট স্নো, সিক্রেট স্নো’-এ অন্ধত্বকে স্কিজোফ্রেনিয়ার রূপক হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এ সমস্ত উপস্থাপনায় অন্ধত্বকে দেখানো হয়েছে অজ্ঞতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের প্রতীকরূপে, স্বাভাবিক ধারণা ও মূল্যবোধের উল্টো অবস্থার প্রতীকরূপে, এবং মৃত্যুর চেয়ে খারাপ বা মৃত্যুসমান অবস্থার প্রতীকরূপে।
সাহিত্যের এই সমীক্ষা থেকে কী শিক্ষা নিতে পারি আমরা? কী বলতে চেয়েছে সাহিত্য আদতে? একটা শিক্ষা এটি যে, এই সমস্ত সাহিত্যকর্মের বদৌলতে আমরা এমন একদল তথাকথিত বিশেষজ্ঞ খুঁজে পেয়েছি যারা এই সাহিত্যের জ্ঞান সম্বল করে অন্ধত্ব নিয়ে গবেষণা করে নানান অশ্বডিম্ব প্রসব করছেন। তাদের মতে, অন্ধত্ব কেবল নিছক দৃষ্টিহীনতা নয়, বরং একজন মানুষের সম্পূর্ণ রূপান্তর। কোনো মানুষের কাছে তার অন্ধত্ব নিছক চোখ হারানোর গল্প দিয়েই শেষ হয় না, আসলে সেটি মৃত্যুসমান, সত্তার ওপর এক বিশাল আঘাত। তারা বলেন, চোখ হল সেক্স সিম্বল, তাই অন্ধ মানুষ কখনই পূর্ণ মানুষ নয়।
শিরোনামের প্রশ্নে ফিরে যাই: সাহিত্য কি আমাদের বিপক্ষে? এই প্রশ্নের সর্বজনগ্রাহ্য কোনো জবাব নেই। শুধু অতীত আমলের সাহিত্য নিয়ে যদি আলাপ হয়, তাহলে প্রশ্নের জবাব হবে, হ্যাঁ। সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে আলাপ হলে মিশ্রজবাব হবে। অন্ধত্বের ধারণায় অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন সমসাময়িক সাহিত্যে পাওয়া যায়, যদিও বস্তাপচা সাবেকী ধারণাগুলোই এখন পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় এটা যে, সমসাময়িক কালে এই সব ধারণা উৎসাহ পাচ্ছে আমাদের তথাকথিত অন্ধ বিশেষজ্ঞদের উদ্ভট গবেষণা থেকেই।
ভবিষ্যতের দিকে যদি ঐ প্রশ্ন নিয়ে তাকাই, জবাব হবে, ভবিষ্যতের সাহিত্য বর্তমান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, যেমন বর্তমানের জীবন পারে না ভবিষ্যতের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অন্ধ জীবনগুলোকে সাজিয়ে তোলার মাধ্যমে আমরাই ভবিষ্যতের সাহিত্যকে নির্দেশনা দিতে পারব। অন্ধত্ব একটা ট্রাজেডী ততক্ষণই, যতক্ষণ আমরা এই সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিটিকে মান্য করি। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ একটাই: আমাদের সময়কে অন্ধত্ব নিয়ে সচেতন ও সবিবেক হতে সাহায্য করা। কল্পকাহিনীর ফ্যান্টাসী থেকে মুক্ত হয়ে সেগুলোকে বাস্তবতার নির্যাস দিয়ে ভরে দিতে হবে। তখনই কেবল আমরা সেই সাহিত্যের জন্য রাস্তা তৈরি করতে পারব যা বাস্তবতার সুবাস ধারণ করবে, সত্যের অপলাপ হবে না, সাহিত্য পড়ে আমরা সেখানে নিজেদের খুঁজে পাব।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত)
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)