বুক রিভিউ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বুক রিভিউ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট, ২০০৮

হালের ইসলামি চিন্তা: কতটুকু র‌্যাডিক্যাল, কোথায় লিবারাল

ইসলামী চিন্তার পুনর্পঠন: সমকালীন মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রাম। প্রথম খণ্ড। সংকলন ও অনুবাদ রেহনুমা আহমেদ। মে ২০০৬। একুশে পাবলিকেশন্স লিমিটেড, ঢাকা। প্রচ্ছদ অজ্ঞাত। ৪৬৪ পৃষ্ঠা। ৩৭৫ টাকা।


গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ইসলামী চিন্তার পুনর্পঠনের একটি প্রক্রিয়া দেখা যাচ্ছে বিশ্ব জুড়ে। অর্থনীতির বিশ্বায়ন এবং উত্তর-উপনিবেশ চিন্তাস্বাতন্ত্র্যের ফলশ্র“তি হিসাবেই এই প্রক্রিয়াটি বেগবান হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। একই সময়ে, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, পুঁজিবাদের নিঃস্বায়ন প্রক্রিয়া এবং আরো নানান প্ররোচনায় প্রথম ও তৃতীয় বিশ্বে ইসলামী জঙ্গিবাদেরও পুনরুত্থান ঘটেছে। ফলে, ইসলাম ধর্ম তথা মুসলিম জীবনব্যবস্থাকে গোটা পশ্চিমাশক্তির কোপানলে পড়তে হয়েছে নানাভাবে। ইসলামকে নিয়ে পশ্চিমের বুদ্ধিজীবীরা যে ধরনের সরলীকৃত এবং কনকুসিভ মন্তব্য করেছেন, তার বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব আমরা পাই তালাল আসাদ, এডোয়ার্ড সাঈদ কিংবা একবাল আহমাদ-এর লেখায়। রেহনুমা আহমেদ সংকলিত এবং অনূদিত ‘ইসলামী চিন্তার পুনর্পঠন: সমকালীন মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রাম’ নামক গ্রন্থে ঐ ত্রয়ীর কোনো লেখা স্থান পায় নি। তাদের অব্যবহিত উত্তরসূরী এবং জীবিত (একজন বাদে) মুসলমান বুদ্ধিজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট এবং ধর্মতাত্ত্বিকদের সাাৎকার, রচনা, এবং বাহাস নিয়ে এই বই। লেখক তালিকায় আছেন আমিনা ওয়াদুদ যিনি মুসলমান নারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাজের ইমামতি করেন। আছেন টাইমস-এর বিচারে পৃথিবীর জীবিত চিন্তাবিদদের সেরা বিশজনের তালিকায় স্থান পাওয়া তারিক রামাদানসহ আরো অনেক খ্যাতনামা/অখ্যাত মুসলিম চিন্তাবিদ। গ্রন্থভূক্ত লেখার বিষয়ও বহুবিধ: সাম্রাজ্যবাদ, ইসলামী রাষ্ট্র, নারীবাদ, কোরআন পঠনরীতি, শরীয়া ইত্যাদি। বিষয় বহুবিধ হলেও প্রণোদনা একটিই: যুক্তি ও প্রপঞ্চের নিরিখে পরিবর্তিত বিশ্ববাস্তবতায় ইসলামকে পুনর্ব্যাখ্যা।


এসব সমকালীন মুসলমান চিন্তাবিদদের অনেকেই সরবে বা নীরবে দশম খৃস্টীয় শতকের মুসলিম চিন্তাগোষ্ঠী ‘মুতাযিলা’ সম্প্রদায়কে তাদের পূর্বসুরী মেনেছেন। একথা অনেকের অজানা নয় যে, যুক্তি এবং পদ্ধতিনির্ভর মুতাযিলা-চিন্তা সেসময়ের মেইনস্ট্রিম মুসলিম মানসে খুব একটা পাত্তা পায়নি। এই বই থেকে আরো জানা গেল যে, আব্দোলকরিম সোরোউশ-এর প্রকাশিতব্য একটি বইয়ের নাম ‘রিইনভেন্টিং দ্য মুতাযিলাইট এক্সপেরিয়েন্স’ বা মুতাযিলা-অভিজ্ঞতার পুনরুদ্ভাবন। এই নাম থেকেই ইসলামী চিন্তার পুনর্পঠনের একটি সূত্র পাওয়া যায়। এই তাত্ত্বিকেরা ইসলামী ঐতিহ্যের পরাজিত দার্শনিক আন্দোলনগুলোকে পুনর্নিরীা করতে চান। বিশ্বব্যাপী ইসলামী চিন্তার যখন পুনর্পঠন হচ্ছে, তখন এ ধরনের নিরীা নিশ্চয়ই অনেক জরুরি। কেন মুতাযিলা সম্প্রদায়ের যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যায় না-মজে ইসলাম ধর্ম আশআরীয় কাব্যে মজেছিল সেসময়ে?

যাক সে কথা। ইসলামী চিন্তার এই যে পুনর্পঠন, তা চরিত্রগত অর্থে সমরূপী (যড়সড়মবহড়ঁং) মনে হয় নি। এই মিছিলে সামিল আছেন এমন চিন্তক (আমিনা ওয়াদুদ) যিনি নিজেকে পোস্টমডার্ণ এবং ইসলামী চিন্তার পুনর্পঠনকে একটি ‘পোস্টমডার্ণ’ চেষ্টা মনে করেন। আবার অনেকেই আছেন, যথা: আব্দোলকরিম সোরোউশ, যার মূল সমস্যা ইসলামের সাথে ‘আধুনিকতা’ তথা গণতন্ত্রের মেলবন্ধন ঘটানো। এটি বেশ চিত্তাকর্ষক বৈচিত্র্য এই গ্রন্থের। বোঝা যাচ্ছে, পশ্চিমা চিন্তার লিগ্যাসীর দিক থেকে যে যেই পাটাতনেই থাকেন না কেন, প্রত্যেকেই সামিল হচ্ছেন ইসলামের পুনর্পঠনে। কেন?

জবাব পাওয়া যায় রাদওয়ান আল সাইয়িদ-এর লেখায়। তিনি লেখেন, “নৃশংস খুনী, ধর্মীয় উন্মাদ, শয়তান, আত্মঘাতী হামলাকারী, গলা জবাই করে Ñ আর অবশ্যই খুব-সাধারণ ‘স’[ন্ত্রাস] শব্দটি: গত এক দশকে ইসলাম সম্বন্ধে এই ইমেজ পশ্চিমে পাবলিক আলাপচারিতাকে আকার-আকৃতিদান করেছে” [পৃষ্ঠা ৩৭৩]। অর্থাৎ ইসলামের নামে জঙ্গীবাদের এই উত্থান-ই প্রকারান্তরে লিবারাল মুসলিম চিন্তাবিদদের ইসলামী চিন্তার পুনর্পঠনে উদ্যোগী করেছে। গ্রন্থভূক্ত অনেক লেখক আবার পশ্চিমের নানান দেশের অভিবাসী হওয়ায় তাদের ওপর বাড়তি একটা চাপ আছে যেটি সহজে বোধগম্য। কিন্তু তারপরও তাদের লেখায় জঙ্গীবাদ নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক আলাপের জায়গা খুবই অপ্রতুল মনে হয়েছে। দার্শনিক ও যৌক্তিকভাবে জঙ্গীবাদকে প্রত্যাখ্যান করলেই যেন দায়িত্ব ফুরাবে, এমন মনে হয় তাদের লেখা পাঠ করলে। কেউ কেউ অবশ্য প্রথম বিশ্বে গজিয়ে-ওঠা জঙ্গীবাদের সামাজিক শেকড় খুঁজেছেন। কিন্তু যে আর্থসামাজিক বাস্তবতায় তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে জঙ্গীবাদ গড়ে ওঠে, তার ব্যাপারে মুখ খোলেন নি এদের প্রায়-কেউই। অথচ এই লেখকদের অনেকেই তৃতীয় বিশ্বের বাসিন্দা।

সামান্য ব্যতিক্রম ছিলেন গুটিকয় চিন্তক: যেমন ফাহমী হাওয়েদী। তিনি বলছেন, “উগ্রপন্থী দলগুলোর জঙ্গীপনার কথা যখন বলা হয়, তখন একইসাথে এই দলগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের সহিংসতার কথা বলা হয় না কেন, সহিংসতার যে চক্রে এগুলো সৃষ্টি হচ্ছে তার কথা বলা হয় না কেন?” [পৃষ্ঠা ৩১৭] অর্থাৎ সেটা বলা কিংবা উদঘাটন করার দায়িত্ব তিনি অন্য কাউকে ন্যস্ত করতে চান। রাদওয়ান আল সাইয়িদও এেেত্র রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দোষী মনে করেন। তার মতে, একটি প্রাণবন্ত রাজনৈতিক আবহ না-থাকার কারণে জঙ্গীবাদের রাজনৈতিক আকাক্সা প্রকাশ্য হওয়ার আশায় শেষমেষ সহিংস হয়ে উঠতে বাধ্য হয়। [ পৃষ্ঠা ৩৭৯]

এ প্রসঙ্গে এই গ্রন্থের সংকলক এবং অনুবাদক রেহনুমা-র একটি মন্তব্যকেও বিপদজনক সরলীকরণ মনে হয়েছে। প্রাককথন অংশে তিনি বাংলাদেশের জঙ্গী সম্পর্কে মন্তব্য করছেন, “ইসলামী/জঙ্গী ইসলামী শক্তি রাষ্ট্র-বিপীয় শক্তি না। ....বরং, তারা আম-জনতার প্রতিপ শক্তি।” [পৃষ্ঠা ২২] নানান পাবলিক স্থানে বোমা হামলার কারণে তিনি এই ‘জনপ্রিয়’ অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। আমল দেন নাই ধরা-পড়া জঙ্গীরা আমাদের বিচারব্যবস্থা নিয়ে কী কী কথা বলছে তার ওপর, এই বই যখন তিনি (রেহনুমা) লিখছেন তখন জঙ্গী শায়খ রহমান কিংবা বাংলা ভাই আদালতে দাঁড়িয়েই আদালত ব্যবস্থাকে প্রকাশ্যে বিদ্রুপ করছে। সেটি কি কেবলি নাটকীয়তা? সেটি কি তাদের রাষ্ট্রবিরোধী পজিশন নয়?

ইসলামী চিন্তার পুনর্পঠনের এই কালে চিন্তকদের নিজেদের মতের ভিন্নতা এবং বিষম অবস্থানের কথা আলোচনা হচ্ছিল। একটা ভাইব্র্যান্ট চিন্তাপ্রক্রিয়া চলমান আছে, এ ধরনের প্রপঞ্চ থেকে এটিই প্রমাণিত হয়। যেমন, রাশেদ ঘান্নুশী তালিবান প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আফগানিস্তানকে একটা অশিতি, ট্রাইবাল ও ভাঙ্গাচোরা সমাজ বলে অভিহিত করেন [পৃষ্ঠা ৫৪], অথচ হেবা এজ্জাত-এর কাছে পূর্ব এশিয়া, ইরান, আফগানিস্তান হচ্ছে বহু ফিকহ্ শাস্ত্রের উৎসস্থল [পৃষ্ঠা ৫৮]। এ কারণে চিন্তার েেত্র হেবা এজ্জাত ভৌগোলিক উৎকৃষ্টতা বা সিনিয়রিটির ধারণার সাথে একমত হন না। আবার আমিনা ওয়াদুদ-এর মতে, শরীয়া সম্পূর্ণরূপে পিতৃতান্ত্রিক [পৃষ্ঠা ৩৫]। কিন্তু তারিক রামাদান শরীয়ার পালম্বন করতে গিয়ে বলেন যে, শরীয়া কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, এটি মূল্যবোধের ব্যবস্থা। স্যাটেলাইট ধর্মযাজক শেখ ইউসুফ আল-কারাদাউয়ি-র মতে শরীয়ার ভিতর পাঁচটি বিষয় আছে: ধর্ম, আত্মা, মন. উত্তরাধিকার এবং ধনসম্পদ [পৃষ্ঠা ১৯০]। এটি পরিষ্কার যে, শেষোক্ত দুইজন শরীয়াকে একটা কোজড পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলে মানছেন না।

মিসরের সেক্যুলার নারীবাদীদের বিষয়ে হেবা এজ্জাতের মন্তব্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ লেগেছে। তিনি বলছেন, আইনের পরিবর্তন করে রাষ্ট্রকে মতায়িত করার মাধ্যমে মিসরের নারীবাদীরা রাষ্ট্রমতা দ্বারা আত্মসাৎকৃত হয়ে গেছেন। [পৃষ্ঠা ৬৪] কারণ চূড়ান্ত বিচারে রাষ্ট্রই যখন জয়ী হয়, তখন সেই নারীবাদীরা কার্যত রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ হয়ে পড়েন। এই পর্যবেণ বাংলাদেশের নারীবাদের েেত্রও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে।

‘সহনশীলতা’ প্রসঙ্গে তারিক রামাদানের অবস্থানটি বেশ চিন্তা উদ্রেককারী। তিনি বলছেন, “আমি সহনশীলতার ধারণার ঘোর বিরোধী। বেশির ভাগ সময়ে এর অর্থ হচ্ছে: ‘আমি গ্রহণ করি যে আপনি এখানে আছেন, যেহেতু আপনার এখানে থাকার ব্যাপারে আমার কোনো চয়েস নাই। কিন্তু আপনার এখানে থাকায় আমার কিছু যায়-আসে না, আমি [শুধু] আপনাকে বরদাশত করি।” [পৃষ্ঠা ১৪৩] একইভাবে, ‘বিশ্বাস’কে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক বৃত্তি হিসাবে দেখার উস্কানি পাওয়া যায় শাবেস্তারির প্রসঙ্গ আলোচনায়। এই চিন্তকের মতে, বিশ্বাস কখনোই অন্ধ অনুকরণ নয়। [পৃষ্ঠা ৪০৭] বিশ্বাস হচ্ছে যাচাই করতে পারা। ফলে তার জন্য চিন্তার স্বাধীনতা একান্ত দরকার। আবার, রাষ্ট্রগঠন আর উম্মাহগঠন যে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস সেটি শেখ তাহা-র জবানিতে পাওয়া যায়। তার মতে, ইসলাম রাষ্ট্রগঠন নয়, বরং উম্মাহগঠন নিয়ে ভাবিত। এসব-ই চিন্তার ঐতিহ্যে সমকালীন মুসলিম দার্শনিকদের মৌলিক অবদান বলে মনে হয়েছে।

খুবই চমৎকার লেগেছে আব্দোলকরিম সোরোউশ-এর কথাবার্তা। মুসলমানদের নীতিনৈতিকতার ঐতিহাসিক পতন বিষয়ে সুন্দর একটি ভাষ্য দাঁড় করান তিনি। তার মতে, ঐতিহাসিক কালে ইসলামে ফিকহ্ শাস্ত্রের চর্চা যতটুকু হয়েছে, এথিক্সের চর্চা/বিকাশ তত পরিমাণে হয়নি। তিনি মনে করেন, ফিকহ্ শাস্ত্রের বিধানকে এথিক্সের বিধানের চেয়ে শ্রেয়তর ভাবার কারণ নেই। এমনটা ভাবা হয়েছে বলেই ইসলামে মানবাধিকার-বিষয়টি দুর্বলভাবে এসেছে। কিন্তু, তার নৈতিক ভাষ্য দাঁড়িয়ে থাকে ‘আমাদের নৈতিক হতে হবে’ জাতীয় একটি পূর্বানুমানের ওপর। এরকম একটি পূর্বানুমান নীতিশাস্ত্রের ঐতিহাসিক বিকাশকে পাশ কাটিয়ে যায় বলে মনে হয়। কেন নৈতিক হতে হবে, এটি কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ কোনো অনুসন্ধান নয়, বিশেষত এই উত্তরাধুনিক যুগে। আরেকটি লেখায় আব্দোলকরিম সোরোউশ অধিকার বনাম কর্তব্যের তর্ক হাজির করেছেন ইমানুয়েল কান্ট তথা আধুনিক পাশ্চাত্যচিন্তার চোখরাঙানির সামনে। তার মতে, কী ইসলাম কী ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের ভাষা হল দায়িত্বপালনের ভাষা। আপনি ঠিকমত দায়িত্ব পালন করছেন কিনা সেটা দেখা ঈশ্বরের কাজ। কিন্তু আজকের আধুনিক মানুষ ঈশ্বরের এবাদত করাকে ‘দায়িত্ব’ ভাবতে রাজি নন, ঈশ্বরের এবাদত তার ‘অধিকার’। আর এই ধ্যানধারণাই হল লিবারাল পশ্চিমের লিগ্যাসী। এই লিগ্যাসী নিয়েই ইসলামের পুনর্পঠন করতে চান সমকালীন এই মুসলমান চিন্তাবিদেরা।

রেহনুমা আহমেদ-এর অনুবাদ ঝরঝরে Ñ এমনটা বলা যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও তার ভাষা আড়ষ্ট, আর হাইফেন-ব্যবহারে যথেচ্ছাচার ল্য করা যায়। বাংলা পরিভাষা প্রণয়নে তিনি বহু জায়গাতেই কনভিন্সিং হয়ে উঠতে পারেন নি, হয়ত বাংলা শব্দের ইটিওমোলজিক্যাল দিকটা বিবেচনায় না-আনার কারণে। যেমন ঊীঃবৎহধষরঃু শব্দের বাংলা করেছেন তিনি ‘বহিরাগততা’, আবার জবষধঃরারংধঃরড়হ শব্দটিকে বাংলায় লিখছেন ‘আপেকিতা-করা’ শব্দবন্ধে, যার অর্থ কী হয় সেটা নিয়ে ধন্দ জাগে। বাক্য গঠনেও তাকে নানা জায়গায় অমনোযোগী লাগে, যেমন ৪০২ পৃষ্ঠায় লিখছেন ‘বিতর্ক তার পিছু অনুসরণ করেছে’। কিংবা ৫০ পৃষ্ঠায়, ‘ঘান্নুশীর চিন্তা প্রকাশ করে পশ্চিমা এবং ইসলামী দর্শন, দুটোরই ওস্তাদী বোধগম্যতা’। এসব বাক্যের অর্থ অস্পষ্ট, দূরান্বয়ী এবং ফলত কখনো কখনো পীড়াদায়ক।

তবে, সমকালীন ইসলামী চিন্তকদের লেখা বাংলায় প্রকাশ করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় (এবং শ্রমসাধ্য) অনুমতিটুকু নিতে কার্পণ্য করেননি অনুবাদক। এটি প্রশংসার দাবিদার, কারণ এই দেশে গ্রন্থস্বত্ব কিংবা লেখাস্বত্ব স্বীকারের সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি। গ্রন্থটির একটি ভূমিকাও লিখেছেন তিনি (ভাগ্যিস সাঈদ ফেরদৌস এবং নাদিম মণ্ডল অনুরোধ করেছিলেন!)। তাতে, স্বল্প পরিসরে ইসলাম, জঙ্গীবাদ এবং বর্তমান দুনিয়ার হালঅবস্থা নিয়ে রেহনুমা আহমেদ একটি আলাপ পেশ করেছেন। ভূমিকাটি আরো বিস্তৃত হতে পারত।

সব মিলিয়ে, রেহনুমা আহমেদ-এর এই সংকলনে স্থান পাওয়া অধিকাংশ লেখকই ইসলামী সিভিল সোসাইটির লোক। দেখা যাচ্ছে, তারা কোরআনের পঠনপাঠন বিষয়ে যতখানি র‌্যাডিক্যাল, পশ্চিমের চিন্তা অ্যাকোমোডেট করার ব্যাপারে ঠিক ততখানিই লিবারাল। ইসলামের শুরুর দিকে গ্রিকচিন্তা-প্রভাবিত মুতাযিলা আন্দোলন কেন ব্যর্থ হয়েছিল, তার একটা পুনর্নিরীা করতে চান এই সমকালীন মুসলমান দার্শনিকেরা। এখন মনে হচ্ছে, সেই নিরীার ফল হাতে পেলেই কেবল এই পুস্তকের শিা সম্পূর্ণ হতে পারে। অপোয় থাকলাম, রেহনুমা আহমেদ বা অন্য কেউ হয়ত ‘রিইনভেন্টিং দ্য মুতাযিলাইট এক্সপেরিয়েন্স’ নামক বইটি বাংলাভাষার পাঠকদের পড়ার সুযোগ করে দেবেন।

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ-এর গল্প বিষয়ে

মাতৃমূর্তি ক্যাথিড্রাল। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। পেঁচা/প্রতিরূদ্ধ ২০০৪। মূল্য ১২৫ টাকা।


বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাস যুক্তি, বুদ্ধি, শুদ্ধি ও দৃশ্যবর্ণনার দাপটের ইতিহাস। এই মহান রাজপথে অনেক সৈনিক অকাতরে তাদের মূল্যবান মেধার খরচ করেছেন, তারপরও একে ছোটগল্পের একমাত্র ডাইস ধরে নিয়ে এর উপরে মালমশলা চাপানোর অন্ত নেই। ব্যতিক্রম চেষ্টা যে কিছু হয় নি তা নয়, তবে তাদের জন্য (কিঞ্চিৎ ভ্রুকুটি/প্রশ্রয়সহ) ‘কাব্যিক’ বা অন্য কোন বাতাবরণে মূলধারার বাইরে অন্য একটি লঘু প্রকরণের দোকান খোলার বাজে অভ্যাসও রপ্ত করেছি আমরা। সব কারখানাতেই ডাইস বদলানোর রেওয়াজ আছে, বছরে একবার, আর মালিক খুব কাইস্টা হলে দু’বছরে-তিনবছরে। বাংলা ছোটগল্পের বর্তমান ডাইসের মালিক শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ কাইস্টা ছিলেন না, নানারকম ডাইসের সন্ধান তিনি নিজেও যে করেন নাই এমনও নয়, তবু পৌত্রপৌত্রাদিক্রমে তারই চালু করে দেয়া ডাইস আমরাও চালু রাখতেছি। ফলে, বাংলা ছোটগল্প শতায়ু হতে না হতেই জটায়ু হয়ে উঠেছে, কেমন যেন প্রবীণ-প্রবীণ ভাব তার হাবভাবে। এখনকার অধিকাংশ ছোটগল্পের সর্বাঙ্গে প্রসববেদনা প্রকাশ্য, পড়ার পর মনে হয়, ফিরিয়া যাই, লইয়া আসি এর পয়দাকারীকে, আগলাইয়া রাখি পরবর্তী রিলিজের মর্মযাতনা থেকে।


সৌভাগ্যবশত, ফিরিবার প্রাক্কালেই কেবল নদীকূলের শ্মশান দৃষ্টিগোচর হয়, পালে জোর হাওয়া লাগে, কর্তব্যবোধ-সংক্রান্ত দার্শনিকভাব জ্রাগ্রত হয়, এবং এক অপেশাদার প্রকাশক কর্তৃক ‘মাতৃমূর্তি ক্যাথিড্রাল’ নামক একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘কালকেতু ও ফুল্লরা’র পর এটি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ’র দ্বিতীয় গদ্যকীর্তি। আয়তনের দিক থেকে মাতৃমূর্তি বেশ স্বাস্থ্যবান একটি সংগ্রহ, আমার মতে অন্তত তিনটি পুস্তকের সম্ভাবনাকে এখানে একত্রে পুরে দেয়া হয়েছে। সম্ভাব্য প্রথম পুস্তকটির (মাতৃমূর্তি ক্যাথিড্রাল, কালিদহ, খুনেরা, রীতিমত পর্ণোগ্রাফি, মিরাজ, ঘাতক, নোবডি ইত্যাদি) উদ্দেশ্য তার পাঠক/সমালোচককে চমৎকৃত করা, স্বস্তির মধ্যে রাখা, কোনোভাবেই অপ্রস্তুত করা নয়। এসব গল্প নিয়ে প্রগলভ হয়ে উঠার সুযোগ অনেক, কালিদহএর ইংরেজি শিক বা নোবডি’র ডেডবডিকে ধরে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পর্যন্ত তরতর করে উঠে যাওয়া যায়। এই পর্বে পাওয়া যায় একজন গল্পকার সুব্রত অগাস্টিন গোমেজকে, যিনি বঙ্গগল্পসাহিত্যে তার অপ্রতিষ্ঠার যাবতীয় সম্ভাবনা নির্মূলের ব্যাপারে একটুও ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নন।
তবু একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার: নোবডি একটি অসাধারণ রচনা, কথিত রাজপথের মার্চপাস্টের প্রোডাক্ট হলেও, এমনকি হ্রস্ব দৈর্ঘের বৃষ্টিও, যার আত্মায় কান পাতলে করলেংকোর নৈশঝড়ের (বনগর্জন-ভ­াদিমির করলেংকো) আভাস মিলবে হয়তো। আভাসেই ভালোবাসা মেলে, বইয়ে যাইই থাকুক, নাম নির্বাচনের জন্য হুমায়ুন আহমেদ যে খনিতে নামেন তার নাম রবীন্দ্রনাথ, সেটি তিনি আভাসের বাজারমূল্য বোঝেন বলেই। আসন পেয়ে যাওয়ার এটিও একটি তরিকা, কিন্তু সুব্রত’র মন মজে নি সেদিকে। তিনি সুদূরের পিয়াসী।

ফলত, তিনি অন্য এক ধরনের সুষমাসন্ধান করেছেন, এটাকে আমি ফেলছি দ্বিতীয় ক্যাটেগরিতে (ওমেগা, যৌবরাজ্য, বদলা, সেনবংশ ইত্যাদি)। এটি ছিল আশি দশকের আড্ডাগুলোর একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ফর্ম। দেখতে (বা শুনতে) তাদের উপকথার মত সাজানোগুছানো লাগলেও ভেতরে ভেতরে এরা ছিল অযুক্তির নৈরাজ্য-ভরা, যুক্তির নিরংকুশ আধিপত্যকে তারই অস্ত্রে পাল্টা আঘাত করার একটা স্বতঃস্ফূর্ত চর্চা । এই মৌখিক ঘরানার আধিকারিক ছিলেন জনাব শামসুল কবীর বা ইচক দুয়েন্দে (দ্রষ্টব্য: মাওলানা নাভাসি- কচিসমগ্র, পেঁচা/প্রতিরূদ্ধ ২০০৪)। যারা বঙ্গসাহিত্যে আশি দশকের ইম্প্যাক্ট নিয়ে নানান কটুকথা বলেন ও কটাসন্দেহ করেন, তাদের আমি এই বিষয়টি বিবেচনার আমন্ত্রণ জানাই। শামসুল কবীর চিন্তার যুক্তিশৃঙ্খলাকে পুরোপুরি পরাজিত করতে পেরেছিলেন তার ঐসব অনুগল্পে (দৃর্ভাগ্য, এদের অনেক গল্পই লিখিত নয়!)। সুব্রত কিন্তু পরাজিত করেন নি, পোষ মানিয়ে নিয়েছেন। ভাষার অলংকার কীভাবে উল্টো যুক্তিপরম্পরাকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করে Ñ ‘সেনবংশ’ এর উদাহরণ। ‘বদলা’ বা ‘আপেল পেকে এসো ক্রমে’ এই প্রবণতাটিকে আরও বড় প্রেেিত ফেলবার প্রচেষ্টা, যদিও খুব সফল হয়েছে এমনটা মনে হয় নাই।

তৃতীয় সম্ভাব্য পুস্তকটি (অফিস, প্রলয়পয়োধিজলে, যান, চরৈবেতি, রাইসুর বিচিত্র কান্ডকারখানা) বঙ্গসাহিত্যের পাঠ অভিজ্ঞতার বিচারে বিব্রতকর ব্যতিক্রম লাগতে পারে। সুব্রত তার অমরত্বের আকাক্সা রোপন করেছেন এই পর্বে এসে। এসব গল্পে তিনি উদ্দাম, অ-শাসিত, পূর্বাপর-অমনস্ক, চরিত্রচিত্রণে বায়াজড, নিজ জীবনাচরণে কমিটেড, এবং গতিধারায় প্রায়ই ইনটুইটিভ। প্রথম স্তরের গল্পগুলোতে তিনি যুক্তিপ্রক্রিয়ার গভীর বশ ছিলেন, দ্বিতীয় স্তরে উল্টো তাকেই পোষ মানিয়েছেন, আর এই স্তরে এসে ঐ পোষ-মানা জন্তুটির শেকল খুলে দিয়েছেন যাতে সে পালাতে পারে। আর শেকল-খোলা ঐ জন্তুটির আচরণ আরো বিস্ময়কর: কখনও সে পালায় দূরে, কখনও আবার পায়ে এসে মুখ ঘষে। এই টানাপোড়েনসমতে সুব্রত যে গদ্য তৈরি করেছেন সেটি তার সময়ের ভাষা, যদিও সেই সময়ের অনেক সাহিত্যকে আমরা ঐ ভাষায় কথা বলতে শুনি নি। এখানেই সুব্রত তার দশকের সাচ্চা প্রতিনিধিদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন হয়ে উঠেছেন, যা তিনি কবি হিসেবে আগে থেকেই ছিলেন (কাব্যগ্রন্থ- তনুমধ্যা, পুলিপোলাও) , যদিও কবিতায় তিনি এতখানি স্বাধীনতা উপভোগ করেন নি বলেই আমার মনে হয়েছে।

এর আগে বাংলা গদ্যসাহিত্যের সম্ভাব্য যে গতিপথটিকে ধ্র“ব ধরে নেয়া হচ্ছিল কয়েক দশক ধরে Ñ সম্ভবত মার্কসবাদী এবং নিও-মার্কসিস্ট নন্দনতত্ত্বের প্রভাবে Ñ মেদহীন ঝরঝরে শাণিত ভাষা, নির্লোভ লেখকত্ব, নির্মম কাহিনীবিন্যাস, মনোদৈহিক জটাজাল Ñ সুব্রত’র এই পর্বের গল্পগুলো তার ধ্র“বত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। সুব্রত আক্রমণ করেছেন ‘শাণিত’ ভাষাভঙ্গি-সম্পর্কিত আমাদের ধ্যানধারণাকে (প্রলয়পয়োধিজলে), লেখকসুলভ ‘নির্লোভ’ দূরত্বের মহিমা তিনি গ্রহণ করেন নি অনেক গল্পেই (অফিস, চরৈবেতি ইত্যাদি), তার বিবৃত কাহিনীর মধ্যে তিনি খুব ‘লিপ্ত’ থাকেন প্রায়ই (রাইসুর বিচিত্র কান্ডকারখানা। আরো দ্রষ্টব্য: ওমেগা এবং তৃতীয় প্রচ্ছদের উপসংহারগত সাযুজ্য)। সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম হল, যেসব প্রেতি লেখকের সাইকোঅ্যানালিসিস দাবি করে সেসব জায়গায় সুব্রত ফিজিক্যাল মুভমেন্ট ও সংলাপের দ্বারস্থ হয়েছেন (যান-এর শেষাংশ, নিশি, ঘাতক ইত্যাদি)। এসবই নতুন (বাংলা) ধরনের গল্পের আলামত, তাদের মধ্যে নৈরাজ্য থাকতে পারে, কিন্তু কেরাণিসুলভ কিষ্টতা নাই। এভাবেই সুব্রত’র গল্প আমাদের কাহিনীহীনতার দিকে আমন্ত্রণ জানায়, গদ্যকে যুক্তির শেকল থেকে মুক্ত করে এবং অযুক্তির বিনোদন পুরে দেয়। ‘মাতৃমূর্তি ক্যাথিড্রাল’ পাঠের বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে বাংলা গদ্যরীতি বা ছোটগল্পের ভবিষ্যত চেহারা ইত্যাদি ভাবনায় ফুর্তি আসে খুব, এটা উপরি পাওনা এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই।

বইটির প্রকাশক মানস চৌধুরী একজন অপেশাদার প্রকাশক, যদিও অপেশাদরিত্বের ছাপ তিনি গ্রন্থে রাখতে পারেন নি, দুয়েকটা বানানভুল ছাড়া। প্রচ্ছদ ভাল লাগে, তবে দূর থেকে। তৃতীয় প্রচ্ছদে লেখক সম্পর্কে একটি অতিনিরীহ বয়ান আছে যেটি গ্রন্থপ্রবেশে উদ্যোগী পাঠককে আরো ক্যাজুয়েল করে, আসন্ন রূদ্ধশ্বাস ভ্রমণের পূর্বাভাস দেয় না কোনমতেই। বিপদজনক ফাঁদ! ইচ্ছাকৃত?

ব্যর্থ গল্প লেখার সাহস ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

অদিতি ফাল্গুনীর গল্প এবং গল্পগ্রন্থের প্রকাশ নানা কারণে বিশিষ্ট। প্রথমত, তিনি বিচিত্র সব বিষয়ের গল্প বলতে চান। দ্বিতীয়ত, তিনি সাদামাটা গল্প বলেন না। তৃতীয়ত, নিজের প্রকাশকে (হয়ত বিকাশকেও) তিনি যাচাই করেন মার্কেজ, দস্তয়েভস্কি, সারামাগো বা আবুল বাশারদের সাথে। চতুর্থত, এই পোড়া দেশে শিতি পাঠক-লেখক-সমালোচকের অভাব আছে জেনেও ‘বাণিজ্যিক প্লাবনে’ গা ভাসান না। পঞ্চমত, গল্পকে তিনি উপন্যাস বানাতে চান না, মালমশলা যতই হাতে থাকুক। ষষ্ঠত, অন্তত পাঁচশ’ পৃষ্ঠার নিচে কোনো উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা তার নাই। ঐতিহ্য কর্তৃক প্রকাশিত এই গল্পকারের ‘বানিয়ালুকা ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থের শুরুতেই এতসব বিশিষ্ট তথ্যের সন্ধান মেলে।

বইয়ের প্রথম গল্প ‘বানিয়ালুকা’র বৈচিত্র্য স্পাশিয়াল বা ভৌগোলিক। জাতিসংঘ মিশনের দায়িত্ব পাওয়া এক বাংলাদেশী বৈমানিকের বসনিয়া-অভিজ্ঞতা। বানিয়ালুকা এক বসনিয়ান মুসলিম মহিলা যার সার্বিয় স্বামীকে মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদীরা মেরে ফেলে এবং তাকে নজরবন্দী করে। চিঠির মাধ্যমে সেই মহিলা শরণ নেয় একদা পরিচয় হওয়া ঐ বাংলাদেশী বৈমানিকের, যে চিঠি তার হাতে পৌঁছায় অনেকদিন পর। সময়মত পৌঁছালে ঐ বাংলাদেশী বৈমানিক কী করতেন সেটা জানা যায় না, কিন্তু পরে পৌঁছানোর কারণে ঐ বৈমানিকের পে নিজের কন্যাসন্তানের নামের সমস্যাটির সমাধান হয়। গল্পের বসনিয়া-প্রেতি বাদ দিলে এটি বিমল মিত্র ঘরানার গল্প, তবে ঐ প্রেতিটিই গল্পটিকে বিশিষ্ট করার চেষ্টা করে। বসনিয়া-পরিস্থিতিকে ক্রিটিক্যালি দেখার চেষ্টা আছে এই গল্পে, সেটি অবশ্য সার্বদের প্রতি মমত্ব জাগায়।

দ্বিতীয় গল্প ‘হেরূকের বীণা’র বৈচিত্র্য কালিক বা ঐতিহাসিক। ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থানের মুখে দাঁড়িয়ে বৌদ্ধদের আত্মোপলব্ধি আর দ্রোহপ্রস্তুতির গল্প। গল্পবুনন রীতি মনে করিয়ে দেয় ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ এর শওকত আলীকে এবং ‘পোড়ামাটির কাজ’এর আবদুল মান্নান সৈয়দকে। পাদটীকায় কিন্তু উনাদের নাম নেই, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা হয়েছে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কাছে।

‘সৌভাগ্যের রজনী’ গল্পে তেমন কোনো দৃশ্যমান বৈচিত্র্য নেই। বুঝি বা সে কারণেই এটিকে এই বইয়ের সেরা গল্প মনে হয়েছে। বিষয় খুব সাদামাটা, পতিতাপল্লীতে পতিতাদের শবেবরাত পালন। চাঁদ ও রুটির মধ্যে সংবেদন-বিপর্যয় ঘটিয়ে এই অসাধারণ গল্পটি শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত পাঠককে এক গভীর মমতায় জড়িয়ে রাখে। এই গল্পের উৎকর্ষ অদিতির বিষয়বৈচিত্র্যস্পৃহাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে। সেই প্রশ্ন আরো পোক্ত হয় পরবর্তী গল্পগুলো পড়ার পর।

‘আক্কাস নিবাড়ন...’ এই বইয়ের আরেকটি ভাল গল্প যার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ‘মিস বাংলাদেশ’ জাতীয় সেরা সুন্দরী ইভেন্টকে ব্যঙ্গ করা। কিন্তু লেখক উদোর পিন্ডি চাপান বুধোর ঘাড়ে, উদ্দেশ্যের অসহায় বলী হয় বামন সম্প্রদায়। অবাক লাগে, যিনি বসনিয়া-পরিস্থিতিতে সার্বদের ওপর মমত্বজাগানিয়া গল্প দাঁড় করান, তিনি কি না বেঁটেবামনদের দেখতে গিয়ে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গেলেন না!

এরপরের গল্পগুলোর ইতিহাস অদিতি’র নানারকম অসফল পরীানিরীার ইতিহাস। ‘জাফর, চিনিজাতক’ আর ‘জয়নালউদ্দিনস ট্রাভেলস’ ভালো লাগে নি তাদের মেটাফিজিক্যাল ট্রিটমেন্টের কারণে। চিনিজাতক-এ রিপোর্টিং আর জাতকগ্রন্থের কোলাজ করা হয়েছে, এক গ্লাসের মধ্যে পানি আর সর্ষে তেলের কোলাজের মত। পানিটুকু খেয়ে তেলটুকু মাথায় মাখা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না পাঠকের। একই অবস্থা ঘটেছে পরের গল্পে জয়নালউদ্দিন আর গালিভর-এর কোলাজ প্রচেষ্টার মাঝে। মেটাফিজিক্স আরো মূর্ত হয় জয়নাল-গল্পের উপসংহারে, যেখানে লেখক বলেন, ‘ফিরে ফিরে আসবে সেই অনন্ত কালচক্র’। এই লাইনটিই উক্ত দুটি গল্পের সারাংশ।

বাকি থাকে দুটো গল্প: ‘আর্থ-সামাজিক সমীা’ আর পুনর্মুদ্রিত ‘ব্রিংনি বিবাল’। এই দুই গল্পে (আগের জয়নালউদ্দীনস-এও) গল্পকার উপস্থিত হন একজন মাঠগবেষকের স্ট্যাটাসে, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে ঢাকাই সাহিত্যের দেশে। অর্থাৎ তিনি সাহিত্যিক, মাঠগবেষণাকে তিনি সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা জোগাড়ের একটা উপায় হিসেবে নিয়েছেন। এরকম একটা সৎ বয়ান আছে ‘আর্থ-সামাজিক সমীা’ গল্পে, যে সততার খপ্পরে-পড়া ডকুমেন্টারি ধাঁচের বৃহদায়তন গল্পটির পাঠ শেষপর্যন্ত একটি নির্ভেজাল পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়।

পুনর্মুদ্রিত ‘ব্রিংনি বিবাল’ পড়ে শেষ করার পর প্রথমেই স্বস্তি আসে এটা ভেবে যে, ভাগ্যিস এটাকে পাঁচশ পৃষ্ঠার উপন্যাস বানান নাই লেখক! আঠার পৃষ্ঠাতেই নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়! লেখকের পরিশ্রম হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায় গল্পটি পড়লে। মান্দি জাতির নানান বিষয় এসেছে এই গল্পে: তাদের ইতিহাস-পূরাণ, খৃস্টীয়করন এবং মান্দিদের ভূমিতে স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্টের নামে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন ফর্মূলার অন্যায় আরোপ, ইত্যাদি। প্রত্যেকটি বিষয়ের ওপরই লেখকের পর্যবেণ ভাল, এমন কি মূল কাহিনী অর্থাৎ পার্লারে কাজ করা মান্দি কিশোরীর কাহিনীটাও ভাল। কিন্তু গল্পে এদের পারস্পরিক ল্যাপ্টালেপ্টির ধরনটা যুতসই লাগে নি। খুব বানিয়ে তোলা মনে হয়েছে। ‘ব্রিংনি বিবাল’ এ লেখক দুইটা জায়গা থেকে মান্দিজাতিকে দেখেছেন: পৌরাণিক আর সমাজতাত্ত্বিক। এদের মেলামেশা কখনো কখনো বিপজ্জনক হয়ে গেছে, বিশেষত যেখানে তিনি মান্দিদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চালুর পৌরাণিক ব্যাখ্যা হাজির করেন, যেটা সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা থেকে অনেক দূরের, একটি পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যা।

‘বানিয়ালুকা’র অদিতি ফাল্গুনীর মাঝে অন্তত তিনটা ইতিবাচক লণ দেখা যায়। এক, ব্যর্থ গল্প লেখার সাহস আছে তার, দুই, গ্রামবাংলার কথাসাহিত্যবটিকা বিক্রি করেন না তিনি, এবং তিন, নিজের প্রায় গল্পেই হাজির থাকার চেষ্টা আছে তার। তার গল্পের বিষয় বিচিত্র, কিন্তু উন্মোচনের ধরন খুব হাতে গোণা। সেখানে তিনি প্রায়ই প্রি-অকুপাইড। এটা তার সীমাবদ্ধতা। ‘বানিয়ালুকা’ আর ‘সৌভাগ্যের রজনী’ ছাড়া এই বইয়ের বাদবাকি গল্প সুখপাঠ্য নয়, পাঠকের স্বস্তির ওপর সরাসরি আঘাত করে। এটা ঠিক সীমাবদ্ধতা নয়, এটা অদিতির সুচিন্তিত অবস্থান, ফলে এখানে সীমাবদ্ধতা যদি কিছু থাকে সেটা লেখকের বোঝাপড়ার এবং দৃষ্টিভঙ্গির। এই সবকিছু নিয়েই অদিতি ফাল্গুনী। বানিয়ালুকা-র গল্পগুলো অদিতি’র পরবর্তী গল্পপাঠের আগ্রহ জিইয়ে রাখে।

ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের ছাপা বাঁধাই ভাল। প্রচ্ছদ রিলিফ দেয়, ফলে ভাল। শেষ ফ্যাপে অদিতি’র ছবিটিও ভাল। কিন্তু টেক্সট ডিজাইন খুব ভাল লাগে না, সম্ভবত প্রতি পৃষ্ঠায় একটা করে আন্ডারলাইন রেখে পৃষ্ঠাসংখ্যা বসানোর কারণে।