নিম্নবর্গীয়পনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নিম্নবর্গীয়পনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯

বহুদিন পর নিজের ঘরে এসে...

বিদ্যাকুটে এলাম অনেক দিন পর। অনেক ধুলো জমেছে দেখি! পাসওয়ার্ড পর্যন্ত ভুলে গেছিলাম!!
বিদ্যাকুটকে পোড়োবাড়ি লাগছে একদমই।
আমাকে যারা এখানে ভিজিট করেছেন, তারা কি মনে রেখেছেন এই সাইটটিকে?
মনে রাখলে দয়া করে একটা করে মন্তব্য রেখে যাবেন।
হিল্লি-দিল্লি করছি, কিন্তু নিজের ব্লগেই থিতু হতে চাই।

বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০০৮

মধ্যবিত্তের কানসাট ও আন্তঃবিত্তীয় যোগাযোগ

কবিসভায় তর্ক হৈতেছিল কানসাট, মধ্যবিত্ত এবং আন্তঃবিত্তীয় যোগাযোগ লৈয়া। কানসাটের বিক্ষোভের সাথে সংহতি প্রকাশ করার জন্য কয়েকজন সংবেদনশীল কবি-সাহিত্যিক-রাজনীতিক একটা সভা আহ্বান করছিলেন টিএসসি-তে, সেইখানে উনারা উনাদের উদ্দিষ্ট শ্রোতৃমন্ডলীর ভিতর দুইচাইরজন ‘শ্রমিক শ্রেণীর’ লোক দেখতে চাইছিলেন। সেইটা ছিল জনাব ব্রাত্য রাইসুর আপত্তির বিষয়। ১. রাইসু মধ্যবিত্তের আয়োজন-করা সমাবেশে শ্রমিক শ্রেণীসদস্যদের এইরকম প্যাসিভ অংশগ্রহণের মধ্যে কোনোই মাহাত্ম্য পান নাই। তার কাছে একটা বহুচর্চিত ফর্মাটের মতই লাগতেছিল এই ধরনের আমন্ত্রণ। এবং ২. এই ধরনের সভাকে নিম্নবিত্তের তরফে মধ্যবিত্তের মতা কুক্ষিগত করা বা জাতির বিবেক হৈয়া উঠার প্রচেষ্টা লাগে রাইসুর।

রাইসুর প্রথম যুক্তি না-মানার কোনো কারণ দেখি না। প্রতিবাদ সংহতির উদ্দেশ্য যদি হয় ‘কানসাটের ঘটনাকে মধ্যবিত্ত সমাজে চাউর করা’ (ফারুক ওয়াসিফের চিঠি) তাইলে সেখানে শ্রমিক শ্রেণীর ‘স্যাম্পল’ রাখার কী ফায়দা? সেটা কি এজন্য যে, এতে কৈরা কানসাট লৈয়া মধ্যবিত্ত সমাজে আরো যা যা আলোড়ন-বিলোড়ন চলতেছে, তাদের সবার থিকা এই সংহতিসভার আয়োজকবৃন্দ যে বেশি ‘মূলানুগ’, কিংবা প্রতিনিধিত্বশীল -- সেই দাবি করতে পারেন? (বাক্যটা জটিল হৈয়া গেল! একটু ভাইঙ্গা ভাইঙ্গা বুইঝা লৈয়েন সবাই।)

অরূপ রাহী, ফারুক ওয়াসিফ কিংবা ইফতেখার মাহমুদ (আরো যারা যারা যুক্ত ছিলেন এই সংহতিসভায়) প্রমুখের নিম্নবিত্ত-দরদে আমার ব্যক্তিগতভাবে কোনো সন্দেহ নাই। এমনকি, গোটা মধ্যবিত্তসমাজে দলিত-সমব্যথী যারা যারা আছেন এবং নানাভাবে সেইটা প্রকাশ কৈরা যাইতেছেন, তাদের সবার মধ্যে এই ভাইদের (রাহী-ওয়াসিফ-লিপু)অগ্রগণ্য বিবেচনা করতেও আমি পিছপা নই। কিন্তু উনাদের সংহতিসভায় শ্রোতাশ্রেণীর যে সাম্যবাদ, বা ক্রস-শ্রেণী-অভিসার, সেইটা উদ্দেশ্যের দিক থিকা মহৎ মনে হৈলেও যোগাযোগের জ্ঞানগত বিবেচনায় কিছুটা অবাস্তব, তাতে সন্দেহ নাই আমার।

কিন্তু, মধ্যবিত্ত যদি নিম্নবিত্তের (তথা জাতির) কণ্ঠস্বর হৈবার চায়, তাইলে কী ক্ষতি (রাইসু এবং ভাস্করকে প্রশ্ন)? ইতিহাসে দেখা গেছে, নিম্নবিত্ত তাদের প্রয়োজনে সমব্যথী মধ্যবিত্ত সমাজের কাউকে নেতা বানায় (স্পার্টাকাস, লেনিন, মাও, হালে রব্বানী)। হয়ত এজন্য যে, একক কণ্ঠস্বর হৈয়া উঠার যে মধ্যবিত্তীয় সংস্কৃতি, সেইটা নিম্নবিত্ত আয়ত্ব করতে চায় না। কিংবা এজন্য যে, অভিজাতের সাথে লড়াইটা কয়েকধাপ ওপর থিকা আরম্ভ করবার যোগাযোগগত সুবিধা। নিম্নবিত্ত যদি মধ্যবিত্তরে তাদের প্রয়োজনে নেতা বানায়া ‘ইউজ’ করবার পারে, তাইলে মধ্যবিত্তও শ্রেণীগত নেতৃত্বলাভের বাসনা থিকা নিম্নবিত্তের আন্দোলনের পুরোভাগে (সমব্যথাসহ) দাঁড়ায়া যাইতে পারে। পারে না? এখানে বিষয়টাকে স্ট্র্যাটেজি অর্থে বিবেচনা করা ভাল, নীতিশাস্ত্রের দিকে না গিয়া। কারণ, নীতিশাস্ত্র প্রথমেই এই তর্কের প্রিমাইজটাকে চ্যালেঞ্জ করে: যা কিছু মহত্ত্ব সবই নিম্নবিত্তের আর যা কিছু ‘খাউজানি’ সবই মধ্যবিত্তের? এই ধরনের মূল্যারোপ নীতিশাস্ত্রসম্মত নয়।

কানসাট বিষয়ে প্রশ্নজাগর হওয়ায় রাইসুরে উছিলা কৈরা ‘কবিসভা’ তথা কবি সাহিত্যিকদের রাজনৈতিক ‘নিষ্ক্রিয়তা'কে বেশ একচোট নিলেন কেউ কেউ (উনারা নিজেরাও কবিসভার মেম্বার!)। এইটা দৃষ্টিকটু ও শ্রুতিকটু শোনাইছে। কে কখন কোন্ উদ্দীপনায় গরম হৈয়া উঠবে, সেইটা আন্দোলনের মাহাত্ম্য দিয়া ডিকটেট করা যায় না (তাইলে আমবাগানের জনগণ পলাশীর যুদ্ধের দর্শক হৈয়া থাকতেন না!) বাংলা সাহিত্য কার পানে ‘ভেটকাইয়া’ পৈড়া আছে সেইটা বাংলা সাহিত্যের অন্তর্যামী জানেন, আর বাংলা রাজনীতি কার পানে ভেটকাইতেছেন সেইটাও আগাম বৈলা দেওনের ব্যবস্থা নাই। থাকলে যে সংহতিসভার দাওয়াত আমরা পাইছি, সেইটা আরো আগে আয়োজিত হৈতে পারত। হয় নাই, কারণ আমাদের উদ্দীপ্ত হওনের নিজ নিজ ধরন আছে, ব্যক্তিভেদে, গোত্রভেদে, সংগঠনভেদে।

‘মহান’ কোনো মিশন নাই এমন সাহিত্যের দিকে অতীতের বামরাজনীতি একটু চোখ গরম কৈরাই তাকাইছে। যেন সাহিত্যের পুলিপিঠা একমাত্র তারই ভাপে সিদ্ধ হওয়া উচিত। মহাত্মা সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি, মায়াকভস্কি প্রমুখ এই কর্মকাণ্ডে বিস্তর ইন্ধন (অজ্ঞাতসারে) জোগাইছেন। উনাদের কর্মকান্ডের ওপর ভর কৈরা বামপন্থা ‘ঈমানপাতলা’ সাহিত্যিকের জন্য একটা ম্যানুয়াল বানাইবার চাইছে সেই সোভিয়েতকাল থিকা। সেই ম্যানুয়াল যুগে যুগে চাপান হৈছে পাস্তরনাক কিংবা সোলঝেনিৎসিন প্রমুখের কলমের আগায়। উনারা পলায়া পলায়া বাঁইচা ছিলেন, অনেকে পলায়াও বাঁচবার পারেন নাই। সেই আমলে স্ট্যালিনের হাত নাকি খোদার হাত থিকাও লম্বা আছিল!

সেই রামও নাই, অযোধ্যাও নাই। তবু মাঝে মাঝে ফোঁসফাঁস ফোঁসফাঁস শোনা যায়।

আরেকটা বিষয়: মানি আর নাই মানি, মধ্যবিত্ত মূলত প্রদর্শনের রাজনীতির-ই ভোক্তা। কানসাটের বিক্ষোভ নাগরিক মধ্যবিত্তের কাছে একটা টেলিভিজুয়াল রিয়েলিটি। অর্থাৎ, যারে ‘কর্পোরেট’ বৈলা গালি দেই, সেই মিডিয়াই কানসাট-কে আমাদের মত ‘বিবেকবান’ মধ্যবিত্তের সামনে হাজির করছে। আমাদের দিলে সহমর্ম তৈয়ার করছে। এইসবের কিউমিলিটিভ পরিণামেই সরকার তার মারদাঙ্গানীতি বদলাইতে বাধ্য হৈছে। কানসাটের বিজয় উদযাপনে টিএসসি-র সংহতিসভার যে ভূমিকা, তার চেয়ে সেই বিজয় অর্জনে মিডিয়ার গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। বেশি কি না, সেইটা হিসাব করলেই বোঝা যায়। যদি না বোঝা যায়, ‘কর্পোরেট’ মিডিয়ার এই রোল প্লে-কে যেসমস্ত রাজনৈতিক তত্ত্বকাঠামোর মধ্যে প্রশংসা করা না যায়, সেসমস্ত রাজনীতির খোলনলচা পাল্টাইবার সময় আসছে।




২০০৬




পরিশিষ্ট (কানসাট তর্কের নির্বাচিত অংশ)




`jeishob KLSB-sramik-peshajibi-rajnoitik-shangskritk kormi'- punjibad, purushtantra-shoshon-nipiron-nirjaton er biruddhe kaj korte chai, tader moddhe amar nam thakle amar bhaloi lagbo. ei lobh amar ase.ami ei lobher charcha kori. porishkar. porichoy to shamajik-rajnoitik nirman.

shobhar shobbho ra ki bolen?
[অরূপ রাহীর চিঠি]

টিএসসিতে আয়োজিত প্রতিবাদ সংহতির একটা লক্ষ্য ছিল, কানসাটের ঘটনার তাৎপর্যকে মধ্যবিত্ত সমাজে চাউর করা। আরেকটি লক্ষ্য ছিল, কানসাট যেভাবে পল্লীবিদ্যুতের শোষণ এবং রাষ্ট্রের খুনী চরিত্রকে তুলে ধরেছে, মধ্যবিত্ত মহলে তার জের টেনে লড়াইয়ের
ধ্বনিকে প্রতিধ্বনিত করা।
[ফারুক ওয়াসিফের চিঠি]

আমরা সুশীল লেখকেরা পরিচিত সম্ভাবনাময় সুশীল শ্রমিককূলেরে নিয়া একটি সংহতি সমাবেশ আসলে কী কারণে করুম! আর তাও আমাগো এলাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা সংলগ্ন! কারণ সেই প্রচার! আমি এই উদ্দেশ্যরে নেতিবাচক দেখি না অবশ্যই! কিন্তু এই অভিপ্সারে আমার মধ্যবিত্তের কুরকুরানীবৎ-ই লাগে!
[ভাস্কর আবেদীন-এর চিঠি]

shobkisui rajniti hoite pare hoito, tobe rajnitir ekta kaj hoilo shatru-mitra bhed, pokkho-bipokho-niropekkho khela chinte para.apne kar pokkhe ba niropokkhe? na ki gorib, borolok, moddhobitto shobar bibhinno bishoy e nijer pokkhe kotha bolen?


somaj shongshar nia apner kono nirdisto bekkha ase naki? ja dia amra 'shathik' upaye cholte firte bolte ebong na bolte pari? na ki , `tui cholte lag, ami tor pison thika shoja-dan-bam komu' ei line-e asen?


[অরূপ রাহীর প্রশ্ন, ব্রাত্য রাইসুকে]

gorib-er andolon luth koira nia buddhijibira je jatir konthoshor hoiya othar cheshtai roto kintu hoite partese na eita sthitabostha? sramik-ra je lekhok kabi buddhijibigo loge ek pongktite boshtei partese na eita sthitabostha?

[ব্রাত্য রাইসুর প্রশ্ন, অরূপ রাহীকে]


এক সাক্ষাৎকারে চমস্কিরে জিজ্ঞেস করা হইছিলো, বুদ্ধিজীবীর দায় কী। উত্তরে চমস্কি কইলো, কাজ হইলো সহজ জিনিসরে জটিল কইর‌্যা তুইল্যা ধরা।...... রব্বানী কানসাটের মানুষগরে আকাঙ্ক্ষারে ধারণ করতে পারছিলো বইল্যাই হেরে নেতা বানাইছে মানুষ। যখন আর ধারণ করতে পারবো না, তখন লাথ মাইর‌্যা সরাইয়া দিবো। আমার স্বল্পজ্ঞানে এতটুকুই বুঝতাছি।
[বাঁধন অধিকারী]


lekhok, kabi, buddhiji-go loge jokhon sromikgo kotha tola hoi tokhon shurutei sromik je lekhok, kabi ba buddhijibi hoite pare na ba parbo na ei shiddhanto deoya
hoiya jai. tokhon oi shobhai alongkarer adhik kono kam thake na sromik shahebgo.

[ব্রাত্য রাইসু]


এই শহরে সভা করিয়া ‘কলা’ করা হয়। কলার (আর্ট) নানান ছাল-বাকলা ছিড়িয়া রসাস্বাদন চলে। বাংলা সাহিত্য আপনাদের পথপানে ভেটকাইয়া পইড়া আছে, আপনারা তাকে উদ্ধার করবেন এই ভরসায় আছিলাম, আর দেখছিলাম সেইখানে কত কত বিষয়, কত মহার্ঘ আলোচনা উঠিতেছে আর পড়িতেছে, কত আগডুম বাগগুডুম ধ্বনিতে কান জারবার হইতেছে-তারপরও ভালই ছিল। খামাখা রাজনীতির কথা আনা রাহীর ঠিক হয় নাই। আপনারা তো ওইসব ভাবেন না।

[ফারুক ওয়াসিফের চিঠি]







শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

অতিগরিবের ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনার ভেতরে কোনো এক দিপালীর আত্মহত্যা



ভৈরবের দিপালীদের পরিবারে এখন অন্য অবস্থা। চাল আসছে, ডাল আসছে, এনজিও আসছে, ভিজিএফ কার্ড আসছে, ওয়ার্ড কমিশনার এসে সকালসন্ধ্যা খোঁজ নিচ্ছে। মেঘ না চাইতেই ঝড়!

ঝড়-ই তো। দিপালী যখন গলায় দড়ি দিয়ে ক্ষুধার জ্বালা চিরতরে মিটাল, তখন দিপালীর পঙ্গু বাবা ভাবছিলেন মেয়ের অন্তিম সৎকারের অর্থ জোগান দেবেন কিভাবে? কিন্তু কোত্থেকে কী যেন ম্যাজিক হয়ে গেল, মেয়েটা মরে গেল, আর সঙ্গে-সঙ্গেই রূপকথার মত অদ্ভূত সব ঘটনা। যে সমস্ত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের স্বপ্নও তিনি দেখেন নি, তারা এসে হাজির: সমবেদনাসহ, খাদ্যসহ, চাকরিসহ। একের পর এক রিকশা আর মোটরসাইকেল এসে থামছে তার ছাপড়ার সামনে, হতভাগা মেয়েটার জন্য মনের মধ্যে এক পশলা শোকও জমতে দিচ্ছে না।

পালা করে খেত দিপালীর পরিবার। আটজনের এই পরিবারে নিয়ম ছিল, যে-চারজন দুপুরে খাবে, রাতে তারা উপোস করবে। রাতে খাবে অন্য-চারজন। এভাবেই চলছিল তাদের ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। ভালই চলছিল। গোলমালটা লাগল, যখন দিপালীর প্রতিবন্ধী এক ভাই নিয়ম ভেঙ্গে পরপর দুইবার খেয়ে বসল। তাতে দিপালীর কপাল পুড়ল, ক্ষুধার যন্ত্রণার চেয়ে তার কাছে মৃত্যুকেই বেশি শান্তির মনে হল।

এরকম হয়েই থাকে। ‘ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনা’র যে দেশব্যাপী নীরব দযজ্ঞ চলে, তার খোঁজ সরকার নেয় না, এনজিও-র ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে তাদের জায়গা নাই, সংবাদপত্রের পাতায় তার সংকুলান হয় না ঘটনাহীনতার কারণে। এরমধ্যে হঠাৎ কোনো এক দিপালী মাঝখান থেকে দুম করে মরে বসে, বিব্রত হয় মধ্যবিত্তের সিভিল বিবেকব্যবস্থা। কিন্তু না হলেও চলত! কারণ পরিসংখ্যানে ‘স্ট্যান্ডার্ড এরর’ বলে একটা বিষয় আছে না? ক্ষুধা ব্যবস্থাপনার এই যে সর্বব্যাপী আয়োজন, তাতে দুয়েকটা দিপালী তো পরিসংখ্যানের নিয়মেও ঝরে যেতে পারে! পারে না?

এই হল শাস্ত্রের আসল নাম: নিখাদ নিপাট ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। এসেটহারা গরিবের ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা। এসেট নাই বলে সে ক্ষুদ্রঋণ পায় না, এনজিওর খাতা তার সামনে খোলে না। সরকারের তো দুইশ টাকার ভিজিএফ মশকরা, ক্ষুধার পেটে বয়স্কভাতার চুলকানি, তার দরজাতেও কত পেট-ভর্তি মানুষের ভিড়! আর বিত্তবান সমাজ? দিপালীর বাবা চেয়ে চেয়ে দেখেন ওদের। বুঝতেই পারেন না, জীবিত দিপালীর চেয়ে মৃত দিপালীর কদর এত বাড়ল কোন্ নিয়মে?


দিপালীদের পরিবারে যেভাবে ক্ষুধার ‘ব্যবস্থাপনা’ চলছিল, দিপালী আত্মহত্যা না করলে তা হয়ত সংবাদপত্রবাসী জানতই না। এভাবে নীরবে নিভৃতে ভয়ংকর ক্ষুধার সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে তাদের জীবন গড়িয়ে চলত। ষাট বছরের আয়ু তিরিশ বছরে ঠেকে যেত, অমর্ত্য সেন যাকে বলেছিলেন ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’। সেই অবসরে জিনি ইনডেক্স লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ত, ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল-এর বাৎসরিক প্রতিবেদনের মুখে মন্ত্রী বাহাদুরদের আস্ফালন দেখে খোদ দুর্নীতির দেবতাই বিব্রতমুখ হয়ে থাকত, আর পলিথিনের ছাউনি-দেয়া ছাপড়ার ঘরে বসে বসে সর্বগ্রাসী ক্ষুধার সাথে দিপালীদের এই কুটনীতি চলতেই থাকত!

এখনও তো চলবে সব-ই। প্রকল্প পরিচালকের পাজেরো চলবে, মাইক্রোক্রেডিট সামিট চলবে, দারিদ্র গবেষণায় দেশ সয়লাব হয়ে যাবে। চলবে না খালি দিপালীদের সাবেক ‘ক্ষুধা-ব্যবস্থাপনা’। কিছু বিবেকবান মানুষের তৎপরতায় এখন তাদের খাওয়া হচ্ছে তিন বেলা (কিন্তু কতদিন?)। আবার গরিবের জন্য তিন বেলা খাওয়াও কম বিপত্তির নয়! কোষ্ঠ তরল হয়ে যায়, ঘন ঘন ল্যাট্রিনে যেতে হয়, একথা বেগুনটিলা বস্তির বৃদ্ধা গুলবানু বলেছিল।

দিপালীর পরিবার তাদের এই গরিবি জানান দিতে চায় নি। তাই নিজেরা নিজেদের ‘ব্যবস্থাপনা’ তৈরি করেছিলেন। দিপালী আত্মহত্যা করায় সিভিল সমাজের জ্ঞানপাপ হয়ে গেল! আমরা জেনে ফেললাম, গরিব কিভাবে তার সবচেয়ে মৌলিক চাহিদার সাথে খেলে। ফলে, দিপালীর পরিবারের মত আরো অতিগরিব যারা আছে, যাদের ধারণা গরিবি জানান দেয়ার বিষয় নয়, তারা আরো সতর্ক হয়ে যাবে। এমনিতেই তারা সমাজে অস্পৃশ্য হয়ে থাকে, এরপর থেকে অদৃশ্য হয়ে থাকবে। ক্ষুধার আরো নিবিড় ‘ব্যবস্থাপনা’ বের করবে তারা। যেখানে আত্মহত্যাজাতীয় কোনো স্ট্যান্ডার্ড এরর থাকবে না, ফলে সিভিল বিবেক আসন্ন ঈদের প্রাক্কালে রং ঝলমল প্লাজার সামনে কোনোরকম দংশনে পড়বে না।

‘অতিগরিব’ নামে সমাজের একটা অংশের কথা অনেকেই স্বীকার করেন শুনি, কিন্তু তাদের কাছে পৌঁছাবার কোনো ফর্মূলা এখনও বাজারে আসে নি। শোনা যায়, অতিগরিবের উন্নয়ন অনেক দুরূহ, কারণ তাদের এসেট নাই (ফলে বন্ধকী নেয়া যায় না!), তাদের ভয়েস নাই (ফলে ইন-ডেপথ ইন্টারভিউ দেয় না তারা!), তাদের এমনকি কোনো আকাঙ্ক্ষাও নাই (ফলে অ্যাডভোকেসী মাঠে মারা যায়!)। আপামর প্ররোচনাহীন এক জনগোষ্ঠী! তারা এমনিতেই তিলে তিলে মরে, তাদের মধ্যে দিপালীর মত কারো কারো হয়ত মৃত্যুর এই শম্বুক গতি পছন্দ হয় না। তখন অতিগরিবেরা শিরোনাম হয়।

দিপালীদের বাড়িতে আজ দেশের বিবেকবান মানুষের সাহায্য পৌঁছেছে, কিন্তু দরকার সুনির্দিষ্ট পলিসি, আর তার যথাযথ বাস্তবায়ন, এইসব অতিগরিব এবং বিপদাপন্ন মানুষের কার্যকরভাবে বেঁচে থাকার জন্য। নাহলে, ভেবে দেখুন, মাস ছয় পরে, দিপালীদের সাহায্যের টাকাই ফুরিয়ে যাবে না, এর সাথে তাদের এতদিনকার ‘ক্ষুধা ব্যবস্থাপনা’র অভ্যাসটিও হারাবে তারা। সেইসাথে, আরেকবার সংবাদ শিরোনাম হবার ভয়ে সমাজে তারা আরো ইনভিজিবল হয়ে যাবে। ফলে, দিপালীর পরিবার তথ্যপ্রবাহ হয়ে আমাদের বিবেকে আর হয়ত কামড় বসাবে না, কিন্তু ক্ষুধার কামড় থেকে তারা কি মুক্তি পাবে?

২০০৫
সংবাদের লিংক:
http://www.thedailystar.net/2005/10/16/d51016110280.htm

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

"চন্দ্রবিন্দু" যেভাবে তৈরি হল




বিপুলা এই টেলিভিশন মিডিয়ার সম্ভাবনার কতটুকু জেনেছি আমরা? সর্বসাকুল্যে টেলিভিশন অনুষ্ঠান বলতে খালি দেখছি বিভিন্ন দৈর্ঘের নাটক, বিভিন্ন প্রস্থের টকশো, আর নানাবর্ণের আইডল প্রতিযোগিতা। এর বাইরে বিস্তীর্ণ অভিজ্ঞতার যে দেশ, সেখানে এই বাক্সটির সম্ভাবনা কীরকম? গতানুগতিক এই সমস্ত ফর্মাটের বাইরে নতুন কোনো বিনোদনের সুযোগ আছে কিনা টেলিভিশনে?

এরকম একটি জায়গা থেকেই চন্দ্রবিন্দুর কথা ভাবা। ২০০৫ সাল সেটি, আমি শিল্পসাহিত্যে দৃষ্টিসংবেদন নিয়ে গবেষণা করছি, একই বছরে এটি দেখা না-দেখার চোখ নামক বই হয়ে বেরোয়। ব্যতিক্রমধর্মী ঐ সংকলনের কাজ করতে করতে কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামানের সাথে চন্দ্রবিন্দু নিয়ে অনেক আলাপ, কবি সাজ্জাদ শরিফের সাথেও। চিন্তার জট খুলতে থাকে, বন্ধু এবং মেধাবী নির্মাতা নূরুল আলম আতিক প্রবল উৎসাহে এগিয়ে আসেন। তারপর অনেকদিন ধরে চন্দ্রবিন্দু এগিয়ে চলছিল এই চতুষ্টয়ের চিন্তার মিথষ্ক্রিয়ায়। এই পর্যায়ে একটা ছন্দোপতন: আমাকে চলে যেতে হয় দেশের বাইরে। কিন্তু থেমে থাকে নি চন্দ্রবিন্দু, বরং আতিকের সুযোগ্য চিন্তায় ও সৃজনী দক্ষতায় তরতর করে বেড়ে উঠতে থাকে। আমি দূরদেশে বসে খবর পাই। পরম আনন্দ হয়।


চন্দ্রবিন্দু বানানোর মূল প্রণোদনা কি? এক কথায় এর উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, শ্রেণীনির্বিশেষে মানুষে মানুষে যোগাযোগের একটা পাটাতন তৈরি হয় কিনা সেটা খতিয়ে দেখা। ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের এই কালে মানুষ তার ধর্মের কিংবা শ্রেণীর ঘেরাটোপে যেভাবে বন্দী হয়ে পড়ছে, তার ফলে কবুতরের খোপের ভেতর ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে আটকা পড়েছে চিরকালের কথকতা। কিন্তু ধনীর বারান্দায় যেমন বৃষ্টি পড়ে, গরিবের ঘরেও। তাদের প্রত্যেকেরই শৈশব আছে, আছে ভুতের ভয় কিংবা মায়ের কাছে যাবার আকূলতা। একই আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে পড়ছে বিভক্ত সমাজে, ফলে তার অর্থ ও অনর্থ স্থানবিশেষে ভিন্ন হয়ে যায়। আমরা ভিন্নবিভক্ত হয়েই একে মোকাবেলা করি, ভুলে যাই এর অভিন্ন উৎসের কথা। চন্দ্রবিন্দু আমাদের এই প্রতিদিনের খন্ডিত অনুভবগুলোকে আশ্রয় করেই চিরকালের বাঁশিটি বাজাতে চেয়েছে।

চিরকালের বাঁশি চিন্তায় বাজানো যত সহজ, পর্দায় বাজানো ততই কঠিন। বিশেষ করে যে পর্দায় স্টেরিওটাইপ ইমেজ আর বাণিজ্যের জংলীজটিল রাজনীতি দিয়ে মধ্যবিত্তের বিনোদন তৈরি হয়, সেখানে ভিন্নধারার একটি অনুষ্ঠানের জন্য জায়গা পাওয়া খুবই মুশকিল। কিন্তু নুরুল আলম আতিক দমে যাবার পাত্র নন, তাই তো নানান বৈরী অবস্থা পার হয়ে চন্দ্রবিন্দু আজ চ্যানেলআই-এর পর্দায়। এর মধ্যেই দর্শক এর প্রথম পর্বটি দেখে ফেলেছেন। চন্দ্রবিন্দু কতটা সফল কিংবা কতটা ব্যর্থ সে বিচারের ভার তাঁদের ওপর। কিন্তু আমি খুশি আমার একটি ভাঙাচোরা স্বপ্নকে এত নিপুণভাবে বাস্তবের পর্দায় হাজির হতে দেখে। আতিক সেটি করেছেন, তিনি এই স্বপ্নের যেমন সারথী ছিলেন তেমনি বাস্তবেরও রূপকার হয়ে দেখালেন। চমৎকার একটি সেটে অনবদ্য লাগছে শারমিন লাকী-র নাটকীয় উপস্থাপনা। চন্দ্রবিন্দু জয়যুক্ত হোক।


মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট, ২০০৮

সাহিত্য কি আমাদের বিপক্ষে? : অন্ধত্ব ও সাহিত্য নিয়ে কেনেথ জার্নিগান-এর রচনা



সাহিত্যের উপাদান হিসেবে অন্ধত্বকে খোদ অন্ধরা কিভাবে মূল্যায়ন করে? আমেরিকার ন্যাশনাল ফেডারেশন অব দ্য ব্লাইন্ড এর ড. কেনেথ জার্নিগান-এর এই লেখাটি সাহিত্যের সেই চেহারা তুলে ধরেছে যেখানে চক্ষুষ্মান সাহিত্যিকগণ চক্ষুহীন মানুষকে সাহিত্যের উপাদান করতে গিয়ে তাদের স্বাভাবিক জগতের বাইরে ছুঁড়ে দিয়েছেন। এমন কি জন মিল্টনের মত খ্যাতিমান অন্ধ সাহিত্যিকেরাও, কেনেথ বলছেন, এইসব জনপ্রিয় ধারণার ফাঁদে পড়ে গিয়ে অন্ধত্ব নিয়ে দৃষ্টিবান মানুষ যা ভাবতে পছন্দ করে তারই প্রতিধ্বনি করেছেন।

কেনেথ-এর মতে, অতীতকালের সাহিত্য যেখানে অন্ধত্ব বিষয় হিসেবে এসেছে তা মোটেও অন্ধদের বাস্তবতাকে সমর্থন করে না, ফলত অন্ধদের জীবনে সেসব মোটেও কোনো উৎসাহ জোগায় না। বর্তমানের সাহিত্যে বেশ কিছু ইতিবাচক মোড়বদলের কথা তিনি বলেছেন, যদিও রেফারেন্স দেন নি। অবশ্য কেনেথ-এর বক্তব্য তৈরি হয়েছে প্রধানত তার চিরায়ত ইংরেজি ও ফরাসী সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা থেকে। আর সাহিত্যের কাছে তার প্রত্যাশার ধরনটিও বিতর্কের বিষয় হতে পারে।

["দেখা না-দেখার চোখ" এ এই অনুবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল]



ইতিহাস যেমন মানুষের কৃতকর্মের সন্নিবেশ তেমনি সাহিত্য হল তার চিন্তার সমাবেশ। আমি এখন বলতে চেষ্টা করব সাহিত্যে অন্ধদের উপস্থাপনার ধরন নিয়ে। কীভাবে দেখা হয়েছে আমাদের সেখানে? আমাদের ভূমিকা কী? কবি, উপন্যাসিক, প্রবন্ধকার ও নাট্যকারগণ কী ভেবেছেন আমাদের নিয়ে? অন্ধত্ব জিনিসটা আসলে যেরকম তারা কি সেইরকমই দেখেছেন, নাকি তারা যেরকম দেখতে চেয়েছেন, অন্ধত্বকে সেইরকম করেই তুলে ধরেছেন?

সাহিত্যে অন্ধজীবন নিয়ে কোনো একক বা একটি সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি নেই। বরং দেখা যায় সাহিত্য অনেকগুলো বিচিত্র এবং পরস্পরবিরোধী অন্ধত্বের ইমেজ হাজির করছে, সেটি শুধু যুগ বা সংস্কৃতিভেদে নয়, শুধু লেখকভেদে নয়, এমন কি একই বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায়ও এই বৈপরীত্য বিদ্যমান।


বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাহিত্যে অন্ধত্বের বিষয়টি মোটামুটি নয় ধরনের বিষয়াশ্রিত হয়ে এসেছে: অলৌকিক ক্ষমতারূপে, নিরুদ্ধার ট্রাজেডী হিসেবে, নির্বুদ্ধিতা ও অসহায়ত্বের পূর্বগামী হয়ে, ধূর্ততা আর শয়তানি সহযোগে, নিখাদ পূণ্যের সহগামী হিসেবে, পাপের শাস্তিরূপে, অস্বাভাবিকতা এবং বিমানবিকীকরণের সূত্রপাত হিসেবে, শুদ্ধতার প্রতীকরূপে, অন্য কিছুর প্রতীক বা রূপক হিসেবে।

অলৌকিক বা আল্লাপ্রদত্ত ক্ষমতা হিসেবে অন্ধত্ব সাহিত্যে কিভাবে চিত্রিত? ধরা যাক আপনাদের কেউ আমায় জিজ্ঞেস করলেন, অন্ধ হওয়ার কি কি সুবিধা আছে বলে আমি মনে করি? এবং ধরা যাক আমি উত্তর দিলাম: কোনোই সুবিধা নেই, তবে এমন কিছু দিক আছে যা হয়ত আমরা ভেবে দেখি না। আবিষ্কারের জন্য একটা নতুন জগত, নতুন এবং অভিনব প্রত্যণ, নতুন জেগে উঠা মতা; অন্ধ জীবন চতুর্থ মাত্রার জীবন। এরকম শুনলে একজন অন্ধ হিসেবে আপনি কী বলবেন? অনুমান করি, হাসতে হাসতে বিষম খাবেন। আমার মনে হয় না এইসব বস্তাপচা বোকাভাষণ কাউকে আকৃষ্ট করবে। আপনারা এবং আমি নিজের মুখে ঝাল খাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, অন্ধত্বের কোনো চতুর্থ মাত্রা নেই, অন্ধ হলে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা জাগ্রত হয় না, কোনো অদ্ভূত অনুভূতি হয় না, উন্মোচিত হবার জন্য নতুন কোনো জগত এসে হাজির হয় না। কিন্তু আমি যে উদ্ধৃতি দিয়েছি সেটি কিছুকাল আগের এক জনপ্রিয় উপন্যাস থেকে নেয়া।

অলৌকিক বা প্রকৃতিপ্রদত্ত মতার সাথে অন্ধত্বের এই যে মেলবন্ধন, এটি সাহিত্যে একটি সর্বজনমান্য ঐতিহ্য, চিরায়ত পূরাণকাহিনীগুলোতেও এর শেকড় আছে। প্রাচীন গ্রিসের দেবতাদের মধ্যে মানুষকে শাস্তি দেয়ার একটা পছন্দনীয় প্রথা ছিল অন্ধ করে দেয়া। একে সাধারণভাবে মৃত্যুর চেয়েও খারাপ মনে করা হলেও, কখনো কখনো, দেবতার কৃপায় সেই অন্ধ হয়ে যাওয়া শাস্তিগ্রহীতা ব্যতিক্রমী কিছু ক্ষতিপূরণও পেয়ে যেতেন: যেমন ভবিষ্যকথন ক্ষমতা। মনে করা হয়, হোমার তার অন্ধত্বের ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেয়েছেন কবিত্বশক্তি। একইভাবে, সফোকিসের নাটকে যে টাইরেসিয়াসকে পাওয়া যায়, অন্ধ হবার বদলে নবুয়তপ্রাপ্তি ঘটেছিল তার।

উনবিংশ শতাব্দীর মহান উপন্যাসিক ভিক্টর হুগো’র ‘দ্য ম্যান হু লাফস’ উপন্যাসে অন্ধত্ব নিয়ে আধুনিক লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি মেলে। সেখানে অন্ধত্ব শুদ্ধতা ও আনন্দের সহযোগী হয়েছে, যা কোনোভাবে দৃষ্টিহীনতাকে পুষিয়ে দিচ্ছে। তার উপন্যাসের অন্ধ নায়িকা দিয়াকে দেখা যায় এক পরমানন্দে বিভোর হয়ে থাকতে, যেটা অন্ধের পক্ষে বেমানান ঠেকে। এই পরমানন্দ কখনো কখনো আত্মার গহীনে অনুধাবনের জন্য অন্ধদের এক সঙ্গীত উপহার দেয় এবং তার মাধ্যমে তাদের অন্ধকার জীবনকে আলোকিত করে তোলে। হুগো’র মতে অন্ধত্ব হল সেই অন্তহীন গুহা যার মধ্যে অসীমের ঐকতান ধরা দেয়।

সম্ভবত, জনপ্রিয় কল্পকাহিনীর অন্ধ গোয়েন্দাদের কীর্তিকলাপের মাধ্যমেই অন্ধত্বের সাথে ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের যোগাযোগ পরিস্ফুট হয়। ম্যাক্স ক্যারেডস নামের ফোর্থ ডাইমেনশনাল চরিত্রটি আবির্ভূত হয়েছিল ১৯১৪ সালে এবং গোটা বিশের দশক ধরে নানান অতিমানবীয় ঘটনার নায়ক হয়ে থেকেছে সে। ১৯১৫ সালে আমরা পাই ডেমন গন্ট নামক আরেকজন অন্ধ গোয়েন্দাকে, যিনি একটা কেসও হারেন নি। এই তালিকায় থর্নলে কল্টন, ডানকান ম্যাক্সেইনসহ আরো অনেক চরিত্রের নাম যোগ করা যায়। যেমন হয়েছে গোয়েন্দা ডানকানের চরিত্রের বেলায়। এখানে ডানকানের নৈপুণ্যের ছটায় তার স্রষ্টাই ঢাকা পড়ে গেছেন। তবু এমন কিছু মুহূর্ত আসে, ডানকানের স্রষ্টা লিখেছেন, যখন সাধারণ মরণশীল মানুষের ক্ষমতার অতিরিক্ত কিছু মতা ডানকানের অধিগত হতে দেখা যায়। এসব মুহূর্ত তাকে উদ্বিগ্ন করে।

তারা সেইসঙ্গে আমাদেরও উদ্বিগ্ন করেন। অন্ধত্বের সাথে এসব অস্বাভাবিক এবং অতিমানবিক ক্ষমতারোপ নিঃসঙ্গ ও আলাদা, অসহজ এবং উদ্ভট একটি বস্তাপচা চরিত্রের আদলে ভাবা থেকে অন্ধকে একটুও রেহাই দেয় না। বরং পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটায়।

এটি শুধু অসত্যই নয়, অন্ধদের জন্য নেতিবাচকও। কারণ এতে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, কোনো অন্ধ মানুষ যা অর্জন করল তা নিজের যোগ্যতায় নয়, বরং অন্ধত্বে নিহিত কোনো ম্যাজিকের বদৌলতে। অন্ধত্বের ওপর এহেন অতিমানবীয় ক্ষমতারোপ এক লহমায় সাধারণ বাস্তবতা থেকে উঠিয়ে নিয়ে অন্ধকে দাঁড় করায় অস্বাভাবিকতার উদ্ভট এক মঞ্চের ওপর। অথচ অতিমানবীয় বা অস্বাভাবিক যাই হোক, এটিই ধ্রুবসত্য যে, অন্ধের কোন দায় নেই, অধিকার নেই, সমাজ নেই এই পৃথিবীতে।

কৃতকর্মের পুরষ্কার হিসেবে প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতা অর্জনের ধারণা অন্ধের জন্য কোনোভাবেই প্রশংসাসূচক নয়, বরং অপমানকর। এই ধারণা আমাদের যাবতীয় অর্জনকে ছিনিয়ে নেয়, এমন কি আমাদের ব্যর্থতার দায়ও আমাদের বহন করতে দেয় না। এই ধারণা অন্ধের জন্য একটা সুষম সমাজ গঠনের দায় থেকে বিদ্যমান সমাজকে মুক্তি দিয়ে দেয়। চারপাশের জীবনে উদ্দাম ও সমান অংশগ্রহণের সামর্থ অর্জনে আমাদের মোটেও উদ্দীপ্ত করে না। সংক্ষেপে এই ধারণা অনুযায়ী, অন্ধ অসাধারণ হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই সাধারণ হতে পারে না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমরা অতি সাধারণ অন্ধলোক, আশির্বাদপুষ্টও নই, অভিশপ্তও নই।

অন্ধত্বের ওপর প্রকৃতিদত্ত মতারোপের ধারণা নেতিবাচক হলেও অনেক কম ক্ষতিকর, সাহিত্যে অন্ধত্বের সাথে এর চেয়েও ক্ষতিকর অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে। সবচেয়ে তিকর ধারণাটি আবার সবচেয়ে প্রাচীনও: সেটি হল অন্ধত্বকে একটি সম্পূর্ণ ট্রাজেডী হিসেবে দেখা। একটি হিব্রু প্রবাদ আছে, অন্ধলোক হল মৃত মানুষের মত। অন্ধকে জীবন্মৃত করে উপস্থাপনের চরম নিদর্শন পাওয়া যায় ইদিপাসকে নিয়ে লেখা গ্রিক নাটকগুলোতে। ইদিপাস রেক্সে রাজা নিজেই যখন নিজের চোখ তুলে ফেললেন তখন নাট্যকার বলছেন: অন্ধ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই ভাল ছিল। এই ঐতিহ্যের বিস্তার ঘটে ইংরেজি সাহিত্যেও। সেখানে একজন কবি, নিজেও যিনি অন্ধ, অন্ধত্বকে মহাদুর্যোগ আখ্যা দিয়ে শেষকথা বলছেন। স্যামসন অ্যাগনেষ্টিজ-এ জন মিল্টন:
শত্রুবেষ্টিত অন্ধের চেয়ে অনেক ভাল ছিল বন্দী হওয়া, পাতালে নিক্ষিপ্ত হওয়া, ভিক্ষা করা, বা ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া। তুচ্ছাতিতুচ্ছ পতঙ্গজীবনও আমার চেয়ে ভাল। তারা হামাগুড়ি দিয়ে চলে, তবুও তো দেখতে পায়। আমি, আলোর মধ্যে অন্ধকার, প্রতিদিনের প্রতারণা, প্ররোচনা, ঠগবাজি বা ভুলভালের কাছে প্রতিদিন ধরা খাই। দরজা খোলা থাকা না থাকা আমার জন্যে সমান, সেটা অন্যের বিষয়, আমার নয়। অর্ধেকের কম আমি জীবিত, অর্ধেকের বেশি আমি মৃত, একটা চলমান কবর।

এই মহাকাব্যিক কবিতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় এর মহাদুর্যোগ পরিস্থিতি নয়, উল্লেখযোগ্য হল আমাদের মহাকবি মিল্টন এর রচয়িতা। তার সব মহৎ রচনা (প্যারাডাইজ লস্ট সহ) লিখিত হয়েছে তিনি অন্ধ হয়ে যাবার পরে। তাহলে তিনি কেন অন্ধত্বকে এমনভাবে দেখতে গেলেন? উত্তরটা সহজ: আমরা অন্ধরা নিজেদের অবস্থাকে সেভাবে দেখতে চেষ্টা করি, যেভাবে চক্ষুষ্মান মানুষ আমাদের দেখতে চায়। এমন কি, যখন আমরা বুঝি ঐ দৃষ্টিভঙ্গি একদম ভুল, তারপরও সেই মতামতটিকেই আমরা নিজেদের ওপর চাপাতে দিই বা চাপিয়ে নিই। এভাবে অনেক সীমিত ও খণ্ডিত অনুধাবন আমাদেরই সহায়তায় আমাদের বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে থাকে। সাহিত্যের গতানুগতিক ঐতিহ্য দ্বারা চালিত হয়ে মিল্টন নিজের এবং তাবৎ অন্ধদের জন্য একটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি উপহার দিলেন। সত্যি বলতে কি, মিল্টন বরং অন্ধত্ব নিয়ে সাবেকী বস্তাপচা মতামতগুলোর পালেই হাওয়া দিলেন, এবং সেটি তিনি করলেন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিপক্ষে গিয়ে। সাহিত্যের ক্ষমতা সত্যিই অনেক!

এক শতাব্দী পর অন্ধত্বের দুর্যোগের ধারণাটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। কিপলিং-এর ‘দ্য লাইট দ্যাট ফেইলড’ পুস্তকে বলা হয়, অন্ধত্ব মৃত্যুর চেয়েও খারাপ। এই বইয়ের নায়ক যখন জানতে পারে যে, সে অন্ধ হতে চলেছে, তখন বলে: এটা হল চলমান মৃত্যু। অন্ধকারে আমাদের নিশ্চুপ হয়ে থাকতে হবে এবং আমরা কাউকেই দেখব না, যা চাই তা কোনোদিনই পাব না, শতবছরও যদি বাঁচি। পুস্তকটির পরবর্তী অংশে নায়ককে দেখা যায় সমগ্র পৃথিবীর বিরূদ্ধে আক্রোশে ফেটে পড়তে, যেহেতু সেই পৃথিবী দেখতে পায়, যেখানে সেই নায়ক অন্ধের মৃত্যুর মাঝে মৃত হয়ে আছে, সহযোগীদের কাঁধে দুর্বহ বোঝা হয়ে। যখন এই আত্ম-অনুকম্পায় ভরা চরিত্রটি আত্মহত্যা করতে সমর্থ হয় (কী যে স্বস্তির খবর!) কিপলিং বলে ওঠেন যে, এই অন্ধ নায়কের ভাগ্য শেষপর্যন্ত ওর সাথে প্রতারণা করে নাই, কারণ সে একটা দয়ালূ বুলেট অন্তত নিজের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে।

‘দ্য এন্ড অব দ্য টিদার’ উপন্যাসে জোসেফ কনরাড তার চরিত্র ক্যাপ্টেন হুয়েলীকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করেন, কারণ সেটি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে অনেক ভাল। ডি এইচ লরেন্সের উপন্যাস ‘দ্য ব্লাইন্ডম্যান’ এ মরিস যুদ্ধে অন্ধ হয়ে যায়, ভবিষ্যতের কোন সোনালি ইঙ্গিতই তার দুর্দশা লাঘব করে না। ‘ইনভাইটেশন টু দ্য ওয়াল্টজ’ উপন্যাসে লেখক রোজামন্ড লেম্যান আরো এককাঠি সরেস। তার উপন্যাসের যুদ্ধে-অন্ধ-হওয়া চরিত্রটি সমাজে সম্মানজনক জীবন যাপন করলেও, কোনো কাজে লাগে না, যেন একটা চলতে ফিরতে থাকা লাশ। যখন সে তার প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে নাচে তখন পরিস্থিতি খুব বেদনাদায়ক হয়ে উঠে। অন্ধলোকটি তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে নিবিড় করে ধরে রাখলেও প্রকৃত প্রস্তাবে সে তখন অনেক দূরে, সঙ্গীত থেকে, জীবন থেকে, সমাহিত এবং পছন্দশূন্য। আর প্রেমিকা আসলে ঐ অন্ধলোকটির চক্ষুষ্মান যুবক বয়স আর বর্তমানের মৃত্যুর সাথে নাচে।

এই লেখকেরা মনে করেন, অন্ধত্বের তথাকথিত ট্রাজেডী এতটাই দুর্বহ যে, খোলা আছে দুইটি রাস্তা: হয় চোখ ফিরে পাওয়া, নয় মরে যাওয়া।

দেখা যাক অন্ধত্বের সাথে নির্বুদ্ধিতা আর অসহায়ত্বের প্রসঙ্গকে কিভাবে মেলানো হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকেই অন্ধরা রগড় নাটক ও প্রহসনে উপহাসের বিষয় হয়ে থেকেছে। প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন রগড় নাটক ও প্রহসনে অন্ধরা উপহাসের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। মধ্যযুগে দেখা যেত অন্ধরা গাধার কান লাগিয়ে পথে পথে ঘুরছে, হাতপা নেড়ে উল্টাসিধা কথা বলে জনগণের মনোরঞ্জন করছে। এই ধারাবাহিকতায় চসার তার ‘মারচেন্টস টেল’এ এক তরুণী বধুর কথা বলেন যে এক অন্ধ বুড়োকে বিয়ে করে। স্বামীর সঙ্গে বাইরে ঘুরতে গিয়ে ঐ বধু তার গোপন প্রেমিকের সঙ্গে গাছের আড়ালে অভিসার করে অন্ধ স্বামীর সামনে। চসার সেখানেই থামেন না, বলতে থাকেন, সেই মোম সময়ে ঐ তরুণীর স্বামী হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় এবং স্ত্রীকে গোপন প্রেমিকের সাথে অভিসাররত দেখতে পায়। কিন্তু চালাক স্ত্রী সাথেসাথেই অজুহাত খাড়া করায়: ঐ অভিসার আসলে ছিল স্বামীর দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায়! শেক্সপিয়ারে অবস্থা আরো খারাপ। ‘কিং লিয়র’এ তিনি যে অন্ধ গ্লকেস্টারকে উপস্থাপন করেন, সে এতটাই অসহায় আর দ্বিধাগ্রস্থ যে, যেকোন কিছু দিয়েই তাকে ভজানো যায়, প্রতারিত হবার জন্য একেবারে আদর্শ চরিত্র।

অন্ধদের নিয়ে মজা করার রূঢ়তম দৃষ্টান্তটি পাওয়া যায় ষোড়শ শতাব্দীর এক জার্মান নাটকে। নাটকের নায়ক তিনজন অন্ধ ভিক্ষুককে একটা মূল্যবান মুদ্রা ভিক্ষা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন যেটা দিয়ে তারা খাদ্যসামগ্রী ও থাকার ব্যবস্থা করতে পারে। সেই মুদ্রা আসলে কাউকেই দেয়া হয়নি, আর তিনজন অন্ধের প্রত্যেকেই মনে করল অন্যজনকে মুদ্রাটি দেয়া হয়েছে। পরের অবস্থাটি সহজেই অনুমেয়।

অসহায় অন্ধলোক একটি সার্বজনীন ধারণা হয়ে উঠেছে। মেটারলিংক-এর ‘দ্য ব্লাইন্ড’ নাটকে দার্শনিক অবস্থান থেকে সবগুলো চরিত্রকে অন্ধ দেখানো হয়েছে। কিন্তু মঞ্চে গিয়ে দেখা গেল দর্শন নয়, বরং অন্ধদের হাস্যকর দলবাজি, হুমকিধামকিই ঐ নাটকের সার।

‘লা সিম্ফনি প্যাস্টোরাল’ এর আঁন্দ্রে জিদ হলেন অন্ধত্বের প্রকৃত সত্যের সবচেয়ে খারাপ বিরূদ্ধবাদীদের একজন। সেখানে অন্ধ কিশোরী গারট্রুড একেবারে নির্বোধ কিসিমের ছিল, প্যাস্টর এসে ওকে লেখাপড়া শিখাতে শুরু করার আগে। অন্ধত্বের কারণেই এই নির্বুদ্ধিতা, লেখক বলেন, দৃষ্টি না থাকায় কিশোরীটি সত্য সম্পর্কে জানতে পারে না। শিক প্যাস্টর তার ছাত্রী গারট্রুড-এর জন্য যে জগত তৈরি করে, সেখানেই অন্ধ গারট্রুড সুখেস্বাচ্ছন্দ্যে কাটায়। সত্যিকার জগতের খারাপ দিক সম্পর্কে কিশোরীটি কিছুই জানতে পারে না। দৃষ্টি না থাকায় সে পাপ সম্পর্কেও সচেতন নয়, আপেল খাওয়ার আগের আদম-ঈভের মত। গারট্রুড যখন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল, তখনই কেবল সে পাপ সম্পর্কে অবগত হল। না বুঝে প্যাস্টরের সাথে যেসব পাপকাজ সে করেছে, সেগুলোর অপরাধবোধ তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে।

সাহিত্যে অন্ধত্ব যেমন নির্বুদ্ধিতার অনুষঙ্গ হয়ে এসেছে, তেমনি এসেছে ধূর্ততার অনুষঙ্গ হয়েও: একেবারে খাঁটি শয়তানির মূর্ত মানবীয় রূপ হয়ে। স্টিভেনসনের ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ এর বুড়ো জলদস্যু অন্ধ পিউ এর জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। উপন্যাসের নায়ক কিশোর জিম হকিন্স অন্ধ পিউকে যখন প্রথম দেখে তখনই তার মনে হয়েছে এই মৃদুভাষী এবং চোখহীন মানুষটির চেয়ে ভয়াবহ কোন চরিত্র সে জীবনেও দেখে নাই। যখন পিউ তাকে ক্রাচ বাগিয়ে ধরে ফেলে, জিমের মনে হয়েছে, এই অন্ধ লোকটির কণ্ঠের চেয়ে নিষ্ঠুর, ঠাণ্ডা আর কুৎসিত কণ্ঠও সে কোনোদিন শোনে নাই।

বহুযুগ ধরেই অন্ধত্ব ও নিচুতার সম্পর্ক সাহিত্যিকদের একটা প্রিয় প্রসঙ্গ, এবং পাঠকদের মধ্যেও এই সম্পর্কের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, যেহেতু পাঠকেরা নানা লোককাহিনী থেকে শিক্ষা পেয়েছে যে, অন্ধত্ব মানবিক গুণাবলী হ্রাস করে। এই শিক্ষা অন্ধ বিষয়ে চক্ষুষ্মান সাধারণ মানুষের নিষ্ঠুরতার অ্যাটিচুডকে সমর্থন করে।

নিখাদ শয়তানির অনুষঙ্গে অন্ধত্বকে যেমন দেখা হয়েছে, এর বিপরীতে কোনো কোনো সাহিত্যে আবার অন্ধত্ব উপস্থাপিত হয়েছে পরম পূণ্যরূপে। আপাতভাবে এই দুটো দৃষ্টিভঙ্গিকে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে তারা একই মুদ্রার এপিঠওপিঠ। অন্ধত্বের প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরার মত জোরালো অন্তর্দৃষ্টি কোনটিতেই পাওয়া যায় না। একটা বিষয়ে এই দুই দলই একমত: অন্ধত্ব হচ্ছে একটা অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা যা তার বহনকারীকে স্বাভাবিক জীবন থেকে পুরোপুরি উৎপাটিত করে।

অন্ধত্বকে হয় পাপ বা শয়তানির ফসল হতে হবে, নয় তাকে হতে হবে পূণ্যের অনুষঙ্গ। লরা রিচার্ডস এর ‘দ্য ব্লাইন্ড চাইল্ড’এ দেখা যায় অন্ধ শিশুটি গাছের বাকলে হাত রেখে বলে দিচ্ছে গাছের নাম, বলে দিচ্ছে কখন ফুল আসবে এবং কিভাবে। গ্রামে এমন কোনো কুকুর বিড়াল নেই যে ঐ শিশুর একটি ডাকে প্রভুর নাম ভুলে ছুটে আসবে না। সে শুধু পূণ্যবতীই নয়, পাশাপাশি যাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী। অগ্নিকাণ্ড থেকে এক শিশুকে রা করে, গান গেয়ে মানুষকে রোগমুক্ত করে, পাঁড় মদ্যপের মদের নেশা ছাড়িয়ে দেয়।

অন্ধত্ব নিয়ে যাবতীয় রোমান্টিক হেঁয়ালিপনার মধ্যে সবচেয়ে উদ্ভট হল, অন্ধত্বকে ছদ্মবেশী আশির্বাদ মনে করা। জন জি মরিসের ‘দ্য ব্লাইন্ড গার্ল অব উইটিনবার্গ’এ অন্ধ নায়িকাকে বলা হচ্ছে: ঈশ্বর তোমায় চোখের আলো থেকে বঞ্চিত করেছেন বলেই তোমার হৃদয় আরো মহান আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। আমার পরিচিতি এমন কোনো অন্ধ মেয়ে নেই যে এরকম অপমানসূচক এবং উদ্ভট বক্তব্য প্রদানকারীর গালে অন্তত একটি চড় না বসিয়ে ছেড়ে দেবে। তারপর এই অন্ধ নায়িকাকে দিয়ে প্রত্যুত্তরে যা বলানো হল তা আরো মারাত্মক: সে বলল, মহাত্মন আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন আমাদের অন্তর্জগত আপনাদের চেয়ে সুন্দর, এবং আপনাদের সূর্যের চেয়ে আমাদের অন্তরের আলো উজ্জ্বলতর?

কল্পকাহিনীতে আরেকটা সুপ্রাচীন এবং অন্যতম নিষ্ঠুর ধারণা হল, অন্ধত্ব হচ্ছে পাপের ফল। ঈদিপাস অন্ধ হন মাতৃসহবাসের কারণে, বেলেল্লাপনার কারণে চোখ হারান শেক্সপিয়ারের গ্লুকেস্টার। এর অব্যবহিত পরের ঘটনা হল, অন্ধত্ব শুদ্ধতা অর্জনের একটা স্তর, যে স্তরে কোনো মানবীয় চরিত্র আগের পাপতাপ ঝেড়ে পূণ্যবান হয়ে উঠতে পারে। যেমন দেখা যায় কিংসলের ‘ওয়েস্টওয়ার্ড হো’ এ অ্যামেয়াস লেই বজ্রপাতে অন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাতারাতি অপরাধী থেকে সাধুতে পরিণত হয়।

এ সমস্ত বিখ্যাত কল্পকাহিনীর মধ্যে অন্ধত্বকে মানবিকতা-বহির্ভূত কিছু একটা দাঁড় করানোর একটা প্রবণতা থেকেই গেছে। অন্ধত্ব যেন স্বাভাবিক জীবন বা মানবিক সম্পর্ক থেকে নির্বাসনের দরজা। ডিকেন্সের বার্থাই হোক, বা লিটনের নিদিয়াই হোক, প্রেমে পড়ে তারা ভুলেও ভাবে না যে তাদের কাক্সিতজনেরা তাদের প্রেমে পড়বে।

সর্বশেষ যে প্রবণতাটি দেখা যায় তা হল, অন্ধত্বকে আক্ষরিক অর্থে না নিয়ে প্রতীকী অর্থে নেয়া, ব্যঙ্গ বা প্যারাবল তৈরির জন্যে। লোকসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র সর্বত্রই এই প্রবণতাটি অন্ধত্বকে মৃত্যু বা নরকযন্ত্রণার প্রতীক হিসেবে দাঁড় করায়, অথবা শারীরিক অন্ধত্বের প্রতীকে মানসিক অন্ধত্বকে মূর্ত করে তোলে। এই ক্যাটাগরিতে পড়বে এইচ জি ওয়েলস-এর ‘দ্য কান্ট্রি অব দ্য ব্লাইন্ড’, পল কোরে’র ‘দ্য প্লানেট অব দ্য ব্লাইন্ড’, মেটারলিংক-এর ‘দ্য ব্লাইন্ড’ ইত্যাদি। এছাড়াও কনরাড আইকেন-এর ছোটগল্প ‘সাইলেন্ট স্নো, সিক্রেট স্নো’-এ অন্ধত্বকে স্কিজোফ্রেনিয়ার রূপক হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এ সমস্ত উপস্থাপনায় অন্ধত্বকে দেখানো হয়েছে অজ্ঞতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের প্রতীকরূপে, স্বাভাবিক ধারণা ও মূল্যবোধের উল্টো অবস্থার প্রতীকরূপে, এবং মৃত্যুর চেয়ে খারাপ বা মৃত্যুসমান অবস্থার প্রতীকরূপে।

সাহিত্যের এই সমীক্ষা থেকে কী শিক্ষা নিতে পারি আমরা? কী বলতে চেয়েছে সাহিত্য আদতে? একটা শিক্ষা এটি যে, এই সমস্ত সাহিত্যকর্মের বদৌলতে আমরা এমন একদল তথাকথিত বিশেষজ্ঞ খুঁজে পেয়েছি যারা এই সাহিত্যের জ্ঞান সম্বল করে অন্ধত্ব নিয়ে গবেষণা করে নানান অশ্বডিম্ব প্রসব করছেন। তাদের মতে, অন্ধত্ব কেবল নিছক দৃষ্টিহীনতা নয়, বরং একজন মানুষের সম্পূর্ণ রূপান্তর। কোনো মানুষের কাছে তার অন্ধত্ব নিছক চোখ হারানোর গল্প দিয়েই শেষ হয় না, আসলে সেটি মৃত্যুসমান, সত্তার ওপর এক বিশাল আঘাত। তারা বলেন, চোখ হল সেক্স সিম্বল, তাই অন্ধ মানুষ কখনই পূর্ণ মানুষ নয়।

শিরোনামের প্রশ্নে ফিরে যাই: সাহিত্য কি আমাদের বিপক্ষে? এই প্রশ্নের সর্বজনগ্রাহ্য কোনো জবাব নেই। শুধু অতীত আমলের সাহিত্য নিয়ে যদি আলাপ হয়, তাহলে প্রশ্নের জবাব হবে, হ্যাঁ। সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে আলাপ হলে মিশ্রজবাব হবে। অন্ধত্বের ধারণায় অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন সমসাময়িক সাহিত্যে পাওয়া যায়, যদিও বস্তাপচা সাবেকী ধারণাগুলোই এখন পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় এটা যে, সমসাময়িক কালে এই সব ধারণা উৎসাহ পাচ্ছে আমাদের তথাকথিত অন্ধ বিশেষজ্ঞদের উদ্ভট গবেষণা থেকেই।

ভবিষ্যতের দিকে যদি ঐ প্রশ্ন নিয়ে তাকাই, জবাব হবে, ভবিষ্যতের সাহিত্য বর্তমান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, যেমন বর্তমানের জীবন পারে না ভবিষ্যতের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অন্ধ জীবনগুলোকে সাজিয়ে তোলার মাধ্যমে আমরাই ভবিষ্যতের সাহিত্যকে নির্দেশনা দিতে পারব। অন্ধত্ব একটা ট্রাজেডী ততক্ষণই, যতক্ষণ আমরা এই সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিটিকে মান্য করি। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ একটাই: আমাদের সময়কে অন্ধত্ব নিয়ে সচেতন ও সবিবেক হতে সাহায্য করা। কল্পকাহিনীর ফ্যান্টাসী থেকে মুক্ত হয়ে সেগুলোকে বাস্তবতার নির্যাস দিয়ে ভরে দিতে হবে। তখনই কেবল আমরা সেই সাহিত্যের জন্য রাস্তা তৈরি করতে পারব যা বাস্তবতার সুবাস ধারণ করবে, সত্যের অপলাপ হবে না, সাহিত্য পড়ে আমরা সেখানে নিজেদের খুঁজে পাব।


(ঈষৎ সংক্ষেপিত)


রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০০৮

সাবঅল্টার্ন-লজিকো-লোয়ারমিডলক্লাশ

"What can be said can be said clearly; what we cannot talk about we must pass over in silence."
Wittgenstein, Tractatus Logico Philosophicus

কবিসভায় আমরা ভার্চুয়াল ভার্চুয়াল খেলি। তবু গতরের শান্তি খুঁজতে মাঝে মাঝে মন শাহবাগে ধায়।
আজকেও ধাইলো। গিয়া লিপুর সাথে কথা। লিপু মানে ইফতেখার মাহমুদ, কবিসভার প্রায়-সাইলেন্ট কমরেড। তার সাথে অনেক আলাপ। মধ্যবিত্তের সাবঅল্টার্ন সাহিত্য লৈয়া। তখন মানস আসলেন। রাইসু আসলেন। আবীর আসলেন। সাবঅল্টার্ন-রাও আসলেন। ভার্চুয়ালি।

তারপর হ্যালো করলাম আহমেদ নকীবকে। তিনিও কবিসভার নীরব গ্রাহক। জানাইলেন, সাবঅল্টার্ন প্রণোদনা নিয়া আমার পজিশন তার পছন্দ হৈছে। তবু যেন একটু ধোঁয়াশা আছে। কৈলেন, আচ্ছা আমি ঢাকাবাসী মানুষ কবিতায় যদি হলুদ ট্যাক্সি উঠায়া দেই.....

- সেইটা এলিটিজম হয়া যায় কি না?

এইবার ফতোয়া দিবার পালা আমার। জোরেশোরে কৈলাম, না। সেইটা এলিটিজম হয় না। হয় যখন আপনে ঢাকাবাসী হৈয়া না-দেখা গেরাম নিয়া পাতলা দরদে মাতেন।

কয় দিন আগে এক দৈনিকে আমি গেরামবর্তী একটা গল্প উল্টাইতেছিলাম। সেইখানে দেখলাম কিভাবে বাঁশের টাট্টি (হাগুখানা)তে যাইতে হয় এরকম একটা সহানুভূতিশীল ম্যানুয়াল আছে। সেইটা গল্পের বিষয়বস্তু ছিল না। তবু লেখক দিলেন। আটষট্টি হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে!

আমি ভাবতেছিলাম, ঐ লেখক যদি উনার ফ্যাটবাড়ির বাথরুমে যাওয়ার ঘটনা লেখেন, তাইলে কি তিনি ক্যামনে ফ্ল্যাশ করা লাগে সেইটা লেখতেন?

হয়ত লেখতেন না। কারণ ঐটাতো তিনি জানেন। ডেইলি যাওয়া-আসা করেনও। তাই লেখনের দরকার নাই। এগজটিক না হৈলে লেইখ্যা কি কোনো আরাম আছে!

তাই গেরাম নিয়া লেখছেন। কারণ গেরাম এগজটিক। মধ্যবিত্ত জাতির কাছে গেরাম প্রমোট করা লাগে। গেরাম থিকা মধ্যবিত্ত লেখকের দূরত্বও প্রমাণ করা লাগে। এইটা এলিটিজম।

সুতরাং বাঁশের টাট্টির ভিতরেও এলিটিজমের ভুত থাকতে পারে। আবার হলুদ ট্যাক্সির ভিতরে নাও থাকতে পারে।

শুইনা আহমেদ নকীবের শান্তি লাগল। কৈয়া আমার তো আরো বেশি।

এইবার মানস থিকা একটা রেফারেন্স দেই। তিনি লেখছেন:

আমি এখনো ঠাহর করে উঠতে পারিনি যে সাবঅল্টার্ন গল্পরীতি বলতে সুমন রহমান যা ব্যাখ্যা করেছেন, তা আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি কিনা; কিংবা সেটাকেই আমার অনুধাবনের পরিকাঠামো বিবেচনা করে আগাতে চাই কিনা।


বিবেচনায় আনেন কি ফালায়া দেন, সমস্যা নাই মানস। তার আগে চলেন একটু স্পষ্ট কৈরা লই। আপনেও বোঝেন। আমিও বুঝি।

মাহবুব পিয়ালের কাছে কয় দিন আগে একদল লেখক এসেছিলেন। উনারা কলকাতার। দলিত সাহিত্য করার মানসে ধোপদূরস্ত জীবন ছাইড়া অতি কষ্টে গ্রামে বাস করতেছেন (স্যাক্রিফাইস!)। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ উনাদের আইডল। দলিত সাহিত্য বলতে উনারা নিম্নবিত্তের জন্য এবং নিম্নবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা লয়া সাহিত্য বুঝান। সেইকথা শুইনা আমি ভুত দেখলাম। দলিত সাহিত্যের ভুত।

এইত সেদিন পিপলস এমপাওয়ারমেন্ট ট্রাস্ট নামে একটা সংস্থা শ্রমজীবী লেখকদের একটা সম্মেলন করল ঢাকায়। সেই উপলক্ষে একটা ম্যাগাজিনও বাইর করল। বিষয়টা আমার খুব মনেও ধরল। আমি খুশিমনে ম্যাগাজিনটা উল্টাইলাম। সেইখানে প্রথমেই দেখলাম, শ্রেণীসংগ্রাম নিয়া একটা বেশ ভারি প্রবন্ধ ঘরানার লেখা। লেখকের পরিচয় আছে, তিনি রিক্সা চালান। আমি চমকাইলাম। একজন রিক্সাওয়ালা প্রাবন্ধিক। তার ওপরে বামপন্থী। ঘটনা তো গুরুতর! তারপর সন্ধান কৈরা জানা গেল যে, উনার বামপন্থী ওরিয়েন্টেশনের ইতিহাস রিক্সা চালানের ইতিহাস থিকাও অনেক লম্বা। ভাবলাম উনার পাইচার্ট কেমন হৈতে পারে ? কত পার্সেন্ট রিক্সাওয়ালা তিনি, আর কত পার্সেন্ট বামপন্থী?

এইটা মনে হয় দলিত সাহিত্যের চেহারা, মানস। আপনে যেমন সেইখানে নাই, আমিও নাই।

এইবার চলেন ভিটগেনস্টাইন-স্টাইলে খোলাসা কৈরা কৈ। আমার পজিশন কিছু প্রিমাইজের ওপর দাঁড়ানো। যেমন:

১. আমার বিবেচনায় সাহিত্য একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিনোদন বা সৃষ্টিমাধ্যম। সাহিত্যের লেখক ও পাঠক উভয়ই মূলত মধ্যবিত্ত। লেখকের বিত্ত-প্রমোশন হৈলে তিনি আর সাহিত্য করেন না, আর বিত্ত-ডিমোশন হৈলে কিছুদিন রক্তবমি করেন, তারপর আস্তে আস্তে নদী নিস্তরঙ্গ হয়া যায়।

১.১ যেসব বিত্তশালী লোকদের আপনেরা লেখক হিসেবে দেখেন, উনাদের পয়সা থাকলেও উচ্চবিত্তের সংস্কৃতি নাই। কালচারালি উনারা মধ্যবিত্ত।

১.২ আবার যেনারা বস্তিতে থাকেন আর সাহিত্য করেন, আকারে বা প্রকারে তেনারা কোনোদিনই মধ্যবিত্তসীমানার বাইরে যাইতে চান নাই। আমি নিজে দেখছি, বস্তির মধ্যেও উনারা আপার কাশ তৈয়ার কৈরা রাখেন। ঘরে পর্দা টাঙ্গান।

২. এই আমাদের শ্রেণী। আমরা এই শ্রেণীমধ্যে গুরুসঙ্গ করি। তাহাদের কথা ভাবি। যাহারা ছোটলোক। গরীব। গ্রামে থাকে। বাঁশের টাট্টিতে হাগে। এই টাট্টি লৈয়া আমাদের মন সমব্যথায় ভৈরা ওঠে। অথচ টাট্টি থিকা বাইর হৈয়া গরীবের কত আরাম! আরাম নাই খালি আমাদের বিবেকের!

৩. এইটা হৈল বাংলাদেশের প্রগ্রেসিভ মধ্যবিত্ত লেখকের ক্যাসিক চেহারা। উনারা ভাবাদর্শের সন্তান। উনাদের শৈশব নীতিকথা-শাসিত।

৪. তাই, রাইসুরে আমি কৈতেছিলাম নিম্নমধ্যবিত্ত হওনের সাহিত্যিক সুবিধার কথা।

৪.১ আপওয়ার্ড মবিলিটি না থাকায় তাদের ভাবাদর্শের যন্ত্রণা খুব একটা পোহাইতে হয় না। পরন্তু, নীতিশাস্ত্রও তাদের জন্য ক্যারিয়ার হিসাবে ভাল দাঁড়ায় না। ফলে নীতিশাস্ত্র লংঘনের প্রশিণও লাগে না তার।

৪.২ মধ্যবিত্ত হৈয়াও সাবঅল্টার্ন শ্রেণীর নিকটতম দূরত্বে থাকে সে।
৪.৩ শ্রেণীচরিত্র লোপ পাইবার ভয় আছে তার। প্রগ্রেসিভ মধ্যবিত্ত লেখক নিজেরে ‘গ্রামবর্তী’ হিসেবে সখের ভাবনা ভাবতে পারে, কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত আরিক অর্থেই সাবঅল্টার্ন শ্রেণীতে পরিণত হৈবার ঝুঁকি মধ্যে থাকে। তাই সে আপন শ্রেণীর মিথলজি তৈয়ার করে। সেইখানে সাবঅল্টার্ন টেস্টের জন্য অনেক স্পেস রাখা লাগে তার। কিনশীপ নেটওয়ার্ক।

৪.৪ সাবঅল্টার্নের সাথে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লেখক যতটুকু দূরত্ব এবং নৈকট্য রক্ষা করেন, সেইটাই নতুন সাহিত্যের বড় প্লাসপয়েন্ট। তার নৈকট্য ভাবাদর্শজাত নয়, বরং অভিজ্ঞতাবলয়ের, আর দূরত্ব এলিটিজমের নয়, স্পেসের।

৪.৫ এই প্রেক্ষাপটে নন-এলিটিস্ট সাহিত্যের গ্যারান্টি কতটুকু? আমার মনে হয় এলিটিজমের ট্র্যাপ এইখানেও আছে, যেহেতু সে (নিম্ন)মধ্যবিত্ত। তবে সাহিত্যে এলিটিজম বিষয়টা আমার কাছে হার্ডল রেসের মত লাগে। দৌড়ানোর সময় যদি আপনের হার্ডল পইড়া যায়, তাইলে আপনি ডিসকোয়ালিফাই করেন না। কিন্তু পিছায়া যান।

সংস্কৃতি অধ্যয়নশাস্ত্র নয়, বা সাংস্কৃতিক ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদ নয়, বা অন্য কোনোরকম উৎপাতও নয়, আমি কৈছিলাম এইরকম সাদামাটা কয়েকটা কথা। ইহাদের নন্দনতাত্ত্বিক লেভেলিং আমার সাধ্যের/ইচ্ছার বাইরে, পদে পদে হঠকারী হৈয়া যাওনের ভয় তো আছেই। আমি শুধু ওয়ার্কিং ম্যানুয়াল খুঁজতেছি। বাঁশের টাট্টিতে হাগার ম্যানুয়াল না-বানাইবার সাহিত্য যাতে করতে পারি।

আসেন, এই প্রিমাইজগুলারে চ্যালেঞ্জ করা যাক।


ঢাকা, ১২/৮/৫


সাবঅল্টার্ন প্রণোদনা


কথা হৈতেছিল কিছু সাম্প্রতিক গল্পপাঠের অভিজ্ঞতা সামনে রাইখা। ‘সাবঅল্টার্ন’ নামে একটা মনোভাবের কথাও হৈতেছিল। মানিক বন্দোপাধ্যায় বা তারাশংকরকে সামনে রাখা হয় নাই। তবে সাবঅল্টার্ন মনোভাবের বার্তা লৈয়া উনাদের সামনে একদিন খাড়াইতে হৈতই। আবীর সেই সুযোগ কৈরা দিলেন।

একটা ভূমিকা দেই। কয়দিন আগে একটা লেখা পড়লাম। নাম “অন্ধত্ব : সাহিত্য কি আমাদের বিপক্ষে” এই লেখার লেখক কেনেথ জার্নিগান নিজে জন্মান্ধ। তিনি আমেরিকার ন্যাশনাল ফেডারেশন ফর দ্য ব্লাইন্ড-এর পরিচালক। এই অন্ধ লেখক তার ইংরেজি ও ফরাসী সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা থিকা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাইছেন যে, অন্ধত্ব নিয়া এ যাবত যত সাহিত্য হৈছে, এর প্রায় সব-ই অন্ধত্বের মূল জায়গাটারে ধরতে পারে নাই। ভুল ব্যাখ্যা করছে। এমন কি কবি জন মিল্টনও, যিনি নিজেও অন্ধ হৈয়া গেছিলেন!


এইখানে, কেনেথ নিজে অন্ধ এবং সাহিত্য-পাঠক হওয়ায় আমাদের পক্ষে অন্ধত্ব নিয়া সাহিত্যের প্রকৃত কৃতিত্ব সম্পর্কে জানা সম্ভব হৈল। এখন মানিক তার ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ তে কতটুকু ‘জাস্টিস’ করছেন, সেইটার সাক্ষ্য দিতে পারত পদ্মা নদীর মাঝিরাই। কিন্তু উনারা কেউ মানিকের উপন্যাস পড়েন নাই। বা পড়লেও সেইটা নিয়া কথাবার্তা বলেন নাই। আর আমরা যারা নানান কৌশলবিচারে একটা উপন্যাসের উৎকর্ষ বিচার করি, তাদের থিকা মানিক পদ্মা নদীর মাঝিমাল্লার জীবন হয়তো বেশিই দেখছেন। ফলে, তিনি তার অভিজ্ঞতা এবং তার দেখা জনগোষ্ঠীর ওপর তিনি কতখানি ‘ন্যায়পরায়ণ ব্যবহার’ করেছেন, সেইটা যাচাইয়ের মতা শ্রেণীগতভাবে আমাদের নাই।

কিন্তু যখন মালোপাড়ার ছেলে অদ্বৈত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ লেখেন, তখন আমরা কিন্তু ‘আহরিত’ অভিজ্ঞতার ফাঁকফোকড়গুলো ধরতে পারি। তবে মানিক বা তারাশংকর নিশ্চয়ই তিনদিনের আর্থসামাজিক সমীক্ষা কৈরা আইসা গল্প লেখতে বসেন নাই। কিন্তু তারপরও মানিকের পক্ষে অদ্বৈতমল্ল বর্মনের জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। মানিকের পদ্মা নদীর মাঝি শক্তিশালী উপন্যাস, কিন্তু তিতাসের মূল শক্তি তার সাবঅল্টার্নিটি। সেইটা আমরা বুঝি, যখন আমরা এই দুই উপন্যাসেরে পাশাপাশি রাইখা পড়ি। সবক্ষেত্রে তো এইরকম সুযোগ হয় না।

মানিক বা তারাশংকর উঁচুমাপের লেখক। তারা (বিশেষ কৈরা তারাশংকর) অন্য শ্রেণীর জীবন বর্ণনায় প্রায় কখনই এলিটিস্ট হন নাই। কিন্তু তারা (বিশেষ কৈরা মানিক) খুব সাবঅল্টার্ন-ও নন। তারাশংকরের বিষয়টা আমার কাছে একটু ভিন্ন লাগে। তিনি যখন ‘গণদেবতা’ বা ‘পঞ্চগ্রাম’ লেখেন, তখন এসব উপন্যাসের কেন্দ্রে তিনি যে চরিত্রটাকে রাখেন সেইটা কিন্তু একটা শিক্ষিত নিম্নমধ্যবিত্ত চরিত্র। এই স্পেসটা থাকায় তারাশংকর ঐ চরিত্রটির মধ্য দিয়া নিজের উপন্যাসে সশরীরে উপস্থিত থাকার সুযোগ পান। বা স্পেসটা তৈয়ার কৈরা রাখেন। এইটা কিন্তু সাবঅল্টার্ন প্রণোদনা।

আমি মনে করি একজন লেখক যে কোনো শ্রেণীর কথাই লিখতে পারেন। কিন্তু তিনি যেই শ্রেণীতে অবস্থান করেন না, সেই শ্রেণীর কথা জানার একটা জ্ঞানতত্ত্বীয় সীমাবদ্ধতা তো তার আছেই। সেইটাকে ডিঙায়া যাওয়া হয়ত সম্ভব না, তবে বিপুল অধ্যবসায় থাকলে হয়ত একটু সুবাস অন্তত পাওয়া সম্ভব। মানিকের বা তারাশংকরের সেই অধ্যবসায় ছিল। অনেকেরই আছে বা ছিল। আবার অনেকেরই নাই বা ছিল না।

সাবঅল্টার্ন সাহিত্য সেই অধ্যবসায় নিয়া আগায় না। আমি যখন লিখি, আমি আমার চারপাশ এবং সেই প্রেক্ষাপটে আমার অবস্থান লৈয়াই লিখি। সাবঅল্টার্ন মনোভাবের গল্প যিনি বলেন, তার পজিশন কখনই উপরে বা নিচে হয় না, তিনি বিষয়ের দিকে সোজাসুজি তাকাইতে পারেন। আর যাদের এইটা থাকে না, তারা সেই বিষয়ের অনুপস্থিতি ঢাকতে ক্যানভাসের ওপর মহত্ত্ব ঢালেন, যাতে বিমূঢ় পাঠক চুপ মাইরা যান। এইটা ছিল আমার সাম্প্রতিক গল্প পাঠের অনুভূতি।

সাবঅল্টার্ন মনোভাব লয়া আরো আলোচনা হৈতেই পারে।


৩০ জুলাই ২০০৫


সখী এলিটিজম কারে কয়?

Elitism kake bole, ami jani naa -- dhonira doridro loker 'taste' ke opochhondo korle take'i ki elitism bole?
....
Elitism kake bole ? ....income inequality'r birud'dhe lorai korte giye ki class er differential preference er birud'dhe lorai korte hoy ? Utopia te ki manushe manushe pochhondo opochhondo bhed thakte parbe
na ? Polash Rizia othoba Momtaz ke ki amake pochhondo kortei hobe ? Naa kole ki ami 'kharap manush' hoye jabo ?
(Abeer-er chithi theke)

“তোমরা যে বলো দিকস রজনী ভালোবাসা ভালোবাসা, সখী ভালোবাসা কারে কয়”
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান থিকা)

রবীন্দ্রনাথ জিগাইছেন ভালোবাসা কারে কয়। আর এদিকে আবীর জিগাইতেছেন এলিটিজম কারে কয়। ভালোবাসা কারে কয় এইটা রবীন্দ্রনাথ হাড়ে হাড়ে বোঝেন, তাই একটা আপাতসরল জিজ্ঞাসা নিজের ওপর ন্যস্ত করছেন। মধ্যবিত্তরে এলিটিজম বোঝানো আর দাদারে ..... শিখানো কি একরকম পণ্ডশ্রম হৈতেছে না?

আজকে আবার আরেক কাণ্ড হৈল। ডিজ্যাবিলিটি’র ওপর দিনব্যাপী একটা সেমিনারে বৈসা থাকতে হৈছিল। সেইখানে শুনতেছিলাম অটিজম (Autism) এর ওপর লেকচার আর ভাবতেছিলাম এলিটিজম নিয়া। অটিজম আর এলিটিজম মিল্যামিশ্যা সন্ধ্যাবেলা আমি হঠাৎ চলৎশক্তিহীন বোধ করলাম। মনে হৈল আমার পেশি যেন সংবেদনশীলতা হারায়া ফেলতেছে। অটিজম থিকা সাবধান, ভাই আবীর!

কেউ যখন কোনো সুবিধাজনক অবস্থানে থাইকা ডিসএডভান্টেজড কোনো শ্রেণীর রূচিকে নির্বাচন/পছন্দ করে, যে পছন্দের মধ্যে অনুমোদন ও করুণার মিশাল থাকে, কখনো প্রমোশনের প্রণোদনা থাকে, কখনো মতাদর্শের প্রেরণা ’বড়’ হয়া থাকে ....তখন সেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা মানুষটার নির্বাচন/পছন্দের মধ্যে এলিটিজমের ঝুঁকি থাকে। এইটা একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সিনড্রম, বাই ডিফল্ট। তবে, প্রত্যেকটা বেটার-অফ শ্রেণীর রূচি-ই তার চেয়ে ওরস-অফ (worse-off) শ্রেণীর রূচির কাছে, কখনো কখনো, মতার সহজাত গরমে, এলিটিস্ট হয়া উঠতে পারে।

আর প্রত্যাখ্যান কিন্তু একটা অনেক কম বিপদজনক অবস্থান। প্রত্যাখ্যানকারীর জন্যও, আবার প্রত্যাখ্যাতের জন্যও। এইখানে আধা গ্রহণবর্জনের সমস্যা তৈয়ার হয় না। মধ্যবিত্ত হৈয়া মমতাজরে অপছন্দ করা একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এইখানে কোনোই সমস্যা নাই। কিন্তু যদি আপনের পছন্দ হয়, দুইবার ভাবেন, দেখেন রেফারেন্স কোনখানে।

আয়-বৈষম্যের বিরূদ্ধে সমাজে কারে লড়াই করতে দেখলেন? আমি তো বছর বছর জিনি (Gini Index) বাইড়া যাইতেই দেখি। ভাইবা দেখেন তো, ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য বিষয়ে পুঁজিবাদ আর সাম্যবাদের পজিশনে কতটুকু ফারাক আছে? কিন্তু তারপরেও সাবঅল্টার্ন-এর রূচি কখনো কখনো ড্রাইভিং সিটে বৈসা পড়ে। যেমন, একটা উদাহরণ দিই: বাংলাদেশের অডিও ক্যাসেট ব্যবসা এখন গরিব মানুষের রূচি দিয়া নিয়ন্ত্রিত হৈতেছে। ফলে এখন শাকিলা জাফর থিকা মমতাজ অনেক বড় প্রেফারেন্স, গিটার ফালায়া হাসান দোতারা হাতে লৈছে, জেমসের কান্ধে গামছা উঠছে, জিন্স খুইলা আমাদের বিপ্লব গেরুয়া পৈরা মমতাজের লগে ডুয়েট অ্যালবাম করতেছে, রিক্সাওলা আকবর আইসা হিট হয়া যাইতেছে।

এইভাবে, সমাজের একটা সাইলেন্ট এবং এক্সক্লুডেড শ্রেণী নিজেরা নিজেদের বিনোদন ঠিক কৈরা নিছে, সেইখানে তাদের পপুলেশন তাদের শক্তি হৈয়া দাঁড়াইছে...আর তারা মধ্যবিত্তের হাত থিকা অডিও ক্যাসেট ইন্ডাস্ট্রি নিজেদের দখলে নিয়া নিছে। এই কারণেই আমারে মমতাজ লৈয়া থিসিস লেখতে হয়, নির্মলেন্দু গুণের কানে মমতাজের গান পৌঁছায়, আর মৌসুমী কাদের-এর বাসায় মমতাজের ক্যাসেটের কালেকশন তৈয়ার হৈতে থাকে।

মধ্যবিত্ত হিসাবে নিম্নবর্গীয় সংস্কৃতির ধারেকাছে যাওয়ার যে কৃতিত্ব আমরা নিতেছি, এইগুলাই সেইখানে ইনভিজিবল ফ্যাক্টর। আসেন, এইগুলারে উদঘাটন কৈরা আমাদের ‘কৃতিত্বরে’ চ্যালেঞ্জ কৈরা দেখি, কতদূর উনি অম্লান থাকতে পারেন!



ঢাকা, ০৫/০৮/০৫


শনিবার, ১৬ আগস্ট, ২০০৮

ভাষাবিতর্কের আগুনে আরো দুই ফোঁটা ঘি

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রে নাটকে এবং সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার ব্যবহার নিয়ে একটি উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। মেহতাব খানম, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও সৌমিত্র শেখরকে ধন্যবাদ জানাই বিষয়টি নিয়ে তাদের সুচিন্তিত মতামত জানানোর জন্য। মেহতাব খানমের উত্থাপিত প্রসঙ্গটি ছিল মূলত টেলিভিশন নাটকের সংলাপ নিয়ে, ফলে আশা ছিল নাট্যজনদের কেউ মতামত দেবেন এবং দেখলাম সরয়ার ফারুকী সেটা দিয়েছেনও। ফলোআপ হিসেবে ১১ নভেম্বর প্রথম আলো-য় সৌমিত্র শেখর তার আলোচনাটিকে শুধু নাটকের সংলাপে সীমিত রাখেন নি, বরং সাম্প্রতিক সাহিত্যচর্চায় আটপৌরে ভাষার “যথেচ্ছ” অনুপ্রবেশ নিয়েও তার উদ্বেগের কথা বলেছেন।


টেলিভিশন নাটকে, সিনেমায় বা সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার অনুপ্রবেশকে “যথেচ্ছ” মনে হওয়ার কারণ কি? সরয়ার ফারুকীর বক্তব্যে তো মনে হচ্ছিল যে, আটপৌরে ভাষার প্রয়োগ নিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট চিন্তা রয়েছে। কার ইচ্ছায় ও চিন্তায় তাহলে আটপৌরে ভাষা “মানভাষা”য় প্রবেশাধিকার পাবে? সৌমিত্র শেখর বলছেন সেটা শতবর্ষ আগের অবিভক্ত বাংলার ভাষাচিন্তক ও সংস্কৃতিবোদ্ধাদের ইচ্ছায় বা সিদ্ধান্তে। তারা বহু গবেষণা করে নদীয়া শান্তিপুর অঞ্চলের বাংলাকে প্রমিত বাংলা বলে ঠিক করে গিয়েছিলেন। তাদের সেই সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের পর একশ বছর গত হল, অবিভক্ত বাংলা বিভক্ত হল, এবং দুই বাংলার সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতা দুই মেরুর দিকে ধাবমান হল। অল্প কিছু সাহিত্য আর সামান্য কিছু “জীবনমুখী” গান ছাড়া আর কোন্ বিষয়টা দুই বাংলার কনজিউমাররা এখন শেয়ার করে বলা মুশকিল। একদা অবিভক্ত, কিন্তু বর্তমানে পরস্পর থেকে নানাভাবে দূরে সরতে- থাকা দুই বাংলা চিরকাল একইভাবে ভাষাব্যবহার করতে থাকবে, এটা কেমন আবদার? আর রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার কারণেই গ্লোবালাইজেশনের চাহিদা দুইবাংলার কাছে দুরকম, যেহেতু পশ্চিমবাংলা একটা বড় ন্যাশন স্টেটের অংশ আর পূর্ববাংলা নিজেই একটা ন্যাশন স্টেট। যে বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ আজ সাহিত্য সাংবাদিকতা কি টেলিভিশন নাটক করছে, তার মধ্যে হিন্দি বা “হিংলিশ” ভাষার দাপট কীরকম আছে? কতটা প্রমিত আজ প্রমিত বঙ্গের বাংলা? প্রমিত বাংলার জন্য শতবর্ষ আগে বেঁধে দেয়া সেই স্ট্যান্ডার্ড থেকে একা পূর্ববাংলাই সরে আসছে, এটা বোধহয় ঠিক নয়।

মেহতাব খানমের উদ্বেগ তবু সময়োচিত, ঢাকাই উচ্চবিত্তের “ডিজুস” কালচার দিয়ে আমাদের কল্পনার আবহমান বাংলা নিয়ন্ত্রিত হোক সেটা তিনি বা সরয়ার ফারুকী কেউই চান না। ফারুকীও তার লেখায় সেই উদ্বেগের পে সাফাই গেয়েছেন এবং “জাতীয়” মিডিয়াকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে উত্তরণের পথ বাতলেছেন। কিন্তু ভাষা মূলত মতাসম্পর্কের দ্যোতক, এবং সে কারণেই এই ধরনের উদ্বেগ মূলত মধ্যবিত্তের, যেহেতু মধ্যবিত্ত এটা ভাবতে পছন্দ করে যে তারাই “জাতীয়” সংস্কৃতির মুখ্য আধিকারিক। এই যুদ্ধ দৃশ্যত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যকার একটি সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধ যেখানে তাদের উভয়ের কুরুত্রে হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের নিজ নিজ শক্তিশেল তো আছেই। উচ্চবিত্তের টাকা থাকলেও মধ্যবিত্তের আছে লোকবল আর উচ্চকিত হবার নৈতিক অধিকার। মিডিয়াব্যক্তিত্ব সরয়ার ফারুকী যেভাবে মেহতাব খানমের উদ্বেগকে সমর্থন জানিয়েছেন তা দেখে মনে হচ্ছে এই কৌরব-পান্ডবের যুদ্ধে তিনি যেন কর্ণ! মন মধ্যবিত্তের দিকে, কাজ করছেন উচ্চবিত্তের ভাষায়!

বলাবাহুল্য, নিম্নবিত্ত সমাজ এই যুদ্ধে উপেতি। গরিব রিক্সাঅলার আবার ভাষা কি? সে তো আমাদেরই বেঁধে-দেয়া ভাষাব্যবস্থায় চলবে, নাকি? অথচ, আমরা খেয়াল করিনা যে, “ডিজুস” বাংলার আগেই নিম্নবিত্তের নিজস্ব বাংলা প্রমিত বাংলার বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তাদের মিডিয়ায়। তাদের মিডিয়া? কেন, দেখছেন না সেই মিডিয়ার দাপটে আমাদের নামী ব্যান্ডশিল্পীদের কাঁধে গামছা, পরনে জিনসের বদলে আলখাল্লা, আর মমতাজকেও দেখুন! সবচে বেশি এলবামের গায়িকা হিসেবে ইতোমধ্যেই গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ নাম উঠেছে তার। হ্যাঁ, অডিও ক্যাসেটই নিম্নবিত্তের মিডিয়া এবং এই কেন্দ্রাতিগ মিডিয়াটি কোনোরকম বিজ্ঞাপনী প্রশ্রয় ছাড়াই বর্তমানে দেশের সবচে দ্রুত বর্ধনশীল মিডিয়াগুলোর একটা। খেয়াল করে শুনে দেখুন, সেখানেও একরকমের বাংলার চল আছে, যা নিম্নবিত্ত বা নগর গরিবের বাংলা। আমার প্রস্তাব এই ধারার বাংলাকেও বর্তমান তর্কে সামিল করা হোক। তাকে পাশ কাটানোর একাডেমিক আভিজাত্য থেকে মুক্ত হোক ঢাকাই মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত।

এবার সাহিত্যের ভাষা প্রসঙ্গে আসা যাক, যেহেতু সৌমিত্র শেখর সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার ব্যবহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তার ঔচিত্যবোধ প্রখর, আটপৌরে বাংলায় রচিত সাহিত্য জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচার অনুচিত বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু কেন? ঢাকাই মিশ্র আটপৌরে বাংলা শেষবিচারে এক ধরনের আঞ্চলিক বাংলাই বটে। মেহতাব খানমের আপত্তির কারণ তো বোধগম্য, তিনি আজকালকার টেলিভিশন-দেখা ছেলেমেয়েদের “শুদ্ধ” বাংলায় কথা বলার েেত্র নাটকের ভাষাকে প্রতিবন্ধক ভাবছেন। কিন্তু আঞ্চলিক বাংলায় সাহিত্য তো নতুন কিছু নয়। তাহলে এখন আপত্তি উঠছে কেন? বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করি।

প্রথাগত ধারণাটি হল, আঞ্চলিক বাংলা ততণ পর্যন্ত “বৈধ”, যতণ তা উদ্ধৃতি এবং বন্ধনীচিহ্নের মধ্যে থাকে। যেমন, সংলাপ আঞ্চলিক হতে পারে, যদি সেই সাহিত্য কোনো এক আঞ্চলিক জীবনযাত্রার আখ্যান হয়। কিন্তু কথকের বা বর্ণনাকারীর ভাষা হতে হবে অবশ্যই “মানভাষা”, যেহেতু তিনি সাহিত্যিক হিসাবে বাইডিফল্ট মধ্যবিত্ত। তিনি “শুদ্ধ” বাংলায় চাষাভুষার জীবন নিয়ে আলেখ্য রচনা করবেন, আর সততার খাতিরে চাষাভুষার মুখের ভাষা সেরকমই বহাল রাখবেন। তাতে আপত্তি নেই। আপত্তিটা তখনই বাঁধে যখন সাহিত্যের ন্যারেটর বা বর্ণনাকারীর ভাষা প্রমিত বাংলা থেকে বিচ্যুত হয়। এ যেন সাহিত্যিকের এবং সাহিত্য-বিচারকের কেন্দ্রীয় চরিত্র থেকে মধ্যবিত্তের আধিপত্যকে খারিজ করে দেওয়ার সামিল! সাহিত্যে আটপৌরে ভাষার ব্যবহার নিয়ে আপত্তির জায়গাটা, আমার ধারণা এখানেই।

বর্তমান পরিসরে এ নিয়ে বিস্তারিত বলবার সুযোগ নেই। ঐতিহাসিকভাবে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে কেন্দ্রে বিবেচনা করেই সাহিত্যের প্রতিষ্ঠান এবং নন্দনতত্ত্বের প্রতীকগুলো গড়ে ওঠেছে। এখন কোনো সাহিত্যিক যদি সেই নির্মাণকে মান্য না করেন, তবে আশংকার ঘণ্টি স্বাভাবিকভাবে প্রথমেই বাজবে সাহিত্যের প্রতিষ্ঠানগুলোতে। কারণ তারাই মানদন্ডের রক এবং এর মাধ্যমে সহজেই তাদের আধিপত্য ধরে রাখা যায়। কিন্তু এটা আমরা ভাবি না যে প্রাতিষ্ঠানিক মধ্যবিত্ত ভাবনা আর সমাজে বিদ্যমান মধ্যবিত্ত ভাবধারা এক নয়। আবার এটাও হাস্যকরভাবে মনে করি যে, কেবল মধ্যবিত্তই চিরকাল অপরাপর শ্রেনীসমূহের পে শিল্পসাহিত্য করবে। কিন্তু ভাষা তো প্রবহমান ঘটনা, সে সমাজে বিদ্যমান শ্রেনীসমূহের মতাসম্পর্কের দর্পণও বটে। তাকে “প্রমিত” বাংলা নাম দিয়ে শতবর্ষ আগের কোনো সমঝোতার ঘেরাটোপে আটকানোর চেষ্টা অর্থহীন, কিভাবে অর্থহীন ফারুকী সেটা সংেেপ বলেছেন। আমার বলবার বিষয় হল, যে বিচারে আমরা সাহিত্যের চরিত্রগুলোর মুখে আঞ্চলিক ভাষাকে বৈধ ভাবি, সেই একই বিচারে বর্ণনাকারীর আঞ্চলিক ভাষাকেও বৈধ ভাবতে পারি। সাহিত্যিকের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি থেকে মধ্যবিত্তকে রেহাই দেয়ার দরকার কিছু আছে, কারণ মুষ্টিমেয় কিছু বাদে মধ্যবিত্তের একটি বিরাট অংশ কিন্তু সাবঅল্টার্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে। বর্তমানের সাহিত্যিক মধ্যবিত্ত কিন্তু সেই উদ্বেগ থেকে বিকশিত হচ্ছে। ফলে, জীবনের প্রয়োজনে, হরহামেশাই তাকে প্রমিত বাংলার বাউন্ডারি টপকাতে হচ্ছে।

আরেকটা বিষয়, প্রমিত বাংলার সাথে শুধু যে উচ্চবিত্তের গ্লোবালাইজড ডিজুস বাংলা মিশছে তা নয়, মিশছে শাহআলম সরকার/মমতাজের “ফাইট্টা যায়” বাংলাও। একইভাবে, নিম্নবিত্তের বাংলায়ও গ্লোবালাইজেশনের প্রভাব পড়ছে এমন দেখতে পাই। এটাকে মিলনমেলা বা কুরুত্রে যাই বলুন, তা থেকে মধ্যবিত্তীয় প্রমিত দূরত্ব বজায় রাখা অসম্ভব, কার্যত সেটি প্রমিত বাংলাকে আরেকটা মৃতভাষায় পরিণত করার সামিল। বরঞ্চ এই নেয়াদেয়ার প্রক্রিয়ায়, শ্রেণীসমূহের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের এই প্রকাশ্য ও গোপন যুদ্ধে কোন্ শ্রেণীর ভাষা কিভাবে বদলাচ্ছে সেটা দেখার বিষয়। শিল্পসাহিত্য বা নাটক সেই যুদ্ধের ময়দান হতে প্রস্তুত, আর অন্যান্য “আনুষ্ঠানিক” প্রয়োজন মেটাবার জন্য না হয় প্রমিত বাংলাই থাকুক।

শুক্রবার, ১৫ আগস্ট, ২০০৮

গরিবের বিনোদন


- আপনে গো টিভি-তে কি জি-সিনেমা আছে?
- আছে।
- স্টার প্লাস?
- স্টার প্লাস তো নাই!
- না থাকলে কেমনে চলে? স্টার প্লাসের সিরিয়াল না দেখলে আমার ঘুম আহে না।


শহুরে গরিবগোষ্ঠীর কাগুজে মতায়ন নিয়ে উচ্চ/মধ্যবিত্তের সমাজে নানান চুটকি চালু আছে। গার্মেন্টস শিল্পের প্রসারে সমাজ থেকে যেভাবে ‘কাজের বুয়া’ নামক শ্রেণীটি বিদায় নিচ্ছে, তা বিত্তবানের জন্য বেশ দুশ্চিন্তার। তাই, যারা গার্মেন্টস-মোহমায়ার চক্করে না গিয়ে এই প্রাচীন পেশায় বর্তমান আছেন, তারা পাণ্ডা প্রজাতি থেকে কিন্তু কোনো অংশে কম মহান নন। আর, বলা হয়, সেই মহত্বের পূর্ণ মূল্য আদায় করতেও সম তারা। ফলে, নিয়োগকর্তার টেলিভিশনে কী কী চিত্তাকর্ষক চ্যানেল আছে, সেইটা কখনও তাদের কর্মস্থল নির্বাচনের ক্রাইটেরিয়া হয়ে দাঁড়ায়। এরকম সম্ভাবনাকে চুটকি বানিয়ে খুব একচোট হাসেন তারা।


তারা আসলে হাসেন কী নিয়ে? স্পষ্টতই গরিবের বিনোদন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। যেন ‘বিনোদন’ নামক কর্মকাণ্ডে বিত্তবানেরই একচ্ছত্র অধিকার! গরিব বিনোদন চাইলে তাদের হাসি পায়। বিত্তবানের বুয়াসংকট বা ডিমান্ড-সাপ্লাই পেজগির চক্করে গরিব তার বিনোদন আদায় করে নিচ্ছে, এটাই হাসির উপলক্ষ।



বিনোদন-বাজারে গরিব ঢুকল কিভাবে

বাংলাদেশে সত্তর দশক পর্যন্ত অডিওভিজুয়াল বিনোদনমাধ্যমগুলো মোটামুটি মধ্যবিত্তের এখতিয়ারে ছিল। যারা বিনোদনমাধ্যমে ‘রুচির পতন’ দেখতে পান তারা সেটা দেখতে শুরু করেন আশি দশকের গোড়া থেকে। তার আগে Ñ কী চলচ্চিত্র, কী সঙ্গীত, কী টেলিভিশনে দাপট ছিল মধ্যবিত্তের। মূলধারার ভিতরে থেকেই আলমগীর কবির ‘সূর্যকন্যা’ বা ‘সীমানা পেরিয়ে’র মত ছবি বানাচ্ছেন, অডিওতে ধুন্ধুমার বাজছে হেমন্ত, মান্না দে বা শ্যামল মিত্র। আর টেলিভিশনের পক্ষে একটা হার্ডঅয়্যার হিসাবেও তখন মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমের বাইরে আসা সম্ভব ছিল না।

অডিও বাণিজ্যে গরিবের পক্ষে প্রথম সত্যিকারের ব্রেক-থ্রু ঘটে সঙ্গীতশিল্পী মুজিব পরদেশী-র আবির্ভাবের সাথে সাথে। তার আগে, সত্তর দশকে ব্যান্ডগুরু আযম খান ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’ গেয়ে গেয়ে একটা পরিবেশ তৈরি করেন বটে, কিন্তু সেই গান যতটা না ‘গরিবের গান’ তার চেয়ে বেশি ছিল ‘গরিবের জন্য গান’। শ্রেণীদূরত্ব কম থাকায় জনপ্রিয়তা বাড়ল বটে, কিন্তু সেই গানের জন্য গরিবের কানের তৃষ্ণা তৈরি হল না সেভাবে। একইভাবে, ফকির আলমগীর যেসব গান গেয়েছেন তা শেষপর্যন্ত গণসঙ্গীতের মধ্যবিত্তপনা। নিম্নবর্গের মানুষের বিদ্রোহ নিয়ে মধ্যবিত্তের নিজস্ব কল্পনা এবং ভ্যালু জাজমেন্ট।

আশির গোড়াতেই মুজিব পরদেশী এসে গাইলেন ‘আমি বন্দী কারাগারে’। হামলে পড়ল গরিব, কান ভারি হয়ে উঠল মধ্যবিত্তের। এসব আবার কী ধরনের গান? কাদের জন্য? প্রথম প্রশ্নের উত্তর তাদের দরবারে হয়ত এখনও পৌঁছায় নাই, কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব মিলল চটজলদি: এসব হচ্ছে গরিবের গান।

গরিব তাহলে গানও শোনে? তাও ক্যাসেট কিনে পয়সা খরচ করে? ততদিনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো পয়সায় গ্রামে গ্রামে ক্যাসেট প্লেয়ার ছড়িয়ে পড়ছে। মুজিব পরদেশীর ‘কলঙ্কের ঢোল’ এর কাটতি হল রেকর্ড পরিমাণ। সেই প্রেরণায় রেকর্ড কোম্পানিগুলো গ্রামে-গ্রামে ঘোরা বয়াতিদের ধরে-ধরে ক্যাসেট বের করল বেশ কিছু। সেগুলোও মন্দ চলল না।

শহুরে শিক্ষিত শ্রেণী এটাকে একটা আকস্মিক ঘটনা হিসাবেই দেখল শুরুতে। তাদের কেউ কেউ শংকা প্রকাশ করলেন রুচির পতন বিষয়ে, কারো কারো কাছে মনে হল এটা কোনো মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর কীর্তি। এরকম একটা সিদ্ধান্তহীনতা যখন চলছে, মমতাজ তখন দৃশ্যপটে এলেন ভীরু ভীরু পায়ে। সেটা আশি দশকের শেষাশেষি।

মাত্র পাঁচ বছর ব্যবধানে বাংলাদেশের অডিও বাজারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলেন মমতাজ। তার জন্য গান লিখতে থাকলেন আরেক বয়াতি শাহ আলম সরকার। এসব গানে চরিত্র হিসাবে আসতে থাকল শহরের অদৃশ্য আর বোবা জনগোষ্ঠী: গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাওলা, বাস ড্রাইভার, বেওয়ারিশ লাশ ইত্যাদি। এসব গানে প্রেম মানে হল অতি অল্প সময়ের মধ্যে কিছু জরুরি বোঝাপড়া, বিরহ মানে হচ্ছে ছেড়ে-আসা গ্রামের প্রতি টান বোধ করা, মৃত্যু মানে হচ্ছে দাফনকাফন ছাড়া ভূগর্ভস্থ হওয়া, নৈঃশব্দ মানে হচ্ছে চোখের সামনে বড়লোকের দুর্নীতি দেখে দেখে মুখ বন্ধ রাখার চর্চা। তারা এসে পপুলার বাংলা গান থেকে প্রবল বিক্রমে হটিয়ে দিলেন সংখ্যালঘু শিক্ষিত বেকার, বিলাসী এবং বিরহী প্রেমিকদের। সর্বাধিক একক এলবামের গায়িকা হিসাবে মমতাজের নাম উঠল গিনেস বইতে। ‘বুকটা ফাইট্টা’ গেল শিক্ষিত মধ্যবিত্তের! তাকে ‘অশ্লীল’ আখ্যা দেয়া হল নানান তরফ থেকে, বলা হল এগুলো ‘অপসংস্কৃতি’ এবং ক্ষতিকারক।

কিন্তু ঠেকানো গেল না তাকে: মমতাজই হয়ে উঠলেন গরিবের বিনোদন-আইকন। তাকে ঘিরে আশপাশের পালাবদল আরো মজাদার। ক্যাসেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সাউন্ডটেক আর সঙ্গীতার দীর্ঘদিনের আধিপত্যে ভাগ বসাল সিলেট বেজড শাহজালাল রেকর্ডিং। নিম্নবর্গের উত্থানের তাত্ত্বিক কিংবা কর্পোরেট প্রেরণায় ব্যান্ড শিল্পী জেমসের কাঁধে গামছা ওঠল, মাকসুদ আর বিপ্লব জিনস ছেড়ে বাউলের আলখাল্লার ভেতর ঢুকে পড়লেন। তাদের এলবামের প্রমোশনালে এবং স্টেজ শো-তে গীটারের সমান মর্যাদা পেতে শুরু করল দোতারা। ড্রামের চেয়ে কখনও কখনও দেশী ঢোল দড় হয়ে ওঠল। বাজার ফিরে পাওয়ার আশায় অবশেষে মমতাজের সাথে ডুয়েট এলবাম করলেন অনেক নামীদামী শিল্পী। একসময় যেটা ‘পাপ’ ছিল, ক্রমে সেটাই হল পাপস্খালন।

যে গরিব এতকাল দূর থেকে তার মনিবের টেলিভিশন বা মিউজিক প্লেয়ারের নীরব অনাকাঙ্ক্ষিত গ্রাহক হয়ে ছিল, ক্রমে তারাই হয়ে দাঁড়াল এর রুচিনির্ধারক। বিত্তবানের নিন্দা কিংবা ভ্রুকুটি কোনোটাই আর এই প্রবাহের রাশ টেনে ধরতে পারল না। গরিবের মমতাজ-বন্যায় ভেসে গেলেন ছোটবড় অনেক জনপ্রিয় সঙ্গীত তারকা। সিনেমা হলের দখল গরিব সত্তর দশকেই নিয়েছিল, এখন দখল নিল অনেকটা টেলিভিশন আর প্রায় সবটা অডিও বাজারের। ‘রুচিশীল’ বিত্তবানের জন্য কেবল বাকি থাকল রাইফেলস স্কয়ার, বসুন্ধরা কিংবা আইডিবি ভবনের দুয়েকটা ডিভিডি-র দোকান। কিন্তু কতদিন?


গরিব এত বিনোদন চায় কেন

সায়দাবাদ ধলপুর সিটিপল্লী বস্তিতে অডিও-ভিডিওর পাঁচ-পাঁচটা চালু দোকান দেখে আমার মনে এই প্রশ্নের উদয় হল। কথা বললাম একজন দোকান-মালিকের সাথে। এর আগে তার দোকান ছিল মধ্যবিত্ত এলাকা মালিবাগে। সেখান থেকে গুটিয়ে তিনি এসেছেন এই বস্তিতে, শ্রেয়তর ব্যবসার আশায়। তার অ্যাডভেঞ্চার যে সফল, সেটা আকর্ণ হাসি থেকেই বেশ বোঝা যাচ্ছিল। একটা বস্তিতে পাঁচ-পাঁচটা অডিও-ভিডিওর দোকান, একটাও ব্যাংক নেই, এনজিও আছে দুতিনটা।

ব্যাংক নাই, কিন্তু ব্যাঙের ছাতার মত সঞ্চয়ী সমিতি আছে বস্তিতে। তারাও এনজিও, নানান হারে গরিবকে টাকা জমাতে উদ্ধুদ্ধ করে, তারপর এক সুন্দর সকালে সবাই ঘুম ভেঙে উঠে দ্যাখে, সমিতির সাইনবোর্ড উধাও। বস্তির খুব কম লোককেই দেখেছি যাদের জীবনে একবার এরকম দু-দশহাজার টাকা খোয়া যায় নাই। সাইনবোর্ড উধাও হয়, নতুন সাইনবোর্ড আসে, নতুন নতুন মুচলেকা সহ। কিন্তু যে লাউ সেই কদু-ই শেষপর্যন্ত।

বস্তির গরিব আসলে কতটা আয়গরিব? স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন নিয়ে একবার বস্তিতে কাজ করতে গিয়ে তাদের রোজগারের ডাটা নিতে হয়েছিল। দেখলাম, তাদের অনেকের রোজগার আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের চেয়ে বেশি। কিন্তু তবু তারা গরিব, নিম্নমধ্যবিত্তও নয়। কারণ, নিম্নমধ্যবিত্ত উত্থানরহিত নয়। তাদের সম্ভাবনা আছে স্বচ্ছল জীবনের, বস্তির গরিবের সেটা নাই। তাদের জন্য আছে এক কঠিন পাপচক্কর:


গাঁটে টাকা থাকলেই সেটা হয় সঞ্চয় সমিতি নামধারী প্রতারকদলের পেটে যাবে, না হয় চুরি ছিনতাই রাহাজানি পুলিশি ধরপাকড়ে যাবে। এই বাস্তবতা শহুরে গরিবকে নগদ ভোগের দিকে ঠেলে দেয়। তবে, গরিবের নগদ ভোগ মানে চিত্তবিনোদন, যেখানে বিত্তবানের ভোগ মানে উদর কিংবা যৌনবিনোদন। কেন? এটাও ভাবার বিষয়।


গরিবের বিনোদন মানে চিত্তবিনোদন কেন

‘বিনোদন’ -- এই শব্দটাকে যেভাবেই বলা হোক, গরিবের তাতে স্পষ্ট আপত্তি থাকে। এটা আমি ঢাকা শহরের প্রায় সব বস্তিতে দেখেছি। টেলিভিশন দেখাকে তাদের কাছে ‘বিনোদন’ মনে হলেও গানবাজনা শোনা-কে তারা কোনোভাবেই স্রেফ ‘বিনোদন’ হিসেবে ভাবে না। ভাবলে কী তি, আমি ভ্যানচালক মজিবুরকে জিজ্ঞেস করি। মজিবুর অল্পকথার মানুষ, কিছুটা নাটকীয়তা পছন্দ করে। আমাকে সে নিয়ে গেল ধলপুর বস্তি-লাগোয়া সরকারি সিটিপল্লী নামক তিনতলা ভবনের ছাদে। বলল, দেখেন তো, আমাদের বস্তিরে কী মনে অয়?

নয়ন খুলে গেল আমার। দেখলাম প্রত্যেকটা ঘরের চালের ওপর হয় লাল না-হয় সবুজ পতাকা।

মজিবুর বলল, লাল মানে মাইজভাণ্ডার আর নীল মানে সুরেশ্বর। বস্তিগুলোতে এই দুইটাই তরীকা। লাল হোক আর নীল হোক, গান দিয়াই আমরা আল্লারে ডাকি। আর কোনো রাস্তা নাই। প্রত্যেক বিষ্যুদবার বস্তিতে সুরেশ্বর তরীকাপন্থীদের গানের মজমা হয়। সারারাত গান হয়, জ্ঞান হওয়ার পর এই নিয়মের ব্যতিক্রম কেউ দেখে নাই বস্তিতে। এটাও একটা সাংগঠনিক প্রক্রিয়া, সমবায়ের ভিত্তিতে এর খরচনির্বাহ হয়। শহুরে বস্তিতে নেয়া নানান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ব্যর্থতাকে ভেংচি কাটার জন্যই কি এই গানের মজমা চালু আছে?

ভিক্ষা করে নদীভাঙা গুলবানু। বলল, বাপজান, আমাগো রক্তের মইধ্যে গান গো। আমাগো আর কিছুই নাই। খালি গানই আছে। অন্ধ কুদ্দুসও একই কথা বলল।

গান কেন স্রেফ ‘বিনোদন’ নয়? বড় ক্যানভাসে ভাবা যাক। শহরে গরিব আসে নিরুপায় হয়ে, ভাগ্যান্বেষণে। নদীভাঙা, ভিটাবেচা, সহায়শূন্য উন্মুল এই জনগোষ্ঠী। হাড়পেঁষা শ্রমের বিনিময়ে শহর তাদের খাদ্য দেয়, কোনোরকম থাকার সংস্থান দেয়। বিনিময়ে কেড়ে নেয় স্বাধীন প্রকাশভঙ্গি, বাকস্বাধীনতা এবং আরো কিছু মূল্যবোধ। এই শহরে যে রিকশা চালায়, তার মুখ দেখি না আমরা, শুধু পাছা দেখি। যে ভিা করে, তার হাত দেখি। এইরকম অদেখার চাপে তাদেরও মুখে মুখোশ চেপে বসে। তারা মধ্যবিত্তের দাপুটে মূল্যবোধের উপরিগ্রাহক হয়ে যায়। হঠাৎ করে তাদের দেখলে মনে হবে, তারা যেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বড় গ্রহীতা। মনে হবে, যেন নগরসভ্যতার অ্যালিয়েনেশন তাদের মজ্জাগত। মনে হবে, অসহায় অভিবাসনের কোনোই বেদনা নাই এইসব উন্মুল মানুষের চোখেমুখে। শহরের রুচি অনুযায়ী এমনি একটি শাদা মুখ পরে থাকে শহুরে গরিব।

অন্ধ কুদ্দুস যেমন বলে, দিনশেষে বস্তিতে যখন ফিরে আসে কর্মকান্ত মানুষ, তখন তার আয়নার সামনে দাঁড়ানো ফরজ হয়ে যায়। একমাত্র সঙ্গীত-ই পারে তার সারাদিনের মুখোশ খুলে তাকে নিজের অতীতের সামনে, সত্যিকারের বেদনাগুলোর সামনে দাঁড় করাতে। উদর কিংবা যৌনবিনোদন তাকে সেই বিশ্রামটুকু দেয় না। নিজের আবছা হতে-থাকা অস্তিত্ব, সেটা যত বেদনাময় হোক, তাকে হারাতে না দেয়াই গরিবের সবচেয়ে বড় বিনোদন। এবং প্রয়োজন। এজন্যেই গান। আর সে কারণেই গানকে তারা বিনোদন বলতে রাজী নন। এই গানই তাদের ধাঁধিয়ে যাওয়া চোখ থেকে মেট্রোপলিটান শহরের নিয়নবাতিগুলো খুলে নেয়। একচিলতে ঘরে কয়েক ঘণ্টার ঘুম ঘুমায় তারা, যদিও সেখানে দুঃস্বপ্নের ভেতর তাড়া করে আগুন আর বুলডোজার।