রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০০৮

সাবঅল্টার্ন-লজিকো-লোয়ারমিডলক্লাশ

"What can be said can be said clearly; what we cannot talk about we must pass over in silence."
Wittgenstein, Tractatus Logico Philosophicus

কবিসভায় আমরা ভার্চুয়াল ভার্চুয়াল খেলি। তবু গতরের শান্তি খুঁজতে মাঝে মাঝে মন শাহবাগে ধায়।
আজকেও ধাইলো। গিয়া লিপুর সাথে কথা। লিপু মানে ইফতেখার মাহমুদ, কবিসভার প্রায়-সাইলেন্ট কমরেড। তার সাথে অনেক আলাপ। মধ্যবিত্তের সাবঅল্টার্ন সাহিত্য লৈয়া। তখন মানস আসলেন। রাইসু আসলেন। আবীর আসলেন। সাবঅল্টার্ন-রাও আসলেন। ভার্চুয়ালি।

তারপর হ্যালো করলাম আহমেদ নকীবকে। তিনিও কবিসভার নীরব গ্রাহক। জানাইলেন, সাবঅল্টার্ন প্রণোদনা নিয়া আমার পজিশন তার পছন্দ হৈছে। তবু যেন একটু ধোঁয়াশা আছে। কৈলেন, আচ্ছা আমি ঢাকাবাসী মানুষ কবিতায় যদি হলুদ ট্যাক্সি উঠায়া দেই.....

- সেইটা এলিটিজম হয়া যায় কি না?

এইবার ফতোয়া দিবার পালা আমার। জোরেশোরে কৈলাম, না। সেইটা এলিটিজম হয় না। হয় যখন আপনে ঢাকাবাসী হৈয়া না-দেখা গেরাম নিয়া পাতলা দরদে মাতেন।

কয় দিন আগে এক দৈনিকে আমি গেরামবর্তী একটা গল্প উল্টাইতেছিলাম। সেইখানে দেখলাম কিভাবে বাঁশের টাট্টি (হাগুখানা)তে যাইতে হয় এরকম একটা সহানুভূতিশীল ম্যানুয়াল আছে। সেইটা গল্পের বিষয়বস্তু ছিল না। তবু লেখক দিলেন। আটষট্টি হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে!

আমি ভাবতেছিলাম, ঐ লেখক যদি উনার ফ্যাটবাড়ির বাথরুমে যাওয়ার ঘটনা লেখেন, তাইলে কি তিনি ক্যামনে ফ্ল্যাশ করা লাগে সেইটা লেখতেন?

হয়ত লেখতেন না। কারণ ঐটাতো তিনি জানেন। ডেইলি যাওয়া-আসা করেনও। তাই লেখনের দরকার নাই। এগজটিক না হৈলে লেইখ্যা কি কোনো আরাম আছে!

তাই গেরাম নিয়া লেখছেন। কারণ গেরাম এগজটিক। মধ্যবিত্ত জাতির কাছে গেরাম প্রমোট করা লাগে। গেরাম থিকা মধ্যবিত্ত লেখকের দূরত্বও প্রমাণ করা লাগে। এইটা এলিটিজম।

সুতরাং বাঁশের টাট্টির ভিতরেও এলিটিজমের ভুত থাকতে পারে। আবার হলুদ ট্যাক্সির ভিতরে নাও থাকতে পারে।

শুইনা আহমেদ নকীবের শান্তি লাগল। কৈয়া আমার তো আরো বেশি।

এইবার মানস থিকা একটা রেফারেন্স দেই। তিনি লেখছেন:

আমি এখনো ঠাহর করে উঠতে পারিনি যে সাবঅল্টার্ন গল্পরীতি বলতে সুমন রহমান যা ব্যাখ্যা করেছেন, তা আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি কিনা; কিংবা সেটাকেই আমার অনুধাবনের পরিকাঠামো বিবেচনা করে আগাতে চাই কিনা।


বিবেচনায় আনেন কি ফালায়া দেন, সমস্যা নাই মানস। তার আগে চলেন একটু স্পষ্ট কৈরা লই। আপনেও বোঝেন। আমিও বুঝি।

মাহবুব পিয়ালের কাছে কয় দিন আগে একদল লেখক এসেছিলেন। উনারা কলকাতার। দলিত সাহিত্য করার মানসে ধোপদূরস্ত জীবন ছাইড়া অতি কষ্টে গ্রামে বাস করতেছেন (স্যাক্রিফাইস!)। অদ্বৈত মল্ল বর্মণ উনাদের আইডল। দলিত সাহিত্য বলতে উনারা নিম্নবিত্তের জন্য এবং নিম্নবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা লয়া সাহিত্য বুঝান। সেইকথা শুইনা আমি ভুত দেখলাম। দলিত সাহিত্যের ভুত।

এইত সেদিন পিপলস এমপাওয়ারমেন্ট ট্রাস্ট নামে একটা সংস্থা শ্রমজীবী লেখকদের একটা সম্মেলন করল ঢাকায়। সেই উপলক্ষে একটা ম্যাগাজিনও বাইর করল। বিষয়টা আমার খুব মনেও ধরল। আমি খুশিমনে ম্যাগাজিনটা উল্টাইলাম। সেইখানে প্রথমেই দেখলাম, শ্রেণীসংগ্রাম নিয়া একটা বেশ ভারি প্রবন্ধ ঘরানার লেখা। লেখকের পরিচয় আছে, তিনি রিক্সা চালান। আমি চমকাইলাম। একজন রিক্সাওয়ালা প্রাবন্ধিক। তার ওপরে বামপন্থী। ঘটনা তো গুরুতর! তারপর সন্ধান কৈরা জানা গেল যে, উনার বামপন্থী ওরিয়েন্টেশনের ইতিহাস রিক্সা চালানের ইতিহাস থিকাও অনেক লম্বা। ভাবলাম উনার পাইচার্ট কেমন হৈতে পারে ? কত পার্সেন্ট রিক্সাওয়ালা তিনি, আর কত পার্সেন্ট বামপন্থী?

এইটা মনে হয় দলিত সাহিত্যের চেহারা, মানস। আপনে যেমন সেইখানে নাই, আমিও নাই।

এইবার চলেন ভিটগেনস্টাইন-স্টাইলে খোলাসা কৈরা কৈ। আমার পজিশন কিছু প্রিমাইজের ওপর দাঁড়ানো। যেমন:

১. আমার বিবেচনায় সাহিত্য একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিনোদন বা সৃষ্টিমাধ্যম। সাহিত্যের লেখক ও পাঠক উভয়ই মূলত মধ্যবিত্ত। লেখকের বিত্ত-প্রমোশন হৈলে তিনি আর সাহিত্য করেন না, আর বিত্ত-ডিমোশন হৈলে কিছুদিন রক্তবমি করেন, তারপর আস্তে আস্তে নদী নিস্তরঙ্গ হয়া যায়।

১.১ যেসব বিত্তশালী লোকদের আপনেরা লেখক হিসেবে দেখেন, উনাদের পয়সা থাকলেও উচ্চবিত্তের সংস্কৃতি নাই। কালচারালি উনারা মধ্যবিত্ত।

১.২ আবার যেনারা বস্তিতে থাকেন আর সাহিত্য করেন, আকারে বা প্রকারে তেনারা কোনোদিনই মধ্যবিত্তসীমানার বাইরে যাইতে চান নাই। আমি নিজে দেখছি, বস্তির মধ্যেও উনারা আপার কাশ তৈয়ার কৈরা রাখেন। ঘরে পর্দা টাঙ্গান।

২. এই আমাদের শ্রেণী। আমরা এই শ্রেণীমধ্যে গুরুসঙ্গ করি। তাহাদের কথা ভাবি। যাহারা ছোটলোক। গরীব। গ্রামে থাকে। বাঁশের টাট্টিতে হাগে। এই টাট্টি লৈয়া আমাদের মন সমব্যথায় ভৈরা ওঠে। অথচ টাট্টি থিকা বাইর হৈয়া গরীবের কত আরাম! আরাম নাই খালি আমাদের বিবেকের!

৩. এইটা হৈল বাংলাদেশের প্রগ্রেসিভ মধ্যবিত্ত লেখকের ক্যাসিক চেহারা। উনারা ভাবাদর্শের সন্তান। উনাদের শৈশব নীতিকথা-শাসিত।

৪. তাই, রাইসুরে আমি কৈতেছিলাম নিম্নমধ্যবিত্ত হওনের সাহিত্যিক সুবিধার কথা।

৪.১ আপওয়ার্ড মবিলিটি না থাকায় তাদের ভাবাদর্শের যন্ত্রণা খুব একটা পোহাইতে হয় না। পরন্তু, নীতিশাস্ত্রও তাদের জন্য ক্যারিয়ার হিসাবে ভাল দাঁড়ায় না। ফলে নীতিশাস্ত্র লংঘনের প্রশিণও লাগে না তার।

৪.২ মধ্যবিত্ত হৈয়াও সাবঅল্টার্ন শ্রেণীর নিকটতম দূরত্বে থাকে সে।
৪.৩ শ্রেণীচরিত্র লোপ পাইবার ভয় আছে তার। প্রগ্রেসিভ মধ্যবিত্ত লেখক নিজেরে ‘গ্রামবর্তী’ হিসেবে সখের ভাবনা ভাবতে পারে, কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত আরিক অর্থেই সাবঅল্টার্ন শ্রেণীতে পরিণত হৈবার ঝুঁকি মধ্যে থাকে। তাই সে আপন শ্রেণীর মিথলজি তৈয়ার করে। সেইখানে সাবঅল্টার্ন টেস্টের জন্য অনেক স্পেস রাখা লাগে তার। কিনশীপ নেটওয়ার্ক।

৪.৪ সাবঅল্টার্নের সাথে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লেখক যতটুকু দূরত্ব এবং নৈকট্য রক্ষা করেন, সেইটাই নতুন সাহিত্যের বড় প্লাসপয়েন্ট। তার নৈকট্য ভাবাদর্শজাত নয়, বরং অভিজ্ঞতাবলয়ের, আর দূরত্ব এলিটিজমের নয়, স্পেসের।

৪.৫ এই প্রেক্ষাপটে নন-এলিটিস্ট সাহিত্যের গ্যারান্টি কতটুকু? আমার মনে হয় এলিটিজমের ট্র্যাপ এইখানেও আছে, যেহেতু সে (নিম্ন)মধ্যবিত্ত। তবে সাহিত্যে এলিটিজম বিষয়টা আমার কাছে হার্ডল রেসের মত লাগে। দৌড়ানোর সময় যদি আপনের হার্ডল পইড়া যায়, তাইলে আপনি ডিসকোয়ালিফাই করেন না। কিন্তু পিছায়া যান।

সংস্কৃতি অধ্যয়নশাস্ত্র নয়, বা সাংস্কৃতিক ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদ নয়, বা অন্য কোনোরকম উৎপাতও নয়, আমি কৈছিলাম এইরকম সাদামাটা কয়েকটা কথা। ইহাদের নন্দনতাত্ত্বিক লেভেলিং আমার সাধ্যের/ইচ্ছার বাইরে, পদে পদে হঠকারী হৈয়া যাওনের ভয় তো আছেই। আমি শুধু ওয়ার্কিং ম্যানুয়াল খুঁজতেছি। বাঁশের টাট্টিতে হাগার ম্যানুয়াল না-বানাইবার সাহিত্য যাতে করতে পারি।

আসেন, এই প্রিমাইজগুলারে চ্যালেঞ্জ করা যাক।


ঢাকা, ১২/৮/৫


৪টি মন্তব্য:

সুমন চৌধুরী বলেছেন...

খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাত দিছেন।

আসল কথা হইল প্রিমিটিভ অ্যাকুমুলেশান। নিম্নমধ্যবিত্ত ঐটা পায় প্রাতিষ্ঠাণিক শিক্ষায়। সেইখানে সুপ্ত থাকে কোন একদিন ভবিষ্যতে আশেপাশের আরো দুইটা ভদ্রতরলোকের ক্রয়ক্ষমতা পাওয়ার চেতনা। এই চেতনা মনে হয় নিছক প্রানীর মতো জীবিত থাকার উপরে, কনজাম্পশানরে নিয়া আসে। অর্থাৎ ইন্টেলিজেনশিয়া বলতে যা বুঝায় সেইটা দিনের শেষে Bourgeoisie'র নানারকম স্তরেই পড়ে।

ডিক্লাসড ইন্টেলিজেনশিয়ার আইডিয়া মূলত লেনিনের। তার লাইন ছিল আছে বস্তু লইয়া বিচার। তাতে শ্রেণীচ্যুতির সহজ র‌ূপ হিসাবে সামনে আইছে শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতায় নাইমা যাওয়া । এই মুহুর্তের কর্তব্য স্থির করার জায়গা থিকা দেখলে সেইটাই যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। কিন্তু বস্তুর আভ্যন্তর গঠণ পাল্টায় না ইত্যাদি।

ঘটনা হইল আইজকা আমরা যারা এগুলি আলোচনা করি...কৈরা ইজি থাকি, তারা সবাই মধ্যবিত্ত (দুইচাইরজন হয়তো জোতদারমহাজনের পোলাপান)। আমরা এই বিশ্লেষণ কি পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে করি? নাকি নীতিকথা খাউজাইয়া পকেটে খাটো থাকার খেদ আড়াল করার উদ্দেশ্যে? ধরলাম দ্বিতীয়টাই ঠিক।

সেইক্ষেত্রে আমার কথা হইল যার যা ভাল্লাগে মানে যার যেই কাঠিতে পীঠ চুলকাইতে সুবিধা সে সেইটাই ব্যবহার করুক। যার ইচ্ছা সে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়ুক,অন্যরা হয় হুমায়ুন আহমেদ নয় কাজী আনোয়ার হোসেন নাইলে রসময় গুপ্ত পড়ুক। এইখানে আসলে কিছু বলার থাকে না।

তবে কেউ যদি সমাজ পরিবর্তনের লাইনে চিন্তা করতে যায় তাইলে তারে বস্তুজগতের নিয়মানুসারে প্রায়োগিক সৃষ্টিশীলতা দেখাইতে হইবো। সেইখানে শুধু লোকায়ত জ্ঞানে পোষাইবো না। ম্লেচ্ছদের জ্ঞানও লাগবো। সেই সুযোগটা আপাতত মধ্যবিত্ত ছাড়তাছে না।

যাই হোক।
আপনার সাইটটা আজকেই দেখলাম। খুবই ভালো সাজাইছেন।

আপনার লেখনীর জয় হোক!

সুমন রহমান বলেছেন...

চমৎকার এনগেজ করেছেন। সত্যি বলতে, আমার জায়গাটা যে মার্কসিস্টের সেইটা আপনার বলার আগে তেমন করে ভাবি নাই। তবে আয়রনি হল, আমাদের দেশের "মার্কসিস্ট"রা যখন সাহিত্যিক আলোচনা/পজিশনিং করেন তখন তারা যে কোন্ জ্বিনের পাল্লায় পড়েন খোদা জানেন। সেই জায়গাটি থেকে ভিন্ন বক্তব্য দিবার চেষ্টা আমার ছিল এই পোস্টে। এখন বোঝা গেল বাঙ্গাল মার্কসিস্টদের চেয়ে ভিন্ন একটি সাহিত্যিক নন্দনতত্ব অনুসন্ধান করতে গেছি বলেই হয়ত আমি মার্কসের মোকাম পর্যন্ত পৌঁছতে পারছি।

ধন্যবাদ আপনাকে।

পান্থ রহমান রেজা বলেছেন...

এইসব এলিটিজম, সাবঅল্টান তত্ত্ব কথা তেমন একটা বুঝি না। তবে আপনার লেখাটি বেশ ঝরঝরে হয়েছে। আমার মতো মাথামোটা পাঠকো মুল সুর ধরতে পেরেছে। পাছে শেষে এলোমেলো কী বলে ফেলি, সেই ভয়ে আমার ভালোলাগাটুকুই জানিয়ে যাচ্ছি।

সুমন রহমান বলেছেন...

এলোমেলো হওয়ার কিছু নাই। কথার ঝাপি উপুড় করে দিন সমস্যা নেই।

ধন্যবাদ পাঠের জন্য। ফলো আপ করুন, অচিরেই আরো কিছু....